× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শিক্ষা

সংকট শেষে ফিরেছে আস্থা

সেলিম আহমেদ

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৯:৫৭ এএম

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ২০:৪৬ পিএম

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

নানা ইস্যুতে গত জুলাই থেকেই দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিরাজ করছে অস্থিরতা। একদিকে কোটা বাতিলের দাবিতে শিক্ষার্থীরা, অন্যদিকে সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রত্যয়’ স্কিম বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করছিলেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কার্মচারীরা। তাদের বহুমুখী আন্দোলনে ওই মাসের প্রথম দিন থেকে বন্ধ ছিল দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এক দফায় রূপ নিলে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শুরু হয় নতুন অস্থিরতা। বিতর্কিত ও সুবিধাভোগী শিক্ষক-কর্মকর্তাদের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। তাদের তোপের মুখে বেশিরভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিসহ গুরুত্বপূর্ণ পদধারীরা পদত্যাগ করেন।

এ ছাড়া অনেক সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষকরাও পদত্যাগ করেন। পদত্যাগ করেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসির) চেয়ারম্যানসহ শিক্ষার অনেক তদারকি প্রতিষ্ঠানের প্রধানরাও। এই অবস্থায় শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরানো এবং শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য। তবে তা দক্ষতার সঙ্গেই মোকাবিলা করছে সরকার। রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো শিক্ষাব্যবস্থায়ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় দলীয়করণে জর্জর বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শীর্ষপদে যোগ্য ও প্রাজ্ঞদের পদায়ন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই ইউজিসির চেয়ারম্যান, সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেছে বেছে খ্যাতিমানদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে আস্থা ফিরতে শুরু করেছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে। 

এ ছাড়া মাধ্যমিক ও প্রাথমিকের বিতর্কিত শিক্ষা কারিকুলাম বাতিল করে পুরোনো কারিকুলামে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কর্মমুখী ও বাস্তবমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করাই এখন প্রধান লক্ষ্য। এ ছাড়াও শিক্ষা খাতে সব ধরনের অন্যায় চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার চিন্তা তাদের। 

প্রাধান্য পাচ্ছেন যোগ্যরা 

সরকার পদত্যাগের পরপরই পদত্যাগ করেন ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাজী শহীদুল্লাহ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ডিজি অধ্যাপক নেহাল আহমেদ, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ফরহাদুল ইসলাম। এর বাইরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেন দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি-প্রোভিসি, রেজিস্ট্রার, কোষাধ্যক্ষসহ বিভিন্ন শীর্ষ পদধারীরা। পদত্যাগ করতে বাধ্য হন বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজের অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষকসহ অনেক শিক্ষকও। তাদের বিরুদ্ধে কোটা আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থী হয়রানিসহ এর আগে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে অনেকেই নিজে থেকেও পদত্যাগ করেন। 

ইউজিসি সূত্র জানিয়েছে, দেশের স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি ৫৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অন্তত ৪৪ উপাচার্য পদত্যাগ করেছেন। এ ছাড়া প্রো-ভিসি, রেজিস্ট্রার, কোষাধ্যক্ষ, বিভাগীয় প্রধান, প্রক্টর, হল প্রভোস্ট, ডিনসহ বিভিন্ন পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন আরও কয়েকশ শিক্ষক। পদত্যাগের এই তালিকা দীর্ঘ হওয়ায় ভেঙে পড়ে শিক্ষাব্যবস্থা। সরকার তৎপর হলেও এখনও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ঠিকমতো শুরু হয়নি শিক্ষা কার্যক্রম। টানা দুই মাসের বেশি সময় থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এই অস্থিরতায় সেশনজট তৈরির আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। 

এই সংকট কাটাতে জোর তৎপরতা রয়েছে সরকারের। ইতোমধ্যেই ইউজিসির চেয়ারম্যান, সাত বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, এনসিটিবির চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এই নিয়োগে দলীয় বিবেচনাকে সামনে না নিয়ে যোগ্যতা ও প্রজ্ঞাকে দেওয়া হয়েছে অগ্রাধিকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতদিন প্রশাসনিক পদসহ ভিসিদের নিয়োগ দেওয়া হতো দলীয় বিবেচনায়। ফলে তারা নানা অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়তেন। এতে শিক্ষার মান দিনদিন তলানির দিকে যাচ্ছিল। এই ধারা থেকে বের হয়ে আসতে চায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তারা যোগ্যদেরই প্রাধান্য দিতে চায়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, সরকার যেসব খাতে সংস্কারের চিন্তা করছে এর মধ্যে অন্যতম শিক্ষা খাত। সেজন্য শিক্ষায় নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে যোগ্য ব্যক্তিদের। রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে গিয়ে সেরা অধ্যাপক, শিক্ষা ও প্রশাসনিক দক্ষতা থাকা হাইপ্রোফাইল শিক্ষকদের বিভিন্ন দায়িত্বে আনা হচ্ছে।

ইতোমধ্যে ইউজিসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজকে। তিনি এসব পদে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে প্রশংসিত হয়েছেন। 

এ ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) নিয়োগ পাওয়া ভিসি অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাজ্যের ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মাননাসহ পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীকালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয় এবং এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে পোস্ট ডক্টরাল গবেষণা সম্পাদন করেন। নিয়োগ লাভের আগে তিনি ঢাবির উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান এবং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) উপ-উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়া অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন অস্ট্রেলিয়া থেকে। বাকিরাও দেশের বাইরে বিভিন্ন নামকরা উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি নিয়েছেন। 

ভিসিসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেওয়া প্রসঙ্গে সম্প্রতি শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু উপাচার্যের পদ খালি আছে, তা নয়। উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষসহ অনেক প্রশাসনিক পদ খালি পড়ে আছে। আগে এ পদগুলো এতটাই দলীয়করণ করা হয়েছে যে, শূন্যপদগুলো পূরণের জন্য কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। উচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা আছে, প্রশাসনিক দক্ষতা আছে, বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে যোগ্য- এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। উপাচার্য পদে নিয়োগের জন্য আমার কাছে শত শত সুপারিশ আসছে নানা দিক থেকে। আমি আমার মতো যোগ্য, যাদের পদায়ন করা যায়, বিভিন্নভাবে খোঁজার চেষ্টা করছি। 

পুরোনো কারিকুলামেই ফিরে যাওয়া 

আওয়ামী লীগ আমলে নতুন শিক্ষাক্রম শুরুর পর থেকেই তা নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক। ভুলে ভরা বই, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অভাব, পরীক্ষা, পাঠদান এবং বইয়ের নানা কন্টেন্ট নিয়ে বিতর্ক তুলে শিক্ষক-অভিভাবকরা তা বাতিল করার দাবি জানাচ্ছিলেন। ফলে ওই শিক্ষাক্রম চালুর দুই বছরের মাথায় তা বাস্তবায়ন সম্ভব নয় জানিয়ে পুরোনো শিক্ষাপদ্ধতিতে (সৃজনশীল) ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

গত রবিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় কারিকুলাম নিয়ে নতুন নির্দেশনায় জানিয়েছে, চলতি শিক্ষাবর্ষ থেকেই পরীক্ষা হবে আগের নিয়মে। এ ছাড়াও আগামী শিক্ষাবর্ষে সব শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে আনা হবে পরিমার্জন ও সংশোধন। নতুন কারিকুলামের কারণে এই বছর নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বিভাগ নির্বাচনের সুযোগ পায়নি, তারা আগামী বছর দশম শ্রেণিতে বিভাগ নির্বাচনের সুযোগ পাবে। দশম শ্রেণিতে তাদের পাঠদান করানো হবে পুরোনো কারিকুলামের আলোকে। দুই বছরের জায়গায় এক বছরে তাদের সিলেবাস শেষ করার জন্য সিলেবাসও সংক্ষিপ্ত করা হবে। আর আগামী বছর থেকে নবম শ্রেণিতেই বিভাগ বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকবে। 

২০২৬ সাল থেকে নতুন আরেকটি শিক্ষাক্রমের আলোকে পাঠদান করা হবে উল্লেখ করে নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শিক্ষাবিদ, শিক্ষাক্রম বিশেষজ্ঞ, প্যাডাগগ, মূল্যায়ন বিশেষজ্ঞ, সংশ্লিষ্ট বিষয় বিশেষজ্ঞ, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও অভিভাবক প্রতিনিধিদের সহযোগিতায় ২০২৫ সালে পরিমার্জিত শিক্ষাক্রম চূড়ান্ত করা হবে; যা ২০২৬ সাল থেকে পরিপূর্ণরূপে কার্যকর করা হবে। এই পরিমার্জিত শিক্ষাক্রমে বাস্তব ও কর্মমুখী শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। 

সরকারের এক মাসে শিক্ষা খাতের মূল্যায়ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, সরকার এই মাসে শিক্ষা নিয়ে অনেক কাজ করেছে। এটা অবশ্যই প্রশংসনীয়। এত দ্রুত ভিসি নিয়োগ দেওয়া অনেকটা অসম্ভব ছিল আগে। এবার যোগ্য শিক্ষকদের নিয়ে একটি যুগোপযোগী কারিকুলাম তৈরি করতে হবে। কারিকুলামে কর্মমুখী ও বাস্তবসম্মত শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা