× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অ্যালিস মুনরো

একালের চেখব

অ্যালেক্স কিগান

প্রকাশ : ১৯ মে ২০২৪ ১৪:৫২ পিএম

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কানাডিয়ান লেখক এলিস মুনরো, ১০ জুলাই ১৯৩১-১৩ মে ২০২৪

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কানাডিয়ান লেখক এলিস মুনরো, ১০ জুলাই ১৯৩১-১৩ মে ২০২৪

কখনই ছোটগল্পকার হওয়ার ইচ্ছে তার ছিল না। তবু ছোটগল্প লিখতেই শুরু করেছিলেন কারণ অন্য কিছু লেখার সময় ছিল না তার। নিজের তিন সন্তানের দেখাশোনা তাকেই করতে হতো। কিন্তু যখনই ছোটগল্প লেখায় অভ্যস্ত হয়ে গেলেন তখন দেখলেন এটাই তার সঙ্গে খাপ খাচ্ছে। এখন তিনি নিজেই বলেন, ‘আমার মনে হয় না কখনও আর উপন্যাস লিখতে পারব।’

সমসাময়িক ছোটগল্পকারদের মধ্যে অ্যালিস মুনরোকেই ধরা হয় এ ধারার অসাধারণ স্রষ্টা হিসেবে। আমেরিকার ছোটগল্পকার, ঔপন্যাসিক ও প্রবন্ধকার সিনথিয়া ওজিক তাকে বলছেন ‘আমাদের চেখভ’। লিখেছেন অনেক। ডান্স অব দ্য হ্যাপি শেডস, ক্যাসল রক, বেগার মেইড, রানঅ্যাওয়ে, দ্য মুনস অব জুপিটার, দ্য বেয়ার কেম ওভার দ্য মাউন্টেন, দ্য প্রগ্রেস অব লাভ ইত্যাদি তার অন্যতম সৃষ্টিকর্ম।

কিন্তু উপন্যাস লেখার পেছনে তার নিজের কি কোনো অনীহা ছিল? এ প্রশ্নের উত্তর তিনি নিজেই দিয়েছেন। ‘সত্যিই উপন্যাস আমি মোটেও বুঝি না। আমি বুঝি না উপন্যাসের ঠিক কোন জায়গায় উত্তেজনা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু ছোটগল্পের বেলায় ব্যাপারটা জানি আমি। এখানে এক ধরনের উত্তেজনা রয়েছে। যখনই কোনো গল্প ঠিকভাবে এগিয়ে যায় অনুভব করতে পারি ঠিক পথেই এগোচ্ছে এটা। কিন্তু উপন্যাস লিখতে যখন চেষ্টা করেছি তখন এভাবে ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। আমি এমন এক মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করি যেটা হবে বিস্ফোরক। গল্পের অন্য সব উপাদান এখানেই একসঙ্গে জড়ো করতে আগ্রহী আমি।’

মুনরোর অধিকাংশ গল্পের প্লট হচ্ছে আত্মপ্রবঞ্চনাÑআমরা কে বা কারা এ বিষয়ে নিজেদের ক্রমাগত যে মিথ্যা গল্প শুনিয়ে থাকি আমরা, সেটাই তার গল্পের উপজীব্য। মুনরোর ভাষ্যমতে, ‘আত্মপ্রবঞ্চনা মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। আমাদের কোনোভাবেই এটা করা উচিত নয়। কিন্তু আমি নিশ্চিত নই, এটা পরিহার করতে আমরা পারব কি না। প্রত্যেকেই তার নিজের জীবনে একান্ত নিজের উপন্যাস রচনা করে চলেছে। উপন্যাসের বিষয় পরিবর্তিত হতে থাকে। প্রথমে আমাদের জীবনে আসে ভালোবাসা এবং তারপর আমরা এখান থেকে বেরিয়ে জীবনের আরও বড় পরিসরে চলে আসি এবং এর শেষটা হয়ে থাকে ধারাবাহিকতাহীন, বিরোধপূর্ণ এবং সমসাময়িক ধরনের এক উপন্যাস। আমি মনে করি, মধ্যবয়সে আমাদের জীবনে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি ঘটে সেটা হচ্ছে আমরা আমাদের নিজেদের জীবনের এ উপন্যাস বা ঘটনাপ্রবাহে সত্যি সত্যিই আর ঝুলে থাকতে পারি না।’

মুনরোর গল্পে বিষয়বস্তু হিসেবে থাকে সত্যের চরম আত্মমাত্রিকতাÑঅন্যদের চোখে সবকিছু দেখার অক্ষমতা। মুনরো বলছেন, ‘এখানে থাকে অসম্ভব বিচ্ছিন্নতা, কিন্তু এ বিচ্ছিন্নতার ঘেরাটপ থেকে বেরিয়ে আসার প্রচেষ্টাও কম থাকে না, যেটা শেষাবধি খুবই আকর্ষণীয় একটি বিষয়। মানুষজন বলে আমি নাকি হতাশাপূর্ণ বা নিরাশাবাদী গল্প লিখি, কিন্তু আমি জানি নিজের জীবনে আমি মোটেই হতাশাবাদী নই। সুতরাং আমি মনে করি, আমার জীবনের অন্ধকারাচ্ছন্ন দিকটি আমার গল্পে উঠে আসে আর আলোকোজ্জ্বল দিকটি হচ্ছে সব সময় যে মঙ্গলময় ও আশাবাদী উপদেশ আমি দিয়ে থাকি। মা হিসেবে আমি সন্তানদের যে উপদেশ দিই সেটা শুনলেই আমার জীবনের এ দিকটি সম্পর্কে ধারণা করা যাবে।’

তার গল্পের অনেক চরিত্রই বিচ্ছিন্ন হিসেবে উপস্থিত হয় এবং তারা নিজেদেরও বহিরাগত হিসেবে মনে করে। অনেক লেখকের ক্ষেত্রেই সেটা ঘটে। কিন্তু মুনরো কি নিজেকে একজন বহিরাগত হিসেবে দেখে থাকেন? মুনরো বলছেন যে তিনি সব সময় দেয়ালের দুই পাশের বিষয়গুলো নিয়েই কাজ করেনÑ‘আমি অনুভব করি যে নিজে একজন বহিরাগত, কিন্তু অধিকাংশ সময় ছদ্মবেশে থাকি। আমার ধারণা অধিকাংশ লেখক সেটাই করেন। কারণ, আমি যে পরিবেশে বড় হয়েছি সেখানে খুব কম লোকই পড়তে জানত আর লেখার কথা তো চিন্তাই করা যায় না। ব্যাপারটা এমন ছিল না যে, অন্য মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় আপনি আপনার আগ্রহ তাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে পারতেন। আমি সেখানে জনপ্রিয় এক মেয়ে হতে চেয়েছিলাম। ছেলেদের সঙ্গে সমানতালে পাল্লা দিয়ে সফল হওয়ার ব্যাপারে আমি সন্দিহান ছিলাম। সুতরাং সব সময় আমাকে ছদ্মবেশ নিতে হয়েছিল। তবে, ব্যাপারটি আমার কাছে কখনই খুব বেশি কঠিন মনে হয়নি। এবং তারপর যখন কোনো এক শহরে ঘরকন্না হিসেবে চলে এলাম তখন আরও বেশি ছদ্মবেশ নিতে হয়েছিল। এবং তারপর যেন বদ্ধ আলমারি থেকে লেখক হিসেবে বের হয়ে আসছিলাম। আমার বয়স তখন ছিল প্রায় চল্লিশ।’

নিজের লেখালেখি বিষয়ে, এগুলোর সফলতা-ব্যর্থতার বিষয়ে মুনরো কথা বলেন অনেকটা অনুসন্ধানকারীর ঢঙে। তিনি বলেন, ‘গল্পে একজন ব্যক্তি বা চরিত্র গড়ে ওঠার জন্য আমাকে অপেক্ষা করতে হয়। চরিত্রের সঙ্গে সঙ্গেই তার ভাষাও চলে আসে এবং গল্পটা যদি ঠিক পথে এগিয়ে যায় তাহলে দ্রুতই চরিত্রটা আকার পায় ও অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে ওঠে। আমার গোটা জীবনে মাত্র কয়েকটি গল্পের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি ঘটেনি।’

বারবার সম্পাদনা করার যে প্রবণতা লেখকদের মধ্যে বেশি দেখা যায় সেটা মুনরোর মধ্যে একেবারেই নেই। তিনি কোনো কিছু লিখে সেটা ফেলে রাখতে এবং ব্যাপারটা ভুলে যেতেই পছন্দ করতেন। কারণ হিসেবে তিনি বলছেন, পরিবর্তন করার প্রবণতা তার মধ্যেই সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এটাকে পাত্তা দিতে গেলে দেখা যাবে একটি গল্প লিখতেই কেটে যাচ্ছে বছর। এ কারণে তিনি পারতপক্ষে সম্পাদনার ধার ধারতেন না। তিনি বলেছেন, গল্প তাকে পুরোপুরি গিলে ফেলত যখন গল্পের চরিত্রগুলো আকার নেওয়া শুরু করত। কিন্তু এভাবে এগোনোর পর দেখা যেত যিনি এ চরিত্র সৃষ্টি করেছেন তার উপস্থিতি সেখানে আর থাকছে না। সুতরাং, একভাবে, যদি তিনি সেগুলো পরিবর্তনের চেষ্টা শুরু করতেন তখন মনে হতো অপরিচত কেউ এটা করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

অ্যালিস মুনরো জন্মেছেন, বড় হয়েছেন এবং লিখেছেনও কানাডার একটি বিশেষ অঞ্চল নিয়েÑদক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় অন্টারিওর গ্রামীণ জনপদ নিয়ে। সেটা ছিল পুরোনো ধাঁচের শহর, বড় বড় ইটের বাড়ি, বিশাল সব গাছ, বিশালাকৃতির গির্জা এবং কারখানা, যদিও সে কারখানাগুলোয় তখন সব পরিত্যক্ত। তিনি বলছেন, ‘সেখানে চাষের জমিও ছিল প্রচুর, ছিল লেকÑলেক হুরন, আমি যেখানে থাকতাম তার থেকে ১০ মাইল দূরে। আর সেখানে ছিল অনেকটা বুনো কিছু আচার-অনুষ্ঠান। খুবই বন্য, খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ড্রাইভিং, খেলাধুলার বিশাল এক সংস্কৃতি, বিশেষ করে হকি ছিল খুবই জাঁকজমক। এখানকার মানুষ এ জায়গার সঙ্গে এতটাই গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল যে বিশ্বের অন্যত্র বা দেশের অন্য প্রান্তে কী ঘটছে তা নিয়ে মোটেই কোনো মাথাব্যথা তাদের ছিল না। তাদের কাছে খ্যাতি ছিল স্থানীয় পত্রিকায় নাম প্রকাশ, টরন্টো গ্লোব বা মেইলে নয়।’

অ্যালিস মুনরো কানাডীয় লেখকদের মধ্যে একজন যিনি নিজ দেশ কানাডাসহ যুক্তরাষ্ট্রে অসামান্য জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। কানাডীয় লেখকদের এ তালিকায় আরও আছেন রবার্টসন ডেভিস, মার্গারেট অ্যাটউড, ম্যাভিস গ্যালান্ট প্রমুখ। সরকারের সহায়তায় লেখকদের উৎসাহিত করার ধারাবাহিক ও সচেতন প্রচেষ্টা এখানে সব সময় ছিল। মুনরো বলছেন, ‘আমাদের এখানে রয়েছে কানাডা কাউন্সিল। এ প্রতিষ্ঠানটি শিল্পসাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করে এবং অর্থসহায়তা দেয়। লেখক কর্মশালার আয়োজন করে, লেখকদের অর্থসহায়তা দেয়, ছোট কাগজ প্রকাশে সাহায্য করে।’

মুনরো কানাডার ভ্যানকুভার ও ভিক্টোরিয়ায় কাটিয়েছেন কিছুকাল। সেখানে জন্ম নিয়েছে তার তিন সন্তান এবং স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়িও এখানেই। তারপর ১৯৭২ সালে ফিরে আসেন অন্টারিওতে। এখানে লেখালেখির পাশাপাশি নিজের ও সন্তানদের ভরণপোষণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ নেন। সেখানেই আবার দেখা হয় তার নতুন সঙ্গীর সঙ্গে, যাকে অনেক আগে থেকেই চিনতেন তিনি এবং তিনি যে এলাকা থেকে এসেছেন সে একই এলাকার বাসিন্দাও ছিলেন তিনি। মুনরো বলছেন, ‘তারপর আমরা একসঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নিই এবং গ্রামে ফিরে যাই কারণ, তার মা ছিল একা এবং নিজের জোগাড়যন্ত্র নিজে করতে পারতেন না। তা ছাড়া আমার বাবা ও সৎ-মাও বুড়িয়ে গিয়েছিলেন। আমরা ভেবেছিলাম এখানে মাত্র কয়েকটি বছর কাটাতে হবে আমাদের এবং তারপর হয়তো তারা চলে যাবেন আমাদের মাঝ থেকে। হ্যাঁ, কয়েক বছরের মধ্যে তারা মারাও গিয়েছিলেন, কিন্তু আমরা এখানে আছি এখনও। এটা কোনো পরিকল্পনার অংশ ছিল না। আমি ঠিক জানতাম না এ অঞ্চল নিয়ে আমি লিখে যাব। এখানে যখন ফিরে এলাম এবং স্মৃতিকাতর দৃষ্টিতে না দেখে সমসাময়িক চোখে দেখতে লাগলাম তখন দেখলাম এখানে অনেক বিষয়ই রয়েছে যা নিয়ে আমি লিখতে চাই এবং সম্ভবত সে বিষয়গুলো এখনও রয়ে গেছে, ফুরিয়ে যায়নি।’ 

  • অনুবাদ : এসএ মামুন
শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা