ড. আতিউর রহমান
প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০২৩ ২৩:০৭ পিএম
শাস্ত্র হিসেবে অর্থনীতির সঙ্গে আমাদের জীবনের যোগসূত্রটি নিত্যদিনের।
সচেতনভাবে বা অবচেতনে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক জীবনে যেমন, তেমন জাতীয় জীবনেও অর্থশাস্ত্রের
তত্ত্বগুলোর যথাযথ প্রয়োগের ওপর বহুলাংশে নির্ভর করে আমাদের সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার
সক্ষমতা।
আর বিশ্বায়নের এই যুগে তো বৈশ্বিক অর্থনীতির হিসাবনিকাশও ক্রমে নিত্যদিনের
বিষয় হয়ে উঠছে। তাই জাতীয় অর্থনীতি বিষয়ক পরিকল্পনা তো বটেই, এমনকি পারিবারিক/ব্যক্তিগত
অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও অনেক সময় আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বাস্তবতাগুলো
বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। আশপাশের এবং বিশ্বের অর্থনৈতিক বাস্তবতার টানাপড়েন নিরন্তর আমাদের
চিন্তা আচ্ছন্ন করে রাখছে। আমাদের জীবনচলার নিত্যসঙ্গী হয়ে গেছে অর্থনীতির বিষয়াবলি।
মোদ্দা কথা, ব্যক্তি থেকে জাতীয় পর্যায়ে আমাদের যে আকাঙ্ক্ষাগুলো
থাকে আর সেগুলো পূরণের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণের যে চ্যালেঞ্জগুলো আছে তার মধ্যে
ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার বিষয়টি জ্ঞানের যে শাখার কাজ তা-ই অর্থনীতি। অর্থনীতির এ ক্লাসিক
সংজ্ঞাটিতেই বোঝা যায় ‘অর্থনীতি সবার বিষয়’। বিষয়টি জীবনচলার
সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। তাই তা ততটা জটিল নয় যতটা অর্থনীতিবিদরা বলার চেষ্টা করেন।
আসলে এটি ‘কমনসেন্স’ বা সাধারণ জ্ঞানের বিষয়। অর্থনীতিবিদরাই
তাদের পেশাগত কৌটিল্য ধরে রাখতে এটাকে অযথা জটিল করে রাখেন। অবশ্যি ব্যতিক্রমও আছে।
অনেক অর্থনীতিবিদ আবার খুব সহজ করে বাজেট, মুদ্রানীতি, বৈদেশিক খাতসহ অর্থনীতির কঠিন
বিষয়গুলো খুবই সহজ করে প্রকাশও করেন।
আর যেহেতু অর্থনীতি সবার বিষয়, ফলে অবশ্যই একে সবার কাছে বোধগম্য
একটি বিজ্ঞান হিসেবে হাজির করাটি ইন্টেলেকচুয়ালদের প্রধানতম দায়িত্ব। সে বিচারে বিরূপাক্ষ
পালের লেখা ‘সহজ কথায় অর্থনীতি’ গ্রন্থটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবং
উপযোগীও। তার এ বইটির প্রকাশনা উৎসবে আমি এসব কথা বলেছি। আমিও চেষ্টা করি অর্থনীতির
কথাগুলো খুব সহজ করে প্রকাশের।
আমি নিজে লেখালেখি শুরুই করেছিলাম অর্থনীতির যে বিষয়গুলো সাধারণ অর্থে
জনমানুষের কাছে কঠিন বলে দাবি করা হয় সেগুলো সহজভাবে উপস্থাপনের দায় থেকে। বাংলায় অর্থনীতি
লিখতে শুরু করি ১৯৭২ সালে। তখন লিখতাম দৈনিক পূর্বদেশ, দৈনিক বাংলা ও ইত্তেফাকে। ৫০
বছরেরও আগে শুরু করেছিলাম এই ধাঁচের লেখালেখি। এর পর থেকে সব সময়ই চেষ্টা করে যাচ্ছি
আরও সহজ করে কীভাবে অর্থনীতিকে সবার কাছে তুলে ধরা যায়। তাই ‘সহজ কথায় অর্থনীতি’ শিরোনামের
গ্রন্থটি আমাকে বিশেষ অনুপ্রাণিত করেছে।
মাইক্রো ও ম্যাক্রো-অর্থনীতির মৌলিক বিষয়গুলো উদাহরণ দিয়ে সহজ ভাষায়
এ গ্রন্থের বিভিন্ন অধ্যায়ে তুলে ধরেছেন লেখক বিরূপাক্ষ পাল। সেটিই প্রত্যাশিত। অর্থশাস্ত্র
হিসেবে একটি একাডেমিক ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে চান এমন যে-কেউ এ সহজ ভাষার বর্ণনা থেকে
উপকৃত হবেন নিঃসন্দেহে। আর সেই বর্ণনায় যদি থাকে রম্য লেখকের মুনশিয়ানা, যদি থাকে জীবন
থেকে নেওয়া উদাহরণ তাহলে তা যে সুখপাঠ্য হবে সে কথা মানতেই হবে।
তবে আমার কাছে, বিশেষ করে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে
বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে এ বইয়ে দ্রব্যবাজার, মুদ্রাবাজার এবং শ্রমবাজার আর এ তিন
বাজারের সম্মিলন নিয়ে লেখকের বিশ্লেষণ। বৃহত্তর জনপরিসরে এ তিন বাজারের আন্তঃসম্পর্ক
এবং আন্তঃনির্ভরশীলতা কমই আলোচিত হতে দেখি। আর এ মুহূর্তে নিত্যপণ্যের বাজার যেমন
‘উথাল-পাথাল’ হয়ে গেছে তাতে এ বইটি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
পত্রপত্রিকার লেখালেখিতে আমরা যে নীতি-প্রস্তাব বা ইকোনমিক মডেলিং-সংশ্লিষ্ট
পরামর্শ দিয়ে থাকি সেগুলো যথাযথভাবে অনুধাবন করতে এ তিন বাজারের ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া
সম্পর্কে একটি একাডেমিক বোঝাপড়া থাকা খুবই দরকার। সে বিচারে এ গ্রন্থের গভীরতর পাঠ
অর্থনীতি বিষয়ক লেখালেখি বোঝার ক্ষেত্রেও এক ধরনের নির্দেশক ভূমিকা পালন করতে পারে
বলে আমার মনে হয়।
তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত কলেবরে হলেও অর্থনীতিতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের
ভূমিকাগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে এ বইটিতে। এটা শুধু অর্থনীতির ছাত্রদের জন্য
নয়, বরং সবার জন্যই দরকারি। কেন দরকারি মনে করছি তার একটা ব্যাখ্যা দিতে চাই। কদিন
আগেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকেও এমন কথাই বলেছি। রিজার্ভ
ক্ষয় রোধ কিংবা মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে আমাদের নীতিনির্ধারকরা প্রায়ই এমন উদ্যোগ/পদক্ষেপ
গ্রহণ করেন, যেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে নিত্যদিনের জীবনে কিছুটা বিরূপ প্রভাব ফেললেও দীর্ঘমেয়াদে
অর্থনীতির সুরক্ষা নিশ্চিত করে। কিন্তু সবাই এই মুহূর্তের মুশকিল আসান করতে আগ্রহী।
ভবিষ্যতে এ কারণে যে আরও বড় মুশকিলের উৎস তৈরি হতে পারে তা বুঝতে চান না। বোঝানোর
উদ্যোগও নেওয়া হয় না।
কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের তাই অনুরোধ করেছিলাম এই আপাতদৃষ্টিতে
কঠিন পদক্ষেপগুলো যে দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের স্বার্থেই নেওয়া হচ্ছে, তা বৃহত্তর জনগণকে
বোঝাতে যেন শক্তিশালী কমিউনিকেশন অভিযান অব্যাহত রাখা হয়। এতে মানুষের ভুল বোঝার আশঙ্কা
কমবে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতেই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা অর্থনীতির অন্য নীতিনির্ধারকদের
তরফ থেকে আমরা আরও গণমুখী কমিউনিকেশন দেখতে পাব। তবে এর বিপরীত ভাবনাও চলমান আছে। কেউ
কেউ মনে করেন এসব বিষয় বেশি খোলাসা করলে ‘স্পেকুলেশন’ বা গুজব বাড়বে।
এ আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতি বা বিনিময় হারে ‘প্রত্যাশা’ বা ‘এক্সপেকটেশন’ জনমনে গেড়ে
বসতে দেওয়া যাবে না। তাই নীতিনির্ধারকদের খানিকটা হলেও আগাম ‘নীতিনির্দেশনা’ তথা ‘ফরোয়ার্ড
গাইডেন্স’ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আর সাহস করে তা দিয়ে যেতে হবে।
তবে একই সঙ্গে ডিমান্ড সাইডের অংশীজন যারা অর্থাৎ যারা গ্রাহক তাদের
নিজেদেরও অর্থনীতি সম্পর্কে বোঝাপাড়া জোরদার হওয়া চাই। সেজন্যই কোনো সামষ্টিক অর্থনৈতিক
সিদ্ধান্ত কোন্ উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়ে থাকে সে সম্পর্কে তাদের একটা ধারণা থাকা দরকার।
আর এজন্যই অর্থশাস্ত্র বিষয়ক আলাপে এ বিষয়গুলো বেশি বেশি করে আশা উচিত। বিরূপাক্ষ পালের
এ গ্রন্থে সে চেষ্টা প্রশংসনীয় মাত্রায় হাজির আছে বলে মনে করি।
এই নতুন সময়ে অর্থনীতির চর্চা হতে হবে আরও বেশি সম্মুখমুখী, প্রযুক্তিনির্ভর,
পরিবেশবান্ধব, গণমুখী ও অংশগ্রহণমূলক। সব অংশীজনকে সেই চর্চায় যুক্ত করার জন্য সহজ
ভাষায় অর্থনীতির তত্ত্বগুলোর উপস্থাপন অপরিহার্য। সে কাজে একটি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে
বিরূপাক্ষ পালের ‘সহজ কথায় অর্থনীতি’ গ্রন্থটি।
নীতিনির্ধারকদের জন্যও বইটি খুবই দরকারি হবে বলে আমার বিশ্বাস।
তাই গ্রন্থটি রচনার জন্য বিরূপাক্ষ পালের আন্তরিক ধন্যবাদ প্রাপ্য।
আমি আশা করব সহজ ভাষায় লেখালেখির এ ধারাটি বেগবান রাখতে লেখক বিরূপাক্ষ পাল সদাসচেষ্ট
থাকবেন এবং তাকে দেখে আরও তরুণ লেখকরা একই পথে এগোবেন। যদিও ‘সহজ কথা যায় না বলা সহজে’, তবু আমাদের
নিরন্তর চেষ্টা করে যেতে হবে অর্থনীতি আরও সহজ ও সাবলীল ভাষায় প্রকাশের।