× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আমার অজেয় জনগণ

মিলটন মোললা

প্রকাশ : ২৯ ডিসেম্বর ২০২৩ ২২:৫৮ পিএম

আমার অজেয় জনগণ

আমার মনে হচ্ছিল আমি যেন এমন কোনো একটা দুঃখের গল্প শুনছি, যে গল্পের চরিত্র আসলে আমরা নই, অন্য কোনো দেশের অন্য কোনো জনগণ। আমার ভেতরে ভীষণ একটা নাড়া দিয়ে গেল গল্পটা। যদিও কিছুতেই নিজেকে এ গল্পেরই একটা চরিত্র হিসেবে ভাবতে পারছিলাম না। অবশেষে ১৯৫৩ সালের বসন্তকালে গিয়ে চরম সত্যটা যখন উপলব্ধি করতে পারলাম, তখন আমার বয়স ৯ বছর। প্রতিযোগিতার একটা সহজাত ধাত ছিল আমার মধ্যে। নিজেকে শুধু আমার পরিবারই নয়, আমার ক্লাসের মধ্যেও সবচেয়ে মেধাবী হিসেবে গণ্য করতাম। কিন্তু একদিন উদ্বাস্তু শিবির থেকে আসা পিচ্চি এক মেয়ে সামিরাহ, ফাইনাল পরীক্ষায় আমাকে অনেক নম্বর পেছনে ফেলে ক্লাসে প্রথম হয়ে গেল; গুঁড়িয়ে দিল আমার অহংকার। ভয়ানক খেপে গেলাম, রীতিমতো ঘৃণা করতে শুরু করলাম তাকে। ঈর্ষায় পুড়তে লাগল সর্বাঙ্গ। মনে হয় রাগের মাথায় দুয়েকবার তার গায়েও হাত তুলেছিলামÑ ঠিক মনে নেই। তবে অপমান যে অবশ্যই করেছিলাম তাতে সন্দেহ নেই। একবার ক্লাসরুমের মধ্যেই আমাদের দুজনার মধ্যে একটা হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে গেল। শিক্ষক আসার পর ঘটনা দেখে তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। আমরা দুজন তখনও গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে একে অপরের চুলের মুঠি ধরে আছি। শেষমেশ কিনা তার সবচেয়ে মেধাবী দুই ছাত্রীই পরস্পরের সঙ্গে মারামারিতে জড়িয়ে গেল! ক্লাসরুমের বাইরে গিয়েও ধাক্কাধাক্কি হয়ে গেল আরেক দফা। আমিই আগ বাড়িয়ে শুরু করলাম এবারও। শিক্ষক এসে ‘দুটি কথা বলার জন্য আমাকে হাত ধরে ভেতরে নিয়ে গেলেন। তার বলা সেদিনের কথাগুলো আমি জীবনেও ভুলব না। তিনি আমাকে বোঝালেন, গরিব চাষাভূষাদের ছেলেমেয়েরাও আমার পরিবার আর বন্ধুদের মতোই মেধাবী। ‘তা ছাড়া,’ যোগ করলেন তিনি, ‘এই চাষাভূষারাই ফিলিস্তিনের ভূমিপুত্র। কেননা ওরাই ভূমিতেই বসবাস করে, ভূমি কর্ষণ করে, তাতে ফসল ফলায়। ভূমিপুত্ররা স্বভাবতই পূণ্যবান এবং এই সরল মানুষগুলোই পৃথিবীর প্রত্যেকটি সমাজের মেরুদণ্ড। ‘এ সমস্ত কৃষক,’ বলেই চললেন তিনি, ‘সেসব ধনী আমির, যারা এখন কায়রো আর বৈরুতে রাজার হালে দিন গুজরান করছে, তাদের মতো স্বেচ্ছায় ফিলিস্তিন ভূখণ্ড ছেড়ে আসেনি। ইহুদি অনুপ্রবেশকারীদের জায়গা করে দেওয়ার জন্য জোরপূর্বক তাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে জন্মভূমি থেকে। শোনো লায়লা, এই মানুষগুলোই ফিলিস্তিনের প্রকৃত জনগণ। ওদের ভালোবাসতে শিখতে হবে তোমাকে। তাদের একজন হয়ে উঠতে হবে। তাদেরই জন্য কাজ করতে হবে। আমার নসিহত শেষ হওয়ার পর এবার সামিরাহকেও ডেকে আনলেন তিনি। আমাদের দুজনের হাতে হাত মিলিয়ে দিলেন এবং সামিরাহকে নির্দেশ দিলেন আমাকে তাদের তাঁবুগৃহে নিয়ে যেতে। আমি যাতে সেখানে গিয়ে নিজের চোখেই দেখতে পারি সে আর তার বাবা-মা, আর তাদের মতো আরও লাখ লাখ ফিলিস্তিনি নাগরিক কী দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্যে বসবাস করছে। সামিরাহর হাত ধরে তাদের তাঁবুগৃহের উদ্দেশে রওনা হলাম।

উদ্বাস্তু শিবির এলাকায় একটা চক্কর দেওয়ার পরই এখানে যা দেখলাম সে তুলনায় আমি যে কতটা বিলাসী জীবন কাটাচ্ছি, সে ব্যাপারে আমার বোধোদয় ঘটল। আমি বুঝতে পারলামÑ আমি কতটা সৌভাগ্যবান এবং একই সঙ্গে বুঝলাম ধনী শ্রেণি কতটা নিকৃষ্ট আর কুৎসিত হতে পারে। সেই বসন্তেই হঠাৎ করে শ্রেণিবিভাজনের বিষয়টিও পরিষ্কার বুঝতে পারলাম। আমার ভেতরে ক্রমশ জন্ম নিচ্ছিল প্রয়োজনীয় সেই বুদ্ধিবৃত্তি ও নৈতিক আদর্শ, যেটা দিয়ে বোঝা সম্ভবÑ কেন সেদিন শিবিরে ঘুরতে গিয়ে আমার মধ্যে ওই জাতীয় অনুভূতি তৈরি হয়েছিল, কেনই-বা আমাদের শ্রেণিবিভক্ত সমাজের বিলুপ্তি ঘটাতে হবে, আর কেনই-বা সেখানে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে সমাজতন্ত্র। তবে আমার সহপাঠী ও ক্লাসতুতো বোন সামিরাহ এবং আমার শিক্ষক ও শ্রমজীবী শ্রেণির প্রতিনিধি আমিরাহর কাছেই আমি প্রথম সবক পেলাম সত্যিকার স্বাধীনতা ও মানবতার। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আমাকে তারা যা শিখিয়ে দিলেনÑ একশ বছর ধরে এক হাজার গ্রন্থ পাঠ করেও তা আমার শেখা হতো না। উদ্বাস্তু শিবিরে আমার সঙ্গে যন্ত্রণা, ক্ষুধা আর অবমাননার সাক্ষাৎ হলো। দেখলাম মূক বনে যাওয়া, রুগ্নদেহ ভগ্নহৃদয় যত প্রাণ। দেখলাম প্লিহা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো নগ্নপদ শিশুদের, নতমুখ বাবাদের, রুগ্ন বাচ্চা বুকে ধরে শূন্যদৃষ্টি চোখে নিয়ে বসে থাকা রক্তশূন্য মায়েদের, হতাশায় স্তব্ধ প্রৌঢ়দের। দারিদ্র্য আর ক্ষুধার প্রকৃত মানে আমার সামনে মেলে ধরা হলো। জীবনের ন্যূনতম চাহিদা মেটাতে না পারার গ্লানি গভীরভাবে ছুঁয়ে গেল আমাকে। নোংরা তাঁবু দেখে এবার কিন্তু আমার মধ্যে কোনো বিকার তৈরি হলো না। মৃত্যুদৃশ্য দেখেও এখন আর আমি বিচলিত হই না। গোটা শিবির এলাকা ঘুরে ঘুরে দেখলাম। মানুষগুলোর অনুভূতি নিজের মধ্যে অনুভব করার চেষ্টা করলাম। আকস্মিক বাস্তবতার তীব্র আঘাতে বেসামাল-চুরমার হয়ে বাড়ি ফিরলাম একসময়। নিজের মধ্যে একই সঙ্গে ক্রুশবিদ্ধ হওয়া আর পুনরুজ্জীবন লাভের আস্বাদ অনুভূত হচ্ছিল। সেদিন থেকেই আমি সারা জীবন পৃথিবীর সব গরিব মানুষের জন্য ভালোবাসা অনুভব করে এসেছি। আমাদের অভিন্ন অত্যাচারীর বিরুদ্ধে যৌথ মিছিলে শামিল থেকেছি সব সময়। সাত লাখের ওপর ফিলিস্তিনি এখনও উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতে মানবেতর দিনাতিপাত করছে। মাঝেমধ্যে কেউ কেউ হয়তো শহরে গিয়ে কখনও কখনও কুলি-মজুরের ছুটাছাটা কাজের সুযোগ পায়, তবে কর্মহীন বসে থাকতে থাকতেই পচে যায় বেশিরভাগ। জাতিসংঘের দয়া-দাক্ষিণ্যে টিকে থাকা এই মানুষগুলোর উদ্ধারের অন্য কোনো পথই খোলা নেই, একটা আরব-ফিলিস্তিনি বিপ্লব ছাড়া।

১৯৫৩ সালের বসন্তে, নিজের আত্মবিশ্বাস ও সহপাঠীদের ওপর আমার আস্থা আরও জোরালো হলো। ‘বেরামের ইভ বা মুসলিম ইস্টার পর্বের সাপ্তাহিক ছুটি উদযাপনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল ছেলেমেয়েরা। গোল হয়ে বসে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিল উৎসবের দিনে কে কী নতুন উপহার পাবে, পুতুল নাকি জামা, নাকি অন্য কিছু। শতচ্ছিন্ন জামা পরনে ছোট্ট একটি মেয়ে বিষাদভরা মুখে বসে ছিল আমাদের নিকটেই। আমার সঙ্গে ওর খুব একটা চেনাজানা ছিল না। ফলে মনে মনে কৌতূহল হলেও মুখ ফুটে বলতে পারলাম নাÑ কেন সে এমন একাকী আর মুখটা অমন ভার করে বসে আছে। তবে তার দুঃখের কাহিনীটা জানা ছিল আমাদের শিক্ষক নাবিলের। টিফিন ব্রেকের পর উনি আমাদের সবাইকে ডেকে বললেন, ‘সামনেই ইস্টার পর্ব। এদিন একটা ছোট্ট মেয়ে ছাড়া বাকি সবাই কোনো না কোনো উপহার পাবে। তারপর আবার বললেন, ‘নিজের সম্পদ অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি না করাটা একজন মুসলমানের পক্ষে অশোভন এবং একজন আরবের পক্ষে সংকীর্ণমনা হওয়াটা একেবারেই অসম্ভব। ভেতরে ভেতরে উত্তেজনা বোধ করছিলাম তার এ জাতীয় কথা শুনে। এবার হয়তো সময় হয়েছে জাতিসংঘের ত্রাণ দপ্তর কিংবা শহরের সরকারি দপ্তরে হানা দেওয়ার। যদিও নাবিলের মাথায় এ জাতীয় কোনো হটকারী পরিকল্পনা ছিল না। ‘তোমাদের মধ্যে কোনো একজনের ইস্টার আনন্দময় হবে না, যদি সেদিন তার কপালে কোনো নতুন জামা না জোটে। কিন্তু আমার একার পক্ষে তো তাকে একটা জামা কিনে দেওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং এই যে আমি এখানে ২৫ পিয়াস্ত্রা জমা রাখলাম। এবার তোমরা প্রত্যেকে যদি দুই থেকে পাঁচ পিয়াস্ত্রা করে রাখো এখানে, তাহলেই হাসনাকে আমরা একটা নতুন জামা কিনে দিতে পারি। তার অনুরোধ শুনে ছেলেমেয়েরা কিছুটা হকচকিয়ে গেল, একে অন্যের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল। আমি চুপচাপ বসে ছিলাম। উদ্বাস্তু শিবিরে আমার সাম্প্রতিক সফর আমাকে হাড়ে হাড়ে চিনিয়েছিল গরিব হওয়ার কী জ্বালা। নাবিলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমি উঠে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলাম, ‘আমার এক সপ্তাহের জমানো পাঁচ পিয়াস্ত্রা আমি এই যে এখানে জমা রাখলাম। আমার দেখাদেখি অধিকাংশ বাচ্চাই এগিয়ে এলো এবং শেষ পর্যন্ত আনন্দাশ্রু বিনিময়ের মধ্যে আমরা সবাই মিলে হাসনাকে একটা নতুন জামা কিনে দিলাম। আমি নিজে সিদ্ধান্ত নিলাম, এ বছর উপহার পাওয়া নতুন জামার একটাও আমি গায়ে পরব না। কীভাবে পরব, যখন জানি, একটা জামার অভাবে উদোম গায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি শিশু।  

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা