বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ২৩:১১ পিএম
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। ফাইল ফটো
দেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছে। এরপরই সারাদেশে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, ট্রেজারার পদ থেকে শিক্ষকরা পদত্যাগ করেছেন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ও এর ব্যতিক্রম নয়। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, ট্রেজারার পদ শূন্য হয়ে আছে। ফলে স্থবির হয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা কার্যক্রম। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা চায় দ্রুত সময়ের মধ্যে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেয়া হোক।
উপাচার্যের পদত্যাগের পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক-প্রশাসনিক এবং শৃঙ্খলার কাজে বিভিন্ন সমস্যার দেখা দেয়ার ফলে, উপাচার্য নিয়োগের আগ পর্যন্ত চলমান গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা কার্যক্রমসহ সকল প্রশাসনিক এবং আর্থিক বিষয়ে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে অর্থনীতি বিভাগের জেষ্ঠ্য অধ্যাপক ড. মো. জাকির ছায়াদউল্লাহ খানকে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থীদের দাবি, উপাচার্যসহ অন্যান্য যে প্রশাসনিক পদগুলো খালি রয়েছে তাতে বিশ্ববিদ্যালয় অভিভাবক শূন্য হয়ে পড়েছে এতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে থেকে আসুক বা বাইরে থেকে আসুক কিন্তু দ্রুত যেনো উপাচার্য নিয়োগ দেয়া হয়।
অধ্যাপক ড. মো. জাকির ছায়াদউল্লাহ খান বলেন, ‘সরকার উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে চারটি ক্রাইটেরিয়া ঠিক করেছে। আমরা সেই চারটি ক্রাইটেরিয়ার সাথে একমত। এখন দেখার বিষয় এই চারটি ক্রাইটেরিয়া মেনে নিয়োগ দেয়া হয় কিনা। এই চারটি ক্রাইটেরিয়ার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রসশনিক দক্ষতা থাকা। বিশ্ববিদ্যালয় চালানোর ক্ষেত্রে একাডেমিক দক্ষতার পাশাপাশি প্রশাসনিক দক্ষতাও প্রয়োজন। আমি বলবো, প্রশাসনিক দক্ষতাই বেশি প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয় চালাতে গেলে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০ জনের মত অধ্যাপক রয়েছে। এর মধ্যে গ্রেড-১ ও গ্রেড-২ মিলিয়ে ১৩ জন অধ্যাপক রয়েছে। এই শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেরই যোগ্যতা চারটি ক্রাইটেরিয়ার সাথে মিলে। ফলে তাদের মধ্য থেকেই উপাচার্য নিয়োগ দেয়া যায়।’
ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মোশারফ হোসাইন বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে উপাচার্য পদ খালি থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ক্ষেত্রেই একটা অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে। আমি চাই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতর থেকে হোক বা বাইরে থেকে হোক দ্রুত যেনো উপাচার্য নিয়োগ দেয় হয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একজন উপাচার্য আসাটা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ভালো। এর আগেও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকে কয়েকজন ভিসি এসেছেন তবে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের কালচার সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। আমরা এমন কাউকে চাই যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কালচার বুঝবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন শিক্ষক উপাচার্য হলে তিনি সকল কালচার সম্পর্কে অবগত থাকবেন। এবং সকল কাজের গতি ভালো থাকবে।’
বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নূর মোহাম্মদ রাজু বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে উপাচার্য পদ খালি রয়েছে। একটা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে উপাচার্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকে আসুক বা বিশ্ববদ্যালয়ের ভিতর থেকে আসুক কিন্তু দ্রুত উপাচার্য নিয়োগ হওয়াটা জরুরি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্য থেকে উপাচার্য হলে আমাদের জন্য তা মঙ্গলজনক হবে। কারণ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক এবং শিক্ষার্থীদের কিছু ব্যপার থাকে যা বাইরের কেউ উপাচার্য হলে জানা সম্ভব না। বাইরের কেউ আসলে এই কালচার বুঝতে অনেক সময় লেগে যায়। এখন সময় এসেছে বিশ্বিবদ্যালয়ের ভিতরের কোন শিক্ষককে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার।’
ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থী হাসিন মাহতাব মাহিন বলেন, ‘বাংলাদেশের অন্যতম বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে আমাদেরও রয়েছে কোয়ালিফাইড অনেক শিক্ষক। তবে বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতি, ছাত্রছাত্রীদের মনোভাব বিবেচনা করে আমার মনে হয় অভ্যন্তরীণ ভিসি নিয়োগ হলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে। সম্প্রতি ঢাকা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সহ অনেক প্রতিষ্ঠানে ভিসি নিয়োগ হয়েছে। এমতাবস্থায় আমরাও চাই আমাদের এই পরিবারের সদস্য হয়েও এমন একজন এক্সট্রাঅর্ডিনারি ভিসি আসুক। বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে সেশন জট, শিক্ষকসংকট সহ অনেক সমস্যা রয়েছে। পাশাপাশি একাডেমিক অনেক বিষয়ে ফোকাস করা দরকার, আমাদের বিশ্বাস শীঘ্রই আমরাও এমন একজন মাল্টি ট্যালেন্টেড ভিসির দেখা পাবো।’
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, ‘অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ হয়ে যাচ্ছে কিন্তু আগের উপাচার্য একমাস আগে পদত্যাগ করলেও এখনো উপাচার্য নিয়োগ দেয়া হচ্ছে না। উপাচার্য না থাকা নানা ধরনের জটিলতায় দিন পার করছে বিশ্ববিদ্যালয়। আমি চাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে থেকে আসুক বা বাইরে থেকে আসুক তিনি হবেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী বান্ধব।’
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর ও বাহির মিলিয়ে নাম শোনা যাচ্ছে অনেকের। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রেড-১ ও গ্রেড-২ অধ্যাপকদের ১১ জনের তালিকা পাঠানো হয়েছে মন্ত্রণালয়ে। এদের মধ্যে উপাচার্য হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করিমের নাম। বাকিরা হলেন -বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সৈয়দূর রহমান, অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: জাকির ছায়াদউল্লাহ খান, লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল, মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোলায়মান, একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: আমজাদ হোসাইন সরকার, গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুল হাকিম।
এছাড়া কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদের জন্য অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও নাম শোনা যাচ্ছে অনেকের। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. হাফিজ মো. হাসান বাবু, একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হায়দার আলী, চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।