সেলিম আহমেদ ও ইউছুব ওসমান
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৪ ১০:৫৭ এএম
আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৪ ১১:০৭ এএম
উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যসহ বিভিন্ন পদধারীদের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনমুখর হয়ে উঠেছে দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের একাংশ শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে পদত্যাগও করেছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় তারা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে থাকা দূরে থাক, উল্টো নানাভাবে হয়রানি করেছেন।
উপাচার্য, ট্রেজারার, প্রক্টরিয়াল বডি, হল প্রভোস্টসহ বিভিন্ন দপ্তরপ্রধান পদত্যাগ করায় কিংবা নিরাপত্তাহীনতার কারণে কার্যালয়ে না আসায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দেখা দিয়েছে প্রশাসনিক অচলাবস্থা। আন্দোলনের কারণে জুলাই মাস ধরে অচলাবস্থার মধ্যে সরকারের পতন ঘটলেও সেই সংকট অব্যাহত বিধায় অভিভাবক মহলে দেখা দিয়েছে দুশ্চিন্তা। এমন প্রেক্ষাপটে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করাও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। নতুন সরকার এই চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবিলা করবে, সেটা নিয়েও নানা মত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রশাসনিক অচলাবস্থা, হলগুলোতে নিরাপত্তাহীনতা
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সোমবার (১২ আগস্ট) পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা প্রকৌশল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইউনিভার্সিটির উপাচার্যরা পদত্যাগ করেছেন। বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার, রেজিস্ট্রারসহ প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরাও পদত্যাগ করেছেন। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের হল প্রভোস্টসহ বিভিন্ন দপ্তরের প্রধানরাও পদত্যাগ করেছেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রশাসনিক অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। প্রক্টরিয়াল বডি পদত্যাগ করায় শৃঙ্খলা রক্ষাসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হলে শিক্ষার্থীরা অবস্থান করায় তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করাসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়াও থমকে গেছে। উপাচার্য না থাকায় ক্লাস-পরীক্ষা শুরুর বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রূপরেখা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া প্রশাসনিক পদে নিয়োগসহ একাডেমিক ও প্রশাসনিক অনেক কার্যক্রমই বন্ধ হয়ে গেছে।
দ্রুত উপাচার্য নিয়োগ প্রয়োজন
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ও প্রশাসনিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ উপাচার্য ছাড়া নেওয়া সম্ভব নয়। ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবেও রাষ্ট্রপতি কাউকে নিয়োগ না দেওয়ায় সেই জটিলতা আরও বেড়েছে। উপাচার্য না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একাডেমিক কাউন্সিল, সিন্ডিকেট সভাসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোও নেওয়া সম্ভব হবে না। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্লাস শুরুর বিষয়েও জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্যসহ প্রশাসনিক পদগুলোতে নিয়োগ না দেওয়া হলে এই সংকট আরও বাড়বে। দ্রুত ক্লাস শুরু না করা গেলে আন্দোলনকে ঘিরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্তঃসম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে; সেশনজটসহ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নানামুখী সংকটে পড়তে পারে বলে মনে করছেন তারা।
প্রসঙ্গত, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ শিক্ষার্থীদের নানামুখী আন্দোলনে গত ১ জুলাই থেকে বিরাজ করছে অচলাবস্থ। ওইদিন থেকে শিক্ষকদের সর্বজনীন পেনশনের প্রত্যয় স্কিমের বাইরে রাখার জন্য শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ক্লাস-পরীক্ষা ও দাপ্তরিক কার্যক্রম বর্জন করে কর্মবিরতি শুরু করেন। প্রায় একই সময়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ক্লাস বর্জন করে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। গত ৪ আগস্ট প্রত্যয় স্কিম বাতিলের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে গত ১৬ জুলাই দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। পরদিন শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল ছাড়তে বাধ্য করা হয়। এখনও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শুরু হয়নি পাঠদান কার্যক্রম।
যা বলছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতদিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্যসহ অন্যান্য নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও দক্ষতার চাইতে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় সরকার পতনের পর এমন গণপদত্যাগের ঘটনা ঘটছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সেখানে উপাচার্যসহ অন্যান্য পদে নিয়োগ দেওয়া না হলে এই সংকট আরও বাড়তে পারে। সংকট উত্তরণে দ্রুত যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগসহ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান তৈরির কথাও বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘অনেকদিন হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসিসহ অন্যান্য নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও দক্ষতাকে বিবেচনা করা হয় না। তাদের নিয়োগ দেওয়া হয় দলীয় বিবেচনায়। ফলে এই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এখন যাদের দায়িত্ব দেওয়া হবে, তাদের যোগ্যতা, দক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা অবশ্যই বিবেচনা করা উচিত। দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দিলে এই অস্থিরতা কাটবে না।’
তিনি বলেন, ‘এখন যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হবেন, তাদের বড় কর্তব্য হবে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল রাজনৈতিক দলকে সমান সুযোগ করে দেওয়া। সকলের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান তৈরি করা। মেধার ভিত্তিতে আবাসিক হলে ছাত্রদের সিট বরাদ্দ করতে হবে। তাদের আরেকটি বড় দায়িত্ব ছাত্র সংসদের নির্বাচন দেওয়া। এতে মেধাবান ছাত্রনেতা তৈরির পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক জীবন ফিরে আসবে।’
ইউজিসির চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক মুহাম্মদ আলমগীর বলেন, ‘সব জায়গায় একই সমস্যা। সরকার হয়তো এটি নিয়ে চিন্তা করবে। সরকারের নির্দেশনা পেলে আমরা শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা করব।’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক বলেন, ‘এভাবে গণপদত্যাগের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। একাডেমিক কাউন্সিল, সিন্ডিকেট সভা তো উপাচার্য ছাড়া করা যাবে না। এটা ছাড়াও ক্লাসও শুরু করা যাবে না। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রশাসনিকভাবে সুসংগঠিত না থাকলে শিক্ষার্থীদেরও ক্লাসমুখী করা যাবে না। ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশনজট দেখা দিয়েছে। যোগ্য ও দক্ষদের উপাচার্যসহ অন্যান্য পদে নিয়োগ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সুসংগঠিত করতে হবে। দেশের আইনশৃঙ্খলার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সুসংগঠিত করা এখন নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।’