ইউছুব ওসমান, জবি
প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০২৫ ১০:৩০ এএম
আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২৫ ১১:৪৯ এএম
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম ও সেবার দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। এসব কারণে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এই দপ্তরটি। তাদের অভিযোগ, এখানে প্রতিটি কার্যক্রমে রয়েছে অকারণ দেরি, কর্মচারীদের অব্যবস্থাপনা ও দুর্ব্যবহার। এদিকে কর্মকর্তাদের অনেককেই পাওয়া যায় না অফিসে। সেবা নিতে বারবার ঘুরতে হয় শিক্ষার্থীদের। এমনকি কোনো শিক্ষার্থী কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করলে মন খারাপ হয় এই দপ্তরের অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীর। বিনিময়ে শুনতে হয় তিরস্কার, মিলে দুর্ব্যবহার। আধুনিক যুগে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি দপ্তরের সেবার আদিম ব্যবস্থাপনা বিলুপ্ত করে ডিজিটালাইজেশনের দাবি তুলেছেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে পরীক্ষা ও ভর্তি সংক্রান্ত ফি পরিশোধের একটি অংশ ডিজিটাইজেশনের আওতায় আনা হলেও অধিকাংশ ব্যবস্থাপনা এখনও বহাল আছে মান্ধাতার আমলের নিয়মে। সনদপত্র, ট্রান্সক্রিপ্ট, নম্বরপত্র, প্রত্যয়নপত্র কিংবা অন্যান্য কাগজপত্র উত্তোলনের ফি পরিশোধ করতে গিয়ে তাদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে নানা ধরনের হয়রানির। ফি জমা দিতে হয় নির্দিষ্ট ব্যাংকে, তবে সেখানে আবেদনপত্র ও অনুমোদনের নানা ধাপ পেরোতে গিয়ে সময় ও ধৈর্যের কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়। যে স্লিপে ফি পরিশোধ করতে হয়, তা অনেকগুলো তথ্য দিয়ে একটির ফি পরিশোধের জন্য চারটি অংশ পূরণ করতে হয়। এতে প্রচুর সময়ের অপচয় আর ভোগান্তি পোহাতে হয় শিক্ষার্থীদের। ব্যাংকেও লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এমনকি ফি পরিশোধের পর সিলমোহর আর স্বাক্ষরের জন্য দৌড়াতে হয় পুরো ক্যাম্পাস। এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে দৌড়াতে দৌড়াতে ক্লান্ত দিন কেটে গেলেও মেলে না কাঙ্ক্ষিত সেবা।
মনির হোসেন নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমাকে স্নাতকের সাময়িক সনদ, ট্রান্সক্রিপ্ট, নম্বরপত্র তুলার জন্য প্রতিটার জন্য আলাদা ফরম পূরণ করতে হয়েছে। আলাদা পেমেন্ট স্লিপ পূরণ করতে হয়েছে। প্রতিটা স্লিপের আবার ৪টি করে অংশ। সেখানে অনেকগুলো তথ্য লিখতে হয়। অথচ একটা স্লিপেই সব করা যেত, সেটা তারা নেবে না।
সরেজমিন দেখা গেছে, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরে অধিকাংশ সময় বেশিরভাগ কর্মকর্তা অনুপস্থিত থাকেন। কয়েক কর্মকর্তার কক্ষে ১ ঘণ্টারও বেশি সময় অপেক্ষা করেও দেখা পাওয়া যায়নি। সেবা নিতে এসে ঘুরে যান সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা। সম্প্রতি অভিযোগের বিষয় খতিয়ে দেখতে দপ্তরটিতে গেলে, এক কর্মকর্তার নামের সঙ্গে ভাই সম্বোধন করে তিনি কোথায় বসেন জানতে চাইলে বাইরে রিসিপশনে বসা এক কর্মচারী এই প্রতিবেদকের ওপর চড়াও হোন। ওই কর্মকর্তাকে কেন ‘ভাই’ সম্বোধন করা হলো তার কৈফিয়ত জানতে চান। সব কর্মকর্তাকে স্যার ডাকতে হবে বলে তিনি জানান। এদিকে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এমনিতে সেবা নিতে ভোগান্তি পোহালেও, কর্মচারীদের চাহিদামতো টাকা দিলেই সহজেই সেবা পাওয়া যায়। আবার বিভিন্ন জায়গা থেকে সুপারিশ এলে তারা সেবা পায়। তবে ভোগান্তি পোহাতে হয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের।
সদ্য স্নাতক পাস করা নাহিদা রহমান নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমি স্নাতকের সাময়িক সনদ আর ট্রান্সক্রিপ্ট তুলতে তিনবার গেছি। আমাকে যেদিন যেতে বলা হয়েছিল, সেদিনই গেছি। প্রতিবারই বলা হয়েছে ‘স্যার নাই’, ‘কাল আসেন’। এত কম সময়ে এসব কাজ হয় না। আরও সময় লাগবে। কর্মচারীদের সঙ্গে কথাও বলা যায় না। কিছু জিজ্ঞাসা করলেই খারাপ আচরণ করে।
এদিকে এই দপ্তরটিতে সেবা নিতে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমাতে সেবার ডিজিটালাইজেশনের দাবি শিক্ষার্থীদের। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের এমন ভোগান্তির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দিন দিন ক্ষোভ বাড়ছে। তারা চান, পুরো প্রক্রিয়াটি যেন অনলাইনে আনা হয়, যাতে ফি পরিশোধ থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র উত্তোলন পর্যন্ত সবকিছু ডিজিটালি করা যায়। এতে সময় বাঁচার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তিও কমবে বলে জানান তারা। তারা বলছেন, পরীক্ষা ও ভর্তির অনলাইনে যেভাবে দেওয়া হচ্ছে, এসব সেবার ফি অনলাইনে করা হলে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমে আসবে। সহজ হবে সেবাদান প্রক্রিয়াও।
মুন্নি আক্তার নামের সদ্য স্নাতক পাস করা এক শিক্ষার্থী বলেন, এই দপ্তরের সব কার্যক্রম অনলাইনে চালু করা হলে ভোগান্তি কমে আসবে। তাহলে সহজে ফি পরিশোধ করা যাবে। স্বাক্ষর সিলের জন্যও বিভিন্ন জায়গায় দৌড়াতে হবে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম বলেন, সেবাগুলোর ডিজিটালাইলেজশন করা গেলে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমে যাবে। আমি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলব। শিক্ষার্থীদের সুবিধা নিশ্চিত করতে যা করা যায় সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেব।