সেলিম আহমেদ
প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ০০:৩৫ এএম
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অভিভাবকদেরও দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়ানোর সেই সব পুরোনো দিন আবার ফিরে আসছে। এই দুর্ভোগ কমাতে বছরের পর বছর ধরে নানা তৎপরতার মধ্য দিয়ে গুচ্ছ পদ্ধতির যে ভর্তি পরীক্ষার প্রক্রিয়া চালু হয়েছিল, এবার তার অবসান ঘটতে চলেছে। এরই মধ্যে গুচ্ছ থেকে বেরিয়ে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের জন্য পৃথকভাবে আন্ডার গ্র্যাজুয়েট ভর্তি নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
একইভাবে চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট), রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) এবং খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ও (কুয়েট) নিজস্বভাবে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার দিনক্ষণ ঠিক করে ফেলেছে। কাজেই ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ে গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি যে আর থাকছে না, এটা নিয়ে এখন আর কোনো সংশয়ের অবকাশ নেই। যদিও গত ১ ডিসেম্বর গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এবারও গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। কিন্তু সব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছ থেকে বেরিয়ে যাওয়া সিদ্ধান্তে অনড় থাকায় আরও অনেকে একই পথে হাঁটতে চাইবে বলে ধরে নেওয়া যায়।
গুচ্ছ থেকে বের হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য হচ্ছে, ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর ও বুয়েটের মতো বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও গুচ্ছ পদ্ধতি থাকলে তারা থাকবে, না হলে তারা আলাদাভাবে পরীক্ষা নেবে। অন্যদিকে বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে উপাচার্যদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। যদিও তাতে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। যার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা উপদেষ্টা নিজেও ভর্তিতে গুচ্ছ পদ্ধতি অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়ে উপাচার্যদের চিঠি দিয়েছেন। এরপরও কোনো বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছে থাকতে না চাইলে সরকারের শীর্ষমহল থেকে চেষ্টা করে তাদের গুচ্ছে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।
সব বিশ্ববিদ্যালয়কে গুচ্ছে রাখতে গত ২৭ নভেম্বর গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালগুলোর উপাচার্যদের সঙ্গে বিশেষ আলোচনায় বসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক এম আমিনুল ইসলামের সভাপতিত্বে ২ ঘণ্টার এই বৈঠকে গুচ্ছ পরীক্ষা নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। পরে ইউজিসি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে ঠেলাঠেলি
করোনার মহামারির সময় যাতায়াত সমস্যার কথা বিবেচনা করে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছ প্রদ্ধতি ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া শুরু হয়। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুয়েট ছাড়া বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেয়। এর মধ্যে কৃষি ও কৃষি শিক্ষাপ্রধান সাতটি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কৃষিগুচ্ছ, ৩টি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে প্রকৌশল গুচ্ছ এবং ২৪টি সাধারণ ও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে (জিএসটি) গত সেশন পর্যন্ত গুচ্ছ পদ্ধতির ভর্তি পরীক্ষা হয়েছে। কিন্তু গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে নানা সমস্যার কথা তুলে ধরে গত দুই বছর ধরে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা বলে আসছে। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় গত বছর জোরালো আপত্তি তুলে বের হতে চাইলে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে যায় উচ্চশিক্ষার ভর্তি পরীক্ষা। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চ্যান্সেলরের অভিপ্রায় অনুযায়ী গতবার গুচ্ছ পদ্ধতিতেই পরীক্ষা হয়।
চলতি বছর থেকে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এককভাবে ভর্তি হওয়ার কথা থাকলেও কয়েকটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের আপত্তির মুখে তা হচ্ছে না। দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একক আওতাভুক্ত করে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা আয়োজনে ইউজিসি গত বছরের ৩১ অক্টোবর ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে স্নাতক পর্যায়ে কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ, ২০২৩’-এর খসড়া চূড়ান্ত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠালেও সেটি চূড়ান্ত হয়নি। মন্ত্রণালয় ওই সময় জানিয়েছিল, অধ্যাদেশের খসড়ায় নানা অসঙ্গতি থাকার কারণে সেটি চূড়ান্ত না হওয়ায় চলতি বছর গুচ্ছভুক্তভাবে পরীক্ষা হবে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছর রাজনৈতিক পালাবদলের কারণে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই আর গুচ্ছ পদ্ধতিতে থাকতে রাজি হচ্ছে না। তারা আলাদাভাবে ভর্তি বিজ্ঞপ্তি ও ভর্তির দিনক্ষণ ঘোষণা করেছে।
এর মধ্যে প্রকৌশল গুচ্ছে থাকা কুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা ১১ জানুয়ারি, রুয়েটের প্রিলিমিনারি আগামী বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি ও ২০ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত পরীক্ষা এবং চুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা আগামী ২৪ অথবা ২৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে বলে প্রতিষ্ঠানের ১৫৫তম একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি আবেদন শুরু হয়েছে গত ১ ডিসেম্বর। ভর্তি পরীক্ষা শুরু হবে ৩১ জানুয়ারি থেকে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নীতিনির্ধারক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, গুচ্ছের কারণে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বকীয়তা ও সুনাম নষ্ট হচ্ছে। আমরা ভালো শিক্ষার্থী পাচ্ছি না। সেশনজট লাগছে। তাই আমরা গত দুই-তিন বছর ধরে গুচ্ছ থেকে বের হতে চেয়েছি। কিন্তু সরকার দেয়নি। অথচ ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর, বুয়েট এককভাবে ভর্তি পরীক্ষা নিচ্ছে। তারা তাদের মান ঠিক রাখছে। এখন প্রশ্ন হলো, ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গুচ্ছ বা একক ভর্তি পরীক্ষায় না থাকলে আমরা থাকব কেন?
তিনি আরও বলেন, আমরা দাবি করেছিলাম সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একক ভর্তি পরীক্ষা আয়োজন করতে। সেটা করলে এই সমস্যা তৈরি হতো না।
এ বছর সব বিশ্ববিদ্যালয়কে গুচ্ছে চায় সরকার
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকার চলতি বছর গুচ্ছভুক্তভাবে পরীক্ষা নিতে আগ্রহী। দেশের চলমান পরিস্থিতিতে গুচ্ছ থেকে বেরিয়ে আলাদাভাবে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের অনুরোধসংবলিত চিঠি পেয়ে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় নমনীয় হয়েছে। জানা গেছে, তারা সিদ্ধান্ত পাল্টে এবারও গুচ্ছে থাকার পরিকল্পনা নিচ্ছে।
উপাচার্যদের কাছে পাঠানো চিঠিতে শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ‘বর্তমানে প্রচলিত গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এলে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। কয়েকদিন আগে উপাচার্যরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভায় এ বিষয়ে আলোচনার জন্য একত্র হয়েছিলেন। দেখা গেছে যে, গুচ্ছ পরীক্ষার পক্ষে-বিপক্ষে বিবিধ যুক্তি আছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজনে এ পদ্ধতির সংশোধন করারও সুযোগ থাকবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে থাকলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হবে। এরই মধ্যে অভিভাবক ও ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে গুচ্ছ পরীক্ষা পদ্ধতি বহাল রাখার পক্ষে স্মারকলিপিও পেয়েছি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের জন্য গুচ্ছ পরীক্ষা পদ্ধতিতে ভর্তির ব্যবস্থা অনুসরণ করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করতে আপনাকে সবিনয় অনুরোধ করছি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সরকার কোনোভাবেই এবার পৃথক ভর্তি পরীক্ষা চায় না। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় যদি সেই উদ্যোগ নেয় তাহলে সরকারের ওপর মহল থেকে আলোচনা করে তাদের গুচ্ছে ফিরিয়ে আনা হবে। এবার গুচ্ছ ভেঙে গেলে তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
গুচ্ছভুক্ত অন্তত ৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরা জানান, গুচ্ছে থাকা বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই মূলত গুচ্ছে থাকতে চায় না। তারা নানা যুক্তি দেখাচ্ছে। তবে ছোট ও নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গুচ্ছে থাকতে আগ্রহী।
গুচ্ছের বিষয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হায়দার আলী বলেন, ‘শিক্ষা উপদেষ্টার চিঠি এসেছিল এবং আমাদের ডাকা হয়েছিল। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে যেন আমরা গুচ্ছ থেকে বের না হই। তাই এবার আমরা গুচ্ছতেই থাকছি।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নেতা ও জিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. আব্দুস সামাদ বলেন, গুচ্ছের বিষয়ে এখনও আমরা শিক্ষকরা আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি। যৌক্তিকতার ভিত্তিতে যেটা শিক্ষার্থীদের এবং দেশের জন্য কল্যাণের হবে, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সেটাই চাইবে।
তিনি আরও বলেন, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলতে পারি, গুচ্ছ পদ্ধতির সুফল নিয়ে সবার মধ্যে বিতর্ক আছে। বর্তমান সরকার সুধীসমাজ, শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের কল্যাণ বিবেচনায় যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেবেÑ সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম বলেন, আমরা চিঠি পেয়েছি। সেটা একটি চিঠি মাত্র। কোনো নির্দেশনা নয়। আমরা অপেক্ষা করছি। ভেবেচিন্তে চিঠির উত্তর দেব। কী উত্তর হতে পারে এখনই বলতে পারছি না।
এ প্রসঙ্গে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এসএমএ ফায়েজ বলেন, শিক্ষা উপদেষ্টা সব বিশ্ববিদ্যালয়কে গুচ্ছে থাকার জন্য অনুরোধ করেছেন। আমরাও তাদেরকে বলেছি গুচ্ছে থাকার জন্য। গুচ্ছে অনেক সমস্যা আছে ঠিকই, তারপরও মন্ত্রণালয় যেহেতু বলছে, সবাই এবারের মতো বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখবে বলে আমরা আশাবাদী।
সব বিশ্ববিদ্যালয়কে গুচ্ছে থাকতে বাধ্য করা হবে কি নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়কে বাধ্য করার এখতিয়ার আমাদের নেই। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় একটি নিজস্ব আইনে চলে। তারা তাদের আইন মেনে কাজ করবে।