ইউছুব ওসমান, জবি
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৪ ১২:১৭ পিএম
আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৪ ১২:১৯ পিএম
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: সংগৃহীত
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে গত ১১ আগস্ট পদত্যাগ করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম। একই সঙ্গে পদত্যাগ করেন ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলাম, প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেনসহ প্রক্টরিয়াল বডির সকল সদস্য, হল প্রভোস্ট ও ছাত্র কল্যাণ পরিচালক। বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন প্রশাসনিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে হঠাৎ বেপরোয়া হয়ে উঠে যা খুশি তাই করে যাচ্ছেন ট্রেজারার অধ্যাপক ড. হুমায়ুন কবির চৌধুরী। রেজিস্ট্রার নিয়োগসহ বিভিন্ন বিভাগের চেয়ারম্যান নিয়োগ ও নানা ধরনের অনিয়ম চালাতে শুরু করেছেন তিনি। তার এসব কর্মকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয় আইনের লঙ্ঘন বলে অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, গত ১১ আগস্ট উপাচার্যের পদত্যাগের পর ট্রেজারার অধ্যাপক ড. হুমায়ুন কবির চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য বিস্তারে শুরু করেন আইনবহির্ভূত বিভিন্ন কর্মকাণ্ড। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৫ অনুযায়ী প্রশাসনিক পদসহ অন্যান্য পদে নিয়োগ ও দায়িত্ব বণ্টনের এখতিয়ার কেবল উপাচার্যের। কিন্তু আইন লঙ্ঘন করে ১৪ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ জাহিদ আলমকে পরবর্তী উপাচার্য নিয়োগ না দেওয়া পর্যন্ত রুটিন দায়িত্ব পালনের জন্য ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগ দেন ট্রেজারার হুমায়ুন কবির চৌধুরী। এ ছাড়া ১৫ আগস্ট ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. রইছ উদ্দীনকে বিভাগীয় চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেন তিনি। সেই অফিস আদেশে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগ পাওয়া ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ জাহিদ আলমের সই ব্যবহার করা হয়েছে। এই অফিস আদেশে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৫-এর ২৪(২) ধারার কথা উল্লেখ রয়েছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, ‘বিভাগীয় অধ্যাপকদের মধ্য হইতে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পালাক্রমে তিন বছরের জন্য ভাইস-চ্যান্সেলর কর্তৃক বিভাগীয় চেয়ারম্যান নিযুক্ত হইবেন।’ অর্থাৎ বিভাগীয় চেয়ারম্যান হিসেবে কাউকে নিয়োগ দেওয়ার এখতিয়ার শুধু ভাইস-চ্যান্সেলর বা উপাচার্যের। ট্রেজারার কোনো নিয়োগ দিতে পারেন না।
এদিকে অধ্যাপক ড. রইছ উদ্দীনকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও নিয়োগ প্রক্রিয়াটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে এখনও তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের সঙ্গে একটা সাংঘর্ষিক বিষয় আছে। আমি এখনও দায়িত্বভার নিইনি। আইনের বিষয়টি পর্যালোচনা করার পর দায়িত্ব নেব কি না ভেবে দেখব।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৫ অনুযায়ী, ট্রেজারারের এসব পদে নিয়োগ কিংবা দায়িত্বভার প্রদানের এখতিয়ার নেই। কোনো কারণে উপাচার্যের পদ শূন্য থাকলে কিংবা তার অনুপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর এবং রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেওয়া হলে কেবল সেক্ষেত্রেই উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব পালন করতে পারেন ট্রেজারার। অধ্যাপক হুমায়ুন কবির চৌধুরীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য এবং রাষ্ট্রপতি আদেশের মাধ্যমে এখনও ভারপ্রাপ্ত হিসেবে কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়নি বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৫-এর ১০ (৩) ধারা অনুযায়ী, ভাইস-চ্যান্সেলরের পদ শূন্য হলে চ্যান্সেলরের ভিন্ন মত না থাকা সাপেক্ষে ট্রেজারার ভাইস-চ্যান্সেলরের দায়িত্ব পালন করতে পারেন। তবে উপাচার্য সাদেকা হালিম ১১ আগস্ট পদত্যাগ করলেও ১৮ আগস্ট পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ও রাষ্ট্রপতি তার পদত্যাগ গ্রহণ করেননি বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ১৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশের ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতি গ্রহণ করে পরিপত্র জারি করলেও সেখানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নাম নেই। অর্থাৎ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদটি এখনও শূন্য হয়নি। সেক্ষেত্রে এই ধারা অনুযায়ী ট্রেজারার রেজিস্ট্রার হিসেবে কাউকে দায়িত্ব দিতে পারেন না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকরা বলছেন, উপাচার্য সাদেকা হালিম ব্যক্তিগতভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দিলেও এখনও চ্যান্সেলর তা গ্রহণ করে পরিপত্র জারি না করায় তার পদ শূন্য হয়নি। এমনকি চ্যান্সেলর ট্রেজারারকে ভারপ্রাপ্ত কিংবা রুটিন দায়িত্ব পালনের আদেশও দেননি। সেক্ষেত্রে এ ধরনের নিয়োগ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের লঙ্ঘন। অফিসের কাজের জন্য একজন ডেপুটি রেজিস্ট্রারকে এমনিতেই দায়িত্ব দিলে হতো। সেক্ষেত্রে আলাদা করে কাউকে রেজিস্ট্রার হিসেবে রুটিন দায়িত্ব দিয়ে নিয়োগ দেওয়ার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। বরং নিয়মবহির্ভূতভাবে এসব নিয়োগ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক শওকত জাহাঙ্গীর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, চ্যান্সেলর পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করায় উপাচার্যের পদটি এখনও শূন্য হয়নি। সে অনুযায়ী ট্রেজারার ভাইস চ্যান্সেলরের দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। তাই তার দেওয়া নিয়োগগুলো সম্পূর্ণরূপে বিশ্ববিদ্যালয় আইনের লঙ্ঘন। আর রেজিস্ট্রার হিসেবে কাউকে দায়িত্ব দেওয়ারও কোনো প্রয়োজন ছিলো না। একজন ডেপুটি রেজিস্ট্রার সাইন করেই সব কাজ করতে পারতেন। যাকে রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তিনি ডেপুটি রেজিস্ট্রার হিসেবেই ফাইলে সই করতে পারতেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী পরবর্তী উপাচার্য দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত ট্রেজারার ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পেলেও শুধু রুটিন ওয়ার্ক করতে পারবেন। তিনি তো সেই ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বও পাননি। ট্রেজারার হিসেবে রেজিস্ট্রার, বিভাগীয় চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের লঙ্ঘন। জরুরি পরিস্থিতিতে যেসব আইনের কথা বলা আছে, সেসব আইনের শর্তও পূরণ হয়নি। এটি বেআইনি।
আইন লঙ্ঘন করে নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে রেজিস্ট্রারের রুটিন দায়িত্ব পাওয়া মোহাম্মদ জাহিদ আলম বলেন, আমাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে রুটিন দায়িত্ব হিসেবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী ঠিক হয়েছে কি না সেটি ট্রেজারারকে জিজ্ঞাসা করলে জানতে পারবেন। আমার এ বিষয়ে জানা নেই।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. হুমায়ুন কবির চৌধুরী বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রেজিস্ট্রারসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল দায়িত্ব বিশেষ বিবেচনায় চলতি সময়ে রুটিন দায়িত্ব হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী উপাচার্য দায়িত্বে না আসা পর্যন্ত তারা এ দায়িত্বগুলো পালন করবেন। শিক্ষার্থীদের স্বার্থেই এ দায়িত্বগুলো দেওয়া হচ্ছে।
আইন অনুযায়ী নিয়োগগুলো বৈধ কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, রুটিন দায়িত্বে চ্যান্সেলর দ্বিমত পোষণ করে না থাকলে তারা কাজ করতে পারবেন। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চ্যান্সেলরকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবদিক বিবেচনা করে একটি চিঠি দিয়ে অবগত করা হয়েছে।