বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৫ ২১:৫৩ পিএম
আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২৫ ২১:৫৪ পিএম
সংলাপে বক্তব্য রাখছেন আলোচকরা। প্রবা ফটো
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) সকল সক্রিয় ছাত্রসংগঠনের অংশগ্রহণে ‘ছাত্র রাজনীতির সংস্কার: প্রসঙ্গ জাকসু, ডাকসু, চাকসু, রাকসু...’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার (৬ জানুয়ারি) বিকেল ৪টায় বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ জাবি সংসদের আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান মিলনায়তন সেমিনার কক্ষে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ছাত্র অধিকার পরিষদের সদস্য সচিব ইকবাল হোসেন।
সংলাপে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লা বলেন, ‘ছাত্র রাজনীতি ক্ষমতার উৎসে থাকলে চাঁদাবাজি থাকবে না৷ জবাবদিহিতা থাকবে৷ এজন্য রাজনীতিবিদদের অর্থনৈতিক উৎস নিয়ে আলেচনা হওয়া উচিত৷ তাহলে স্বচ্ছতা ফিরবে৷ জাতি গঠনের শুরু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি বাদ দিতে হবে।’ জাতীয় নির্বাচনের আগে জাকসু দাবি করে তিনি বলেন, ‘জাকসুর লক্ষে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা ছাত্রপ্রতিনিধিদের নিয়ে প্রতিনিধিত্বশীল আলোচনার ব্যবস্থা করা দরকার। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরবে। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিয়ে সংঘাত হবে না৷ সকলকে নিয়ে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে।’
ছাত্রশিবিরের প্রকাশনা সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ আলোচনায় কয়েকটি প্রস্তাব রাখেন। প্রস্তাবগুলো হলো- সরকারি ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক সিন্ডিকেট, আধিপত্য বিস্তার প্রভূতিতে যুক্ত ছিল। সে জায়গা থেকে ফিরে এসে ছাত্র রাজনীতিকে আদর্শ জায়গায় নিয়ে আসতে হলে সরকারি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের বিধিমালা প্রণয়ন করা ও নির্বাচনের জন্য নীতিমালা তৈরি করা; ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে আন্তঃকোন্দল দূর করে সহাবস্থান নিশ্চিতে উদ্যোগ নেওয়া; ছাত্রসংগঠনকে লেজুরবৃত্তিমুক্ত করা ও সংগঠনের অফিসগুলো জ্ঞানচর্চার জায়গা হিসেবে তৈরি করে প্রিয় অভিভাবকের ছবি টানানো বাদ দেওয়া; বিরোধী মত দমন করার সংস্কৃতি বন্ধ করা; শিক্ষার্থী-শিক্ষক খুনের মতো সংঘাতময় ছাত্ররাজনীতির বন্ধ করা ও ছাত্ররাজনীতি পরিচালিত হবে ছাত্র সংসদকেন্দ্রীক৷
ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর বলেন, ‘সব সংস্কারের আগে রাজনীতি সংস্কার দরকার ছিল। রাজনৈতিক দলগুলো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কথা বললেও দলগুলোর অভ্যন্তরে কতটুকু গণতান্ত্রিক অবস্থা তাও দেখতে হবে। এক্ষেত্রে গণতান্ত্রিকভাবে ছাত্র সংসদগুলো চালু করলে সামনের দিনে জাতীয় রাজনীতিতে তারা ভূমিকা পালন করতে পারবে।
ছাত্রদের রাজনীতিতে আই হেট পলিটিক্স প্রবণতা থেকে বের করে নিয়ে আসতে হবে৷ কেননা রাষ্ট্র আগামীদিনে চালাবে ছাত্ররা।’ লেজুরবৃত্তিক রাজনীতি নিয়ে নুর বলেন, ‘ছাত্রশিবির বা বামপন্থি দলগুলোতে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে আঙুল তোলার অপশন কম। যারা ক্ষমতাসীন ছাত্ররাজনীতি বা ক্ষমতার আশেপাশে থেকেছেন তাদের ক্ষেত্রে এ লেজুড়বৃত্তিক প্রবণতা এবং লাঠিয়াল বাহিনী তৈরির প্রবণতা বেশি। তাই ছাত্র সংসদভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি হওয়া উচিত৷ তাই বলতে চাই, ছাত্রসংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় রাজনীতি নয়।’ জাকসুতে সহাবস্থান নিয়ে নুর বলেন, ‘৮০ এর দশকে ছাত্ররাজনীতির নৈতিক অধঃপতন শুরু হয়৷ ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতায় থাকার জন্য নানা ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে ছাত্র রাজনীতি বিপথে নিয়েছে। বিগত সরকারের আমলে ছাত্রশিবির, ছাত্রদল অথবা অন্য দলগুলো যারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়েছে তাদের সবার একই উদ্দেশ্যে ছিল স্বৈরাচারের পতন। তখন তো বিভেদ ছিল না। তাহলে এখন কেন এমন হচ্ছে, এটা ভাবতে হবে৷ এই ভুলগুলো নিয়ে আলোচনা হবে। কোন দল কোন ভুল করল তা আলোচনা হতে পারে। এতে সকলকে নিয়ে শান্তিপূর্ণ জাকসু হবে বলে আশা রাখি।’
আলোচনা শেষে বক্তারা প্রশ্নের উত্তর দেন। প্রশ্নত্তোর পর্বে উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘ছাত্ররা তাদের নিজস্ব কাউন্সিল করে নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে। সহাবস্থান বৃদ্ধির তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশকে গণতন্ত্রের পথে ধাবিত করতে হলে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে সংযম রেখে ভুল জায়গাগুলোতে পরস্পরের মধ্যে বেশিবেশি আলোচনা করতে হবে। যতদিন জাকসু নেই ততদিন ছাত্রপ্রতিনিধি নেই। গঠনতন্ত্র বলে আমি জাকসুর সভাপতি। আমি কেন জাকসু দিব না তা খুঁজে পাই না৷ আড়াই মাস আগে সাধারণ শিক্ষার্থীরা জাকসুর দাবিতে স্মারকলিপি দিয়েছে৷ এই আড়াই মাস আমার নির্লিপ্ততার জন্য দুঃখিত৷’ জাকসু নির্বাচন নিয়ে তিনি বলেন, ‘জাকসু সফল করতে হবে টিম ওয়ার্কের মধ্য দিয়ে। এটা একক কোনো ব্যক্তি দ্বারা সম্ভব নয়৷ এজন্য দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা হওয়া উচিত। আমরা চাই ডিবেটের বদলে ডায়লগ চালু হোক। তবে ছাত্রসংগঠনগুলোকে চিঠি দিয়ে আলোচনায় বসানোর এখতিয়ার আমি রাখি না৷ কারণ এটা প্রশাসনিক বিষয় নয়, রাজনৈতিক বিষয়৷ জাকসু নিয়ে সবাই মিলে আমার নিকট যে আস্থা রেখেছেন তা যেন পূরণ করতে পারি সে জন্য সকলের সহযোগিতা চাই।’
সংলাপে আরও বক্তব্য রাখেন বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য সচিব আরিফ সোহেল, জাবিসাসের সাবেক সভাপতি প্লাবন তারিখ, ইয়াহিয়া জিসান প্রমুখ৷
এদিকে আলোচক হিসেবে আসলেও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আমানুল্লাহ আমান আলোচনায় অংশ না নিয়ে চলে যান।