রাজিব রায়হান, জাবি
প্রকাশ : ৩১ মে ২০২৪ ১০:০৭ এএম
আপডেট : ৩১ মে ২০২৪ ১৩:১২ পিএম
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিযায়ী পাখির একটি আবাসস্থল। প্রবা ফটো
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) পরিযায়ী পাখির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত পুরোনো রেজিস্ট্রার ভবনের সামনের লেকটি। লেকটিকে ‘মেইন বার্ডস’ নামে অভিহিত করা হয়। সম্প্রতি সেখানে ছয়তলা ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে চারুকলা বিভাগ। এ নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের মাধ্যমে ভবন নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
গত ৬ মে বিশ্ববিদ্যালয় জলাশয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় চারুকলা অনুষদ ভবন নির্মাণের জন্য নির্ধারিত জায়গায় পাশের লেকটিকে মেইন বার্ডস লেক নামে শনাক্ত করা হয়। যার আয়তন ৭.১৫ একর। ওই সভায় লেকটি সংস্কারের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু ওই স্থানে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হলে, নির্মাণকালীন সময়ে উৎপন্ন শব্দ ও বিশৃঙ্খলায় লেকটি আর পরিযায়ী পাখির বাসাযোগ্য থাকবে না বলে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। জলাশয় ব্যবস্থাপনা কমিটির এ সিদ্ধান্ত গত ২৩ মে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় অনুমোদিত হয়।
এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী তৌহিদ মোহাম্মদ সিয়াম বলেন, চারুকলা অনুষদের জন্য নির্ধারিত জায়গায় পরিবেশের বাস্তুতন্ত্র রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্যাম্পাসের সব থেকে জীববৈচিত্র্যপূর্ণ লেকটি অবস্থিত ওই জায়গায়। কয়েক শতাধিক গাছ কাটা পড়বে বলে জেনেছি। প্রতি বছরই লেকটির পাড়ে অতিথি পাখিরা আসে। ঠিক এমনই একটি জায়গা যখন কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করে, তখন আসলে তারা চরম অদক্ষতার পরিচয় দেয়। আমরা আসলে ভবনের বিরুদ্ধে না, আমরা চাই ভবন হোক। কারণ চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা যে শ্রেণিকক্ষ সংকটে রয়েছে সেটা আমরা বুঝতে পেরেছি। যদি ওই জায়গাটায় ভবন করা লাগে তাহলে মাস্টারপ্ল্যান করেই করতে হবে। আর যদি মাস্টারপ্ল্যান পর্যন্ত অপেক্ষা করতে না পারে তাহলে বিকল্প জায়গায় ভবনটি করতে হবে।
ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদের একাংশের সভাপতি আলিফ মাহমুদ বলেন, পরিবেশবিজ্ঞানীরা বলছেন ওই জলাশয়ের পাড়ে বহুতল ভবন নির্মাণ হলে পাখির ফ্লাইট জোন নষ্ট হয়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে পাখি কোনোভাবেই আসবে না। এর পাশে একটি এক তলা টিনশেড ভবন আছে। সে সময় পাখির কথা চিন্তা করেই সেখানে বহুতল ভবন করা হয়নি। যাতে গাছ দিয়ে টিনশেড ঢাকা পড়ে যায়। কিন্ত এসব আমলে নেওয়া হচ্ছে না। এখানে বাস্তুতন্ত্রের জন্য সংবেদনশীল জায়গায় ভবন নির্মাণ হলেও ইআইএ করা হয়নি। এটি এক ধরনের প্রতারণা, যা মেনে নেওয়া যায় না।
পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়া বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছিল মূলত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে বিবেচনা করেই। এখানে যতগুলো লেক আছে, সেগুলো তার সৌন্দর্যের অন্যতম বাহক। নব্বইয়ের দশকে লেকের পাড়গুলোতে এবং যে সমস্ত জায়গায় টিলা রয়েছে, সেখানে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল। একটা ‘গ্রিন জোন’ তৈরি করা হয়েছিল। যার কারণে প্রাণ-প্রকৃতি আরও বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক-শিক্ষার্থী চেষ্টা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশকে রক্ষা করে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করার। কিন্তু সম্প্রতি অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পে গাছপালা কেটে ও জলাশয় ভরাট করে খেয়াল-খুশিমতো ভবন বানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ-প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য নষ্ট করা হচ্ছে। এখানে মাস্টারপ্ল্যানকে বিবেচনায় আনা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে যেখানে চারুকলা ভবন তৈরি করা হচ্ছে, সেখানে ভবন নির্মাণ একেবারেই অনুচিত। এটাই ছিল আমাদের প্রথম জলাধার, যেখানে অতিথি পাখি বসত। কাজেই সেখানে আবার কীভাবে পাখি ফিরিয়ে আনা যায়, নিরাপদ আশ্রয়স্থল করা যায়, সে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অনেক বিকল্প জায়গা আছে, যেখানে তারা ভবন করতে পারবে।
এ বিষয়ে চারুকলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এমএম ময়েজউদ্দিন বলেন, আমরা অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতেই চারুকলা অনুষদের ভবনের জন্য জায়গা নির্ধারণ করেছি। ভবনটি জলাশয়ের কোনো ক্ষতি করবে না। ইচ্ছা করলেই আমরা জায়গা পরিবর্তন করতে পারি না, বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য আমাদের যে জায়গা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, আমরা সেভাবেই নকশা করেছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারপ্ল্যান কমিটির সদস্য সচিব এবং নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক মো. আকতার মাহমুদ বলেন, চারুকলা অনুষদের জন্য নির্ধারিত জায়গা জীববৈচিত্র্য এবং পরিযায়ী পাখির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের স্থানগুলোতে ভবন নির্মাণের আগে ইআইএ করা বাঞ্ছনীয়। কারণ এই জায়গাকে কেন্দ্র করে জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যতা গড়ে উঠেছে। পরিবেশের ওপর ভবনটি কিরূপ প্রভাব ফেলবে, এটা অবশ্যই চিন্তা করতে হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সংশ্লিষ্ট ভবনের স্থপতি আলিয়া শাহেদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও রিসিভ করেননি।