প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০২২ ১৮:২১ পিএম
আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২২ ১৮:২৪ পিএম
রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে শিক্ষাথীদের উচ্ছ্বাস। ছবি : এস এম আরিফুল আমিন
সোমবার সকাল ১১ টার দিকেও শুনশান নিরবতা ছিল রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের আশপাশের এলাকায়। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা (এইচএসসি) চলায় ক্যাম্পাসের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছিল না কাউকে। ক্যাম্পাসের বাইরে অপেক্ষমান কয়েকজন অভিভাবককে দেখা গেছে। অভিভাবকের জটলায় অনুপস্থিত তাদের সন্তানরা।
কথা বলে জানা গেল- সন্তানের পড়ালেখায় মনোযোগ দিতে গিয়ে নিজেদের সখ-আহ্লাদ ত্যাগ করেছেন তারা। তাই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা ঘিরে তাদের এই উৎকণ্ঠা।
অভিভাবকদের উৎকণ্ঠা এবং এসএসসি পরীক্ষার ফলের প্রতি তেমন কোনো আগ্রহ নেই অন্য শিক্ষার্থীদের। তারা ব্যস্ত ছিল সহপাঠী-বন্ধুদের সঙ্গে হইহুল্লুড়ে।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গণমাধ্যম কর্মীদের ভিড় বাড়তে থাকে রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ এলাকায়। দুপুর ১২টার দিকে অনুমতি মেলে ভেতরে প্রবেশের। কলেজ ফটক খুলতেই হঠাৎ শুরু হয় শিক্ষার্থীদের ভিড়। নিমেষেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে কলেজ মাঠ; প্রাণ ফিরে পায় ক্যাম্পাসে।
দুপুর ১২টার দিকে শিক্ষার্থীদের জটলা থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে খুশির চিৎকার। সব শব্দ বোঝা না গেলেও ‘গোল্ডেন এ প্লাস’ বুঝতে অসুবিধা হয়নি কারো। এই আওয়াজের তীব্রতাই ছিলো সবচেয়ে বেশি। থাকবেই না কেন, কলেজটির শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে। আর প্রায় ৯৯ শতাংশ শিক্ষার্থীই পেয়েছে জিপিএ-৫।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ইন্টারনেটের কল্যাণে দুপুর ১২টার আগেই নিজেদের ফলাফল জানতে শুরু করেন শিক্ষার্থীদের। নোটিশ বোর্ড ঘিরে তাই খুব একটা আগ্রহ দেখা যায়নি। নোটিশ বোর্ডের বদলে মোবাইল ফোনের ছোট পর্দায় ছিল সবার চোখ। সহপাঠিরা জটলা বেঁধে দেখছিলেন নিজের ফল। ফল পাওয়া মাত্র জটলা ছেড়ে দৌড় দিয়েছেন খানিকটা দূরে থাকা অভিভাবকদের কাছে। সন্তানের এই দৌড়ে অভিভাবকরা নিমেষেই ভুলে গেছেন ১০ বছরের বেশি সময়ের পরিশ্রম। প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে আলাপকালের এমন অভিব্যক্তিই প্রকাশ করেছেন অভিভাবকরা।
আল মুকিত সিদ্দীকী নামে এক শিক্ষার্থীর মা তাসমিয়া সুলতানা মিতা বলেন, ’নগর জীবনে আমাদের সব সাধ-আহ্লাদ বিসর্জন দিতে হয় সন্তানের জন্য। বিগত ১০ বছরের বেশি সময় নিজের সন্তানকে চোখে চোখে রাখতে হয়েছে। সব ধরণের সেবা যত্নের পাশাপাশি পড়ালেখার প্রতি খেয়াল রাখতে হয়েছে। আমার ছেলে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে। সন্তানের জন্য করা সব পরিশ্রম ভুলে গেছি। এই অভিব্যক্তি ভাষায় প্রকাশ করার মতো না।’
সন্তান গোল্ডেন এ প্লাস না পেলে কী হতো- এমন এক প্রশ্নও করা হয় হাসিন আরা নামে একজন অভিভাবককে।
তিনি বলেন, আমাদের ছোট বেলায় এসএসসি বা এইচএসসিব পরীক্ষায় খারাপ করেও অনেক শিক্ষার্থী ভালো করেছে। কিন্তু বর্তমানে সে সুযোগ অনেক সীমিত। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার ফরম পর্যন্ত কিনতে পারে না। তাই এই ফল ঘিরে আমাদের প্রত্যাশা বেশি থাকে। সন্তানের ভালো ফল তখনই স্বার্থক হবে যখন সে ভালো মানুষ হয়ে উঠবে, দেশের কল্যাণে অবদান রাখতে পারবে।
দুপুর সাড়ে ১২ টার পর নোটিশ বোর্ডে টাঙানো হয় ফল। একে একে মাঠে আসতে শুরু করেন রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের শিক্ষকরা। ইন্টারনেটে ফল জানার পরও নোটিশ বোর্ড ঘিরে বাড়তে থাকে শিক্ষার্থীদের ভিড়। এবার ছাপা ফলে পুনরায় নিশ্চিত হওয়ার পালা। শুরু হয় বন্ধুদের সঙ্গে হুড়োহুড়ি। আরেক দফা চিৎকারের সুযোগ তৈরি হয় জিপিএ-৫ পাওয়াদের। সেই সঙ্গে গণমাধ্যমে ছবি দেওয়ার পর্ব। বড় হয়ে কী হতে চান, কীভাবে অবদান রাখতে চান- সে পরিকল্পনাও জানিয়ে দেন অনেকে। তবে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রকাশে কেউ কেউ ছিলেন কথার মিতব্যয়ী। নিজের স্বপ্ন নিজের কাছেই রাখতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করেছেন অনেকে।
রাজউক উত্তরা মডেলের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রেজাউল করিম রেজা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এ বছর আমি জিপিএ ফাইভ পেয়েছি। উচ্চ মাধ্যমিক শেষে পড়তে চাই যন্ত্রকৌশল বিষয়ে। এ বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা নেওয়ার ইচ্ছা আছে।’
আনিশা জামান নামে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, স্বপ্ন এখনো অনেক দূর। মাত্র মাধ্যমিক শেষ হলো। উচ্চ মাধ্যমিকের পর নিজের পছন্দের বিভাগে ভর্তি হবো। স্বপ্ন ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে এখনি কিছু বলতে চাই না। আমার মা শুধু জানেন আমি কী হতে চাই। তবে এটা নিশ্চিত যে কাজ করতে চাই দেশ ও মানুষের জন্য।’
রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ বছর মাধ্যমিক পরীক্ষায় মোট ৯২২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে ৯১২ জনই পেয়েছেন জিপিএ-৫। সর্বোচ্চ ফল পাওয়া শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই বিজ্ঞান বিভাগের। বিজ্ঞান বিভাগের ৮১৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র চার জন বাদে সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছেন। আর ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ১০৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৯৯ জন পেয়েছেন কাঙ্খিত ফল।
রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তায়েফ উল হক বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের কোন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়নি। শতভাগ পাশ করেছেন। তবে ১০ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ বঞ্চিত হয়েছেন। শিক্ষার্থীদের এই ভালো ফলের ধারা আমরা অব্যাহত রাখতে চাই।’