ভ্রমণ
মঈনুস সুলতান
প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০২৩ ২২:৫৭ পিএম
আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২৩ ১৫:১৫ পিএম
স্কোপিয়ার মেসিডোনিয়া স্কয়ার। ছবি: লেখক
মেসিডোনিয়ার রাজধানী শহর স্কোপিয়ায় আছে রকমারি বিপণিবিতান ও চমকপ্রদ
সব ক্যাফে। এখানে আমি একটি প্রকল্প পরিচালনা করতে এসেছি, কিন্তু হাতে কাজের চাপ কম।
তাই প্রতিদিনের খানিকটা সময় কোনো না কোনো ক্যাফেতে বসে কাটাচ্ছি; এবং বিচিত্র সব ক্যাফে
খুঁজে পেতে সহায়তা করছে এখানকার একটি মেয়ে এইমি এলরিম। অষ্টাদশী এইমি মূলত সংগীতশিল্পী,
তবে ড্রাগসে আসক্তির কারণে তার গানবাজনার ক্যারিয়ার যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনা একাডেমিকভাবে
পড়াশোনার জগৎ থেকেও সে দলছুট হয়ে ঝরে পড়েছে। মেয়েটির ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা আমাকে ইমপ্রেস
করেছে, এবং মাঝেমধ্যে আমি ব্যক্তিগত প্রয়োজনে তাকে দোভাষী হিসেবে ব্যবহার করছি। আজ
এইমি তার এক সুইটহার্ট বা পুরুষ-স্তাবকের কাছ থেকে গিফ্ট কার্ড পেয়েছে। সে কাছাকাছি
একটি বিপণিবিতানে শপিং করতে চায়। দুপুর ১২টা বাজতে চলল, তবে সরণিতে রোদ তেমন চড়া নয়,
উইকেন্ড চলছে, তাই ট্র্যাফিক-জ্যাম বলেও কিছু চোখে পড়ে না। আমরা পয়দলে পথ চলি। এইমি
যেন দারুণ উচ্ছ্বাসে কল্পনায় রীতিমতো দড়ি-স্কিপ করতে করতে হাঁটছে। ‘হেই, ইউ সিমস্ আলট্রা
হ্যাপি টু-ডে- এইমি।’ দাঁড়িয়ে পড়ে ভারি সুন্দর করে হেসে
সে বলে, ‘ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড স্ক্রিনিং আমাকে ক্যানসার থেকে ক্লিয়ার করে দিয়েছে।’
আমরা ফের হাঁটতে শুরু করি, কিন্তু মন থেকে মাত্র মুহূর্তে কয়েক আগে
দেখা এইমির মুখের অভিব্যক্তি মুছতে পারি না। মনে হয়, নিকট-অতীতে আমি অন্য একটি তরুণীর
মুখেও অবিকল এ রকম অভিব্যক্তি দেখেছি। ঝিক করে স্মৃতি ফিরে আসে করোটিতে। সামান্য কিছু
কাজে গিয়েছিলাম, আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলের দেশ মালাওয়িতে। আমার পরিচিত এক মার্কিন মহিলা
মাউন্ট-মুলানজির পাদদেশে পাড়াগাঁয়ের দুস্থ নারীদের জন্য চালাচ্ছিলেন ক্যানসার স্ক্রিনিং
ক্লিনিক। তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে মাত্র দুই রাত ছিলাম ওখানে। প্রতিদিন ক্লিনিকে
আসত ব্রেস্ট ও সারভিক্যাল ক্যানসারের ফ্রি স্ক্রিনিংয়ের জন্য গ্রামের তরুণীরা।
আমার পরিচিত মার্কিন মহিলাটির অফিসে বসে ছিলাম। স্ক্রিনিংয়ে ক্লিয়ারেন্সের
সুন্দর সংবাদটি পাওয়ার পর পিঠে গামছায় বাঁধা ছটফটে শিশু নিয়ে একটি কৃষ্ণাঙ্গ নারী পর্দা
ঠেলে ঢুকে পড়েছিলেন। যুবতী মা-টির প্রায় নৃত্যরতা দেহ থেকে যেন সুসংবাদজনিত আনন্দ উপচে
উঠছে। তাকে অভিনন্দন জানাতে ক্লিনিকে কাজ করা আমার চেনা মার্কিন মহিলাটির সঙ্গে আমিও
শামিল হয়েছিলাম। আমার অভিনন্দনকে তিনি স্থানীয় ভাষায় তরজমা করে দিয়েছিলেন। কৃষ্ণাঙ্গ
নারীটি খুশি হয়ে পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত তার গ্রামে যেতেও আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
কৃষ্ণাঙ্গ মহিলার নাম যতটা মনে পড়ে, চিমওয়ালা আবিকানিলে, গ্রামটির
নাম সম্ভবত চিকওয়াওয়া। এই নারীর তালাশে আমি কখনও তার জনপদে যাইনি, তবে আমাদের গুডবাই
বলার সময় তার মুখে যেন জলে ডুবতে বসে ভেসে পাড়ে উঠেছেন এ রকম অভিব্যক্তিটি আমার মনের
মণিকোঠায় অদৃশ্য বর্ণে আঁকা হয়ে গিয়েছিল। আজ, এ মুহূর্ত কয়েক আগে, এইমির মুখমণ্ডলেও
আমি একই রকম অভিব্যক্তি পর্যবেক্ষণ করলাম। তবে কি দেশ-জাতি, গাত্রবর্ণ ও সাংস্কৃতিক
তফাত সত্ত্বেও কিছু কিছু বিষয়ে দুনিয়ার সব মানুষে প্রতিক্রিয়া অভিন্ন, সবার মুখমণ্ডলে
ফোটে একই ধরনের অভিব্যক্তি?
স্মৃতিচারণার তোড়ে আমার চলার গতি স্লো হয়ে গিয়েছিল। এইমি কাঁধে মৃদু
ধাক্কা দিয়ে অনুনাসিক স্বরে বলে ওঠে, ‘কাম অন ম্যান... উই নিড টু মুভ অ্যালং-।’
জোরেশোরে পা চালিয়ে আমরা গলিপথে মোড় ফিরি। ফুটপাতে হোমলেস মহিলাটিকে
দেখতে পেয়ে আমি দাঁড়িয়ে পড়ে তার দিকে তাকাই। মানুষটি বেজায় নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বেডরোলের
ওপর বসে আছেন। আবহাওয়ায় দুপুরের উষ্ণতা প্রচুর। কিন্তু মহিলা এ গরমেও পরে আছেন মাফলারসুদ্ধ
শীতবস্ত্র। তার সামনে ফুটপাতে রাখা যথাসর্বস্ব ব্যাগটি।
মাত্র দুই দিন আগে প্রকল্পের ইন্টাপ্রেটারের সঙ্গে আমি ফুটপাতে ঘুরতে
বেরিয়েছিলাম। তখন এই মহিলার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে আমি কথা বলতে চেষ্টা করেছি, হাসিমুখে
একটি-দুটি প্রশ্নের জবাবও তিনি দিয়েছিলেন। তার আদিনিবাস রোমানিয়ার একটি ছোট্ট শহর আলবা
লুলিয়ায়। আমি ফুডকার্ট থেকে চিজ-ব্রেড ও কোল্ড ড্রিংকস্ কিনে এনে তাকে অফার করেছিলাম।
রুটির গন্ধে উড়ে এসে তার কাঁধে বসেছিল একটি ছোট্ট পাখি। তিনি রুটি নিজ মুখে না তুলে
টুকরো ভেঙে পাখিটিকে খাওয়াচ্ছিলেন।
আমার কৌতূহল ছিল প্রচুর, জানতে চেয়েছিলাম কেন স্কোপিয়ায় এসেছেন, আলবা
লুলিয়া শহরে আত্মীয়স্বজন কেউ আছে কি? প্রকল্পের ইন্টারপ্রেটার রোমানিয়ান বোঝে অতি অল্প,
তবে মহিলা রুশ ভাষায় টুকটাক জবাব দিচ্ছেন, তাই সে র্যাশানে আমার প্রশ্নগুলো তরজমা
করে। তিনি ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকালে আমি ৫ ইউরোর নোট বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিলাম, নিজের
সম্পর্কে কিঞ্চিত তথ্য দিলে আমি বড্ড উপকৃত হই। মহিলা খাবার ফিরিয়ে দিয়ে রুশি ভাষায়
বলেছিলেন, ‘উখোডিতা’, বা ‘গোল্লায় যাও’।
এইমির ইশারায় একটি ট্যাক্সি-ক্যাব দাঁড়িয়ে পড়েছে। সে আমার কবজি টিপে
ধরে ‘কামঅন’ বললে আমি চুপচাপ উঠে পড়ি ক্যাবে। মহিলার পাশ দিয়ে স্পিড
তুলে যাওয়ার সময় কেবলই মনে হয়, মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা বলার কিছু অলিখিত নিয়ম আছে,
দুই দিন আগে আমি তা ভেঙেছি, উচিত তার কাছে ফিরে গিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করা, আজ বোধ করি
এ সুযোগও হারালাম।
স্কোপিয়া সিটি-মলের কর্নারে ট্যাক্সি আমাদের ড্রপ করে দেয়। এ শপিং
কমপ্লেক্সের সুনাম আছে, কিন্তু আমার কেনাকাটার দরকার নেই, তাই এখানে কখনও আসা হয়নি।
সিঁড়ি বয়ে উঠতে উঠতে ভারি আহ্লাদি ভঙ্গিতে এইমি গ্রীবা বাঁকিয়ে তার গিফ্ট কার্ডটি দেখায়।
আমার সর্বস্বান্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই বুঝতে পেরে প্রীত হই।
এসকেলেটরের গোড়ায় কাচের ছাউনি দেওয়া খোলামেলা পরিসর। দেখি, ওখানে
রেলিং ধরে রীতিমতো হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে জনা ছয়েক সঙ!
খানিক দূরে দাঁড়ানো বো-টাই পরা ধোপদুরস্ত টেকো মানুষটির দিকে তাকাই।
তাকে দেখে ইতালির ফ্যাসিবাদী ডিক্টেটর মুসোলিনির কথা মনে পড়ে যায়। তিনি কেইস থেকে ভায়োলিনটি
বের করে তাতে করুণ সুর বাজান। বিষণ্ন সেরেনাদ শুনে মন খারাপ হওয়ার উপক্রম হয়, মনে হয়
বেহালাবাদক মশাই শ্বশুরের সম্ভাব্য অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানে বাজানোর অনুশীলন করছেন।
ভাবি, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আরেকটু শুনি, কিন্তু এইমি কবজি খামচে ধরে আওয়াজ দেয়, ‘কামঅন
ম্যান, গেট গোয়িং।’
অষ্টাদশী সঙ্গীর প্ররোচনায় এরপর তরুণীদের পোশাক-আশাকের বিষয়ে প্রসিদ্ধ
যে দোকানটিতে এসে ঢুকি, তা আকৃতিতে ঘোড়ার নালের মতো, মানের নিরিখে বলা চলে ‘হাই এন্ড
বুটিক’, এখানকার পরিবেশ শুধু ক্রেতাবান্ধবই নয়, আলো-আঁধারিতে
ছড়াচ্ছে রীতিমতো ডিস্কো পারলারের উদ্দীপনাও। বুটিকটির নাম ‘ডাবেস তি ইডেন’, আমি খটোমটো
শব্দবন্ধটির ইংরেজি তরজমার জন্য এইমির সাহায্য প্রার্থনা করি। জবাব আসে, ‘টোয়েনটি ওয়ান’, সঙ্গে ব্যাখ্যা
হিসেবে সে যোগ করে, পোশাকের ডিজাইনে এরা নাকি সৃষ্টি করে দেহবল্লরীতে আবৃতি ও অনাবৃতির
দোলাচল, বয়স বিগতভাবে বৃদ্ধি পেলেও নারীদের দেখাবে তামাম জিন্দেগিভর ২১ বছরের তরুণীর
মতো।
নামকরণের প্রতীকটি বুঝতে পেরে প্রীত হই, কিন্তু মুখ থেকে ফস করে বেরিয়ে
যায়, ‘ইউ আর অনলি এইটিন, এইমি!’ কপট ভ্রুকুটি করে সে প্রতিক্রিয়া জানায়, ‘গোয়িং নাইনটিন...
আমি আজ যা কিনতে যাচ্ছি, আমি উইল শো ইউ হাউ সার্টেন ডিজাইন ট্রান্সফর্মস্ ইয়োর লুক।’
পোশাকে পরিবর্তিত এইমির দেহবল্লরী চাক্ষুষ করার প্রত্যাশা নিয়ে আমি
দুই কদম সামনে এগোই। বুটিকের চৌকাঠ অতিক্রম করতেই বুটজুতা পরা, জিন্সের পায়া গোটানো
ব্লন্ড-চুলো জোড়া মেনিকিনের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। অবলোকনে মনে হয়, হালফ্যাশনের দুটি তরুণীর
পুতুল-প্রতীক কফিটেবিল-বুকের চিত্রিত পৃষ্ঠাটি ছেড়ে এসে দাঁড়িয়েছে বুটিকের দোরগোড়ায়।
উল্টো দিকের সুপরিসর স্পেসে দেয়ালের কিনারঘেঁষে তৈরি হয়েছে স্টেজ।
আমি দাঁড়িয়ে পড়ে একজনের কোঁচকানো কপাল স্টাডি করি। অভিব্যক্তিতে মনে হয়, স্কুলে তার
সন্তান মারাত্মক কোনো উৎপাত করেছে, তাই তাকে ডেকে আনা হয়েছে, ভদ্রলোক বেজায় টেনশন নিয়ে
প্রিন্সিপালের দরোজার সামনের লবিতে বসে আছেন। বাহারে সামার-স্যুট পরা অন্য ভদ্রলোককে
আর স্টাডি করতে হয় না, একনজর তাকিয়েই বুঝতে পারি, ক্রেডিট কার্ডে আজ যে ওভার ড্রাফ্ট
হবে, এ বাবদে তিনি মনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আমি এবার মডেল মেয়েটির দিকে দৃষ্টি ফেরাই, সে রঙিন বস্ত্রখণ্ডে নিম্নাঙ্গ
আড়াল করে কীভাবে সৈকতে বিকিনি বদলে কোমরে জড়াতে হয় বাটিকের র্যাপ, তা দেখাচ্ছে। এইমি
বিরক্তি হয়ে বলে, ‘হার বুবস্ আর অল ফেইক, নাথিং রিয়েল অ্যাবাউট দিস গার্ল, হার বাটস্
আর অলসো এনহান্সড উইথ প্যাডস্।’ বুঝতে পারি, মেয়েটির কিছু অঙ্গপ্রত্যঙ্গ
কৃত্রিম, তবে আসল হলেই বা আমার কী?
থিয়েটারের স্টেজ থেকে বছর পাঁচেক আগে অবসর পেয়েছেন, এ রকম মুখে প্রচুর
মেকআপ পরা সাবেক অ্যাকট্রেস গোছের এক মহিলা এসে আমাদের ওয়েলকাম করেন। এইমিকে লোকেশন
বাতলে দিয়ে তিনি পরিষ্কার ইংরেজিতে আমাকে বলেন, ‘জেন্টলম্যান, ইউ লুক অ্যা বিট হট,
লেটস মি গেট ইউ অ্যা রিফ্রেশিং ড্রিংক ।’
কাটগ্লাসে আমাকে বরফকুচি দেওয়া পানীয় সরবরাহ করা হয়। জানতে পারি,
কোক মেশানো রেড ওয়াইনের রিফ্রেশিং ককটেলটির নাম বামবুস, এক চুমুক পানেই অনুভব করি,
পুরো গেলাস সাবাড় করলে ক্রেডিটকার্ড বাবদে হুঁশ ঠিক রাখা কঠিন হবে।
এদিক-ওদিক তাকিয়ে আমি ড্রেসিং-খুপরির ওপর দিয়ে এইমির থুপি থুপি চুল
শনাক্ত করি। মনে হয় সে পরে নিচ্ছে জংলাছিটের একটি টপ। একটু পর বেরিয়ে আসে মেয়েটি, বাটিক
কিংবা অন্য কোনো সফ্ট ম্যাটেরিয়ালে তৈরি খাটো ঝুলের টপের সঙ্গে মিনি স্কার্ট পরে। পোশাক
দুটির জমিনে সবুজাভ শেডে বনানীর মোটিফ আঁকা। আয়নার সামনে দাঁড়ায় সে, আমি প্রতিফলনে
চোখ রাখি, তার বাহু, মিডরিফ্ট ও কণ্ঠার নিচের অনাবৃতি গাছপালা ফাঁকফোকরে ফুটে থাকা
মেঘভাসা আকাশের মতো দেখায়। কিন্তু ঠোঁটের এক ভঙ্গিতে পোশাকটি বাতিল করে দিয়ে এইমি
ভিন্ন কোনো পোশাক সিলেক্ট করার উদ্যোগ নেয়।
বনানীর মোটিফ আঁকা বস্ত্রটি আমার চোখে ছড়িয়েছিল প্রকৃতিনিবিড় সিগ্ধতা,
সচেতন হই যে, এ ব্যাপারে নৈর্ব্যক্তিক থাকার প্রয়োজন আছে আমার। আমি মন অন্য দিকে সরিয়ে
নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। এইমি প্রচুর সময় নিচ্ছে, ভাবি, ফিরে যাব মডেল মেয়েটির ডিসপ্লে
মঞ্চের সামনে। কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উপস্থাপনায় ততক্ষণে আমি উৎসাহ হারিয়েছি।
এক পা-দুই পা করে চলে আসি, ঘোড়ার নালের আকৃতির বুটিকের প্রান্তিকে।
এদিককার দেয়ালে বিরাট একটি ছবিতে ঝুলছে বাঁশবেতে বোনা মাদুর। তা ঘেঁষে বিরাট আকৃতির
ডিজাইনার পার্স হাতে পোজ দিচ্ছে একটি মডেল কন্যা। আমি খুঁটিয়ে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের
সামঞ্জস্য ও ত্বকের মসৃণতা পরীক্ষা করি। মনে হয়, লিটারেচারে যাকে আইডিয়াল বিউটি বলা
হয়, এ নারী সম্ভবত তার প্রতিনিধি। আমার বিশ্লেষণী মন যেসব নারীর সান্নিধ্যে আমার দিন
কাটে, তাদের সঙ্গে এর তফাতটুকু খোঁজে। কিন্তু বেশিক্ষণ এইমির সঙ্গ-বলয় থেকে দূরে থাকা
যায় না। দারুণ খাটো ঝুলের একটি শর্টসের সঙ্গে বিভাজন উন্মোচিত ট্যাংকটপ পরে সে আমার
কাছে এসে দাঁড়ায়।
উল্টো দিকে লাইফসাইজ আয়না আছে একাধিক। প্রতিফলনে ফুটছে বস্ত্রের চেয়েও
অনেক বেশি অনাবৃতি, নানা অ্যাঙ্গেল থেকে একত্রে আরশিগুলোয় ভেসে উঠেছে এইমির দেহবল্লরী।
শরীরের ঊর্মিময় কার্ভে মিশে গিয়ে ত্বকের পিংকিস্ আভা যেন তৈরি করছে রূপের যুগলবন্দি।
গ্রীবা বাঁকিয়ে সে জানতে চায়, ‘অ্যাম আই নট লুকিং সুপার সেক্সি?’
‘আই অ্যাম শিওর ইউ আর’, বলতে গিয়ে আমার দেহপ্রীতির প্রবণতায়
বিব্রত বোধ করি। ডিসপ্লে করা অসংখ্য মেয়েলি পোশাক-আশাকের ভেতর দিয়ে এইমি ছোটাছুটি করে,
ছাদ থেকে ঝুলে থাকা পুতুলদের তলায় হরেক রকমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বারবার দেখে।
তার চলাচলে ফুটে উঠেছে বনানীর ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া দখিনা বাতাসের মতো কান্তিময় চঞ্চলতা।
চেষ্টা করি এ ইমেজটি মনে ধরে রাখতে।
পোশাকাদি খরিদ করা হলে পরও এইমিকে এখান থেকে সহজে টলানো যায় না।
আমার হাতে প্যাকেটটি গছিয়ে দিয়ে সে গিয়ে দাঁড়ায় ডিজাইনার পার্সগুলোর ডিসপ্লে-র্যাকের
সামনে। বিড়ালকে আদর করার মতো বিরাট একটি পার্সের গতরে বারবার হাতও বোলায়। পার্সটির
ডিজাইন চেনা মনে হতেই আমি একটু খেয়াল করে তাকাই, তখনই বুঝতে পারি, একটু আগে মাদুরের
প্রেক্ষাপটে শর্টস্ পরে বসে থাকা সুপার-মডেল মেয়েটির ছবিতে এ রকম একটি পার্স আমি চাক্ষুষ
করেছি। আড়চোখে দেখে নিই মূল্য লেখা লেভেলটি। অন্য কিছু কিনলে বিশ পার্সেন্ট ছাড় দেওয়া
হচ্ছে, তার পরও ভ্যানিটি ব্যাগটির মূল্য ছাড়িয়ে যায় ২০০ ইউরো। খানিক অধৈর্য হয়ে বলেই
ফেলি, ‘আই অ্যাম হ্যাংরি এইমি... এটা কিনতে হলে কিনে ফেলো, তারপর শপিং মল থেকে বেরোতে
হয় যে।’
আমার দিকে কাতরদৃষ্টিতে একটু সময় তাকিয়ে থেকে অন্যমনস্কভাবে সে জানায়,
‘আই জাস্ট বার্ন মাই গিফ্ট কার্ড, সবকিছুই তো খরচ হয়ে গেছে।’
আমি কথা না বাড়িয়ে নির্লিপ্তভাবে সামনে বাড়ি। আমার বাহুসংলগ্ন হয়ে
হাঁটতে হাঁটতে অসতর্কভাবে সে মন্তব্য করে, ‘মাই প্রিন্স চার্মিং লাভস্ টু সি মি ইন
শর্টস্ অ্যান্ড ট্যাংকটপ, বাট হি ডিডন্ট পুট এনাফ মানি টু বাই বোথ ক্লোদিং অ্যান্ড
দ্য পার্স,’ বলেই সে লাজুকভাব হেসে জানায়, ‘হি অ্যাপ্রিসিয়েট মাই ফিগার সো মাচ।’
ঠাট্টা করে বলি, ‘ইউ আর টকিং অ্যাবাউট ইয়োর সুইটহার্ট রাইট? ইজ হি
এনি গুড,’ বলে ভ্রূপল্লবের ইঙ্গিতময় ভঙ্গিতে বলি, ‘ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড হোয়াট আই মিন?’
দুই চোখে কৌতুক ফুটিয়ে সে জবাব দেয়, ‘হি ইজ নাইস, ভেরি নাইস লাভস্
মি ট্রুলি, বাট নট রিয়েলি অ্যা ফিজিক্যাল টাইপ,’ বলেই সে ঘাড় বাঁকিয়ে গাঢ় দৃষ্টিতে
আমার দিকে তাকায়, আর তার মুখে ছড়িয়ে পড়ে অস্বস্তিকর অভিব্যক্তি।
আমি প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য বলি, ‘এইমি, আই অ্যাম হ্যাংরি, লেটস্
গেট দ্য হেল আউট অব হিয়ার।’নীরবে আমরা হেঁটে বেরিয়ে আসি চলমান
রাজপথে।