রামেবির উপাচার্য মোস্তাক
রাজু আহমেদ, রাজশাহী
প্রকাশ : ২৮ মে ২০২৪ ১৪:২৮ পিএম
আপডেট : ২৮ মে ২০২৪ ১৫:০৪ পিএম
উপাচার্য অধ্যাপক এজেডএম মোস্তাক হোসেন তুহিন। ছবি: সংগৃহীত
এখনও কোনো চাকরি বিধিমালা নেই রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি); নেই কোনো অর্গানোগাম। এই আইনগত দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানটির উপাচার্য অধ্যাপক এজেডএম মোস্তাক হোসেন তুহিন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নির্ধারিত বেতন-ভাতার চেয়ে অনেক বেশি নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের কাজে যথোপযুক্ত বিভাগকে কাজে না লাগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ ও অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পেও নানা দুর্নীতি-অনিয়ম ঘটানো হচ্ছে তার ইশারায়। বিশ্ববিদ্যালয়টি রাজশাহীতে হওয়ার পরও উপাচার্য অফিস করছেন ঢাকার গেস্ট হাউসে। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) দেওয়া নির্দেশনাতে টনক নড়েনি তার। অভিযোগ- বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়ম ও দুর্নীতি ঢাকতে গণমাধ্যমে কোনো বক্তব্য দেওয়ার ব্যাপারেও চিঠি দিয়ে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছেন তিনি।
এমন প্রেক্ষাপটে আজ মঙ্গলবার রাজশাহীর একটি অভিজাত হোটেলে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে রামেবির ১৬তম সিন্ডিকেট সভা। এ সভার পেছনে ব্যয় হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা। সভায় যোগ দিতে ঢাকা থেকে বিমানে রাজশাহীতে আসবেন ভিসি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই সিন্ডিকেট সভার আগে এমন অনেক প্রয়োজনীয় ও দাপ্তরিক কাজ করতে হয়েছে, ভিসি উপস্থিত না থাকায় যেগুলো নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে এবং অসম্পূর্ণ রাখতে হয়েছে। অবশ্য ভিসি মোস্তাক হোসেন তুহিন বলছেন, তিনি রাজশাহীতেই নিয়মিত অফিস করে থাকেন। তাই সমস্যা হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। আর রামেবির নিজস্ব কোনো অবকাঠামো না থাকার কারণেই বাইরে স্থানীয় একটি হোটেলে এ সভার আয়োজন করা হয়েছে।
অনিয়মের কারণে ব্যয় বেড়েছে প্রকল্পে
ছয় বছর আগে ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। এর ভূমি অধিগ্রহণসহ অবকাঠামো নির্মাণে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮৬৭.০৮ কোটি টাকা। তবে ভূমি অধিগ্রহণে গাফিলতি ও সঠিক তদারকির অভাবে এই ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৫৭.৯৪ কোটি টাকায়। ভূমি অধিগ্রহণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পরিকল্পনা শাখার জনবল থাকার পরও এ-সংক্রান্ত কাজ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল রামেবির লিয়াজোঁ ও প্রটোকল অফিসার এবং ভিসির পিএস (বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত) মো. ইসমাঈল হোসেন; যা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। তবে ভিসি মোস্তাক হোসেনের সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, পরিকল্পনা শাখায় জনবল না থাকায় আমাদের স্টাফদের দিয়েই কাজ করানো হচ্ছে এবং সঙ্গত কারণেই প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে।
সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পরও কর্মরত পিএস
উল্লেখ্য, রামেবির লিয়াজোঁ ও প্রটোকল অফিসার এবং ভিসির পিএস মো. ইসমাঈল হোসেন জাল সার্টিফিকেট দিয়ে চাকরি করছেনÑ এমন অভিযোগ ওঠার পর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং জালিয়াতির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। এরপর ১৫তম সিন্ডিকেট সভায় এ ঘটনায় ইসমাঈলকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিভাগীয় মামলার মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। একাধিক সিন্ডিকেট সদস্য অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ভিসি নানা কৌশলে সিন্ডিকেটের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে দিচ্ছেন না। বরং বরখাস্তের পরও ভিসি তাকে ঢাকায় রামেবির গেস্ট হাউসের লিয়াজোঁ অফিসে বসিয়ে তাকে দিয়ে দাপ্তরিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করাচ্ছেন।
মূল বাজেট পর্যালোচনায় আর্থিক অনিয়ম
এদিকে গত ৪ মার্চ ইউজিসির বাজেট পর্যালোচনা দল রামেবিতে এসে ২০২২-২৩ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মূল বাজেট পর্যালোচনা করে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অনিয়ম তুলে ধরে। প্রতিবেদনে এ সম্পর্কে বলা হয়, উপাচার্য নিয়োগ শর্তানুযায়ী তিনি সরকারি চাকরিতে আহরিত সর্বশেষ প্রাপ্ত বেতনের সমপরিমাণ বেতন-ভাতাদি প্রাপ্য হবেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য তার বেতন-ভাতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সর্বশেষ প্রাপ্ত বেতনের সঙ্গে উৎসব ও নববর্ষ ভাতা যোগ করে বেতন নির্ধারণপূর্বক ভাতাদি নির্ধারণ করেন। এভাবে তার বেতন-ভাতার পরিমাণ সর্বশেষ প্রাপ্ত বেতন-ভাতার চেয়ে বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে; যা নিয়মের ব্যত্যয় ও আর্থিক ক্ষতি।
এতে আরও উল্লেখ করা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত কোনো অর্গানোগ্রাম নেই। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ বিষয়ে নির্দেশনা থাকলেও এ নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই। এখন পর্যন্ত চাকরি বিধিমালা করাও সম্ভব হয়নি। বেতন নির্ধারণী কমিটি ছাড়াই বেতন নির্ধারণ করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির আয়েরও কোনো সঠিক হিসাব নেই। ফলে বাজেট প্রণয়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।
ঢাকায় বসে অফিস করেন উপাচার্য
উপাচার্য (ভিসি) একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদ। এমন একটি পদে থেকেও ভিসি মোস্তাক হোসেন দিনের পর দিন ঢাকায় থেকে অফিস করছেন মর্মে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঢাকায় অবস্থিত রামেবির গেস্ট হাউসকে তিনি লিয়াজোঁ অফিসে পরিণত করেছেন। রামেবিতে ডিনের আটটি পদের সবগুলোই বর্তমানে শূন্য। এ অবস্থায় উপাচার্যের অনুপস্থিতির ফলে প্রশাসনিক কাজে একদিকে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। অভিযোগÑ চলতি মে মাসে তিনি মাত্র দুই দিন রাজশাহী ক্যাম্পাসে অফিস করেছেন।
প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালের ২৩ মে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের অর্থ ও হিসাব শাখার পরিচালক স্বাক্ষরিত একটি পরিপত্র প্রকাশ করা হয়। রামেবির ২০২২-২৩ অর্থবছরের সংশোধিত এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মূল বাজেট (পরিচালন) বরাদ্দ এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে পালনীয় গাইডলাইন বিষয়ক এই পরিপত্রের ৫ নং পয়েন্টে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট হাউস ছাড়া কোনোরূপ অফিস বা লিয়াজোঁ অফিস অথবা অন্য কোনো নামে অফিস করা যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের ঠিকানায় বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে রামেবির অর্থ ও হিসাব শাখার পরিচালক এবং অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ডা. জাকির হোসেন খন্দকার বলেন, ভিসির ঢাকা-রাজশাহী যাতায়াতে অফিস থেকে বিল দেওয়া হয়। তবে ঢাকার লিয়াজোঁ অফিস ও ভিসির অবর্তমানে ক্যাম্পাস পরিচালনার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি শুধু জানিয়েছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিষয়ে মন্তব্য করতে ভিসির দপ্তর থেকে চিঠি দিয়ে নিষেধ করা হয়েছে।’
তবে ক্যাম্পাসে অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন রামেবির ভিসি অধ্যাপক ডা. এজেডএম মোস্তাক হোসেন তুহিন। তিনি বলেন, রাজশাহী ক্যাম্পাসের বাইরে রামেবির কোনো অফিস নাই। আমি রাজশাহীতে নিয়মিত অফিস করছি। ঢাকায় থাকলে গেস্ট হাউসে কিছু কাজ করি। চলতি মে মাসে দুই দিন অফিস করার বিষয়টি অস্বীকার করে ভিসি বলেন, ‘আমি ঢাকায় আছি, কাল রাজশাহী যাব। মাঝে মাঝে ঢাকায় থাকি। কিন্তু নিয়মিত থাকি না।