প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৪ ১৫:১৬ পিএম
শনিবার বিকালে শাহবাগ মোড়ে কোটা পদ্ধতি বাতিলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। প্রবা ফটো
স্ব-স্ব ক্ষেত্রের দাবিকে ঘিরে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চতুর্মুখী আন্দোলনে থেমে আছে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম। ক্লাস, পরীক্ষাসহ সব দাপ্তরিক কার্যক্রম বন্ধ রেখে কর্মবিরতি পালন করছেন তারা। গত পহেলা জুলাই থেকে শুরু হওয়া ‘প্রত্যয়’ স্কিম ও কোটা বাতিলের আন্দোলনের ছয় দিন পেরিয়ে গেলেও সংকট নিরসনে কোনো উদ্যোগ নেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। মন্ত্রণালয়ের এই নীরব ভূমিকায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় যদি সমঝোতার উদ্যোগ না নেয়, তাহলে উদ্যোগ নেবে কে? মন্ত্রণালয়ের উচিত সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সমঝোতার পথ তৈরি করা।
গত ১ জুলাই থেকে স্বশাসিত, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ বা সমজাতীয় সংস্থা এবং তাদের অধীনস্থ অঙ্গ-প্রতিষ্ঠানের কর্মে যোগদানকারীদের জন্য সর্বজনীন পেনশনের প্রত্যয় পেনশন স্কিম কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। কিন্তু বিদ্যমান পেনশন থেকে প্রত্যয় স্কিমে সুযোগ-সুবিধা অনেক কমÑ এ কথা জানিয়ে সরকারের এ সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের ডাকে পহেলা জুলাই থেকে তারা ক্লাস-পরীক্ষা ও সব ধরনের দাপ্তরিক কার্যক্রম বন্ধ রেখে লাগাতার কর্মবিরতি পালন করছেন। বিএনপিসহ সমমনা কয়েকটি রাজনৈতিক দল এসব আন্দোলনে গতকাল শনিবার একাত্মতা প্রকাশ করেছে।
‘পরিস্থিতি বিবেচনা করে পদক্ষেপ’ নেবে মন্ত্রণালয়
শিক্ষকরা কর্মবিরতি শুরু করলেও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে এখনও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। উল্টো গত ৩০ জুন এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেছেন, ‘সর্বজনীন পেনশনের আওতায় কারা আসবে, সেটা সরকারের নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্ত। সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সেটার সঙ্গেই আছে। শিক্ষকরা দাবিদাওয়া সরকারের কাছে জানাচ্ছেন, সরকারই এ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এখানে কিছু করার নেই।’
শিক্ষকদের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে মন্ত্রণালয় কোনো ব্যবস্থা নেবে কি নাÑএ প্রশ্নের জবাবে ওইদিন তিনি বলেন, ‘তাদের দাবিদাওয়া আদায়ে তারা আন্দোলন করছেন। সেই অধিকার তাদের আছে। শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে আমি বলব, আমরা বিষয়টির দিকে নজর রাখছি। এখনও সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু হয়নি। তাদের কর্মসূচি শুরু হোক, পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমরা পদক্ষেপ নেব।’
এরপর বিষয়টি নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী আর কোনো কথা বলেননি। আন্দোলনরত শিক্ষকদের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো যোগাযোগও করা হয়নি বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি অধ্যাপক আখতারুল ইসলাম। গতকাল শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তিনি বলেন, ‘আমরা আলোচনার জন্য অপেক্ষা করছি। এখনও শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা সরকারের কোনো মহল থেকে আমাদের আলোচনার জন্য আহ্বান জানানো হয়নি।’
এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ‘প্রত্যয়’ ও ‘কোটা সংকট’ নিয়ে কোনো সামাধান তাদের হাতে নেই। এটা সরকারের নীতিগত বিষয়। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেই কেবল বিষয়টির সমাধান সম্ভব।
আজ থেকে আবারও কর্মবিরতিতে শিক্ষকরা
ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ফলে সেশনজট তৈরির পাশাপাশি শিখন ঘাটতিসহ নানা সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে শিক্ষকদের সঙ্গে সরকারের দ্রুত বসে সমাধানের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষাবিদ-অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা। এদিকে উদ্ভূত এই সংকট নিরসনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক-পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সঙ্গে দুদিন শিক্ষকদের বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও অনিবার্য কারণে সেই বৈঠক হয়নি। সর্বশেষ গত শুক্রবার এই বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গতকাল শনিবার রাত পর্যন্ত এই বৈঠক হয়নি। আজ রবিবার থেকে ফের কর্মবিরতি পালন করবে আন্দোলনরত শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। আখতারুল ইসলাম বলেন, ‘সাপ্তাহিক ছুটির দিন থাকায় শুক্র ও শনিবার আমাদের আন্দোলন স্থগিত ছিল। আমাদের পূর্বঘোষণা ছিল দাবি মেনে নেওয়া না হলে আজ রবিবার থেকে আমরা ফের কর্মবিরতিতে যাব। আমরা আমাদের সিদ্ধান্তে অটল, আজ থেকে আবার আমরা কর্মবিরতি পালন করব।’
কোটা বাতিলের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে
দাবি পূরণ না হওয়ায় ১ জুলাই থেকে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ব্যানারে ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা আন্দোলন করে যাচ্ছেন। প্রথম দিকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করলেও এখন তা ছড়িয়ে গেছে দেশজুড়ে। প্রতিদিনই বিভিন্ন স্থানে সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন তারা।
গতকাল শনিবার শাহবাগে অবরোধ চলাকালে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ঘোষণা করেন, রবিবার বেলা তিনটা থেকে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি শুরু করা হবে।
এই আন্দোলন নিয়েও কিছু বলছে না শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে গতকাল শনিবার এক অনুষ্ঠানে কোটা সংস্কার আন্দোলনের বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘এটা তো (কোটা) কোর্টের রায়ের ব্যাপার। আমরা তো কোথাও এই কোটা রাখিনি। আমাদের ব্যবস্থা ছিল কোটামুক্ত। আদালতে কারা মামলা করেছে? আদালতের রায়, সেখানে আমাদের কী বলার আছে? সরকারের কী দোষ? সরকার তো এটা করেনি।’
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘সকল বিশ্ববিদ্যালয় অচল হয়ে আছে। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে আছে। শিক্ষকরা আন্দোলন করছেন। শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দ্রুতই আলোচনায় বসতে হবে। যেকোনো সংকটই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।’
জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির কো-চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ‘শিক্ষকরা রাষ্ট্রের খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা কয়েক দিন ধরে আন্দোলন করছেন। তাদের সমস্যাগুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শুনে একটা সমাধান দেওয়া উচিত। উদ্যোগ না নিলে তো কোনো সমাধান আসবে না। শিক্ষার্থীদের বিষয়টিও শোনা উচিত।’
শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীকে একাধিকবার ফোন দিয়েও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় তদারকি প্রতিষ্ঠান ইউজিসির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুহাম্মদ আলমগীর বলেন, ‘শিক্ষকদের আন্দোলনের বিষয়টি নিয়ে ইউজিসির কোনো করণীয় নেই। পেনশন স্কিম সরকারের নীতিগত বিষয়। তবে আমরা শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবিগুলো শিক্ষামন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টাকে জানিয়েছি। এখন সরকারের তরফ থেকে বলা হলে আমরা বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেব।’ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ক্ষতির কথা বিবেচনা করে দ্রুত বিষয়টির সমাধান হওয়া উচিত বলেও মনে করেন তিনি।