সাত কলেজ
সেলিম আহমেদ
প্রকাশ : ১২ নভেম্বর ২০২৪ ১০:৪৭ এএম
আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০২৪ ১১:০১ এএম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) অধিভুক্ত সাতটি কলেজের সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্বশাসিত স্বতন্ত্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন এসব সরকারি মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এ লক্ষ্যে রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ’ নামে একটি প্ল্যাটফর্মও গড়ে তুলেছেন তারা।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে এ কলেজগুলোকে নিয়ে আলাদা একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কোনো চিন্তা বা পরিকল্পনা নেই। বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাত কলেজের জন্য আলাদা একটি ইউনিট গঠন করে কিংবা বিকল্প কোনো পথে এই সংকটের সমাধান করতে চাইছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। এজন্য শিগগিরই গঠন করা হতে পারে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি। তবে এ ধরনের আলাদা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সমাধানের ঘোষণা মানতে নারাজ শিক্ষার্থীরা। তারা তাদের ক্লাস বর্জন অব্যাহত রেখেছেন।
শিক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের সমস্যা ও তা সমাধানের দাবির যৌক্তিকতা রয়েছে। তবে আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় করার প্রাসঙ্গিকতা ও কার্যকারিতা আছে কি না, তা-ও ভেবে দেখার বিষয়। বিকল্প উপায়ে এসব সংকট সমাধানের চেষ্টা করাই তাই অনেক যৌক্তিক হতে পারে। শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে কোনো চাপকে প্রাধান্য না দিয়ে সুপরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়াই মঙ্গলজনক হবে বলে মনে করছেন তারা।
সাত কলেজ নিয়ে সংকট কোথায়
২০১৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্বাহী আদেশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা রাজধানীর সাতটি সরকারি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। ধারণা করা হয়েছিল, কলেজগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আনা হলে শিক্ষার মানোন্নয়ন হবে। কিন্তু ঘটেছে উল্টোটি। মানোন্নয়নের জন্য প্রত্যাশিত পদক্ষেপ না নেওয়ায় এসব কলেজে বরং সেশনজটসহ প্রশাসনিক ও একাডেমিক নানা সংকট বেড়ে গেছে। শিক্ষার গুণগত কোনো মানোন্নয়ন না ঘটায় শিক্ষার্থীরা অধিভুক্তির দুই বছর পর থেকেই অধিভুক্তি থেকে মুক্তির আন্দোলন শুরু করেন। শিক্ষাবিদরা বলছেন, কোনো ধরনের বিচার-বিশ্লেষণ, পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি না নিয়ে হুট করে এসব কলেজকে অধিভুক্ত করা হয়েছিল। গত প্রায় সাত বছর আট মাসে এই সংকট আরও ঘনীভূত ও জটিল হয়ে উঠেছে।
এই সাতটি কলেজ হলোÑ ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, মিরপুরের সরকারি বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজ। কলেজেগুলোতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় দুই লাখ।
সাত কলেজকে অধিভুক্তির বছরই সেশনজটের প্রতিবাদে আন্দোলনে নামেন সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। ওই বছরের ২০ জুলাই পরীক্ষার দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী সিদ্দিকুর রহমান তার দুই চোখ হারান। তখন অজ্ঞাত প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থীর নামে মামলা করেছিল শাহবাগ থানা পুলিশ। এরপর থেকে নানা দাবিতে তারা প্রতিবছরই একাধিকবার রাস্তায় নামছেন। সম্প্রতি আবার শিক্ষার্থীরা অধিভুক্তির কবল থেকে মুক্তির জন্য আন্দোলন করছেন। গত বুধবার শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সঙ্গে বৈঠক করে ‘স্বতন্ত্র পরিচয়ের’ আশ্বাস পেয়ে আন্দোলন স্থগিত করেছেন শিক্ষার্থীরা। তবে কার্যকর কোনো সমাধান না পেলে আবারও রাজপথে নামবেন বলে জানিয়েছেন তারা।
সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের দাবি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তির পর থেকে বেড়েছে সেশনজট। কারণ এসব কলেজের জন্য নেই পরিকল্পিত একাডেমিক ক্যালেন্ডার ও সিলেবাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত হলেও শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী পরীক্ষা নেয়, রেজাল্ট প্রকাশ করে। সাত কলেজের রেজাল্ট প্রকাশ করতে সময় নেয় কয়েক মাস। প্রকাশিত ফলেও থাকে নানা ক্রটি। অনেক ব্যাচে দেখা যায় গণহারে ফেল দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক কাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে পোহাতে হয় নানা ভোগান্তি। এর বাইরে শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষের তীব্র সংকট, গবেষণাগার, লাইব্রেরি, আবাসিক হলের সীমিত সুবিধার কারণেও বিঘ্ন হচ্ছে পড়াশোনা।
ঢাকা কলেজের স্নাতক চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘অধিভুক্তির পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। বলা যায়, তারা আমাদের ওপর স্বৈরশাসন চালিয়েছে। আমাদের শিক্ষার মানোন্নয়নে তাদের কোনো পরিকল্পনা নেই। আমাদের ছোট ছোট যৌক্তিক দাবি আদায় করতেও রাস্তায় নামতে হয়েছে। আমরা এই অবস্থা থেকে মুক্তি চাই।’
ইডেন কলেজের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার বলেন, ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও শুধু আমাদের পরীক্ষা নিয়েছে আর রেজাল্ট দিয়েছে। তাদের শিক্ষার্থীদের তুলনায় আমাদের কাছ থেকে সব রকম ফি বেশি নেওয়া হয়েছে। অথচ আমাদের সুশিক্ষা নিশ্চিতের জন্য কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’
একই কথা জানান সাবেক শিক্ষার্থীরাও। সাত কলেজের সরকারি তিতুমীর কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী মাকসুদা রিনা। তিনি ওই কলেজ থেকে স্নাতক (পাস) পাস করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্তির পর তাদের ব্যাচই ছিল স্নাতকের (পাস) সর্বশেষ ব্যাচ। রিনা বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত হওয়ার পর আমাদের তিন বছরের কোর্স শেষ হতে সাত বছর লেগেছে। শুধু তাই নয়, পাস কোর্সের শিক্ষার্থী হওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের কোনো গুরুত্বই দেয়নি।’
ঢাকা কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান মনে করেন, এই অধিভুক্তি সাত কলেজের সমস্যাকে আরও গাঢ় করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে তাদের শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও সার্বিক তদারকি শেষে সাত কলেজের এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর গুণগত শিক্ষা, মনোনয়ন ও তদারকি সম্ভব নয়। বিষয়টি বুঝতে গবেষণার প্রয়োজন হয় না। এত শিক্ষার্থীকে দূর থেকে মনিটরিং করা সম্ভব নয়। তাই একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাত কলেজের বিদ্যমান সংকট মোকাবিলা করে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে যথাযথ পন্থা।
সংকট সমাধানের পথ কী
সম্প্রতি সরকার সাত কলেজের সংকট দূর করতে এবং সেগুলোর শিক্ষার্থীদের দাবি পর্যালোচনা সাপেক্ষে সুপারিশ করতে ১৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। শিক্ষা উপদেষ্টার পক্ষ থেকেও দেওয়া হয়েছে তাদের স্বতন্ত্র পরিচয়ের আশ্বাস। এতে আপাতত আন্দোলন স্থগিত হলেও কার্যকর কোনো সমাধান না পেলে আবারও রাজপথে দেখা যাবে তাদের।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারা মনে করছেন, সাত কলেজের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা একটি ব্ভিাগ থাকবে। সেখানে একজন রেজিস্টার থাকবেন। থাকবেন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তারাই তত্ত্বাবধান করবেন এ কলেজগুলোকে। আবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা ইউজিসির অধীনে সাত কলেজ পরিচালনার জন্য একটি ইউনিট তৈরি করার ভাবনাও রয়েছে। তবে পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবিদদের সঙ্গে আলোচনা করে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তারা।
সাত কলেজ আন্দোলনের মুখপাত্ররা সম্প্রতি জানান, শিক্ষা উপদেষ্টা গত বুধবার তাদের আশ্বস্ত করেছেন যে সাত কলেজের ঢাবি অধিভুক্তি বাতিল করা হবে এবং তাদের জন্য নতুন একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করা হবে। কোন প্রক্রিয়ায় এ পরিচয় তৈরি করা সম্ভব, সেটা নির্ধারণ করবেন মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটি ও একটি বিশেষজ্ঞ টিম। এজন্য সরকারের কিছুটা সময়ও লাগবে।
এ ব্যাপারে সাত কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় রূপান্তর টিমের ফোকাল পারসন জাকারিয়া বারী সাগর বলেন, ‘শিক্ষা উপদেষ্টা উল্লিখিত স্বতন্ত্র কাঠামো তৈরির জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি শিগগিরই করা হবে। এ ছাড়া সাত কলেজ নিয়ে নানা ধরনের অনেক প্রস্তাব আছে। সেগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। যদি দাবি মেনে নেওয়া না হয় তাহলে আবারও মাঠে নামা হবে।’
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
এ প্রসঙ্গে ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক একেএম ইলিয়াস বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি রাষ্ট্র বিবেচনা করবে। তবে শিক্ষার্থীদের তোলা অভিযোগ সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েই সমাধানের চেষ্টা করা হবে। বিষয়গুলো নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গেও আমরা আলোচনা করব।’
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. আবদুল হালিম বলেন, ‘এই সংকট সমাধানে সুচিন্তিত পরিকল্পনা নিতে হবে। শিক্ষার্থীরা আলাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি করছে। এই দাবি বাস্তবায়ন কিংবা সংকট সমাধানে কী করা যায়, সেজন্য একটা বিশেষজ্ঞ কমিটি করতে হবে। তারা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে হুট করে একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় করলে সংকট আরও বাড়তে পারে।’
একই ইনস্টিটিউটের আরেক অধ্যাপক ড. মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের অভিযোগগুলো যথার্থ। তারা প্রশাসনিক কাজে বারবার বিশ্ববিদ্যালয়ে আসায় অনেক সময় ঠিকমতো লেখাপড়ায় মন দিতে পারে না। ক্লাস করতে পারে না। তাদের বসার জায়গা নেই। আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এত শিক্ষার্থীকে নিয়ন্ত্রণ করাও সম্ভব নয়। কারণ আমাদের মূল শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করতেই হিমশিম খেতে হয়। আবার তাদের যে কারিকুলামে পাঠদান করানো হচ্ছে, সেটাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম নয়। তারা তাদের মতো কারিকুলামে পড়ছে, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষা নিচ্ছেÑ এটাও অনৈতিক। এ ছাড়া পর্যাপ্ত শিক্ষক, ক্লাস ও আবাসিক সংকট তো আছেই। সব মিলিয়ে সাত কলেজ নিয়ে একটা হাঁসফাঁস অবস্থা দেখা দিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ করে এর যে সমাধান আসবে, দেশের অন্য কলেজগুলোর জন্যও তা একটি যৌক্তিক মডেল হতে পারে।’
ইউসিজির চেয়ারম্যান ড. প্রফেসর ড. এসএমএ ফায়েজ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সাত কলেজ নিয়ে সরকার কাজ শুরু করেছে। আমাদের সঙ্গে আলোচনা করলে আমরা এ বিষয়ে আমাদের পরামর্শগুলো দেব। আমার বিশ্বাস, সরকার একটি যৌক্তিক সমাধান বের করবে।