পারভীন সুলতানা
প্রকাশ : ২২ ডিসেম্বর ২০২৩ ২২:৫০ পিএম
ডাক্তারের কথা শুনে এক ধরনের ভোঁতা বোধের মধ্যে হোঁচট খায় আমার সমস্ত সত্তা। ডান হাতটা
আর সচল-সবল হবে না! নেতিয়ে পড়া লাউডগার মতো অঙ্গের সঙ্গে শুধু লটকে থাকবে। রক্ত বইবে
না শিরার ভেতর, ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাবে; সমস্ত শারীরিক সৌন্দর্য শুষে নেবে। আমি ফ্যালফ্যাল
করে তাকাই। অসহায় নিরুপায় দৃষ্টি!
Ñআমার ডাংগুলি খেলার দুষ্টু হাত...
Ñআমার নামতা লেখা মনোযোগী হাত...
Ñআমার ভাত মাখিয়ে খাওয়া ক্ষুধার্ত হাত...
Ñআমার খেটে খাওয়া কর্মী হাত...
Ñনাজনীনকে আদর করা প্রেমিক হাত...
এসব ফালতু আবেগকাতর ভাবনার একটাও মাথায় আসে না। বরং পুরুষ চোখ টপকে
ভীত কষ্টের, তীব্র যন্ত্রণার অনিয়ন্ত্রিত অশ্রু গড়াতে শুরু করলে আব্বা, আম্মা, ছোট
দুই বোন, বড় ভাইয়া আর জনাকয়েক ডাক্তারের উপস্থিতিতে কান্না সংবরণের দুর্মর চেষ্টায়
ঠোঁট দুটো বেঁকেচুরে গেলেও ঠেলে আসা কান্না থামাই। নিজের ফিসফিসানো কণ্ঠস্বর শুনতে
পাইÑ তুমি পুরুষ! তুমি পুরুষ!
হাতে আঘাত একটাই। রডের প্রচণ্ড দশাসই বাড়ি। কবজির সব শিরা সম্ভবত
ছিঁড়ে কিংবা থেঁতলে গেছে। মনে হলো হাতটা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। খানিকটা দৌড়ে
এর পরই বিবশ গোঙানিতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। এক ফোঁটা রক্তপাত হয়নি। সেন্স ফিরে আসার
সঙ্গে সঙ্গে, হাসপাতালের বেডে হাতটা নিজের অঙ্গের সঙ্গে সংযুক্ত দেখে আমার চোখে স্বস্তি
ফিরে আসে। উদ্বিগ্ন স্বজনদের মধ্যে আম্মার দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করলে সমস্ত শরীরটা
জেগে উঠলেও হাতটার ঘুম ভাঙে না। শরীরের একটা বাতিল ও অপ্রয়োজনীয় ঝামেলার মতো লতপত করে
ওঠে এটা। অচেনা শত্রুর আঘাতের মতো এক ধরনের চিড়িক চিড়িক ব্যথা অনুভব করি কাঁধের কাছটায়।
এরপর পুরো এক মাস যন্ত্রণাকর অনুভূতি। পিজি থেকে রেফার করা হয় সাভারের সিআরপিতে। ফিজিওথেরাপি,
ব্যায়াম...। দেড় মাস পর মৃত্যুর রায় ঘোষণার মতো জানানো হয়, হাতটা চিরকালের জন্য অবশ
হয়ে গেছে। রডের আঘাতে সমস্ত নার্ভ অকেজো হয়ে যাওয়ায় কোনো ওষুধ বা ফিজিওথেরাপি কাজ করছে
না। ব্লাড সার্কুলেশন না হওয়ায় মূলত এখন এটি একটা বাড়তি অঙ্গ; কার্যক্ষম কোনো অঙ্গ
নয়। এসব ভয়াবহ কথাবার্তার কিছু বুঝে, কিছু না বুঝে সঘন উৎকণ্ঠায় আম্মা বলে ওঠেন, বিদেশে
চিকিৎসা করালেও কি ঠিক হবে না? ডাক্তারের কথা শুনে দুই বোনের ফুঁপিয়ে ওঠা কান্নার ওজনে
আম্মার প্রত্যাশার গলা ডুবে যায়। সিনিয়র চিকিৎসকরাও আমার হাতের বিষয়ে প্রচণ্ড হতাশা
ব্যক্ত করে শ্লথ পায়ে ঘর ছেড়ে বের হয়ে যান।
গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিতে ইচ্ছে করে আমার।
পৃথিবীটা আছাড় মেরে কাচের গ্লাসের মতো ভেঙে ফেলতে মন চায়।
শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চেষ্টা করি হাতটা ওঠাতে।
সবশেষে সঘন বিষাদেরই জয়। আমাকে রিলিজ দেওয়া হয়।
তবে সঞ্চিত বিষাদ ধীরে ধীরে অপস্রিয়মাণ হয়ে ক্রুদ্ধ বাঘ হয়ে ওঠে।
প্রেমিকা ফিরিয়ে দেয়। চাকরি চলে যায়। বেশ কিছুদিন ভাত মাখিয়ে খাইয়ে দিয়েছেন মা। একদিন
প্লেটের পাশে চামচ রেখে বলেন, অতুল, বাবা, আমার কত কাজ! এখন থেকে রহমত তোকে খাইয়ে দেবে।
আর আমিও সময় পেলে...। মায়ের অনেক কাজ। তবু অযৌক্তিক অভিমানে মন অবুঝের মতো কোঁকায়।
মাথা ঝাঁকাইÑ হ্যাঁ আম্মা...। কষ্ট প্রকাশ করলে মা আরও দুঃখ পাবেন।
প্রথম দিকে প্রায় প্রতিদিন নাজনীন আসত। আমি একা থাকলে পুরোনো দয়িতা
গলায় তরুণ প্রেমে ‘জান, সব ঠিক হয়ে যাবে’ বলে শক্তির
আগুন জ্বালাত। দুই মাসেই হাতটা কুৎসিত হয়ে গেছে। ঠিক বৃন্তচ্যুত শাখার মতো। সবুজ রঙ
খুইয়ে নেতিয়ে পড়া, মসৃণ টসটসে সতেজতা হারানো রুক্ষ হাড়গিলে। নাজনীন আসে বলে ফুলহাতা
শার্টে হাতটা লুকিয়ে রাখি।
মনে পড়ে সুযোগ পেলে আমার হাতে ওর নেল পলিশ মাখা আঙুলগুলো ঘষতে ঘষতে
বলত, কী চমৎকার তোমার হাত! কে বলে নারীর হাতই কেবল সুন্দর! কবি আলাওল বেঁচে থাকলে তোমার
হাতের সৌন্দর্য নিয়ে কয়েকশ পঙ্ক্তি লিখে ফেলত! কথাগুলো এমন সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলা যে
না হেসে পারিনি। বাংলার ছাত্রী নাজনীন। খুব আর্টিস্টিক। কোনো উপলক্ষ পেলেই সুতি তাঁতের
শাড়ি পরে, কপালে টিপ বসায়, খোঁপায় গোঁজে ফুল। আমি ওর প্রশংসার প্রত্ত্যুত্তরে এক দীর্ঘ
ইতিহাসের বয়ান শুরু করিÑ জন্মের পর দাদা আমাকে দেখে বলেছিলেন, আমার বাপ হয়ে জন্মেছে
দাদুভাই। কী সুন্দর গড়ন! আর হাত দুটো তো এ পোলা বাজানের শরীর থেকে খসিয়ে এনেছে। বড়
পয়মন্ত হাত! ছেলে হলেও দাদা আমাকে সোনার বালা দিয়ে মুখে ভাত তুলে দিয়েছিলেন। বালা দুটো
মায়ের গয়নার বাক্সে আজও তোলা আছে। তো হাত নিয়ে বাড়াবাড়ির একটা কারণ আছে বইকি! ব্রিটিশ
শাসনামলের শেষ প্রান্তে ১৯৪৬ সালে নোয়াখালী দাঙ্গার সময় আমার দাদার বাবা বেগমগঞ্জের
প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন। স্থানীয়দের দ্বারা সংঘটিত সে দাঙ্গায় ধারাবাহিক
গণহত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, হিন্দুদের জোরপূর্বক ধর্মান্তর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
বড় বাবা সে সময় গান্ধীজির সঙ্গে থেকে, নিজের জীবন হুমকির মধ্যে ফেলে নির্যাতিত হিন্দুদের
পাশে দাঁড়ান। দাঙ্গার পর গান্ধীজি স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে যেসব এলাকায় গণহত্যা হয়েছিল
সে স্থানগুলো পরিদর্শন করেন। ১৯৪৬ সালের ১০ অক্টোবর কোজাগরি লক্ষ্মীপূজার দিন দাঙ্গার
শুরু আর তা প্রায় চার সপ্তাহ ধরে চলমান ছিল। বড় বাবার ভূমিকায় ক্ষিপ্ত কিছু লোক তাকে
হত্যার চেষ্টা পর্যন্ত করে। তার বাড়ি বেগমগঞ্জে এবং এলাকার জনপ্রিয় শিক্ষক হওয়ায় তাৎক্ষণিক
তেমন ক্ষতি করতে পারেনি। হিন্দুদের বাড়িতে অগ্নিসংযোজনের সময় আগুন নেভাতে গিয়ে বড় বাবার
দুটো হাতই দগ্ধ হয়। অবশ্য চিকিৎসায় পরে তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। দাঙ্গাকারীরা
ছিল প্রবল শক্তিশালী। স্থানীয় এবং এলাকার জনপ্রিয় শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও দাঙ্গার আসল
খলনায়ক শ্যামপুর দায়রা শরিফের পীর গোলাম সরোয়ার হুসাইনি আর তার সাঙ্গোপাঙ্গদের সঙ্গে
পেরে ওঠা অসাধ্য ও অসম্ভব ছিল। সেই সূত্রে আমাদের পরবর্তী তিন পুরুষের নিবাস থিতু হয়
ঢাকার কেরানীগঞ্জে বুড়িগঙ্গার তীরে। দাদার বাবা পুরোনো পেশা বাদ দিয়ে জাহাজের ব্যবসা
শুরু করলে তার হাতে লক্ষ্মী ধরা দেয়। সবাই বলাবলি করে, উপকারী হাত বলে বাণিজ্যলক্ষ্মী
ধরা দিয়েছে। বড় পয়মন্ত হাত! আগ্রহ নিয়ে আমাদের মাইগ্রেশনের ইতিহাস শোনার পর নাজনীন
কৌতুক করেÑ এজন্যই তোমার হাতের এমন কদর! আমার করতলে ওর নরম আঙুল সমর্পণ করে তরল গলায়
হাসতে হাসতে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে, এই কারণেই তোমাকে দেখিবার ক্ষণে অবয়বের চেয়ে তোমার
এই পৌরুষদীপ্ত হস্তযুগলই আমাকে অধিক আকৃষ্ট করিয়াছিল!
এসব গল্প এখন পুরোনো। ভাদ্রের তীব্র গরমে বিদ্যুৎ চলে গেলে শরীর ও
মনের ক্লান্তিতে খালি গায়ে ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুম থেকে ওঠার পর ঘামে নেয়ে-ওঠা শরীরটাকে নিজের
কাছেই কুৎসিত লাগে। লুঙ্গি হাঁটুর ওপরে উঠে এসেছে। শরীরের সঙ্গে ঝুলে থাকা কাঙালের
মতো সরু, মৃত দীনহীন হাতটা আমাকে বিবশ করে দেয়। শেষ বিকালে চা দিতে এসে মা জানান, নাজনীন
এসেছিল। তুই ঘুমিয়ে আছিস বলে ডাকতে বারণ করে চলে গেছে। আমার বুক তরাস করে ওঠে, ও কি
আমার ঘরে ঢুকেছিল আম্মা?
এরপর নাজনীন আর কোনো দিন আসেনি; আমিও কোনো খোঁজ নিইনি। অফিস থেকেও
অব্যাহতি পত্র পাই। আমি আইটি স্পেশালিস্ট। ডান হাত ছাড়া কম্পিউটারে কাজ করতে পারছি
না। বিকল্প হাতে অভ্যস্ত হওয়ার জন্য অফিস কিছুটা সময়ও দিল না! সেজন্য কোনো অনুরোধ জানাইনি।
অভিমানের ভাঁজে সবকিছু গুঁজে দিই। বাসার বিষাদভরা গুমোট ধীরে ধীরে কেটে যেতে থাকে।
ড্রয়িংরুমে বোনদের সিরিয়াল দেখা, হাসাহাসি, আব্বা ও ভাইয়ার ক্রিকেট খেলা দেখা নিয়ে
উত্তেজনা, মাঝে মাঝে খালাদের সঙ্গে আম্মাকেও হেসে ফোনে কথা বলতে শুনি। আব্বা প্রায়ই
বলেন, ঘর থেকে বের হও তুমি। চাকরি করতেই হবে এমন তো কথা নাই। আমরা আছি না! এসব কথায়
প্রবোধ মানে না মন। নির্জনতার একাকিত্বে নিজেকে ঠেসে রাখি।
বাসায় থাকতে থাকতে পাগল হয়ে যাচ্ছি। মনে করতে না চাইলেও বারবার সেই
দুঃসহ দিনটির কথা মনে পড়ে... অফিস থেকে ফেরার সময় সিএনজিতে ওঠার পর যখন সংসদ ভবনের
পেছনের নির্জনতায় গাড়িতে যান্ত্রিক ত্রুটির কথা বলে চালক থামিয়ে দেয় তখনই সন্দেহ হয়।
লাফ দিয়ে নেমে ছুটতে গিয়েও টের পাই তিনজন ধেয়ে আসা লোক; থামিনি, তবু শেষরক্ষা হয়নি,
একজনের হাতের রডের আঘাত আমার ডান কাঁধে প্রচণ্ডভাবে নেমে আসে। তবে দৌড় থামাইনি, ছুটতে
ছুটতে ফার্মগেটের ঘরোয়া হোটেলের কাছে এসে সম্ভবত জ্ঞান হারাই। এরপর আর স্বাভাবিক জীবনের
আয়োজনে ফেরা হয়নি। আজ হসপিটাল তো কাল ডাক্তারের কাছে, সিআরপি, থেরাপি সেন্টার। মাস
তিনেক একটা পরাজিত যুদ্ধ চলে।
আজ সকালে কাউকে কিছু না বলে বেরিয়ে পড়ি। গন্তব্যহীন পথে নেমে একটা
পাবলিক বাসে উঠে বসি। ভিড়, হইচই ভরা গিজগিজানো বাহনেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। নির্জনতাকে
নিতে পারছি না আর। সেদিন যদি সিএনজি না নিয়ে বাসে ফিরতাম! ভিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে বাসে দাঁড়িয়ে
থাকি। হঠাৎ চোখ পড়ে এক যুবতীর ওপর। বাঁকা, ত্যাড়া হয়ে দাঁড়ানো শরীরটা কোনোভাবেই পাশের
যাত্রীর ঘেঁষাঘেঁষি থেকে আগলে রাখতে পারছে না। এরই মধ্যে একটা অসভ্য হাত সাপের মতো
হিসহিস করছে। আমার চোখ নিশ্চল পাথরের মতো সাপটার ফণার দিকে স্থির। ওটা ক্রমে এগিয়ে
যাচ্ছে যুবতীর স্তনের দিকে। মেয়েটা কঁকিয়ে ওঠে ভয়ে, ব্যথায় কিংবা ঘৃণায়। আমার ডান কাঁধটাসহ
হাতটা জেগে ওঠে যেন! কাছাকাছি বসে থাকা এক মহিলা যাত্রী কালো হাতটা চেপে ধরে। ভীতু
মেয়েটা একবার বোবা দৃষ্টিতে তাকায়। তারপর বাসটা একটু স্লো হতেই দ্রুত পায়ে নেমে যায়।
হতাশ হই। মেয়েটার তো নিদেন পক্ষে বদমাশটাকে একটা চড় দেওয়া উচিত ছিল! হতাশায় টের পাই
ডান হাতের জেগে ওঠাটা স্রেফ একটা বিভ্রম ছাড়া কিছু নয়।
আমিও নেমে পড়ি। একদলা ক্ষোভ আর ঘৃণা বহন করে বাসায় ফিরে আসি।
এর মধ্যে নাজনীনের বিয়ের খবর দেখি ফেসবুকে। ভেতরের আগুনটা দাউদাউ
জ্বলে ওঠে। নাঃ, এ আগুন নেভানো যাবে না। নাজনীনের বধূবেশ আমাকে বিশাল এক ঝাঁকুনি দেয়;
আমার অচল হাতটাও এ ঘৃণা আর কষ্ট পাওয়ার সঙ্গে শামিল হয়। শীর্ণকায় হাত আমাকে ক্রমে দ্রোহী
আর তেজি করে তোলে।
এরপর নিজেকে নিয়ে পড়ে থাকি। বাঁ হাতটা ডান হাতের বিকল্প বানানোর চেষ্টায়
উঠেপড়ে লাগি। স্টিফেন হকিং মোটর নিউরো রোগে আক্রান্ত হয়ে তার ঘুমিয়ে পড়া অঙ্গপ্রত্যঙ্গ
নিয়ে কাজ করে পৃথিবীতে আলোড়ন তুলেছিলেন! আর মাত্র একটা হাতের জন্য আমি কি না শোকে মুহ্যমান!
অথর্ব হয়ে যাচ্ছি! কিন্তু দিনশেষে এসব বড় বড় উদাহরণ আর প্রবোধেও শক্তি বা স্বস্তি আসে
না।
প্রিয়তম ডান হাতের করুণ অবস্থা কোনো কিছুতেই শান্তি দেয় না আমাকে।
দুমড়ে মুচড়েও এখনও এটা আমার সঙ্গ ছাড়েনি।
মৃত হাতটার সঙ্গে ফিসফিসিয়ে কথা বলিÑ ঘুম ভাঙবে না তোমার? অনেক তো
হলো এবার জাগো! ওকে বাঁ হাত দিয়ে আদর করি। ঠোঁটের কাছে তুলে নিয়ে চুমু খাই। যেন অবুঝ
বাচ্চার মান ভাঙাচ্ছি এমন ভঙ্গিতে গলায় জড়িয়ে ধরি! তখনই হঠাৎ কানে আসে বাইরের একটা
অস্পষ্ট শোরগোল। আমার দরোজার বাইরে দৌড়ে যাওয়া কিছু পদশব্দ শুনি। দ্রুত শার্ট গায়ে
জড়িয়ে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরোই। দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাতলা অন্ধকারে শোরগোলের উৎস
অনুসন্ধান করি। কিছু ক্রুদ্ধ গলা ধারালো ছুরির মতো শানিত হয়Ñ শালা মালাউনদের কত্ত বড়
সাহস! ভোট না দিয়া ফেইল করায়া দিল পাড়ার চেয়ারম্যানেরে! মাথাটা এবার পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
গেল সপ্তাহে হয়ে যাওয়া ইলেকশনে ফেল করেছে এ পাড়ার স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী। কোনো
দল থেকে নমিনেশন না পেয়ে আগে থেকেই খেপে ছিল ব্যাটা। পানির মতো টাকা খরচ করেও বৈতরণি
পার না হওয়ায় দুর্নীতিবাজ লোকটা উন্মাদ হয়ে গেছে। অনায়াসে এর সব দায় চাপিয়ে দিয়েছে
পাড়ার হিন্দুদের ওপর। ওই অসৎ লোকটাকে আমাদের বাসার কেউ ভোট দেয়নি। এসব নিয়ে এলাকায়
যে কানাঘুষা চলছিল ফেসবুকে তার আভাস পাই। আমাদের বাসার দক্ষিণে, নদীর দিকটায় কিছু হিন্দু
ঘর আছে। এদের বেশির ভাগই ডকইয়ার্ডে কাজ করে। এরা পরিশ্রমী, হাতের কাজও নিখুঁত, সুনিপুণ।
পুরোনো জাহাজ মেরামত কেন্দ্র করে ১৯৫৮ সালে ঢাকার সদরঘাটের উল্টো দিকে কেরানীগঞ্জে
যে ডকইয়ার্ড শিল্প গড়ে উঠেছে, এদের অধিকাংশই সেখানকার জাহাজ মেরামত ও নির্মাণ কাজের
সঙ্গে জড়িত। এরা যে দিনরাত পরিশ্রম করে, তা শৈশব থেকে দেখে আসছি। গোছানো, ঝুটঝামেলাহীন
নিপাট জীবনযাপন ওদের। ও পাড়ার মাধব, সুবিমল, পরেশ আমার কৈশোরের বন্ধু। একসঙ্গে স্কুলে
পড়েছি। কত দিন কারণে অকারণে বুড়িগঙ্গা পাড়ি দিয়ে নৌকায় ঘুরেছি! সুবিমল ছাড়া কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের
চৌকাঠ পার হয়নি। বেশিরভাগই ডকইয়ার্ডের কাজে লেগে গেছে। মাধব এখন জাহাজ তৈরির নামকরা
কারিগর। এজন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নিতে হয়নি ওকে। কাজ করতে করতেই অভিজ্ঞতাসম্পন্ন
হয়ে উঠেছে। উপার্জনও ভালো। আমি আর নাজনীন মাঝে মাঝে ওদিকে যেতাম। মাধব কত খাতির করত!
আমরা ঘণ্টাচুক্তি নৌকা নিয়ে চলে যেতাম নদীর ওপারে...। অসুস্থতার খবরে সুবিমল, মাধব,
পরেশ আমাকে দেখেও গেছে বাসায়। সময় পেলে ফোনে এখনও খোঁজখবর নেয়। আমি খুব ভালো করে জানি
ইলেকশনে ভোট দেওয়া ছাড়া আর কোনো জটিল ভাবনা কাজ করে না ওদের।
এ খবরে খুব অস্থির হয়ে উঠি। ভাল্লাগে না। ঘুম আসে না। মাঝরাতে প্রচণ্ড
কোলাহলে বারান্দায় দাঁড়ালে চোখে আসে দাউদাউ আগুনের লেলিহান শিখা। কোনোরকমে ৯৯৯-এ কল
করে ওদের পাড়ার দিকে ছুটি। আমার মৃত হাতটাও এ উন্মাদ দৌড়ে আমার সঙ্গে লতপত করতে করতে
শামিল হয়। চিৎকার, চেঁচামেচির শোরগোলে আগুন তার তাণ্ডব চালাতে কোনোরকম বাধা পাচ্ছে
না; কারণ বেশিরভাগ লোকই তামাশা দেখছে। মাঝরাতে ঘুম থেকে জেগে ওঠা আতঙ্কিত মানুষ হতভম্ব
হয়ে ঘর থেকে বেরোতেও দেরি করছে! আমি গায়ের শার্টটা খুলে উদোম শরীরে সরাসরি ভেতরে ঢুকে
পড়ি। এর মধ্যেও কানে আসে অশ্রাব্য শব্দগুচ্ছÑ লুলা ব্যাডার সাহস দেখ...। এক বৃদ্ধাকে
পাঁজাকোলা করে বের করতে গিয়ে ভুলে যাই অথর্ব ডান হাতটার কথা...!
অসহ্য উত্তাপে ঘুমন্ত শিশুকে ঘরে রেখে ছুটে বেরিয়ে আসা মায়ের বিলাপ
কানে আসে। আগুনে ভেঙে পড়া জানলায় ঢুকে ওকে বের করতে গিয়ে খেয়ালই থাকে না লুলা হাতটার
কথা...।
ফায়ার সার্ভিস ততক্ষণে আগুন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে। প্রশস্ত রাস্তা
থাকায় আর ঘরগুলো এক তলা হওয়ায় দমকল বাহিনীর পক্ষে আগুন নেভানোর কাজটা দ্রুত করা সম্ভব
হয়েছে। এরপর সবার নজর আমার ওপর পড়ে। দুটো পা ফোসকা পড়ে কালো হয়ে উঠেছে। ডান হাতটা বাঁ
হাতের ঝলসানো আঙুলগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে পরখ করছে! মায়ের কোলে ফেরা বাচ্চাটা তখনও কাঁদছে,
তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মায়ের আনন্দাশ্রু। নিজের উদোম শরীরের দিকে তাকাই। বাইরের আগুন
নিভে গেলেও মৃত হাতটার নিভে যাওয়া আগুন জ্বলে উঠতে দেখি। দীর্ঘ নিদ্রা শেষ করে যেন
জেগে উঠছে ও...।