রকিব হাসান
প্রকাশ : ১৯ মে ২০২৪ ১৫:০৬ পিএম
তিনটি থ্রিলার গল্প
টেলিভিশনের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে বিস্মিত চোখে আগন্তুকের দিকে তাকাল সেলিম ওসমান।
‘আরে, সামিনা,’ বলল ও, ‘এত রাতে কী মনে করে? নিশ্চয় জরুরি কোনো ব্যাপার, নইলে রাত ১২টার সময় চুরি করে আমার বাসায় ঢুকতে না। দরজা খুললে কী করে? নিশ্চয় স্কেলিটন আছে সঙ্গে?’
সামিনা রহমান- ঢাকার অপরাধ জগতে ‘বিউটি কুইন’ নামে পরিচিত, গায়ের ওড়নাটা গলার কাছে তুলে দিয়ে হাতের হাতব্যাগটা পাশের টি-টেবিলে রাখল। মেয়েটা সুন্দরীÑসামিনার দিকে তাকিয়ে ভাবছে সেলিমÑতাতে কোনো সন্দেহ নেই। শ্যাম্পু করা কালো রেশমের মতো চুল ঘরের আলোয় চকচক করছে। ওকে দেখে আর যা-ই হোক, কুখ্যাত একটা চোরের দলের সদস্য মনে হয় না কিছুতেই।
ভুবন ভোলানো মিষ্টি হাসি দিয়ে সেলিমকে কাত করার চেষ্টা করল সামিনা, এ হাসি তার একটা বড় সম্পদ।
‘সেলিম,’ বলল ও, ‘আমার ধারণা, আমরা দুজনে দুজনকে খুব ভালোমতো বুঝতে পারি। পাঁচ বছর ধরে হোসেন মোল্লার দলে কাজ করে এটুকু জেনে গেছি, ওর সঙ্গে তোমার সাপে-নেউলে সম্পর্ক।’ হঠাৎ সামনে ঝুঁকল ও। বদলে গেল মুখের ভাব। ‘ও আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে, সেলিম। এতকাল ওর ওখানে এত বিশ্বস্ততার সঙ্গে কাজ করলাম, আর এখন একটা পিচ্চি অযোগ্য মেয়ের প্রেমে মজে মেয়েটার পরামর্শে আমাকে দল থেকে বের করে দিয়েছে। এত খারাপ লাগছে আমার, তোমাকে কী বলব, আমার মাথায় অপমানের আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে। আর সেজন্যই তোমার কাছে এসেছি।’
টেলিভিশনের শব্দ ‘মিউট’ করে দিল সেলিম। হেসে বলল, ‘তার মানে কি ধরে নিতে পারি, তুমি এখন আমার দলে যোগ দিতে এসেছ? তা যদি ভেবে থাকো, ভুল করছ। আমি তোমাকে নিতে পারব না। সরি!’
মৃদু হাসল সামিনা। ‘বোকার মতো কথা বোলো না, সেলিম। কোটি টাকা দিলেও আমি তোমার দলে কাজ করব না। ধূর্ত শিয়ালকে বিশ্বাস করা যায়, তোমাকে যায় না। যাক সে কথা। আমি এসেছি তোমাকে সাবধান করে দিতে।’
মৃদু শিস দিল সেলিম। ‘বলে যাও।’
‘ভেবো না, হঠাৎ তোমার প্রেমে পড়ে গিয়ে তোমাকে এসব কথা বলতে এসেছি,’ সামিনা বলল। ‘আমি এসেছি হোসেন মোল্লার অবিচারের বদলা নিতে।’ সামনে ঝুঁকে গম্ভীর স্বরে বলল, ‘তুমি তো জানো, ভারতের নিহালপুরের মহারাজ নিশঙ্কুচন্দ্র গিরিকান্তর সেক্রেটারি হরনাথ রায়, একটা অ্যান্টিক ড্যাগার নিয়ে ঢাকায় এসেছে, নিলামে বিক্রি করার জন্য, যেটার দাম ইতোমধ্যে ১০ কোটি টাকা উঠে গেছে। মোটা টাকায় বীমা পলিসি করানো হয়েছে ওটার জন্য...’
‘ড্যাগারটার বাঁট খাঁটি সোনায় তৈরি,’ বাধা দিয়ে বলল সেলিম, ‘তাতে দামি দামি রত্ন বসানো, বলা হয় সম্রাট অশোকের আমলের জিনিস ওটা, সব জানি। তুমি কেন আমাকে এসব শোনাচ্ছ, সেটা বলো।’
‘হোসেন মোল্লা জেনে গেছে,’ সামিনা বলল, ‘তুমি ওই ড্যাগারের পেছনে লেগেছ। হরনাথ রায় যে বাড়ির যে ফ্ল্যাটে উঠেছে, ওটার ঠিক ওপরের ফ্ল্যাটটা ভাড়া নিয়েছে তোমার সহকারী আবুল হাশেম। হোসেন মোল্লার ধারণা, হরনাথ রায়কে চোখে চোখে রাখার জন্য তুমিই ওই বাসাটা ভাড়া নিয়ে হাশেমকে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছ, কারণ, ওই ড্যাগারটা তুমি চুরি করতে চাও। তোমাকে সে সুযোগ দিতে চায় না হোসেন মোল্লা, তাই যত শীঘ্র সম্ভব ওটা দখল করে ফেলতে চায়। কাল রাতেই ওটা চুরি করতে যাবে ওর লোক। এখন তোমার উচিত, ওর আগেই কাজটা সেরে ফেলা। হরনাথ রায়ের ফ্ল্যাটের নকল চাবি তৈরি করিয়েছে হোসেন মোল্লা। আয়রন সেফের কম্বিনেশন নম্বর জোগাড় করেছে। আমি সেগুলো চুরি করে নিয়ে এসেছি। আমার এ ব্যাগের মধ্যেই আছে,’ টেবিলে রাখা হাতব্যাগটায় চাপড় দিল সামিনা। ‘কী বুঝলে?’
‘কিছুই না,’ বিড়বিড় করে বলল সেলিম।
হাসল সামিনা। ‘মিনিটখানেকের মধ্যেই বুঝে যাবে। ড্যাগারটা যদি চাও, তাহলে তোমাকে আজ রাতেই ওটা নিয়ে আসতে হবে। ফ্ল্যাটের চাবি আর কম্বিনেশন নম্বর দেওয়া হবে তোমাকে। হরনাথ রায় এখন ‘ড্রিম নাইট’ ক্লাবে মদ খেয়ে নাচানাচি করছে, রাত দুটোর আগে ফিরবে না। ওর ফ্ল্যাট এখন পুরোপুরি খালি। এ সুযোগে খুব সহজেই ড্যাগারটা সরিয়ে ফেলতে পারবে। ভেবো না আমি ড্যাগার বিক্রির টাকার ভাগ চাইব, যদি ইচ্ছে করে কিছু দাও, ভালো; না দিলেও কিছু মনে করব না। হোসেন মোল্লার ওপর প্রতিশোধ নিতে পারলেই আমি খুশি।’
‘আমাকে একটু ভাবতে দাও, সামিনা।’
নীরবে টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে রইল সেলিম। ছবিতে মন নেই। হঠাৎ বাইরে থেকে ভেসে এলো চড়া স্বরের বাউল গান। গায়ককে এ এলাকার সবাই চেনে। গনু ফকির। গান গেয়ে গেয়ে রাস্তায় ভিক্ষে করে। কিন্তু এত রাতে তো কখনও গান গায় না ও। উঠে গিয়ে জানালার সামনে দাঁড়াল সেলিম। দেখল, ওর জানালার দিকেই তাকিয়ে আছে গনু ফকির। সেলিম বুঝল, ওকে কোনো জরুরি সংবাদ দিতে এসেছে ফকির। মাঝে মাঝেই দেয়। কারণ, গনু ফকির ওর চর।
‘দেখলে, কী রকম ভ্যাঁ-ভ্যাঁ শুরু করেছে,’ সামিনার দিকে ফিরে বিরক্ত ভঙ্গিতে বলল সেলিম। ‘টাকা না দিলে যাবে না, এ রকম যন্ত্রণা দিতেই থাকবে। যাই, দুটো টাকা দিয়ে আসি।’
ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো সেলিম। সামনের গেট দিয়ে না বেরিয়ে নিঃশব্দে পেছন দিয়ে বেরোল। দেয়ালের ছায়ায় দাঁড়িয়ে রাস্তার অন্য পাড়ে তাকাল। স্ট্রিট ল্যাম্পের নিচে দাঁড়িয়ে আছে গনু ফকির। এক বগলের নিচে ক্রাচ। সেলিমের ফ্ল্যাটের জানালার দিকে তাকিয়ে রয়েছে একভাবে, গান গাইছে।
আস্তে করে রাস্তাটা পার হয়ে এসে ফকিরের সামনে দাঁড়াল সেলিম। পকেট থেকে একটা একশ টাকার নোট বের করে গনুর দিকে বাড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করল, ‘কী ফকির, এত রাতে গান গাওয়ার শখ হলো কেন?’
পাঞ্জাবির ছেঁড়া পকেট থেকে ডান হাতটা বেরিয়ে এলো গনুর। সেলিমের হাত থেকে নোটটা নেওয়ার সময় এক টুকরো কাগজ গুঁজে দিল ওর হাতে।
‘সাবধান থাকবেন, সেলিম ভাই,’ ফিসফিস করে বলল গনু। ‘এ কাগজে সব লিখে দিয়েছি, পড়লেই বুঝতে পারবেন।’ তারপর জোরে জোরে সেলিমের জন্য দোয়া চেয়ে, ক্রাচে ভর দিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে চলে গেল।
আবার বাড়িতে ঢুকে পড়ল সেলিম। সিঁড়ির ল্যান্ডিঙে উঠে ছাতে লাগানো বালবের আলোয় কাগজটা পড়ল। মুচকি হাসি ফুটল মুখে। কাগজটা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে একটা ময়লা ফেলার ড্রামে ফেলে দিয়ে, ওপরে নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে এলো।
সাড়া পেয়ে টিভির দিক থেকে মুখ ফেরাল সামিনা।
‘হ্যাঁ, সেলিম,’ সামিনা বলল, ‘এবার বলো কী ঠিক করলে? তোমার হাতে কিন্তু বেশি সময় নেই।’
মাথা ঝাঁকাল সেলিম। ‘কাজটা আমি করব, সামিনা। দাও ওগুলোÑচাবি আর কম্বিনেশন নম্বর।’ ঘড়ি দেখে বলল, ‘এখন বাজে সাড়ে ১২টা। হরনাথ রায় ফিরবে দুটোয়। দেড় ঘণ্টা সময় আছে আমার হাতে। আশা করি, সেরে ফেলতে পারব।’
হাসল সামিনা। ব্যাগ থেকে চাবি আর এক টুকরো কাগজ বের করে টেবিলে রাখল। ‘আমাকে এগিয়ে দেওয়ার দরকার নেই, সেলিম। আমি একাই যেতে পারব। তুমি গিয়ে তোমার কাজটা সেরে ফেলো। কাগজটা হারিয়ো না, তাহলে আর কিন্তু কম্বিনেশন নম্বর পাওয়া যাবে না। যাই। ভালো থেকো।’
বেরিয়ে গেল সামিনা। দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে গেল। দীর্ঘ কয়েকটা মিনিট নীরব টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে ভাবল সেলিম। পরিস্থিতিটা বেশ মজার। মোবাইল ফোনে হাশেমের সঙ্গে কথা বলল। তারপর মোটা একটা সোয়েটার গায়ে দিয়ে, চাবি আর কম্বিনেশন লেখা কাগজের টুকরোটা পকেটে ভরে, বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। রাস্তায় নেমে হাঁটতে শুরু করল মালেক ম্যানশনের দিকে। বাড়িটা কাছেই। হেঁটে যেতে কয়েক মিনিটের বেশি লাগবে না ওর।
বাড়ির গেটে পৌঁছে দেখল, গার্ড বক্সের ভেতর বসে ঘুমিয়ে আছে দারোয়ান। নিঃশব্দে মূল গেটের কোনায় লাগানো ছোট দরজার পাল্লাটা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল সেলিম। সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলো তিন তলায়। বারান্দায় আবুল হাশেম দাঁড়িয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করছে।
‘তোমার সামনের জানালা দিয়ে নজর রাখো,’ হাশেমকে বলল সেলিম। ‘কিছু ঘটতে দেখলে সঙ্গে সঙ্গে জানাবে আমাকে।’ সিঁড়ি দিয়ে আবার দোতলায় নেমে এলো ও। হরনাথ রায়ের দরজার সামনে কান পেতে দাঁড়িয়ে ভেতর থেকে কোনো শব্দ আসে কি না শুনল। ভেতরে কেউ নেই, সন্তুষ্ট হয়ে, সামিনার দেওয়া চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঘরে ঢুকল।
পনেরো মিনিট পর ঘর থেকে বেরিয়ে, নিঃশব্দে দরজাটা লাগিয়ে, মৃদু শিস দিয়ে হাশেমকে ডাকল। সিঁড়ির ল্যান্ডিঙে হাশেমের সঙ্গে দেখা করল সেলিম। তারপর কেউ নেই নিশ্চিত হয়ে, নিচে নেমে ঘুমন্ত প্রহরীর পাশ কাটিয়ে বাইরে বেরোল দুজনে। হনহন করে হাঁটতে শুরু করল সেলিম, নিজের ফ্ল্যাটের দিকে।
‘ঘটনাটা কী, বস?’ পাশাপাশি চলতে চলতে জিজ্ঞেস করল হাশেম। ‘আপনি যখন হরনাথের ফ্ল্যাটে ঢুকলেন, আমি দুজন লোককে রাস্তার অন্য পাশে দাঁড়িয়ে এদিকে চোখ রাখতে দেখেছি, সাদা পোশাকে পুলিশের লোক বলে মনে হয়েছে। পেছন পেছন আসছে এখন। আমাদের অনুসরণ করছে, কোনো সন্দেহ নেই।’
হাসল সেলিম। কোনো জবাব দিল না।
১০ মিনিট পর হাশেমকে নিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকল সেলিম। টিভিটা যেভাবে অন করে রেখে গিয়েছিল, সেভাবেই আছে। রিমোট টিপে ‘মিউট’টা অফ করে দিল। আবার শব্দ শোনা গেল টেলিভিশনের।
‘শোনো,’ হাশেমের দিকে ফিরে বলল সেলিম, ‘একটু আগে হোসেন মোল্লার প্রেমিকা সামিনা এসেছিল। আমাকে একটা গল্প শোনাল, হোসেন মোল্লা নাকি অন্য আরেকটা মেয়ের প্রেমে হাবুডুব খেয়ে সামিনাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। সামিনা প্রতিশোধ নিতে চায়। হরনাথ রায়ের ফ্ল্যাটের নকল চাবি আর আয়রন সেফের নম্বর লেখা কাগজ চুরি করে এনেছে হোসেন মোল্লার কাছ থেকে। সেগুলো আমাকে দিয়ে বলেছে, আজই যেন ড্যাগারটা আমি সরিয়ে ফেলি, তাহলে হোসেন মোল্লা আর পাবে না সেটা, সামিনার প্রতিশোধ নেওয়া হবে। গল্পটা আমার কাছে খুবই কাঁচা মনে হয়েছে। ড্যাগার সরাতে চাইলে আমাকে দিয়ে কেন? সামিনা নিজেই তো সেটা পারে। হোসেন মোল্লার কাছে থেকে এ ধরনের কাজই তো করে। কী করব ভাবছি, এ সময় আমাকে সংকেত দিল গনু ফকির। সামিনা তখন এখানেই বসা। গনুকে ভিক্ষে দেওয়ার ছুতো করে নিচে নামলাম। কাগজে লিখে আমাকে একটা মেসেজ দিল ও। আমাকে সাবধান করে দেওয়ার জন্য। দুই রাত আগে হোসেন মোল্লা, সামিনা আর হরনাথ রায়কে আজিজ হোটেলের রেস্টুরেন্টে মিটিং করতে দেখেছে। জানালার পাশের টেবিলে বসে কথা বলছিল ওরা। সন্দেহ হওয়ায় জানালার নিচে দাঁড়িয়ে কান পাতে গনু। আমাকে ফাঁদে ফেলার পরিকল্পনা করছিল ওরা। ওরা জানত, হরনাথ রায়ের ড্যাগারটার ওপর নজর আছে আমার। আমাকে ওটা আনার সুযোগ করে দেবে। পুলিশের ইন্সপেক্টর মাহমুদ উল্লাহকে জানিয়ে রাখবে। পুলিশ আমার ওপর নজর রাখবে। তারপর বমাল হাতেনাতে ধরবে। এভাবে রাস্তা থেকে পথের কাঁটা সরাতে চেয়েছে হোসেন মোল্লা। ওরা ভেবেছে, আমি ওদের ফাঁদে পা দিয়েছি। দেখো, আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমার ফ্ল্যাটে পুলিশ ঢুকবে।’
‘ড্যাগারটা কোথায়?’ জিজ্ঞেস করল হাশেম। ‘সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন?’
‘পাগল!’ হাসল সেলিম। ‘হরনাথ রায়ের জানালার বাইরে একটা পানির পাইপ আছে। ওটার মুখ খুলে ড্যাগারটা ওখান দিয়ে ছেড়ে দিয়েছি। একেবারে তলায় গিয়ে আটকে থাকবে ওটা। পাইপের মুখটা আবার বন্ধ করে দিয়েছি। কেউ কিছু বুঝতে পারবে না। সুযোগমতো কোনো একসময় গিয়ে ড্যাগারটা বের করে নিয়ে আসতে পারব।’ এক মুহূর্ত থেমে বলল, ‘কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, এর মধ্যে হরনাথ রায়ের স্বার্থটা কী...’
কলিং বেলের শব্দে থেমে গেল ও। উত্তেজিত হয়ে যেন একটানা বেজে চলল বেলটা। হাশেমের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে চোখ টিপল সেলিম। উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিল। দরজায় দাঁড়ানো ইন্সপেক্টর মাহমুদ উল্লাহ, সঙ্গে আরও চারজন সাদা পোশাকের পুলিশ।
‘আরে, সার, আপনি,’ অবাক হওয়ার ভান করল সেলিম, ‘এত রাতে! তা সার, আমার মতো অধমের কাছে কী কাজ?’
‘ওসব ছেঁদো কথা বাদ দাও,’ কঠিন পুলিশি কণ্ঠে ধমকে উঠলেন মাহমুদ উল্লাহ। ‘একটু আগে হরনাথ বাবুর ঘর থেকে একটা দামি ড্যাগার চুরি গেছে। ওটা এখানেই আছে। এবার আর আমার হাত থেকে তুমি বাঁচতে পারলে না, সেলিম ওসমান। এখন ভালো চাও তো, ড্যাগারটা বের করে দাও।’
একেবারে যেন আকাশ থেকে পড়ল সেলিম। ‘আপনি কী বলছেন, সত্যি আমি কিছু বুঝতে পারছি না, সার। ঠিক আছে, আপনি যখন এতই শিওর, দেখুন খুঁজে।’ দরজা থেকে সরে এসে আরাম করে সোফায় গা এলিয়ে দিল সেলিম। হাসিমুখে তাকিয়ে রইল পাঁচজন পুলিশ অফিসারের দিকে। ফ্ল্যাটের প্রতিটি ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজল পুলিশ, জিনিসপত্র তছনছ করল, ওলট-পালট করে ফেলল সব। দুই ঘণ্টা কঠোর পরিশ্রমের পর ঘর্মাক্ত হয়ে হাল ছেড়ে দিল পাঁচজনে। রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে হতাশ ভঙ্গিতে সহকারীদের দিকে তাকালেন ইন্সপেক্টর।
‘কী, সার,’ হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল সেলিম, ‘সন্তুষ্ট হয়েছেন তো? প্রথমেই যদি আমার কথা বিশ্বাস করতেন, অকারণ এ কষ্টটা করতে হতো না। তা ছাড়া সব কথা আমাকে খুলে বললে হয়তো ড্যাগারটা কোথায় আছে অনুমান করতে পারতাম।’
ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেললেন মাহমুদ উল্লাহ। ‘তোমার স্নায়ুর জোর দেখে আমি অবাক হচ্ছি, সেলিম। আমি শিওর ছিলাম, ড্যাগারটা এখানেই পাওয়া যাবে, যে সোর্স থেকে জেনেছি, সেটা মিথ্যে হতে পারে না। তিন ঘণ্টা আগে তুমি হরনাথের ফ্ল্যাটে গিয়েছিলে, আর ড্যাগারটা তুমিই সরিয়েছ।’
হাসল সেলিম। ‘সার, বোঝা যাচ্ছে, আপনার সঙ্গে চালাকি করা হয়েছে, মিথ্যে বোঝানো হয়েছে আপনাকে। কী ঘটেছে, আমি অনুমান করতে পারছি। হরনাথ রায় আপনার কাছে রিপোর্ট করেছে ওর ড্যাগারটা চুরি গেছে, আর হোসেন মোল্লা কোনোভাবে আপনাকে জানিয়েছে, জিনিসটা আমিই সরিয়েছি। আমার কথা যদি বিশ্বাস করতে পারেন, সোজা বাড়ি গিয়ে শুয়ে পড়ুন। কাল সকাল ১০টায় আমি আপনার সঙ্গে দেখা করব। ড্যাগারটা কোথায়, কার কাছে আছে, জানাব আপনাকে।’
কঠোর দৃষ্টিতে সেলিমের দিকে তাকালেন মাহমুদ উল্লাহ। রুক্ষ কণ্ঠে বললেন, ‘তুমি একটা মহাশয়তান, ধড়িবাজ লোক, সেলিম। আমার আগেই ভাবা উচিত ছিল, ড্যাগারটা সঙ্গে করে নিয়ে আসার মতো এত বোকা তুমি নও। যাই হোক, কাল সকাল ১০টায় আমি আমার অফিসে থাকব। চলি এখন।’
‘আসুন, সার,’ সেলিম বলল। ‘নিশ্চিন্তে ঘুমোন গিয়ে। ড্যাগারটা পেয়ে যাবেন।’
পরদিন বেলা ১১টায় একটা বীমা কোম্পানির অফিসে ঢুকে জেনারেল ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করতে চাইল সেলিম। দুই মিনিট পর ম্যানেজারের অফিসে তার টেবিলের সামনে মুখোমুখি বসল।
‘আমার বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে, ম্যানেজার সাহেব,’ সেলিম বলল, ‘আজ সকালে বিশাল অঙ্কের টাকার একটা ক্লেইম পেয়েছেন আপনি, ভারতের নিহালপুরের মহারাজ নিশঙ্কুচন্দ্র গিরিকান্তর ড্যাগারটার ওপর যে পলিসিটা করিয়েছেন তার সেক্রেটারি হরনাথ রায়, সেটার। কাল রাতে ড্যাগারটা চুরি গেছে, আজ সকালে সেটা জানিয়ে থানায় ডায়েরি করেছেন হরনাথ রায়।’ ম্যানেজারের ডেস্কে কনুই রেখে সামনে ঝুঁকল সেলিম। কণ্ঠস্বর খাদে নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘ড্যাগারটা কোথায় আছে, আমি জানি।’
বিস্মিত হলেন জেনারেল ম্যানেজার।
‘ওসমান সাহেব,’ তার সামনে টেবিলে পড়ে থাকা সেলিমের কার্ডটার দিকে তাকালেন ম্যানেজার, ‘মনে হচ্ছে, সময়মতোই এসেছেন আপনি। এইমাত্র আমাদের তরফ থেকে পত্রিকায় একটা ঘোষণা পাঠানো হয়েছে, ড্যাগারটার সন্ধান যে দিতে পারবে, তাকে দুই লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে।’ ফাইল থেকে একটা কম্পিউটার প্রিন্টআউট বের করে দেখালেন ম্যানেজার। ‘এই যে, ঘোষণার কপি।’
‘আপনি আমাকে ১০ লাখ টাকার একটা চেক লিখে দিন,’ সেলিম বলল। ‘ড্যাগারটা পুলিশের হাতে যাওয়ার পর টাকাটা যাতে ক্যাশ করার ব্যবস্থা করতে পারি।’
খামে ভরা চেকটা পকেটে ভরে খুশিমনে ম্যানেজারের অফিস থেকে বেরিয়ে এলো সেলিম। ট্যাক্সি ভাড়া করে ফিরে এলো নিজের ফ্ল্যাটে। ঘড়ি দেখল। হ্যাঁ, সময় হয়ে গেছে। যা ঘটার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘটে যাবে। ঠিক ওই সময়, সামিনা যে হোটেলে থাকে, সেটার লিফট দিয়ে উঠতে দেখা গেল হোটেলের একজন বয়কে। হাতে তাজা
গোলাপ ফুলের একটা বড় তোড়া। সাত তলায় উঠে, লিফট থেকে নেমে, সামিনার রুমের বেল বাজাল ও। সামিনা দরজা খুলে দিলে তোড়াটা ওর হাতে গুঁজে দিল বয়। জানাল, কয়েক মিনিট আগে এক ভদ্রলোক তোড়াটা ম্যাডামকে দিতে বলেছেন। না, তার নাম-ঠিকানা কিংবা পরিচয় কিছুই জানাননি ভদ্রলোক। বয়কে একটা ১০ টাকার নোট বকশিশ দিয়ে দরজা লাগিয়ে দিল বিস্মিত সামিনা। অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে তোড়াটা নাকের কাছে তুলে ফুলের সুবাস শুঁকল। আর ঠিক এই সময় বাজল ঘরের টেলিফোন।
রিসিভার তুলে কানে ঠেকাতেই ভেসে এলো একটা হাসি হাসি পরিচিত কণ্ঠ, ‘হ্যাল্লো, সামিনা, আশা করি তোড়াটা তোমার পছন্দ হয়েছে। পরের বার আমাকে ঠকাতে আসার আগে একশবার চিন্তা কোরো। গুড লাক।’
‘সেলিম, কী বলছ...’ সামিনার কথা শেষ হলো না। কট করে কেটে গেল লাইনটা।
ফুলের তোড়াটা ছুড়ে মারল ও, সুন্দর মুখটা বিকৃত হয়ে গেছে প্রচণ্ড রাগে। দেয়ালে বাড়ি লেগে ছিঁড়ে গেল তোড়া বাঁধার সুতোটা। ফুলগুলো ছড়িয়ে পড়ল। ভেতর থেকে খটাং করে মেঝেতে পড়ল একটা ধাতব জিনিস। সেটার দিকে তাকিয়ে হাঁ হয়ে গেল সামিনা। ছড়ানো ফুলের মাঝখানে চকচক করছে রত্নখচিত ড্যাগারটা। ওটা হাতে তুলে নিয়ে অবাক হয়ে দেখতে লাগল।
ওর বিস্ময়ের ঘোর কাটার আগেই ঝটকা দিয়ে খুলে গেল দরজা। সাদা পোশাক পরা দুজন অফিসারকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন ইন্সপেক্টর মাহমুদ উল্লাহ।
‘মিস সামিনা,’ ইন্সপেক্টর বললেন, ‘ড্যাগারটা যে আপনিই চুরি করেছেন, সে কথা সেলিম আমাদের জানিয়েছে। আপনি আর হোসেন মোল্লা মিলে ওকে ফাঁসাতে চেয়েছিলেন।’
‘মিথ্যে কথা,’ চেঁচিয়ে বলল সামিনা। ‘এ ড্যাগারের ব্যাপারে কিছুই জানি না আমি। এইমাত্র গোলাপের তোড়ার ভেতরে পেলাম। নিশ্চয় আমাকে ফাঁসানোর জন্য সেলিমই করেছে এ কাজ।’
‘চোরাই মাল পাওয়া গেছে আপনার কাছে, আপনাকে অ্যারেস্ট না করে পারছি না। কে কী করেছে, সেটা তদন্ত করলেই বেরিয়ে পড়বে। আপাতত আপনাকে আমাদের সঙ্গে থানায় যেতে হবে।’ একটু থেমে মাহমুদ উল্লাহ বললেন, ‘ও হ্যাঁ, আপনার বস হোসেন মোল্লাও কসম খেয়ে বলেছে, ড্যাগারাটা আপনিই চুরি করেছেন।’
ঘণ্টাখানেক পর ব্যাংক থেকে বেরিয়ে এলো সেলিম। পকেটে ১০ লাখ টাকা। ড্যাগারটার সন্ধান দিতে পারার পুরস্কার হিসেবে বীমা কোম্পানির কাছ থেকে পেয়েছে।
নিজের ফ্ল্যাটবাড়ির সামনে আসতেই মাহমুদ উল্লাহর সঙ্গে দেখা। কঠিন হাসি হেসে ইন্সপেক্টর বললেন, ‘টাকাটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব খরচ করে ফেলো, সেলিম। কারণ খুব বেশি দিন আর বাইরে থাকতে পারবে না, জেলে তোমাকে আমি পাঠাবই। যত চালাকিই করো, আমি জানি, ড্যাগারটা তুমিই চুরি করেছিলে। এখন সেটা শুধু প্রমাণ করা বাকি।’
আর একটিও কথা না বলে ঘুরে দাঁড়িয়ে বুটের শব্দ তুলে চলে গেলেন তিনি।