× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রবীন্দ্রনাথের চিন্তাবিশ্ব

যে দৃষ্টি সম্মুখপানে

রফিকউল্লাহ খান

প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৪ ১৫:৪৯ পিএম

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ২৫ বৈশাখ ১২৬৮- ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ২৫ বৈশাখ ১২৬৮- ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮

সময় ও সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজগতের অনেক কিছুরই পরিবর্তন ঘটে। বিষয় ও ঘটনার প্রকৃতি অনুযায়ী এসব পরিবর্তনের রূপ ও স্বরূপ বিচিত্র। কখনও সেটা কেবলই পরিবর্তন, কখনও বিবর্তন, কখনওবা রূপান্তর। পরিবর্তনের আবার দুটি ধারাÑএকটি পরিমাণগত, আরেকটি গুণগত। পরিমাণের দৃশ্যমান প্রকাশ অনায়াসে বোঝা যায়; কিন্তু গুণগত পরিবর্তন কেবল উপলব্ধির বিষয় নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু। রবীন্দ্রসাহিত্য পাঠ ও বিচারের ক্ষেত্রে বর্তমানে বাংলা তথা পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় আয়োজন লক্ষ করি, বাঙালি হিসেবে তা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য গৌরবের। প্রত্যেক কালের অনুভবশীল মানুষ সাহিত্যপাঠ ও অনুধাবনের ক্ষেত্রে নিজ নিজ কালের মানদণ্ড ব্যবহার করবে, সেটাই স্বাভাবিক ও সঙ্গত। মনে রাখতে হবে, রবীন্দ্রনাথের রচনাসম্ভার সম্পন্ন ও পরিপূর্ণ। চলমান মানবপ্রবাহের কাজ হচ্ছে সময়স্বভাবের রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী তার অনুধাবন ও পর্যালোচনা। বর্তমান বিশ্ব-পরিপ্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথের কর্ম ও চিন্তার সমগ্র প্রান্ত অনুধাবন ও অনুশীলনের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করার মধ্যে নতুন পাঠ ও ভাষ্য রচনার ইঙ্গিত বহন করে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে রবীন্দ্রচর্চার গতিপ্রকৃতির একটা ধারণা উপস্থাপন করা যায়।

বস্তু এবং ভাবের সমগ্রতায় এক চৈতন্যময় মানবসত্তার সর্বময় প্রকাশ ও প্রতিষ্ঠাই ছিল রবীন্দ্রনাথের আমৃত্যু সাধনা। তার সাধনার উৎসকেন্দ্রে নিয়ত শক্তি সঞ্চার করেছে ইতিহাস, দর্শন, সমাজ ও সভ্যতার অনিঃশেষ বৈচিত্র্য ও গতি। রবীন্দ্রনাথের মননাবেগ এ কারণেই মনুষ্যত্বের ধ্বনি-প্রতিধ্বনিময় শিল্পক্রিয়ায় পর্যবসিত হয়েছে। সমাজ, সময় ও জীবন যেকোনো মহৎ প্রতিভার সৃষ্টিশীলতার কেন্দ্রীয় প্রেরণা। সমাজ এবং জীবন-আশ্রিত বলেই ব্যক্তির ভাবনা-কল্পনা-অনুভূতি সমষ্টির মধ্যে মুক্তি সন্ধান করে। ব্যক্তির পরিচয় একদিকে যেমন তার জৈবসত্তার সমগ্রতায় (in organic wholes), অন্যদিকে তেমনি তার চেতনা-সংগঠন এবং শৈল্পিক ক্রিয়াশীলতার মূলেও রয়েছে বৃহত্তর সমাজজীবন এবং সমাজ-অন্তর্গত মানবসমষ্টি। রবীন্দ্রনাথের জীবনবোধের কেন্দ্রস্থ সত্য ছিল এই বিশেষ এবং নির্বিশেষ মানব। তিনি মানুষকে বিচার করেছেন তার সমগ্র জীবন, সমাজ ও সময়ের পটভূমিতে, তার অস্তিত্বকে শ্রদ্ধা করে। মানুষের অস্তিত্বের সংকট এবং সংঘর্ষ রূপায়ণের ক্ষেত্রেও তিনি পরিবেশ-পরিস্থিতির অনিবার্য ভূমিকা সম্পর্কে ছিলেন নিঃসংশয়। তিনি কেবল মানুষের রূপ পর্যবেক্ষণ করেননি, তার স্বরূপও বিশ্লেষণ করেছেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিতে সমাজ ও সভ্যতা সদাচঞ্চল ও গতিময়। তার সৃষ্টিকর্মে বিধৃত মানুষ এ চলমানতারই জীবন্ত প্রতিনিধি। এর কারণ জন্ম-মৃত্যুর সময়সীমাশাসিত জীবন এবং জড়বৈশিষ্ট্যনির্দেশক সমাজ রবীন্দ্রনাথের অন্বিষ্ট ছিল না, তার সূক্ষ্ম ও নিগূঢ় উপলব্ধিতে জীবন এক চলমান সত্তা, সমগ্রের বহিঃপ্রকাশ। নবজাগরণের (Renaissance) গভীর উপলব্ধি এবং অঙ্গীকারে তিনি মানুষকে স্থাপন করেছিলেন সবকিছুর কেন্দ্রমূলে। তার সৌন্দর্যানুভূতি, মর্ত্যপ্রেম এবং ধর্মধারণা তাই মানবমুখী। সৃষ্টিশীলতার প্রথম পর্যায়ে তার জীবনবোধের ক্ষেত্রে যে আধ্যাত্মিকতার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়, তার মূলেও রয়েছে রেনেসাঁসলব্ধ জীবনকল্পনা এবং মানবিক চিত্তমুক্তির অপরিমেয় উল্লাস। রবীন্দ্রনাথের প্রভাতসংগীত (১৮৮৩) কাব্যের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতায় কেবল ব্যক্তির আবেগমুক্তিরই প্রকাশ ঘটেনি, সামাজিক অবরুদ্ধতা মোচনের গভীর আকাঙ্ক্ষাও ব্যক্ত হয়েছে। বাংলার রেনেসাঁসের মধ্যাহ্নলগ্নে জন্মগ্রহণ করলেও রবীন্দ্র-পূর্ববর্তী বাংলা সাহিত্য মূলত ক্লাসিক। ব্যক্তির অন্তর্বেদনা সমষ্টিগত যন্ত্রণায় প্রকাশ করার ক্ষেত্রে মাইকেল মধুসূদন দত্তের যে প্রয়াস, সেখানে সমাজমানসের পরাভবচেতনাই ছিল মুখ্য। বিহারীলাল চক্রবর্তীর আত্মমুখী গীতোচ্ছ্বাস এ পরাভবচেতনা করে আরও গভীর ও ব্যক্তি-আশ্রয়ী। রবীন্দ্রনাথের রোমান্টিক জীবনদৃষ্টিই প্রথম এ পরাভবচেতনার মধ্যে সঞ্চার করে সামাজিক বন্ধনমুক্তির কাব্য-প্রেরণা। স্মরণীয় যে, বাংলার উনিশ শতকীয় রেনেসাঁস কলকাতা নগরকেন্দ্রিক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি সৃষ্টির সহায়ক হলেও বৃহত্তর সমাজজীবনের বিবর্তনের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল গৌণ। ইউরোপীয় সংস্কৃতি ও জীবনধারার প্রভাবে উনিশ শতকে বাঙালির জীবনচেতনার যে রূপান্তর শুরু হয়, সেখানে বৃহত্তর সমাজপটভূমি এবং ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলমুক্তির প্রশ্ন ছিল অনুচ্চারিত। নবজাগরণের ফলে জীর্ণ, জড়, গতিহীন ও নির্জীব সামন্ততাত্ত্বিক সমাজকাঠামোর খণ্ডাংশে আলোড়ন সূচিত হলেও রবীন্দ্রনাথের সামনে পরিবর্তিত কোনো সামাজিক দৃষ্টান্ত ছিল না। সে কারণেই সমকালীন শিক্ষিত মানস এবং ভবিষ্যতের স্বাধীনতাকামী মানবপ্রবাহের উত্তরণ কামনায় সামন্তসমাজের অমানবিক স্থবিরতার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন : ‘ভাঙ ভাঙ ভাঙ কারা, আঘাতে আঘাত কর।’ এভাবেই ব্যক্তির আবেগ-কল্পনার সঙ্গে সমষ্টি সংযুক্ত করে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিশীলতার সূচনা।

রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শন তথা মানবভাবনার মূলে যে চলমান ও সমগ্রতাবাদী বিশ্বতত্ত্ব বিদ্যমান, তা কেবল রেনেসাঁস-প্রভাবিত নয়। প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের সভ্যতা ও সংস্কৃতির আবহমান উৎসসমূহের গভীর অঙ্গীকার তার মধ্যে এক স্বতন্ত্র বোধ সঞ্চার করেছিল। এ বোধ বস্তুগত এবং ভাবগত উপকরণপুঞ্জের সুষম ঐক্যে সুগঠিত। তাই বিচিত্র ভাবধারার দ্বন্দ্ব-সমন্বয়ের ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে পরিণামে এক সামঞ্জস্যময় জীবনকল্পনা হয়ে ওঠে তার অন্বিষ্ট। আধুনিক সভ্যতার দ্বন্দ্বজটিল পথপরিক্রমায় নিজের ব্যক্তিজীবনের উত্তরণ এবং বিশ্ব-অবলোকনের ক্ষেত্রে Thesis, Antithesis Ges Synthesis-কেন্দ্রিক মনোভঙ্গি রবীন্দ্রনাথের ছিল না। যে কারণে তার জীবনতত্ত্ব ক্রমবিকাশবাদের পরিবর্তে সম্পূর্ণতই হয়েছে রূপান্তরমুখী। এ রূপান্তরকামী জীবনদৃষ্টিই রবীন্দ্রনাথকে পৃথিবীর সৃষ্টিশীলতার ইতিহাসে স্বতন্ত্র মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।

রবীন্দ্রনাথ সমগ্র দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষকে পর্যবেক্ষণ এবং সাহিত্যে রূপায়িত করেছেন। এ মানুষ জৈবসত্তা এবং আত্মিকসত্তা মিলিয়ে এক পূর্ণাঙ্গ সৃষ্টি। তার ঈশ্বরচেতনা এ সমগ্র মানবের মধ্যেই মুক্তি লাভ করেছে। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নিজ অভিমত উদ্ধৃতিযোগ্য :

[এক] আমার দেবতা মানুষের বাইরে নেই। নির্বিকার নিরঞ্জনের অবমাননা হচ্ছে বলে, আমি ঠাকুর ঘর থেকে দূরে থাকি এ কথা সত্য নয়Ñমানুষ বঞ্চিত হচ্ছে বলেই আমার নালিশ। (চিঠিপত্র-৯, পত্রসংখ্যা-২)

[দুই] আমার ভগবান মানুষের যা শ্রেষ্ঠ তাই নিয়ে। তিনি মানুষের স্বর্গেই বাস করেন। মানুষের নরকও আছেÑসেইখানে মূঢ়তা সেইখানে অত্যাচার সেইখানে অসত্য। (চিঠিপত্র-৯, পত্রসংখ্যা-৫)

[তিন] আমার ঠাকুর মন্দিরেও নয়,Ñপ্রতিমাতেও নয়, বৈকুণ্ঠেও নয়,Ñআমার ঠাকুর মানুষের মধ্যেÑযেখানে ক্ষুধাতৃষ্ণা সত্য, পিত্তিও পড়ে, ঘুমেরও দরকার আছেÑযে দেবতা স্বর্গের তাঁর মধ্যে এসব কিছুই সত্য নয়। ... মানুষের মধ্যে যে দেবতা ক্ষুধিত তৃষিত রোগার্ত শোকাতুর, তার জন্য মহাপুরুষেরা সর্বস্ব দেন, প্রাণ নিবেদন করেন, সেবাকে ভাববিলাসিতায় সমাপ্ত না করে তাকে বুদ্ধিতে বীর্যে ত্যাগে মহৎ করে তোলেন। আমার মানুষরূপী ভগবানের পূজাকে এত সহজ করে তুলে তাঁকে যারা প্রত্যহ বঞ্চিত করে তারা প্রত্যহ নিজে বঞ্চিত হয়। (চিঠিপত্র-৯, পত্রসংখ্য্যা-১৯)

এ মানবদর্শনই ছিল রবীন্দ্রনাথের আমৃত্যু আরাধ্য বিষয়। সীমার মাঝে অসীম মেলাবার যে সাধনা গীতাঞ্জলি-পর্বে, বা সৃষ্টিশীলতার সূচনালগ্নেই শুরু করেছিলেন তিনি, সে অসীম পরিণামে আশ্রয় নিয়েছে মানুষের মধ্যে। এ মানুষ ব্যক্তিগত মানুষ নয়; জ্ঞানে কর্মে, সাধনায় পূর্ণাঙ্গ সামাজিক মানুষ। মনুষ্যত্বের এ সাধনাই ছিল রবীন্দ্রনাথের শিল্পসৃষ্টি এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের মূল লক্ষ্য। মানুষের প্রতি তার সুগভীর মমত্ববোধের কার্যকারণ সন্ধান করলেও দেখা যাবে একটা বৈজ্ঞানিক বিচারশক্তির প্রবর্তনা; ‘আমার বুদ্ধি মানববুদ্ধি, আমার হৃদয় মানবহৃদয়, আমার কল্পনা মানবকল্পনা। তাকে যতই মার্জনা করি, শোধন করি, তা মানবচিত্ত কখনোই ছাড়াতে পারে না, আমরা যাকে বিজ্ঞান বলি তা মানববুদ্ধিতে প্রমাণিত বিজ্ঞান, আমরা যাকে ব্রহ্মানন্দ বলি তাও মানব-চৈতন্যে প্রকাশিত আনন্দ। এই বুদ্ধিতে, এই আনন্দে যাকে উপলব্ধি করি তিনি ভূমা কিন্তু মানবিক ভূমা।’ (মানবসত্য)। বিশ্বজগতের সমগ্রতার পটভূমিতে মানুষকে স্থাপন করে তার মধ্যে সর্বজনীনতা আরোপ করেছেন তিনি। বিজ্ঞানের সত্য যে পরিণামে মানবিক সত্য, রবীন্দ্রনাথ তা নিঃসংকোচে ব্যক্ত করেছেন আইনস্টাইনের সঙ্গে আলাপচারিতায় :

The infinite personality of Man comprehends the Universe. There cannot by anything that cannot be subsumed by the human personality and this prove that the truth of the Universe is human truth. 

বিশ্বজগৎ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের উক্ত ধারণা আইনস্টাইন Purely human conception of the universe হিসেবে আখ্যায়িত করার রবীন্দ্রনাথ যে উক্তি করেছিলেন, সেখানে তার বিজ্ঞানচেতনার স্বরূপ প্রতিফলিত হয়েছে :

There can be no other conception. This world is a human world- the scientific view of it is also that of the scientific man.

বিশ্বজগৎ আর মানবমন, বিশ্বশিল্প আর মানুষের চিত্তলোকÑউভয়ের ওপরই রবীন্দ্রনাথের ঐকান্তিকতা সমান। ব্যক্তির পক্ষে বিশ্বজগতের অস্তিত্ব নিজ অস্তিত্ব উপলব্ধির মাধ্যমেই কেবল নির্ণয় করা সম্ভব : ‘আমি আছি আর আর সমস্ত আছে, আমার অস্তিত্বের মধ্যে এই যুগল মিলন।’ (সাহিত্যতত্ত্ব, সাহিত্যের পথে)

প্রভাতসংগীত-পর্বে চৈতন্যের যে আলোকিত অভ্যুদয়কে রবীন্দ্রনাথ ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ অভিধায় চিহ্নিত করেছিলেন, সেখানে ব্যক্তিগত বন্ধনমুক্তি সামূহিক (Collective) আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছিল। ‘প্রভাত-উৎসব’ কবিতায় এই ব্যক্তি ‘আমি’র সঙ্গে বিশ্বজগতের যুগলমিলন ঘটেছে :

হৃদয় আজি মোর কেমনে গেল খুলি!

জগৎ আসি হেথা করিছে কোলাকুলি!

ধরায় আছে যত, মানুষ শত শত

আসিছে প্রাণে মোর, হাসিছে গলাগলি।

কবিহৃদয়ের এ আবেগী উচ্ছ্বাস জীবনের শেষ পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেনÑ‘মানুষের হৃয়ের তরঙ্গলীলা’। কড়ি ও কোমল (১৮৮৬) কাব্যে এ তরঙ্গলীলা যেন গভীর বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে :

মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভবনে,

মানবের মাঝে আমি বাঁচিবার চাই।

এ মানববোধ কেবল কাব্যের নয়, রবীন্দ্রনাথের সমগ্র জীবনদর্শনের কেন্দ্রস্থ সত্য, তার অন্তরে অন্তরে অবিরল প্রাণপ্রবাহের মতো বহমান।

রবীন্দ্রনাথের কৈশোর-যৌবনের প্রত্যয় মানসী (১৮৯০) কাব্যগ্রন্থ থেকেই নতুন সংকট এবং জিজ্ঞাসার সম্মুখীন। এ সংকট যুগপৎভাবে সামাজিক এবং মানবিক। সামাজিক সংঘাতের অনিবার্য অভিঘাত তার চেতনা বারবার করেছে রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত। উনিশ শতকের আশির দশকেই বাঙালির সমাজজীবনে হিন্দু জাতীয়তাবাদের উগ্র প্রকাশ প্রবল রূপ ধারণ করে। এ সময়ের সামাজিক রক্ষণশীলতা এবং উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রেক্ষাপটে ‘মানসী’র ব্যঙ্গ কবিতাগুলো রচিত। এভাবেই রবীন্দ্রনাথের কাব্যের ধারা ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে, নিসর্গ থেকে মানুষে পরিণতির পথসন্ধান করেছে। মননশীল প্রবন্ধসমূহে রবীন্দ্রনাথের যে সুগভীর সমাজ-অনুধ্যান লক্ষ করা যায়, কবিতার মধ্যে রূপক, প্রতীক এবং চিত্রকল্পের অভিব্যক্ত হলেও সৃষ্টিশীলতার সূচনালগ্ন থেকেই মানবপ্রীতি এবং সমাজ-অন্বেষা তার জীবনবোধের সচেতন প্রান্ত।

মনে রাখতে হবে, রবীন্দ্রনাথ কোনো পূর্বসংস্কার বা নির্দিষ্ট বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে শিল্পজীবন শুরু করেননি। সমাজ, সময় ও সভ্যতার পটভূমিতে অভিজ্ঞতা, অনুধ্যান এবং সৃষ্টিশীল কল্পনায় তিনি সবকিছু প্রত্যক্ষ করেছেন। যে কারণে তার উপলব্ধির বারবার রূপান্তর ঘটেছে, তার সৃজিত সাহিত্যলোকে বারবার ঘটেছে পালাবদল। উনিশ শতকে রচিত কবিতা, গল্প, উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথকে ভিক্টোরীয় জীবনমূল্যমানে আস্থাশীল বলে মনে হওয়া স্বাভাবিক। বক্তব্য এবং প্রকরণেও এ পর্যায়ে তিনি অনেকাংশে ভিক্টোরীয়। কিন্তু ব্রিটিশ উপনিবেশ-শৃঙ্খলিত বাংলাদেশের সচেতন শিল্পীচৈতন্যে ভিক্টোরীয় জীবনকল্পনা ও সৌন্দর্যানুভূতি সামাজিক সংকট ও সংঘাতে বারবার রক্তপাতের সম্মুখীন হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের অন্তর্জগতে এ রক্তক্ষরণের সূচনা উনিশ শতকের শেষ দুই দশকে। এ সময়েই তিনি জমিদারিসূত্রে বাংলাদেশের গ্রামজীবন সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জনে সক্ষম হন। এ যাবৎকাল যে মানুষ এবং সমাজকে তিনি দেখেছেন নাগরিক জীবন-অভিজ্ঞতায়, কবির দৃষ্টি দিয়ে, শিলাইদহ পর্বে সেখানে নতুন মাত্রা সংযোজিত হলো। মানসী কাব্যের ‘সূচনা’য় রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘কবির সঙ্গে একজন শিল্পী এসে যোগ দিল। এ পর্যায়ে পল্লীজীবনসম্পৃক্তির মধ্য দিয়ে শিল্পীর সঙ্গে সংযোগ ঘটল একজন কর্মীর। চিন্তা এবং সৃষ্টির ক্ষেত্রে উন্মোচিত হলো রবীন্দ্রচেতনার নতুন দিগন্ত। একদিকে পল্লীবাংলার অবারিত নিসর্গলোক, অন্যদিকে গ্রাম বাংলার সাধারণ মানবসমষ্টি, একদিকে প্রবহমান পদ্মা নদী, অন্যদিকে নদীর ভাঙাগড়ায় লালিত সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা-অপ্রাপ্তি-আনন্দ-বেদনা-শ্রমে-কর্মে আন্দোলিত জীবনচিত্র। সোনার তরী (১৮৯৪) কাব্যের ‘সূচনা’য় জীবনাভিজ্ঞতার নবতর উৎস সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ :

মানুষের পরিচয় খুব কাছে এসে আমার মন জাগিয়ে রেখেছিল। তাদের জন্য চিন্তা করেছি, কাজ করেছি, কর্তব্যের নানা সংকল্প বেঁধে তুলেছি, সেই সংকল্পের সূত্র আজও ছিন্ন হয়নি আমার চিন্তায়। সেই মানুষের সংস্পর্শেই সাহিত্যের পথ এবং কর্মের পথ পাশাপাশি প্রসারিত হতে আরম্ভ হলো আমার জীবনে। আমার বুদ্ধি, কল্পনা এবং ইচ্ছা উন্মুখ করে তুলেছিল এ সময়কার প্রবর্তনাÑবিশ্বপ্রকৃতি এবং মানসলোকের মধ্যে নিত্যসচল অভিজ্ঞতার প্রবর্তনা।

কেবল সাহিত্যের পথ এবং কর্মের পথ নয়, রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শনের পথে ঘটল চলমান মানবজীবনপ্রবাহের পদপাত। লোকজীবনসমগ্রতা উপলব্ধি করবার এ সুযোগ রবীন্দ্রনাথের জীবনচিন্তা এবং শিল্পসৃষ্টির প্রেক্ষাপটে এক মহত্তর প্রাপ্তি। অভিজ্ঞতালব্ধ এ দেশ কেবল মানচিত্রের, প্রতীকের, রূপকের নয়; রক্তমাংসের মানুষ-অধ্যুষিত বাস্তব দেশ। দেশ অর্থে বাংলাদেশের জনসাধারণÑব্রাহ্মণ, শূদ্র, হিন্দু কিংবা মুসলমান নয়, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি-বিত্ত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ। এ অখণ্ড মনুষ্যত্বের বোধ রবীন্দ্রনাথের জীবনচেতনায় আমৃত্যু অবিচল ছিল। সমাজজীবন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের এ অভিজ্ঞতার প্রকাশ ঘটেছে এ সময়ের বিভিন্ন কবিতায়, প্রবন্ধে। বৃহত্তর জনজীবনের গভীর উপলব্ধি থেকেই চিত্রা (১৮৯৬) কাব্যের ‘এবার ফিরাও মোরে’ কবিতায় তার আত্ম-উদ্বোধন তথা মানবিক এবং সামাজিক দায়িত্বসচেতনতা।

এ সময়ে সাধনা পত্রিকায় প্রকাশিত ‘ইংরাজ ও ভারতবাসী’, ‘ইংরাজের আতঙ্ক’, ‘অপমানের প্রতিকার’, ‘সুবিচারের অধিকার’, ‘রাজা ও প্রজা’, ‘রাজনীতির দ্বিধা’ প্রভৃতি প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের সামাজিক ও রাজনৈতিক চিন্তার প্রকাশ ঘটেছে। ব্রিটিশ কুশাসন, অত্যাচার, অপমান ও তার সাম্রাজ্যবাদী লোভের প্রতিবাদ এসব প্রবন্ধের বিষয়বস্তু। একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত : ‘আজ আমি বলিতেছি, ভারতবর্ষের দীনতম কৃষককেও আমি ভাই বলিয়া আলিঙ্গন করিব, আর ওই যে রাঙা সাহেব টম টম হাঁকাইয়া আমার সর্বাঙ্গে কাদা ছিটাইয়া চলিয়া যাইতেছে উহার সহিত আমার কানাকড়ির সম্পর্ক নাই।’ জাতির প্রাণশক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার ফলে রবীন্দ্রনাথের জীবনভাবনার ক্ষেত্রে যে অভাবনীয় রূপান্তর সাধিত হলো তা পরবর্তী সময়প্রবাহে গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথের মানুষ সম্পর্কিত ভাবনার বস্তুময়তা এবং ভাবময়তার সুষম ঐক্যের সুগঠিত এ পর্যায়ে রচিত গল্পসমূহ। সমাজসত্তার স্বরূপ ও তার অন্তর্গত মানবসমষ্টির জীবনসমগ্রতার উন্মোচনে তার সাফল্য বিস্ময়কর। মানুষের দ্বন্দ্বময় ও রক্তাক্ত অনুভূতিপুঞ্জের রূপায়ণ, চলমান সময়প্রবাহে মানব-অস্তিত্বের অবস্থা ও অবস্থান, অস্তিত্বের জন্য সংগ্রামরত মানবিক জীবন সমগ্রতা প্রভৃতি রবীন্দ্রনাথের গল্পে শিল্পরূপ লাভ করেছে। ‘মেঘ ও রৌদ্র’ গল্পে কলোনিশাসিত বাংলাদেশের সমাজজীবনের অসঙ্গতির সঙ্গে ব্যক্তির যন্ত্রণা এবং রক্তক্ষরণ যেমন বিন্যস্ত হয়েছে, তেমন ‘শাস্তি’ গল্পে গ্রাম বাংলার ভূমিহীন কৃষক পরিবারের শূন্যতা, অস্তিত্বহীনতা ও সংকট রূপায়িত করলেন তিনি।

উনিশ শতকের শেষ দশক থেকেই রবীন্দ্রনাথ জাতীয় এবং ৬ পৃষ্ঠার পর

আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ ও সংকটের সঙ্গে নিজেকে বারবার সংযুক্ত করেছেন। জাতীয় কল্যাণের জীবনমুখী অভিযাত্রা ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে শিলাইদহ গমনের মধ্য দিয়ে সূচিত হলেও তার কর্মময় পদক্ষেপ ১৯০১ সালে শান্তিনিকেতনে ‘ব্রহ্মচর্যাশ্রম’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। মানবিক এবং সামাজিক অগ্রগতির মূল শক্তি যে শিক্ষার মধ্যে নিহিত এ বোধ থেকেই তিনি শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা করেন। সমাজমুক্তির অন্তরশক্তি যে মানুষের চিত্তমুক্তিতে নিহিত, এ বোধ রবীন্দ্রচেতনার গৌরবময় প্রান্ত।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৭) পূর্ববর্তী পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের জীবনসাধনা অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী ভাবধারার সমন্বয়বিধানের। যন্ত্রনির্ভর পাশ্চাত্য সভ্যতার অন্তর্গত ক্ষয়, নৈরাজ্য এবং শূন্যতার পটভূমিতে তার গীতাঞ্জলি (১৯১০) কাব্যের প্রশান্ত ও আধ্যাত্মিকতামণ্ডিত কবিতা ও গান নবতর জীবনচেতনায় বিশিষ্ট। গীতাঞ্জলির মধ্যে ইউরোপীয় সমাজমানস তাদের বস্তুগত ধ্বংসযজ্ঞের পটভূমিতে আত্মিক এবং নৈতিক অবক্ষয় রোধের প্রেরণা প্রত্যক্ষ করেছিল। রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি (১৯১৩) এ স্বীকৃতিরই বহিঃপ্রকাশ। গোরা (১৯১০) উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ যে সর্বজনীন বিশ্বমানবতার তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন, গীতাঞ্জলির ‘ভারততীর্থ’ যেন তারই কাব্যরূপ। সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এবং ধর্মীয় আলোড়নের পটভূমিকায় মানুষের ভাবশক্তি, হৃদয়শক্তি, জ্ঞানশক্তি ও প্রেমশক্তির বিচিত্রমুখী প্রকাশ ও বিকাশকে এ সময়ে রচিত কবিতায়, গানে উপন্যাসে এবং ছোটগল্পে বিন্যস্ত করেছেন রবীন্দ্রনাথ। এ পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথের সমাজ ও স্বদেশভাবনার কেন্দ্রস্থ বিষয় কেবল মানুষ নয়, মানুষের চিত্তগত ও বৈষয়িক জীবনের সংকটমুক্তির প্রত্যাশা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা, জীবনের বিপুল প্রসারী অমঙ্গল মর্মে অনুভব করে আসন্ন এক অকল্যাণ ও সর্বনাশের উৎকণ্ঠায় রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন বেদনাদীর্ণ, অন্তর্জ্বালাতাড়িত। কিন্তু মানুষ এবং মনুষ্যধর্মে চির-আস্থাশীল রবীন্দ্রনাথ এ মানসিক অস্থিরতা ও বিষণ্নতা দ্রুত অতিক্রম করেন। ব্রিটেন যুদ্ধে জড়িত হয় ৪ আগস্ট, ১৯১৪-এ। বিশ্বযুদ্ধের প্রেমহীন ধ্বংসযজ্ঞ এবং রক্তস্রোতের মাঝে মনুষ্যত্ব ও হৃদয়ধর্মের বিলুপ্তি রবীন্দ্রনাথ প্রত্যক্ষ করেন বেদনার্দ্র চিত্তে। ৫ আগস্ট শান্তিনিকেতনে ভাষণ দেন, ‘মা মা হিংসীঃ’, তিনি প্রার্থনা করেন, ‘সমস্ত মানবজাতিকে বাঁচাও ... বিশ্বপাপের যে মূর্তি আজ রক্তবর্ণে দেখা দিয়েছে সেই বিশ্বপাপকে দূর করো। বিনাশ থেকে রক্ষা করো।’( ‘মা মা হিংসী’, শান্তিনিকেতন) এ বিশ্বজাগতিক সংকটের পটভূমিতে জীবনচেতনা ও শিল্পসৃষ্টির ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ কঠোর অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হন। কিন্তু জীবনবোধের কেন্দ্রস্থ প্রাণশক্তি বলেই যুগযন্ত্রণা ও সৃষ্টিবেদনার অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পুনর্জাত রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিশীলতা ধাবিত হলো নতুন জগতের সাধনায়। জীবন ও মানুষ সম্পর্কে নতুন মূল্যমানের সন্ধান হয়ে উঠল তার একান্ত আরাধ্য। বলাকা কাব্য, ফাল্গুনী নাটক এবং চতুরঙ্গ উপন্যাসে (১৯১৬) রবীন্দ্রনাথের এ রূপান্তরিত জীবনদৃষ্টি তথা মানববোধের সার্থক প্রকাশ ঘটেছে।

রবীন্দ্রনাথের জীবনভাবনার ক্ষেত্রে যে চলমানতা এবং সমগ্রতাবোধের প্রতিফলন লক্ষ করা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক সভ্যতার বিচিত্রমাত্রিক সংকট ও তা থেকে উত্তরণের দিগ্‌দর্শন। এ পর্যায়ে মানুষের আত্মিক ও বৈষয়িক স্বাধীনতা এবং সমাজসমস্যার প্রতিবিধান রবীন্দ্রনাথের কাম্য হয়ে ওঠে। মুক্তধারা (১৯২২) নাটকে পাশ্চাত্য যন্ত্রসভ্যতার সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী নীতির প্রতিফলন সুস্পষ্ট। উত্তরকূট যন্ত্রসভ্যতার সর্বধ্বংসী আগ্রাসনের প্রতীক। অন্যদিকে শিবতরাইয়ের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে মানুষের প্রতিরোধ সংগ্রামের জীবন্ময় আলেখ্য। মনুষ্যত্বের সঙ্গে যান্ত্রিকতার বিরোধ আধুনিক সভ্যতার প্রধান সংকট। সমষ্টিগত মানুষের জাগরণের মধ্য দিয়েই কেবল এ সংকট অতিক্রম করা সম্ভব। রক্তকরবী (১৯২৬) নাটকে কর্ষণজীবী এবং অকর্ষণজীবী এ দুই জাতীয় সভ্যতার মধ্যবর্তী দ্বন্দ্ব প্রতীকের মাধ্যমে ব্যক্ত করেছেন রবীন্দ্রনাথ। এশীয় সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে গোড়া থেকেই রবীন্দ্রনাথ স্বতন্ত্র মনোবভাব পোষণ করতেন। যার সারার্থ হলো কৃষিব্যবস্থার আধুনিকায়নই কেবল এ সমাজের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে পারে। পাশ্চাত্য সমাজব্যবস্থার সঙ্গে ভারতীয় সমাজব্যবস্থার পার্থক্যের স্বরূপ এ নাটকে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তার মীমাংসিত বোধে সংঘবদ্ধ মানবশক্তিই কেবল সব রকম প্রতিবন্ধকতা ও অবরুদ্ধতা অতিক্রম করতে সক্ষম। সৃষ্টিশীলতার পথপরিক্রমায় রবীন্দ্রনাথ এভাবেই সমাজবিন্যাসের নতুন ধারণা ব্যক্ত করেছেন; যেখানে সাধারণ মানুষই হচ্ছে সমাজকাঠামোর মূল চালিকাশক্তি।

১৯৩০ সালে রাশিয়া ভ্রমণের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ তার কাঙ্ক্ষিত জীবনবাস্তবতার স্বরূপই যেন প্রত্যক্ষ করলেন। মানুষের যে অমর প্রয়াসের কথা রবীন্দ্রনাথ তার একাধিক রচনায় বলেছেন, সেই মানুষকে তিনি প্রত্যক্ষ করলেন রাশিয়ায়, যারা নতুন সমাজ সৃষ্টির কাজে নিযুক্ত। রাশিয়া ভ্রমণকে রবীন্দ্রনাথ আখ্যায়িত করেছেন ‘এ জন্মের তীর্থদর্শন’ হিসেবে। যে সমষ্টিগত মানুষের কল্পনা রবীন্দ্রসাহিত্যের প্রাণময় উৎস, রাশিয়ায় প্রতিষ্ঠিত Collective Humanity যেন তারই বাস্তব রূপায়ণ। রুশ ভ্রমণ- পরবর্তীকালে শেষ দশ বছরের রচনায় মানুষের প্রতি বিশ্বাস রবীন্দ্রচেতনায় হলো গভীর, নির্দ্বন্দ্ব এবং প্রত্যক্ষ। সাধারণ মানুষের জীবনকথা, তাদের দুঃখ-দারিদ্র্যের প্রসঙ্গ রবীন্দ্রসাহিত্যে ইতঃপূর্বেও ছিল, কিন্তু এ পর্যায়ে কাব্যের বক্তব্য এবং প্রকরণ হলো একান্তই মানবনির্ভর, বাস্তবসম্মত। কালের যাত্রা (১৯৩২) নাটকে ধ্বনতি-প্রতিধ্বনিত হলো মানবিক অভ্যুত্থানের দীপ্তচেতনা। মাটি ও মানুষের কাছাকাছি গমনের যে ঐকান্তিকতা তার সারা জীবনের সাধনা, তার অধিকতর গভীর, লোকায়ত এবং জীবন্ময় প্রকাশ ঘটল জন্মদিনে কাব্যের ‘ঐকতান’ কবিতায়। পুনশ্চ কাব্যের ‘মানবপুত্র’ এবং ‘শিশুতীর্থ’ কবিতায় যে মানবমহিমা ব্যক্ত হয়েছে, তা রবীন্দ্রনাথের রূপান্তরিত চেতনার বার্তাবহ। পত্রপুট (১৯৩৬) কাব্যের পনেরো সংখ্যক কবিতায় তিনি মানবাত্মার যে সর্বশেষ মন্ত্রটি উচ্চারণ করলেন, তা কবির সর্বজনীন মানবতাবোধে গৌরবময় :

আমি ব্রাত্য, আমি মন্ত্রহীন

সকল মন্দিরের বাহিরে

আমার পূজা আজ সমাপ্ত হল

দেবলোক থেকে

মানবলোকে

আমার মনের মানুষে আমার অন্তরতম আনন্দে।

রবীন্দ্রনাথের জীবনবোধের মূলীভূত মানববিশ্বাস এবং মানবকল্যাণকামিতা কোনো প্রকার আধ্যাত্মিক দ্বিধা কিংবা সংকীর্ণতা দ্বারা সংকুচিত বা কুণ্ঠিত হয়নি। তার মানববাদের কেন্দ্রে অবস্থিত মানুষের বস্তুজ্ঞান, কর্মশক্তি এবং আত্মশক্তির সমন্বিত রূপ। মানুষের জীবভাব এবং বিশ্বভাবÑএ দুয়ের সমন্বয় সাধনই ছিল তার জীবনধর্ম, শিল্পদর্শ। অস্তিত্বমূলাশ্রয়ী এ গভীর বিশ্বাস থেকে মানুষকে পর্যবেক্ষণ করার ফলে সভ্যতাসংকটের বিপন্ন পটভূমিতেও তিনি ছিলেন অবিচল, নির্দ্বন্দ্ব :

আজ পারের দিকে যাত্রা করেছিÑপিছনের ঘাটে কী দেখে এলুম, ইতিহাসের কী অকিঞ্চিৎকর উচ্ছিষ্ট সভ্যতাভিমানের পরিকীর্ণ ভগ্নস্তূপ। কিন্তু মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ; সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব। ... মনুষ্যত্বের অন্তহীন প্রতিকারহীন পরাভবকে চরম বলে বিশ্বাস করাকে আমি অপরাধ মনে করি। (সভ্যতার সংকট)

এ সুগভীর বিশ্বাসই রবীন্দ্রনাথের সুদীর্ঘ দুই শতাব্দীতে বিস্তৃত জীবনের কর্ম ও শিল্পসাধনার মধ্য দিয়ে অভিব্যক্ত হয়েছে। ব্রিটিশ উপনিবেশ-শৃঙ্খলিত ভারতবর্ষে সামাজিক এবং মানবিক মুক্তির যে দর্শন উপস্থাপন করেছেন রবীন্দ্রনাথ, তা মানুষের প্রতি মুহূর্তের সংকট-উত্তরণের জীবন্ময় প্রেরণা-উৎস।

সমাজবিবর্তনের যে পর্যায়ে আমরা এসে উপনীত হয়েছি, সেখানে জাগতিক সম্পদ বিপন্ন, রবীন্দ্রনাথ কথিত Collective Humanity সমরতন্ত্রের প্রয়োজনে রক্তরঞ্জিত ও শৃঙ্খলিত। এ অবস্থায় বর্তমান প্রজন্মের অবলম্বন বাঙালি জাতিসত্তার মানসসম্পদ রবীন্দ্র-সৃষ্টিজগৎÑতার প্রেরণাই কেবল সক্ষম আমাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি পুনরুজ্জীবিত করতেÑঅনাগত সংগ্রামশীল ভবিষ্যতের সম্মুখীন হতে। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা