বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০২৫ ২২:৫০ পিএম
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। ফাইল ছবি
দীর্ঘ ৯ বছর পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালযয়ে (চবি) সমাবর্তনের আয়োজন করছে প্রশাসন। আগামী ১৪ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হবে। সমাবর্তনের শর্তাবলিতে বলা হয়, ‘যারা মূল সার্টিফিকেট উত্তোলন করেছেন, তারা পঞ্চম সমাবর্তনে অংশগ্রহণের জন্য আবেদন করতে পারবেন না।’ সমাবর্তনের এ শর্ত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।
এবারের সমাবর্তনে ২০১১-২০২৩ পর্যন্ত স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীগণ অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন। রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া শুরু হবে আগামী ১৫ মার্চ।
শিক্ষার্থীদের দাবি, দীর্ঘ ৯ বছর কোনো সমাবর্তন হয়নি। সমাবর্তনের আশায় তারা ৯ বছর সার্টিফিকেট না তুলে বিশ্ববিদ্যালয় রেখে দিবেন এটি অবান্তর। এত বছরে নানা কাজে তারা মূল সার্টিফিকেট উত্তোলন করেছেন। সার্টিফিকেটের জন্য তারা এমন আয়োজন থেকে বাদ পড়বেন- সেটি চরম অন্যায়। প্রয়োজনে এটি অন্য কোনোভাবে ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এছাড়া চতুর্থ সমাবর্তনে মূল সনদপ্রাপ্তদের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এবারও তাই করা হোক। শর্ত অনুযায়ী সমাবর্তন করা হলে হাজারো শিক্ষার্থী বাদ পড়বে।
তবে এসব সমালোচনা আমলের নিচ্ছে না প্রশাসন। প্রশাসন বলছে, সমাবর্তন মানে সনদ নেওয়া। সনদ নিয়ে নেওয়ার পর সমাবর্তনে অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ নেই।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী জাওয়াদ হোসাইন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতি বছর সমাবর্তন করে এজন্য যাতে শিক্ষার্থীরা পাস হওয়ার পরপরই সনদ পেয়ে যায়। তাদের উচ্চ শিক্ষার জন্য বাইরে যেতে হয়, গবেষণার জন্য বাইরে যেতে হয়, চাকরির জন্য লাগে সনদ। এসব জায়গায় তো সাময়িক সনদের কোনো মূল্য নেই। তাহলে ১০ বছর পর সমাবর্তন করবে, শিক্ষার্থীরা কি সমাবর্তনের জন্য মূল সনদ বিশ্ববিদ্যালয়ে রেখে দিবে?
বাংলা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী লোকমান হাকিম বলেন, চাকরির ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় মূল সনদ প্রয়োজন হয়। তাই আমরা তা উত্তোলন করে ফেলেছি। নিয়মিত সমাবর্তন হচ্ছে না- এটা আমাদের দায় নয়। অথচ এটার কারণে প্রশাসন আমাদেরকে এত বড় ইভেন্ট থেকে বাদ দিয়ে দিচ্ছে। চতুর্থ সমাবর্তনে যারা মূল সার্টিফিকেট উত্তোলন করেছিল, তাদেরকেও সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। আমরা চাই এবারও তা-ই করা হোক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মো. শহিদুল ইসলাম ফেসবুকে লিখেন, বেশিরভাগ শিক্ষার্থী মূল সনদ তুলে ফেলছে নিজ প্রয়োজনে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবছর সমাবর্তন আয়োজন করে না। ১০ বছর পর পর সমাবর্তন হবে আর আজাইরা নিয়ম দিয়ে অনেককে সবচেয়ে সুন্দর ইভেন্টা থেকে বঞ্চিত করবে! প্লিজ, একটা কিছু করেন, যাতে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারে!
সাবেক শিক্ষার্থী জারিন তানজুম সোহানি ফেসবুকে লিখেন, হ্যালির ধুমকেতুর ছোট বোন চবির ‘ধুমকেতুইয়ান সমাবর্তন’ করবে এক যুগ পরপর। আর প্রশাসন আশা করবে- সাবেক শিক্ষার্থীরা বিদেশে না গিয়ে, চাকরি না করে, মূল সনদ না তুলে, হাত গুটিয়ে ঘরে বসে থাকবে? ঢাবিসহ দেশের অন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রাইভেটের মত ২/৩ বছর পরপর সমাবর্তন দিলেও তাদের এ শর্তের যৌক্তিকতা থাকত। যেহেতু চবির সমাবর্তন হওয়া অনিশ্চিত একটা বিষয়, তাই এক্ষেত্রে চবিয়ানরা বাধ্য হয়েই নিজের মূলসনদ নিজে তুলে নেয়। সেজন্য এক্সেপশনাল কেস হিসেবে এবং নিজেদের ব্যর্থতার দায় থেকেই মূল সনদ উত্তোলনকারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হোক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, সমাবর্তনের রেজিস্ট্রেশনের যেসব শর্তাবলি দেওয়া হয়েছে তা পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই। যদি প্রশাসন সবাইকে সমাবর্তনে সুযোগ দিতে যায়, তাহলে বেসামাল একটা অবস্থা হবে। সমাবর্তন মানেই সার্টিফিকেট নেওয়া। সার্টিফিকেট নিয়ে নেওয়ার পর আসলে এ ধরনের কোনো সুযোগ নেই। সমাবর্তন রেগুলার কেন হয়নি- সেটা আগের প্রশাসনই ভালো বলতে পারবেন। এখন থেকে আমরা প্রতিবছর বা দুই বছর পরপর সমাবর্তন করব।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, আসলে এ বিষয়ে আমাদের কিছু করার নেই। আমরা ২০১১-২০২৩ পর্যন্ত পাস করা শিক্ষার্থীদের জন্য সমাবর্তন আয়োজন করছি। এখানে প্রচুর শিক্ষার্থী রয়েছে। সমাবর্তনকে নিয়মিত করার জন্যই মূলত আমরা ২০২৩ সাল পর্যন্ত যুক্ত করেছি। আগের সমাবর্তনে সনদ উত্তোলনকারীদের সুযোগ দেওয়ার যে কথা বলা হচ্ছে সেখানে অল্প কয়েকজনকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সুযোগ দিলে সবাইকে দিতে হবে, কাউকে বাদ দেওয়া যাবে না। তাই সমাবর্তনের সিস্টেমের মধ্যে থেকেই আমাদেরকে কাজ আগাতে হবে।
চবিতে এ পর্যন্ত চার বার সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বপ্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৪ সালে। এরপর দ্বিতীয়টি ১৯৯৯ সাল, তৃতীয়টি ২০০৮ সাল এবং চতুর্থ সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৬ সালে।