নাসির আহমেদ
প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২৩ ২২:৩১ পিএম
আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনিবার্য নাম জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪)।
অনিবার্য এ কারণে, রবীন্দ্রোত্তর আধুনিক কাব্যধারায় জীবনানন্দ দাশই পরবর্তীকালের কবিদের
সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছেন।
জীবনানন্দের আধুনিকতা এবং তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব উপলব্ধি করতে হলে
আমাদের তাকাতে হবে কম করে হলেও বাংলা কবিতার গত ১০০ বছরের বিবর্তনের দিকে। রবীন্দ্রোত্তর
বাংলা কবিতায় যে নতুন যুগের স্রষ্টা কবিকুল, তাদের পুরোভাগে রয়েছেন স্বকালে সবচেয়ে
নিভৃতচারী, অসম্ভব লাজুক জীবনানন্দ দাশ। জীবনানন্দ দাশের মা কবি কুসুমকুমারী দাশ প্রায়
শতাব্দীকাল আগে লিখেছিলেন : ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/কথায় না বড় হয়ে কাজে
বড় হবে’। পুত্র চিরলাজুক জীবনানন্দ দাশের ক্ষেত্রে সে কথাই যেন
অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়েছিল। মিতভাষী, অন্তর্মুখী এবং নির্জনতাপ্রিয় কবি জীবনানন্দ
দাশ কবি হিসেবে এতটাই উচ্চতায় নিজেকে অধিষ্ঠিত করে গেছেন, যা তার সমকালে কবি সম্পাদক
বুদ্ধদেব বসু ছাড়া কেউ ভাবতেও পারেননি। অথচ মৃত্যুর (২২ অক্টোবর, ১৯৫৪) মাত্র দুই
দশকের মধ্যেই জীবনানন্দ আর কবিতা প্রায় সমার্থক শব্দ হয়েছে। অনেক সময় মনে হয় তিনি
যেন বাংলা কবিতার অনিবার্য অভিধান। কারণ তাকে না জানলে, না পড়লে বাংলা কবিতার আধুনিকতার
স্বরূপ সম্পূর্ণ বোঝা যায় না।
ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র এবং কর্মজীবনে কলেজশিক্ষক জীবনানন্দ বিশ শতকের
ইংরেজ ও ফরাসি কবিদের কী গভীর অভিনিবেশে পাঠ করেছিলেন, তার কবিতা পড়লে সচেতন পাঠকমাত্রই
উপলব্ধি করতে পারেন। বাংলা কবিতায় পরাবাস্তববাদের পথিকৃৎ বলা যায় তাকে।
উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে বিশ্বজুড়ে আধুনিক কাব্যের যে নবযাত্রা,
সেই নতুন কাব্যধারায় স্নাত হয়ে তিনি পশ্চিমা আধুনিকতার বহু উপকরণ গ্রহণ করে বাংলা
কবিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে দিয়েছেন। তার পরও জীবনানন্দ দাশ ছিলেন অস্থিমজ্জায়
বাঙালি। তিনি বাংলার কবি, বাঙালির কবি এবং সেই বাঙালি, যিনি বাংলার প্রকৃতির রূপমুগ্ধতায়
আজীবন আচ্ছন্ন ছিলেন।
বাংলাদেশের কৃষক-শ্রমিক থেকে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ তার কবিতায়
ছড়িয়ে আছে। বাংলার শরৎ, হেমন্ত ও শীতের সমস্ত শস্যের বিবরণ নানান প্রতীকে চিত্রিত
হয়েছে তার কবিতায়। ধান কাটার পরের শূন্যমাঠ, খড়, ঘাস-বিচালি, লক্ষ্মীপ্যাঁচা, ইঁদুর,
দোয়েল, বক, শালিক, চড়ুই, টিয়েসহ বাংলার যত পাখির কলস্বর, ফুল-ফসলের গন্ধ ছড়িয়ে
আছে তার কবিতায়। এক কথায় বললে গোটা বাংলাদেশই বেজে উঠেছে তার কবিতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
এখানেই তার সার্থকতা এবং কৃতিত্বও। সে আলোচনায় যাওয়ার আগে এক পলকে দেখে নেওয়া যেতে
পারে কবিতার আধুনিকায়নের চিত্রটি।
শিল্পসাহিত্যে আধুনিকতার সূত্রপাত মূলত উনিশ শতকের মধ্যভাগে ফ্রান্সে
(১৮৫৭)। ফরাসি কাব্য ও চিত্রকলায় ইমপ্রেসনিজম, এক্সপ্রেসনিজম, প্রতীকবাদ, চিত্রকল্পবাদ,
পরাবাস্তববাদের যে সূচনা; সেই পথ ধরে বিশ শতকের প্রথম ভাগেই (১৯১৪) দুটি ধারা বিস্তৃত
হয় বিশ্বসাহিত্যে। একটি ইঙ্গ-মার্কিন আধুনিকতা, অন্যটি আইরিশ আধুনিকতা। এর মধ্যে সাহিত্যে
প্রবলভাবে বিস্তৃত হয় প্রতীকবাদ, পরাবাস্তববাদ, চিত্রকল্পবাদ এবং প্রবলভাবে নাগরিক
নৈঃসঙ্গ্যের চেতনা, যা কৃত্রিম নাগরিক যন্ত্রণার সৃষ্টি করে। ভাষাভঙ্গিরও ব্যাপক পরিবর্তন
শুরু হয়। আধুনিকতা বিকাশের কালপরিসর উল্লেখ করে কবি-প্রাবন্ধিক আবিদ আনোয়ার তার
‘বাংলা কবিতার আধুনিকায়ন’ গ্রন্থে ছক কেটে বিস্তারিত দেখিয়েছেন
এই আধুনিকতার স্বরূপ এবং বাংলা কবিতায় তা কীভাবে প্রবেশ করেছে। তাতে আমরা সহজেই বাংলা
কবিতার তিরিশি আধুনিকায়নের একটি রূপরেখা পেয়ে যাই।
জীবনানন্দ দাশের কবিতার মূল্যায়ন করতে গেলে ইঙ্গ-ফরাসি ও স্প্যানিশ
নতুন কাব্যধরার প্রভাব ও পরিণতি আমাদের মনে রাখতে হয়। তার যে কাব্যভাষা তা বাংলা কবিতায়
নতুন যুগের সূচনা করেছে। তার কাব্যভাষায় এবং বাকরীতি বা ডিকশন বিশ শতকের চল্লিশ ও
পঞ্চাশের দশকের কবিদের শুধু নয়, বিপুলভাবে আকৃষ্ট করেছে ষাট-সত্তর দশকের এমনকি তারও
পরবর্তীকালের অর্থাৎ নিকট অতীতের কবিদের পর্যন্ত।
যদিও জীবনানন্দ দাশের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’ (১৯২৭)-এর
কোনো কোনো কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষাভঙ্গি এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাজী নজরুল
ইসলামের কবিতার ডিকশন প্রবলভাবে লক্ষণীয়। আঙ্গিক-প্রকরণ এবং শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও
জীবনানন্দ দাশ নজরুল দ্বারা অনেকখানি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।
যেমন নাম কবিতা ঝরা পালকের ভাষা এবং আঙ্গিকে দেখি :
আমি কবিÑ সেই কবিÑ/আকাশে কাতর আঁখি তুলি হেরি ঝরা পালকের ছবি!/আনমনা
আমি চেয়ে থাকি দূর হিঙ্গল-মেঘের পানে!/মৌন নীলের ইশারায় কোন কামনা জাগিছে প্রাণে!...
বইয়ের তৃতীয় কবিতা ‘নব নবীনের লাগি’ থেকে একটুখানি
উদাহরণ :
Ñনব নবীনের লাগি/প্রদীপ ধরিয়া আঁধারের বুকে আমরা রয়েছি জাগি/
ব্যর্থ পঙ্গু খর্ব প্রাণের বিকল শাসন ভেঙে/
নব আকাঙ্ক্ষা আশার স্বপনে হৃদয় মোদের রেঙে,/
দেবতার দ্বারে নবীন বিধানÑ নতুন ভিক্ষা মেগে/
দাঁড়ায়েছি মোরা তরুণ প্রাণের অরুণের অনুরাগী!/
গাহি মানবের জয়!/
কোটি কোটি বুকে কোটি ভগবান আঁখি মেলে জেগে রয়!/
সবার প্রাণের অশ্রু-বেদনা মোদের বক্ষে লাগে,/
কোটি বুকে কোটি দেউটি জ্বলিছেÑ কোটি কোটি শিখা জাগে,...
এ ছোট্ট দুটি উদ্ধৃতি থেকেই পরিষ্কার বোঝা যায় কাজী নজরুল ইসলাম
বিপুলভাবে তার কবিমানসে প্রভাব ফেলেছিলেন কাব্যজীবনের শুরুতে। কিন্তু দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ
‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ থেকেই তিনি নিজস্ব কাব্যভাষা তৈরি
করে ফেলেছিলেন, যার সম্পূর্ণ পরিণতি ঘটে বহুল আলোচিত ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থে।
মৌলিক কাব্যভাষার পাশাপাশি জীবনানন্দের কবিতায় বাংলার রূপ-রস-গন্ধ
আর প্রকৃতির উপস্থিতি উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হতে থাকে। বাংলার প্রকৃতি আর নিসর্গের
প্রতি তার যে অনুরাগ, নজরুল-প্রভাবিত হওয়া সত্ত্বেও তার কবিতায় সে নিজস্ব শব্দাবলিও
কিন্তু দুর্লক্ষ্য নয়।
‘জীবনানন্দ দাশের কবিতায় আবহমান বাংলার নিসর্গ-চিত্র
সবচেয়ে বেশি উন্মোচিত হয়েছে যে কাব্যগ্রন্থে তা হচ্ছে ‘রূপসী বাংলা’। কিন্তু জীবদ্দশায়
‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’সহ তাঁর সাতটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হলেও রূপসী বাংলা
ছিল সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত। কবিতাগুলো লেখা হলেও তার কোনো শিরোনাম তিনি যেমন দেননি, এমনকি
পাণ্ডুলিপিও প্রস্তুত করেননি বই প্রকাশের জন্য! তার মৃত্যুর তিন বছর পর ৬২টি কবিতা
নিয়ে কলকাতার সিগনেট প্রেস থেকে ১৯৫৭ সালের আগস্টে প্রকাশিত হয় রূপসী বাংলা। পাণ্ডুলিপি
তৈরি করেছিলেন জীবনানন্দ দাশের ছোটবোন সুচরিতা দাশের সহযোগিতায় জীবনানন্দ-গবেষক ভূমেন্দ্র
গুহ। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন সত্যজিৎ রায়। জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত রূপসী বাংলার
কবিতাগুলো সম্পর্কে কেউ কিছুই জানতেন না।
১৯৫৪ সালে ট্রাম দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়
মৃত্যুর কিছুকাল পর মার্চ ১৯৩৪-এ চিহ্নিত একটি কবিতার খাতা পাওয়া যায়, যেখানে ছিল
কবির নিজ হাতে লেখা ৭০টি শিরোনামহীন, অগ্রন্থিত ও অপ্রকাশিত কবিতা। ওই খাতা থেকে ৬২টি
কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘রূপসী বাংলা’।
ভূমেন্দ্র গুহ প্রতিটি কবিতার প্রথম পঙ্ক্তি থেকে শিরোনাম তৈরি করেন।
বইয়ের প্রথম কবিতা ‘সেই দিন এই মাঠ’ মৃত্যুচেতনা
তাড়িত। কী গভীর বোধ উদ্ভাসিত এ কবিতায়!
‘সেই দিন এই মাঠ স্তব্ধ হবে নাকো জানিÑ
এই নদী নক্ষত্রের তলে/সেদিনো দেখিবে স্বপ্নÑ/
সোনার স্বপ্নের সাধ পৃথিবীতে কবে আর ঝরে!
আমি চ’লে যাব ব’লে/চালতা ফুল
কি আর ভিজিবে না শিশিরের জলে/নরম গন্ধের ঢেউয়ে?/লক্ষ্মীপেঁচা গান গাবে নাকি তার লক্ষ্মীটির
তরে?/সোনার স্বপ্নের সাধ পৃথিবীতে কবে আর ঝরে!
চারিদিকে শান্ত বাতিÑ ভিজে গন্ধÑ মৃদু কলরব;/
খেয়ানৌকাগুলো এসে লেগেছে চরের খুব কাছে/
পৃথিবীর এইসব গল্প বেঁচে র’বে চিরকাল;Ñ
এশিরিয়া ধুলো আজÑ বেবিলন ছাই হ’য়ে আছে।
বাংলা কবিতায় এমন করে বাংলার প্রকৃতি আর পরিবেশ; শিশিরের জলের নরম
গন্ধ কোনো দিন কেউ পাননি! লক্ষ্মীপেঁচার গান, চরের কাছে এসে খেয়ানৌকাগুলো ভেড়ার যে
চিত্রময়তা, বাংলার চালতাফুল শিশিরের জলে ভেজার এমন স্নিগ্ধ কোমল দৃশ্য জীবনানন্দ দাশের
মতো এমন মমতা দিয়ে কেউ আগে কখনও রচনা করেননি। বাংলা কবিতায় বাংলার নিসর্গচিত্রের
এ এক অপূর্ব সংযোজন।
প্রায় একই বয়সের এবং জীবনানন্দ দাশের সমসময়ের কবি জসীমউদ্দীনও
গ্রাম বাংলার জীবন আর প্রকৃতি তার কবিতায় ব্যবহার করেছেন বারবার। কিন্তু দুজনের দেখার
দৃষ্টি এবং জীবনবোধ সৌন্দর্যবোধের ব্যবধান যোজন যোজন। একজন লোকায়ত জীবন ধারণ করেছেন,
অন্যজন ইউরোপীয় আধুনিক কবিতার প্রতীকী কাব্যভাষ্যে চিত্রকল্পময় বাংলার মাটি আর নিসর্গের
জন্য প্রবল আকুতি নিয়ে লিখেছেন :
‘তোমরা যেখানে সাধ চলে যাওÑ আমি এই বাংলার পারে/র’য়ে যাব, দেখিব
কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে;/দেখিব খয়েরি ডানা শালিকের সন্ধ্যায় হিম হ’য়ে আসা/ধবল
রোমের নিচে তাহার হলুদ ঠ্যাং ঘাসে অন্ধকারে,/নেচে চলেÑ একবারÑ দুইবারÑ তারপর হঠাৎ তাহারে/বনের
হিজল গাছ ডাক দিয়ে নিয়ে যায় হৃদয়ের পাশে;/দেখিব মেয়েলি হাত সকরুণ সাদা শাঁখা ধূসর
বাতাসে/শঙ্খের মতন কাঁপে; সন্ধ্যায় দাঁড়ালো সে পুকুরের ধারে,/
খইরঙা হাঁসটিরে নিয়ে যাবে যেন কোন কাহিনীর দেশেÑ/‘পরণ-কথা’র গন্ধ লেগে
আছে যেন তার নরম শরীরে,/কলমীদামের থেকে জন্মেছে সে যেন এই পুকুরের নীড়েÑ/নীরবে পা
ধোয় জলে একবারÑ তারপর দূরে নিরুদ্দেশে/চ’লে যায় কুয়াশায়,
তবু জানি কোনোদিন পৃথিবীর ভিড়ে হারাব না তারে আমিÑ সে যে আছে আমার এ বাংলার তীরে’।
বাংলার প্রকৃতি, বাংলাদেশের ফুল-ফল-ফসল তথা এমন কোনো নৈসর্গিক বস্তু
নেই যা জীবনানন্দ দাশের হৃদয় স্পর্শ করেনি। বাংলার লোকজ শব্দ, অতি সাদামাটা শব্দও
কি দুঃসাহসে, কি অসামান্যভাবে ব্যবহার করেছেন তিনি, যা নতুন মাত্রা পেয়েছে বাংলা কবিতায়।
শালিকের পা আমরা ভাবতে পারি কিন্তু শালিকের ঠ্যাং এ কথ্য উচ্চারণ! কম সাহসের নয় এরকম
শব্দ ব্যবহার! রূপসী বাংলায় আঙ্গিকের ক্ষেত্রে একেবারে অন্যরকম জীবনানন্দ দাশ। সনেটের
আঙ্গিক ব্যবহার করেছেন বিশুদ্ধতার সঙ্গে।
অনেক কবিতায় মৃত্যুচেতনাও প্রবলভাবে ফুটে উঠেছে রূপসী বাংলায়। যেমন,
ঘুমায়ে পড়িব আমি, যখন মৃত্যুর ঘুমে, যদি আমি ঝ’রে যাই, যে
শালিখ মরে যায়, তোমার বুকের থেকে... ইত্যাদি অনেক কবিতায় মৃত্যুর বোধ প্রবলভাবে ফুটে
উঠেছে।
‘যেদিন সরিয়া যাব’ শিরোনামের
কবিতায় তিনি যখন লেখেন : যেদিন সরিয়া যাব তোমাদের কাছ থেকেÑ দূর কুয়াশায়/চ’লে যাব, সেদিন
মরণ এসে অন্ধকারে আমার শরীর/ভিক্ষা ক’রে লয়ে যাবে;Ñ
সেদিন দুদণ্ড এই বাংলার তীরÑ/এই নীল বাংলার তীরে শুয়ে একা-একা কি ভাবিব, হায়;Ñ/
সেদিন র’বে না কোনো ক্ষোভ মনেÑ এই সোঁদা ঘাসের
ধুলায়/জীবন যে কাটিয়াছে বাংলায়Ñ চারিদিকে বাঙালির ভিড়/বহুদিন কীর্তন ভাসান গান
রূপকথা যাত্রা পাঁচালীর/নরম নিবিড় ছন্দে যারা আজো শ্রাবণের জীবন গোঙায়,/আমারে দিয়েছে
তৃপ্তি; কোনদিন রূপহীন প্রবাসের পথে/বাংলার মুখ ভুলে খাঁচার ভিতর নষ্ট শুকের মতন/কাটাইনি
দিন মাস, বেহুলার লহনার মধুর জগতে/তাদের পায়ের ধুলো-মাখা পথে বিকায়ে দিয়েছি আমি
মন/বাঙালি নারীর কাছে চালধোয়া স্নিগ্ধ হাত ধান মাথার চুল হাতে তার শাড়িটির কস্তা
পাড়; ডাঁশা আম কামরাঙা কুল।
সেই যে বহুল উচ্চারিত ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতাটি,
ওই কবিতার চরণে চরণে লতিয়ে উঠেছে যে পুনর্জন্মের আকাঙ্ক্ষা, সেও তো শুধু এই প্রিয়
জন্মভূমির বাংলার বুকে ফিরে আসার জন্যই। শুধু জীবনের অনেক স্মৃতিবিজড়িত বরিশালের ধানসিড়ি
নদীই নয়, খুলনার রূপসা নদীর ঘোলা জলের কাছেও ফিরে আসবার আকুতি তার। এসে কী কী দেখবেন
সেই তালিকায় নদীতে সাদা ছেঁড়া পালের নৌকায় কিশোরকে তিনি দেখেন, উঠোনের এক কোণে শিশু
ঘাসের মধ্যে খই ছড়াচ্ছে এমন দৃশ্য তিনি দেখবেন কল্পনা করেন আবার আসিব ফিরে কবিতায়।
বাংলার রূপ তিনি যে কেবল রূপসী বাংলাতেই দেখেছেন তা নয়। ‘বনলতা সেন’-এর মতো বিস্ময়কর
প্রতীকী বহুমাত্রিক অর্থবহ কবিতায় তিনি নাটোরের জনপদেই শুধু ভ্রমণ করেননি, সমগ্র ভারতবর্ষের
কিংবদন্তি স্থানগুলোও পরিভ্রমণ করেন নৃতাত্ত্বিক ইতিহাসের পথ ধরে। হাজার বছর ধরে তার
যে প্রতীকী ভ্রমণ বনলতা সেন কাব্যে, সে পথ মানবসভ্যতার নিরন্তর বহমানতার পথ। সিংহল
সমুদ্র থেকে বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগৎ পর্যন্ত যে মানসভ্রমণ, এই ভ্রমণের মধ্য দিয়ে
তিনি নৃতাত্ত্বিকের মতো ইতিহাসে এবং ভূগোলে সভ্যতার যাত্রাপথকে মিলিয়ে দেন নানামাত্রিক
মিথ ব্যবহার করে। বনলতা সেন প্রেমিকা নারী, নাকি মৃত্যুর প্রতীকÑ এমন জিজ্ঞাসারও কোনো
নিশ্চিত উত্তর পাওয়া যায়নি আজও।
একটি মহৎ কবিতা বহুমাত্রিক অর্থব্যঞ্জনায় বিভিন্ন পাঠকের কাছে বিভিন্ন
উপলব্ধি নিয়ে বাঙময় হয়ে ওঠে। যখন আমরা পড়ি, ‘সব পাখি ঘরে ফেরে, সব নদী/ফুরায় এ
জীবনের সব লেনদেন/থাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন’Ñ তখন এক পরম
বিস্ময় ঘোর লাগিয়ে দেয় আমাদের মনে! পৃথিবীর সব লেনদেন ফুরিয়ে যায় তো মৃত্যুর অন্ধকারে
নিমজ্জনের পরে! তাহলে বনলতা মৃত্যুর প্রতীক, নাকি প্রেমিকা নারী, যিনি ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত
বিপন্ন জীবনে দুই দণ্ড শান্তি দিয়েছিলেন কবিকে?
এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের এখনও জানা হয়নি। ধূসর পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থের
‘বোধ’ কবিতাটি যখন পাঠক পড়েন, তখন জীবনের গহন বিপন্নতাই পাঠকের
হৃদয় ছুঁয়ে যায়। ব্যক্তির বিপন্নতার মধ্য দিয়ে সৃজনশীল মানুষের, এমনকি সমগ্র মানবসভ্যতারই
একান্ত নিজস্ব ভুবনের বিপন্নতার বোধ কবিতার ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে আছে। অনেক সময় সরল
অর্থে ভাবতে গেলে মনে হয় জীবনযুদ্ধে পরাজিত কবি জীবনানন্দ দাশ যেন রক্তাক্ত হৃদয়ের
ক্ষরণই মূর্ত করে তুলেছেন এই দীর্ঘ কবিতাটিতে।
একটু উদ্ধৃতি নেওয়া যাক :
আলো-অন্ধকারে যাইÑ মাথার ভিতরে/স্বপ্ন নয়,
কোন এক বোধ কাজ করে!/
স্বপ্ন নয়Ñ শান্তি নয়Ñ ভালোবাসা নয়,/
হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়!/
আমি তারে পারি না এড়াতে,/
সে আমার হাত রাখে হাতে;/
সব কাজ তুচ্ছ হয়,Ñ পণ্ড মনে হয়,
শূন্য মনে হয়!/
সকল লোকের মাঝে বসে
আমার নিজের মুদ্রা দোষে
আমি একা হতেছি আলাদা?
আমার চোখেই শুধু ধাঁধা/
আমার পথেই শুধু বাধা?/
জন্মিয়াছে যারা এই পৃথিবীতে/
সন্তানের মত হয়ে,Ñ/
সন্তানের জন্ম দিতে দিতে/
যাহাদের কেটে গেছে অনেক সময়/
কিংবা আজ সন্তানের জন্ম দিতে হয়/
যাহাদের; কিংবা যারা পৃথিবীর বীজখেতে
আসিতেছে চ’লে/
জন্ম দেবেÑ জন্ম দেবে বলে;/
তাদের হৃদয় আর মাথার মতন/
আমার হৃদয় না কি?Ñ/
তাহাদের মন আমার মনের মতো না কি?/
তবু কেন এমন একাকী/
তবু আমি এমন একাকী!...
মাথার ভিতরে/স্বপ্ন নয়Ñ প্রেম নয়Ñ কোনো এক বোধ কাজ করে।/আমি সব
দেবতার ছেড়ে/আমার প্রাণের কাছে চ’লে আসি,/বলি
আমি এই হৃদয়েরে :/
সে কেন জলের মত ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়!...
মনে হয় এ দীর্ঘ কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তি উদ্ধৃতিযোগ্য। মানুষের নিঃসঙ্গতার
যে গভীর বোধ, দার্শনিকের প্রজ্ঞায় তারই ধ্বনি-প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে দিয়েছেন কবি তিন
পৃষ্ঠার কবিতাটিতে।
কবি জীবনানন্দ দাশের ব্যক্তিজীবনের দিকে তাকালেও আমরা সৌন্দর্যে নিমগ্ন
বিহ্বল এই নিঃসঙ্গ, বিপন্ন মানুষটিকেই যেন দেখতে পাই। বাংলার রূপমুগ্ধ কবি জীবনানন্দ
দাশের কবিতার মতোই তার ব্যক্তিজীবনও অনেক খেয়ালি আর রহস্যময়তায় ঘেরা। কবি জীবদ্দশায়
ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে অনেক বঞ্চনার শিকার হয়েছেন, তেমনি কর্মজীবনেও একাধিকবার
চাকরি হারিয়েছেন। বিয়ের আগে এবং পরে বেকারত্বের মুখোমুখি হয়েছেন।
তার চরিত্রের লাজুকতা আর নিজেকে গুটিয়ে রাখা যে কী মারাত্মক ক্ষতিকর
হয়েছিল সে সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসুসহ সমসময়ের একাধিক কবি-সাহিত্যিকের পাশাপাশি তার
স্ত্রী, ছোটবোন এবং কন্যার স্মৃতিচারণামূলক লেখা পড়লে জানা যায়। বিয়ের পরও অনেক
দিন লাবণ্য দাশ জানতেন না তার স্বামী একজন কবি! তিনি লুকিয়ে লুকিয়ে লিখতেন এবং তা
পরিবারের কাউকে দেখতেও দিতেন না! বিস্ময়কর হলেও এটাই সত্য।
প্রয়াণবার্ষিকীতে কালজয়ী কবিকে স্মরণ করি। তার স্মৃতির প্রতি গভীর
শ্রদ্ধা নিবেদন করি।