বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০২৪ ২২:৪১ পিএম
কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ কার্যকর ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রম স্থগিতের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থীরা।
বৃহস্পতিবার (৩১ অক্টোবর) বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন রেজিস্ট্রার ভবনের সামনে ‘গণ-অভ্যুত্থান রক্ষা আন্দোলন’ ব্যানারে এই কর্মসূচি শুরু করে তারা। এদিকে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর জাবিতে প্রকাশ্যে এসেছে ইসলামী ছাত্রশিবিরের শীর্ষ তিন নেতা। গত মঙ্গলবার আত্মপ্রকাশের পর থেকে পক্ষে-বিপক্ষে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। এরপর থেকে বিক্ষোভ মিছিলসহ নানা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে বাম ধারার ছাত্র সংগঠনগুলো।
বৃহস্পতিবার লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রম স্থগিতের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে শিক্ষার্থীরা ‘ছাত্ররাজনীতির কালো হাত ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’; ‘ডান বামের রাজনীতি, চাই না কারও উপস্থিতি’; ‘দলীয় ছাত্ররাজনীতির আস্তানা ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’ স্লোগান দেয়।
সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী জিয়াউদ্দিন আয়ান বলেন, আমরা যে নয় দফা নিয়ে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটিয়েছি তার অন্যতম দাবি হলো দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা। এর আগে আমরা দেখেছি ছাত্ররাজনীতির নামে এত বছর ধরে ছাত্রলীগ কীভাবে অপরাজনীতি করছে। উপাচার্যকে বলতে চাই, সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়ে গড়িমসি চলবে না। সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিন।
ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী শাকিল ইসলাম বলেন, উপাচার্য আমাদের বলেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা যা চাইবে তাই হবে। এর প্রেক্ষিতে আমরা প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার শিক্ষার্থীর স্বাক্ষর নিয়েছি ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের পক্ষে। আমরা উপাচার্যকে মনে করিয়ে দিতে চাই সাধারণ শিক্ষার্থীদের রক্ত ও জীবনের বিনিময়ে আপনি চেয়ারে বসেছেন। আমরা রক্ত দিয়েছি প্রয়োজনে জীবন দিব। তবে দাবি আদায় করে ছাড়ব।
এ সময় ‘গণ-অভ্যুত্থান রক্ষা আন্দোলনের’ আহ্বায়ক আব্দুর রশিদ জিতু বলেন, আমরা যে নয় দফার ভিত্তিতে এই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলাম তার সাত নম্বর দাবি ছিল ক্যাম্পাসে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে না। আমরা স্পষ্টভাবে বলে দিতে চাই শহীদের সঙ্গে বেইমানি করবেন না। অবিলম্বে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে ছাত্র সংসদ চালু করতে হবে অন্যথায় আমরা কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হব।
কর্মসূচি চলাকালে সেখানে উপস্থিত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল আহসান। শিক্ষার্থীরা তাকে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি জানালে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গেলে অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ অনুযায়ী নিতে হবে। অধ্যাদেশ ব্যতিরেকে আমরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। পুরো জাহাঙ্গীরনগর পরিবার নিয়ে মুক্তমঞ্চে আলোচনায় বসব। সেখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশীজন মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর জাবিতে প্রকাশ্যে এসেছে ইসলামী ছাত্রশিবিরের শীর্ষ তিন নেতা। গত মঙ্গলবার আত্মপ্রকাশের পর থেকে পক্ষে-বিপক্ষে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।
জানা যায়, ১৯৮৯ সালের ১৫ আগস্ট ছাত্র শিবিরের হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ১৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছাত্রদল নেতা হাবিবুর রহমান কবির আহত হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই বছর ২৬ আগস্ট মারা যান। এর প্রেক্ষিতে ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্রফ্রন্ট, জাবি সাংস্কৃতিক জোটসহ ক্যাম্পাসের কয়েকটি সংগঠন মিলে শিবিরের বিরুদ্ধে ‘সর্বদলীয় ঐক্য’ গড়ে তুলে শিবিরকে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের ১৪২তম সভায় শিবির নিষিদ্ধের প্রস্তাবনা এলেও এরকম কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি বলে জানান প্রশাসন। বরং সভার সিদ্ধান্ত ছিল ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাবহির্ভূত বিধায় এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব নয়’। তবে এরপর দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের কার্যনীতি প্রকাশ পায়নি।
শিবিরের রাজনীতি নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জাবি শাখার সমন্বয়ক তৌহিদ সিয়াম বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চায় ক্যাম্পাসে সকল দল-মতের রাজনীতির মুক্তচর্চার পরিবেশ বিদ্যমান থাকুক। আমরা ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের বর্জনমূলক রাজনীতি পুনরায় দেখতে চাই না। তবে আমরা জাহাঙ্গীরনগরের বিচিত্রতার ইতিহাসকে শ্রদ্ধা করি। পূর্বের কোনো ছাত্র সংগঠনের অমীমাংসিত বিষয়কে সমাধান না করে বা সুস্পষ্ট বক্তব্য না দিয়ে হুট করে শিবিরের আত্মপ্রকাশে বিশৃঙ্খলা হবে এবং তাই ঘটেছে। এ ক্ষেত্রে ছাত্রশিবির, যারা গত ৩৫ বছর ধরে ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে পারে নাই, তাদেরকে নব্বই দশকের অমীমাংসিত বিষয়ের সুস্পষ্ট বক্তব্য দিতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যলয়ের সকল রাজনৈতিক, সামাজিক সাংস্কৃতিক সকল সংগঠনের সঙ্গে বসে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে আসতে হবে।
ছাত্র ইউনিয়ন বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের একাংশের সভাপতি অমর্ত্য রায় বলেন, পূর্বে তাদের সংঘটিত সন্ত্রাসী কার্যক্রমের ব্যাপারে আমরা জবাবদিহিতা চাই। তাদের জবাবদিহিতার ভেতর দিয়ে, শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চেয়েই আসতে হবে। কারণ উদাহারণ তৈরি না করতে পারলে এভাবে তো আরও কয়েক বছর পর জবাবদিহিতা ছাড়া ছাত্রলীগও তাদের রাজনীতি করতে চাইবে। যাদের সমস্ত স্টেকহোল্ডার সর্বৈবভাবে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করেছিল তাদের স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসতে দিলে ক্যাম্পাসে জবাবদিহিতামূলক আর কোনো ছাত্ররাজনীতি থাকবে না। আমরা জবাবদিহিতামূলক, সংবেদনশীলতার, সহনশীলতার এবং অংশগ্রহণমূলক ছাত্ররাজনীতি চাই।
ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদের আরেকাংশের সভাপতি আলিফ মাহমুদ বলেন, হামলা ও সহিংসতায় জড়িত ছাত্রলীগ ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য হয়েছে, একইভাবে ক্যাম্পাসে হত্যার রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হওয়ায় পূর্বে ছাত্রশিবির ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হয়েছিল। যে শঙ্কা থেকে ছাত্রলীগের উপস্থিতি আমরা ক্যাম্পাসে মেনে নিতে পারি না, একই শঙ্কা শিবিরের ক্ষেত্রেও রয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ থাকবে, সবার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, সবার ব্যক্তিস্বাধীনতা সমুন্নত থাকবে এমন ক্যাম্পাস আশা করে। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থী ও ক্যাম্পাস প্রশাসনসহ সবাইকে সচেতন হয়ে যেকোনো সহিংসতা প্রতিরোধে তৎপর হতে হবে। সহিংসতাকারী কেউ ক্যাম্পাসে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করলে তাদের রুখে দিতে হবে।
জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহফুজ ইসলাম মেঘ বলেন, একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২টি সংগঠন বিবৃতিদানের মাধ্যমে শিবিরকে নিষিদ্ধ করে ক্যাম্পাস থেকে। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে শিবিরের কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না কিন্তু সামাজিকভাবে ছিল। যেহেতু অনেক প্রেক্ষাপট বদলেছে তিন দশক পর শিবির আবার প্রকাশ্যে এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে ওই নিষেধাজ্ঞা এখনও বলবৎ আছে কি না সেটা একটি যৌক্তিক প্রশ্ন। কারণ তারা শিবির করতেই পারে। যে জনমতের ভিত্তিতে শিবিরকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, সেই জনমত কি এখনও বিদ্যমান আছে কি না এটাও দেখতে হবে। যেহেতু ২৪-এর আন্দোলন ছিল বৈষম্যহীন সমাজ নির্মাণের। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী এবং ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা যদি মনে করে শিবির রাজনীতি করতে পারবে, তাহলে অবশ্যই আলোচনায় বসতে হবে। তবে শিবির কি তার পূর্বের কর্মকাণ্ডের জন্য অনুতপ্ত কি নাÑ এ বিষয়টা আমাদের পরিষ্কার করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের ক্যাম্পাসে গত ১০ বছরে শিবিরের ট্যাগ দেওয়ার রাজনীতি আমরা দেখেছি। যেহেতু শিবিরের আত্মপ্রকাশ নেই, তাই কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ বিভিন্ন সময় ট্যাগ দিয়ে মানসিক এবং রাজনৈতিকভাবে হেনস্থা করত। শিবির যদি কোনোভাবে প্রকাশিত হয় তাহলে এই ট্যাগিং কালচার থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা মুক্তি পাবে। আর এটা তখনই সম্ভব যখন জনমতের ভিত্তিতে শিবিরের রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হবে।