ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার
প্রকাশ : ৩০ জানুয়ারি ২০২৫ ১০:২৩ এএম
আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৬:২৬ পিএম
শ্রীমঙ্গলের কাকিয়াছড়া চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রবা ফটো
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ৭০টি বিদ্যালয়ে নেই নিয়মিত প্রধান শিক্ষক। এতে এসব বিদ্যালয়ে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে উপজেলা শিক্ষাব্যবস্থায়।
জানা গেছে, শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১৩৮টি।
মামলা, পদোন্নতি জটিলতা ও নিয়োগ বা পদায়ন না হওয়ায় এর মধ্যে প্রধান শিক্ষকের ৭০টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে ৩৫ জন প্রধান শিক্ষক পদমর্যাদা নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলছে। বাকি ৩৫টি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক থেকে পদোন্নতি কার্যক্রম জটিলতায় এবং নিয়োগ না হওয়ায় আটকে রয়েছে প্রধান শিক্ষক পদায়ন। শুধু তাই নয়, উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের ২২টি পদও রয়েছে ফাঁকা। প্রধান শিক্ষক না থাকায় সহকারী শিক্ষকরা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে। ফলে অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক স্বল্পতার কারণে স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ বা পদোন্নতি না হওয়া এবং জাতীয়করণ হওয়া কিছু বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদ নিয়ে উচ্চ আদালতে দায়ের করা রিট পিটিশনের কারণে চলতি দায়িত্ব প্রদান ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে চালানো হচ্ছে বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রম। ফলে বিরূপ প্রভাব পড়ছে শ্রীমঙ্গলের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায়।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, শ্রীমঙ্গল উপজেলায় মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৩৮টি। এর মধ্যে ১৯৭২ সালে জাতীয়করণ হওয়া বিদ্যালয় ৬৬টি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক বলেন, উপজেলার ১৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৭০টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। সেখানে সহকারী শিক্ষকদের ভেতর থেকে চাকরির মেয়াদের জ্যেষ্ঠ কাউকে ওইসব বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিনিয়তই প্রশাসনিক কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে ওই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে। ফলে অনেক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকদের পালাক্রমে পাঠদান করাতে হচ্ছে। এতে শিক্ষকদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে।
উপজেলার পাত্রীকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সমীর দেব বলেন, 'আমাদের বিদ্যালয়ে দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন ছয়জন। এর ভেতর থেকে একজন দায়িত্ব পালন করছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে। তাকে প্রায়ই প্রশাসনিক কাজে বিদ্যালয়ের বাইরে যেতে হয়। ফলে পাঁচজন সহকারী শিক্ষক দিয়ে পাঁচটি শ্রেণির কার্যক্রম চালাতে আমাদের গলদগর্ম হতে হয়। এর মধ্যে কেউ ছুটিতে গেলে সমস্যা আরো বাড়ে।'
কামারগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সঞ্জয় শর্মা বলেন, 'আমাদের বিদ্যালয়ে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত একসঙ্গে আড়াই শতাধিক শিক্ষার্থীকে পাঠদানের জন্য মাত্র ছয়জন শিক্ষক কর্মরত। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে আমাকে প্রশাসনিক কাজও করতে হচ্ছে। ফলে শ্রেণি কার্যক্রমে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।’
কৃষ্ণরাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জয়শ্রী দেব বলেন, 'আমাদের বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষক রয়েছেন পাঁচজন। শিক্ষার্থী শতাধিক। পাঁচজন শিক্ষক দিয়ে এমনিতেই বিদ্যালয়ের শ্রেণি কার্যক্রম চালানো কষ্টকর। এর মধ্যে আমাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ায় সব সময় শ্রেণিতে পাঠদান করতে পারছি না। ফলে শিক্ষা কার্যক্রমে সমস্যা হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরাও সংকটে রয়েছে। দ্রুত প্রধান শিক্ষক নিয়োগ করে সংকটের সমাধান করার জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি কামনা করছি।'
শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে ২০১৭ সাল থেকে পদোন্নতি এবং নতুন নিয়োগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার ৭০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকার কারণে সহকারী শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। অনেক সহকারী শিক্ষককে একই সময়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। একসঙ্গে পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চালাতে গিয়ে শিক্ষকদের ওপর চাপ বেড়েছে এবং নিয়মিত পাঠদানেও ব্যাঘাত ঘটছে।’ তিনি বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক নিয়োগের জন্য তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, শিগগির সমস্যার সমাধান হবে এবং শূন্য পদ পূরণ করা হবে। তবে মামলার জটিলতা এবং অন্যান্য কারণে শূন্য পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া কিছুটা দেরি হতে পারে।’