প্রতিষ্ঠা দিবস
সিরাজুদ্দৌলা আরাফাত, শেকৃবি
প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২৪ ১১:৩৮ এএম
আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৪ ১১:৪৮ এএম
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি : সংগৃহীত
ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী এ ভূখণ্ডের কৃষি এবং কৃষককে পরিচালিত করেছিল এমনভাবে, যাতে এদেশের স্বাভাবিকভাবে বর্ধনশীল কৃষিকাঠামো ভেঙে পড়ে, যাতে ইউরোপের পুঁজিবাজারকে সমৃদ্ধ করে তোলে এখানকার কৃষি উৎপাদন। এ কারণে তখন প্রায়ই এই ভারতীয় উপমহাদেশে দেখা দিত দুর্ভিক্ষ। কিন্তু অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক চেয়েছিলেন কৃষি ও কৃষককে নতুন এক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে। তাই ১৯৩৮ সালের ১১ ডিসেম্বর ৩০০ একর জমিসহ বড়সড় এক ক্যাম্পাসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তিনি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির নাম দেন ‘দি বেঙ্গল কৃষি ইনস্টিটিউট’। সেটিই ছিল বাংলায় প্রথম কৃষির উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
ইংল্যান্ডের রেডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক কৃষি কারিকুলামকে অনুসরণ করে ১৯৪১ সালে এই ইনস্টিটিউটের একাডেমিক যাত্রা শুরু হয়। ১০ জন মুসলমান ও ১০ জন হিন্দু ছাত্র নিয়ে শুরু হয় ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন অ্যাগ্রিকালচার (বিএসসিএজি) কোর্স। তখন এ কোর্সের কৃতী শিক্ষার্থীরা দুই বছর কৃষিসংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর পড়ালেখা করে পরীক্ষা পাসের পর জেলা কৃষি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কৃষি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে চাকরি করতে পারত। এরাই ছিল ১৯৪৩ সালে বাংলার প্রথম কৃষি গ্র্যাজুয়েট।
১৯৪৩ সাল থেকে এ প্রতিষ্ঠান থেকে যেসব গ্র্যাজুয়েট পাস করেছে মূলত তারাই এদেশে কৃষি গবেষণা কার্যক্রমের সূচনা করে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে স্বাধীন দেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রেখেছেন গৌরবময় ভূমিকা।
ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটলে এ প্রতিষ্ঠানটির নাম করা হয় ইস্ট পাকিস্তান অ্যাগ্রিকালচার ইনস্টিটিউট। ১৯৬১ সাল থেকে ৮০ জন ও ১৯৭১ সাল থেকে এখানে প্রতি বছর ১২০ জন ছাত্র ভর্তি করা হয়। উচ্চতর কৃষি শিক্ষার ক্ষেত্রে এটিই এদেশে একক উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সে কারণেই একে উচ্চতর কৃষি শিক্ষার সূতিকাগার বলে চিহ্নিত করা হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এর নাম রাখা হয় বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট (বিএআই)। অবশ্য সর্বসাধারণের কাছে এটি ‘কৃষি কলেজ’ হিসেবেই পরিচিতি লাভ করে।
এ ভূখণ্ডের দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের অন্নের সংস্থান, কৃষি শিক্ষা, কৃষি গবেষণা ও কৃষি সম্প্রসারণে এ ইনস্টিটিউটের গ্র্যাজুয়েটরাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এরই মধ্যে ১৯৬১ সালে ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর ১৯৬৪ সালে এ ইনস্টিটিউট কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত কলেজ হিসেবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকে।
২০০১ সালের ৬ জানুয়ারি বিএআই-এর হীরকজয়ন্তী অনুষ্ঠানে তৎকালীন এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ প্রতিষ্ঠানকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় করার ঘোষণা দেন। ৯ জুলাই ২০০১ সালে জতীয় সংসদে ‘শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আইন’ অনুমোদন পায়। ঠিক ৬ দিন পর ১৫ জুলাই তিনি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। দক্ষিণ এশিয়ার সেই প্রাচীনতম কৃষি শিক্ষার অগ্রদূত শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ।
অনুষদ ও আবাসিক হল
প্রতি বছর শুধুমাত্র বিজ্ঞান বিভাগের সাড়ে ছয়শর মতো শিক্ষার্থী এখানে ভর্তির সুযোগ পান। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ৪টি অনুষদ ও ১টি ইনস্টিটিউটের অধীনে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি কোর্সে সাড়ে ৪ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। ২০১৫ সালের ১৬ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষার পাশাপাশি গবেষণার জন্য এখানে রয়েছে একাধিক খামার এবং উন্নত ল্যাব সুবিধা। শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে সাতটি আবাসিক হল। এগুলোর চারটি ছাত্রদের ও তিনটি ছাত্রীদের জন্য।
গ্রন্থাগার
প্রশাসনিক ভবনের ঠিক পূর্ব পাশে ছয় তলাবিশিষ্ট স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রন্থাগার স্থাপন করা হয়েছে। এখানে রয়েছে ডিজিটাল লাইব্রেরি। সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় এবং আরএফআইডি টেকনোলজিসমৃদ্ধ এই গ্রন্থাগারে রয়েছে ৪৩,০০০-এরও বেশি দেশি-বিদেশি বই, বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নাল ও ম্যাগাজিনের এক বিশাল সংগ্রহশালা। এ ছাড়া এ গ্রন্থাগারের জন্য একটি অ্যাপ ডেভেলপ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে যখন-তখন যেখানে-সেখানে বসে দরকারি বই পড়া ও তথ্য সংগ্রহ করা যাবে। গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত শেকৃবিসহ অন্যান্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নাল ও থিসিস পেপারের জন্য একটি ডিজিটাল আর্কাইভও তৈরি করা হয়েছে।
গবেষণা
শিক্ষক, গবেষক ও ছাত্ররা এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গবেষণাগারে গবেষণা করে নতুন নতুন ফসলের জাত আবিষ্কার করে যাচ্ছেন। জলবায়ু পরিবর্তন ও নিরাপদ খাদ্যোৎপাদনের উপায় নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। ঢাকা শহরকে সবুজে আচ্ছাদিত করার জন্য ছাদবাগান নিয়ে চলছে ব্যাপক গবেষণা। মাছ ও পোলট্রির প্রচলিত খাদ্যের বিপরীতে বিকল্প খাদ্য ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই ব্যবহার, সামুদ্রিক মাছ পুকুরে চাষযোগ্য করা ও বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবনসহ আন্তর্জাতিক মানের মৌলিক ও ফলিত গবেষণা করছেন গবেষকরা। দেশের মাটিতেই ব্ল্যাক গোল্ড ভ্যানিলা চাষের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন এখানকার গবেষকদল।
ইতোমধ্যেই এখানে গবেষণার মাধ্যমে সাউ সরিষা-১, সাউ সরিষা-২, সাউ সরিষা-৩, সাউ টমাটিলো-১, সাউ টমাটিলো-২, সাউ হাইব্রিড ভুট্টা-১, সাউ হাইব্রিড ভুট্টা-২, সাদা ভাট্টা, বাংলাদেশের আবহাওয়ায় আলু বীজ ও পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনে সফলতা এসেছে। রওকোলা, বাটন মাশরুম, জামারুসান মুলা ও বিভিন্ন বিদেশি ফুলের উৎপাদনে সফলতাও উল্লেখযোগ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়নে গড়ে উঠেছে একটি আধুনিক টিস্যু কালচার ল্যাব। দেশের প্রথম মৎস্য হাসপাতালও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
এ প্রতিষ্ঠানের ছাত্র এএসএম কামাল উদ্দিন দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে দিয়েছেন অমৃত কলার চাষ। তিনি পেঁপে ও আনারসের লাগসই চাষের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন। ড. নূর মোহাম্মদ মিয়া ও ড. ছিদ্দিক আলীসহ অনেক কৃষিবিদ উচ্চ ফলনশীল ধান বিআর-৩, বিআর-৪, বিআর-১০, বিআর-১১, বিআর-১৪, বিআর-১৯, বিআর-২৩ জাত আবিষ্কার করে শুধু নিজ দেশে নয় প্রতিবেশী ভারত, নেপাল, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, পশ্চিম আফ্রিকায় স্বীকৃতি পেয়েছেন। কাজী পেয়ারার জনক ড. কাজী এম বদরুদ্দোজা এ বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র। ড. কাজী এম বদরুদ্দোজা এবং ড. এসএম জামান নামে দুজন কৃষি বিজ্ঞানী বাংলাদেশ সরকারের ‘সায়েন্টিস্ট ইমেরিটাস’ পদে ভূষিত হয়েছিলেন।
৮৬ বছর পুরোনো এ প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার কৃষি গ্র্যাজুয়েট তৈরি হয়েছে। যারা অবদান রাখছে কৃষিসহ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এ বিদ্যাপীঠের নাম ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। গবেষণা, শিক্ষা ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষিক্ষেত্রে সেন্টার অব এক্সিলেন্স হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠানকে দেখতে চান বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।