ইমতিয়ার শামীম
প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২৩ ২২:২৪ পিএম
আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৩ ১৩:২১ পিএম
শামসুর রাহমানকে নিয়ে অগ্রন্থিত সৈয়দ শামসুল হক
একদা আমরা সবাই যখন পুরনো ঢাকার বাসিন্দা, আমরা একটি আড্ডার পত্তন
করেছিলাম বাংলাবাজারে, বাংলাবাজার থেকে শিংটোলা ঢোকার মুখে পুরনো ভাংগা তোরণ, সেই তোরণের
ডানপাশে পুরনো দেয়ালঘেরা বাড়ি, একদা সেই বাড়িতে ছিল ঢাকার পুরনো সাপ্তাহিক পত্রিকা
‘সোনার বাংলা’ এর প্রেস ও অফিস, সেটা উঠে গিয়ে বহুদিন পড়ে থাকে নির্জনতার ভেতরে,
একদিন সেখানে সাইনবোর্ড ওঠে ‘বিউটি বোর্ডিং’ তারই রেস্তোরাঁ অংশে আমাদের আড্ডা। এখান
থেকে আধ মিনিটের পথ শহীদ কাদরির বাসা, মিনিট পাঁচেক দূরে আমার বাসা, আমরা দুজন ভোর
থেকে মাঝরাত পর্যন্ত বসতাম বিউটির আড্ডায়; শামসুর রাহমান লায়ন সিনেমার গলি থেকে মিনিট
কুড়ির পথ, হেঁটে আসতেন অপরাহ্ণের ভেতরে, অপরাহ্ণ থেকে মাঝরাত পর্যন্ত উপস্থিত থাকতেন
তিনি; কবিদের মধ্যে নিয়মিত এই তিনজন, আর হঠাৎ হঠাৎ এসে শরিক হতেন কায়সুল হক, আল মাহমুদ,
কখনো ফজল শাহাবুদ্দিন, সামান্য কিছুদিন আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, কখনো বা হাসান হাফিজুর
রহমান, গদ্যলেখক কখনোসখনো কেউ কেউ; আরো অনেকে আড্ডার অংশ ছিলেন যাঁরা লিখতেন না, কখনো
মনে হতো তাঁদের কেউ কখনো লিখবেন, কিন্তু ঐ পর্যন্ত আর ছিলেন অন্তত জনা তিনেক যাঁরা
সকাল থেকে মাঝরাত পর্যন্ত দর্শনশাস্ত্র নিয়ে তর্কে কাল কাটাতেন। আমাদের সকলের দ্বিতীয়
বাসা ছিল ঐ বিউটি বোর্ডিং-উনিশ শো ছাপ্পান্ন থেকে আটান্ন অবধি; এই বাড়ি থেকেই একদা
যে ‘সোনার বাংলা’ বেরুতো, সেখানেই ছাপা হয়েছিল শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতা আটচল্লিশ
সালে; আর এই বাড়িতে পরে যে আমাদের আড্ডা গড়ে ওঠে, যার কথা এখনো অমরা স্মরণ করি, আমরা
এখনো যার কথা মনে করে কাতর হয়ে উঠি, ফিরে যাওয়া অসম্ভব জেনেও ফিরে যাবার টান অনুভব
করি, সেই আড্ডা সম্পর্কেই শামসুর রাহমান অনেক বছর পরে একদিন আমাকে বলেছিলেন, ‘বড় নিষ্ফলা
গেছে ঐ ক’টি বছর, প্রায় কিছুই লিখিনি।’
তাঁর সেই খেদ আমি বুঝতে পারি, সত্যিই তখন আমাদের লেখার চেয়ে কথার
পরিমাণ ছিল অনেক বেশি এবং শামসুর রাহমান নিজেও জানেন, যে, সেই আড্ডার ভেতর দিয়ে আমরা
প্রস্তুত হচ্ছিলাম, অনবরত আমাদের সাধ্যগুলোকে তৈরি করে নিচ্ছিলাম, একেকটি সন্ধ্যার
অন্তিমে মহৎ বাসনার তাড়নায় দ্রুত বাসায় ফিরেছিলাম এবং সমস্ত রাত ঠিক যে লেখাটি লিখতে
চাই তা লিখতে না পারার জ্বরে তপ্ত হয়ে পরদিন পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছিলাম, দিনের পর
দিন; এবং যে শামসুর রাহমান ঐ খেদোক্তি করেছিলেন তিনি পরবর্তী শামসুর রাহমানÑ যাঁর হাত
নির্মাণ করেছে এ দেশের আধুনিক কাব্য-রুচি, যাঁর কবিতা এ দেশে প্রতিষ্ঠিত করেছে কবিতার
এক প্রথম মানদণ্ড।
সেই শামসুর রাহমানের কবিতা নিয়ে লেখা আরো একজন কবি যিনি নিজেকে এ
দেশের একমাত্র জীবিত ও সক্রিয় ভাষাবিজ্ঞানী বলেও বর্ণনা দেন সেই হুমায়ূন আজাদের বই
‘শামসুর রাহমান/নিঃসঙ্গ শেরপা’ পড়তে পড়তে আমার মনে পড়ে গেল ‘বড় নিষ্ফলা গেছে ঐ
ক’টি বছর’ এই খেদ, মনে পড়ে গেল এই কারণে, যে শামসুর রাহমান কেবল আমাদের প্রধান কবিই
নন, কবিতার ক্ষেত্রে আমাদের ভেতরে সবচেয়ে অতিপ্রজ্ঞ, কবিতা হিসেবে নিজেই তিনি স্বীকার
করেন এমন রচনার সংখ্যা তাঁর দু’হাজারেরও অধিক, তাঁর কাব্যসমগ্র এখুনি প্রকাশিত হলে
দেড় হাজার পৃষ্ঠা ছাড়িয়ে যাবে এবং এখনো তিনি প্রায় প্রতিদিন নতুন একটি কবিতা লিখে
চলেছেনÑনতুন কেবল সদ্যোজাত অর্থে নয়, অস্তিত্বের এবং উপলব্ধির অর্থেই তা বরং নতুন
এই পঁয়ত্রিশ বছর কাব্যসাধনার পরেও আজো শামসুর রাহমান তরুণতম কোনো কবির মতোই পাথর ভাঙ্গার
কাজে সমান তেজী, পথরচনার সমান পরিশ্রমী এবং দিক উন্মোচনে সমান সাহসী ও অভূতপূর্ব।
এমন একজন কবির জন্যে, তাঁর কবিতার মূল্যায়নের জন্যে, বাংলা সাহিত্যে
তাঁর স্থান নির্ণয়ের জন্যে, এবং তাঁর কবিতা আরো খানিকটা এগিয়ে বুঝতে ও অনুভব করতে
সাহায্য করবার জন্যে অপেক্ষা করছিল হুমায়ূন আজাদের মতো পরিশ্রমী নিষ্ঠাবান ও প্রতিভাবান
একজন গবেষক ও নিজেই বিশিষ্টভাবে প্রমত্ত একজন কবির। সেই অপেক্ষার ফসলÑ হুমায়ূন আজাদ
রচিত প্রায় আড়াইশো পৃষ্ঠার অসাধারণ বই শামসুর রাহমানেরই একটি কবিতা থেকে নেয়া উপমা
ধারণ করে যার শিরোনাম শামসুর রাহমান/নিঃসঙ্গ শেরপা।
অসাধারণ? বইটি হাতে নিয়ে দোকানের ভিড়ে কেবল পাতা উল্টে গেলেও বোঝা
যায়, বিশদভাবে পড়বার আগেই যে, হুমায়ূন আজাদ কি ভয়াবহ পরিশ্রম করেছেন বইটি লিখতেÑঅসাধারণ
এই অর্থে। শামসুর রাহমানের কবিতার নির্মাণের কারিগরি তিনি বৈজ্ঞানিকের মতো বিশ্লেষণ
করে দেখিয়েছেনÑঅসাধারণ এই অর্থে। শামসুর রাহমানের কবিতার প্রতি অনুজ একজন কবির অকুণ্ঠ
ভালোবাসা তিনি বাক্য না চিবিয়ে প্রকাশ করেছেনÑঅসাধারণ এই অর্থে এবং অসাধারণ এই অর্থে
যে, জীবিত সক্রিয় ও এখনো বিশাল সম্ভাবনা যাঁর সম্মুখে তেমন একজন লেখককে নিয়ে বাংলা
ভাষায় এমন একটি বিশদ ও অনুপ্রাণিত বইÑএর আগে কখনো লেখা হয়েছে বলে আমার জানা নেই।
বইটিতে রয়েছে চারটি অধ্যায় এবং পরিশিষ্ট অংশে শামসুর রাহমান বিষয়ে
কিছু তথ্য, তাঁর অন্তলোক সংক্রান্ত কিছু, সংকেত, রচনাপঞ্জি ও গ্রন্থপঞ্জি প্রথম পরিচ্ছেদ
‘আদিম দেবতারা ও সন্ততিরা-তে হুমায়ূন আজাদ বাংলা কবিতার পটভূমি, বিশেষ করে তিরিশের
কবিতার পটভূমি রচনা করেছেন যার প্রেক্ষিতে শামসুর রাহমানকে আমাদের দেখতে হবে। দ্বিতীয়
পরিচ্ছেদ ‘দু-চোখে দূর্গম শিখর’-এ তিনি শামসুর রাহমানের আপন পটভূমি রচনা করেছেন, কিম্বা
বলা যায়, তিনি সেই সব কাঠ ও মাটির সন্ধান দিয়েছেন যার সাহায্যে শামসুর রাহমান নির্মাণ
করেছেন কবি শামসুর রাহমান। তৃতীয় পরিচ্ছেদ ‘মাংসে-বেঁধা গোলাপ কাঁটা’-য় হুমায়ূন
আজাদ এই কবির মূল একটি বিষয়Ñপ্রেমের প্রেরণাকে সনাক্ত করতে চেষ্টা করেছেন। এবং চতুর্থ
পরিচ্ছেদ ‘কবিতার কলাপ্রকৌশল’-এ তিনি শামসুর রাহমানের কবিতার নির্মাণ সংক্রান্ত উদ্ভাবন
আবিষ্কার, বৈশিষ্ট্য বুঝে দেখেছেন।
কত গভীরভাবে শামসুর রাহমানকে পড়েছেন হুমায়ূন আজাদ, এবং সেই পঠন
তাঁকে কত কাছাকাছি নিয়ে গেছে শামসুর রাহমানের কবিতার, তা বোঝা যায় এই একটি মাত্র
উদ্ধৃতিতেই বস্তুত এই অনুচ্ছেদেই ধরা পড়ে আছেন এখন পর্যন্ত যিনি শামসুর রাহমান :
‘শামসুর রাহমান দ্রোহী ননÑভেঙে তচনচ করে তিনি আসেননি, বিপ্লবী ননÑদিকে
দিকে আত্মঘোষণার ইশতেহার ছড়াননি : আবিষ্কারকও নন তিনিÑতাঁর চোখ সবার আগে দেখতে পায়নি
কোনো অজানা মহাদেশ অথবা গ্রহ। তিনি বিনয়ী ও শ্রমী; পূর্বগামীদের পথের শেষপ্রান্ত থেকে
যাত্রা শুরু হয় তাঁর এবং একদিন চলে যান অনেক দূর, যতদূর যাওয়ার স্বপ্ন দেখেননি পূর্বগামীরা।
তিরিশি আধুনিকেরা বাংলা কবিতার ভাষ্য ও বিষয় বদলে দিয়েছিলেন, নতুন চেতনা সঞ্চার করেছিলেন;
এবং কবিতায় কিছু পরিমাণে, অনেকটা সংকোচের সাথে, সংক্রমিত করে দিয়েছিলেন ব্যক্তিতা
ও প্রতিবেশ; কিন্তু ব্যক্তিতা, অব্যবহিত প্রতিবেশ ও সময়কে তাঁরা গৌণমূল দিয়েছিলেন,
কেননা তাঁরা চারপাশের সমাজ-জীবন-প্রতিবেশকে কখনো মূল্যবান মনে করেননি। ‘প্রান্তরে কিছুই
নেই; জানলার পর্দা টেনে দে’Ñবুদ্ধদেবের এ উক্তি যেন তিরিশের সারকথা। শামসুর রাহমান
খুলে দিলেন ওই জানালাটি এবং সমস্ত দরোজা, যা দিয়ে ঢুকল অব্যবহিত প্রতিবেশ পৃথিবী,
সময় জীবন তাঁর অভ্যন্তরে, মিশ্রিত হলো তাঁর একান্ত ব্যক্তিতার সাথে। প্রত্যেক কবিই
যাকে আপন এলাকা সাম্রাজ্যÑ; শামসুর রাহমানের কবিতার সাম্রাজ্যের নাম একান্ত ব্যক্তিতাড়িত
অব্যবহিত প্রতিবেশ পৃথিবী জীবনপূর্ব সমকাল।’
এবং এই একটি অনুচ্ছেদের জন্যেই হুমায়ূন আজাদ অন্তত আমার টুপিখোলা
অভিবাদন নেবেন যে, তাঁর মতো একই সঙ্গে কবি ও পাঠক, কবিতার প্রেমিক ও গবেষক না হলে এভাবে
শামসুর রাহমানের মুখ আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠত না। আমি মনে করি, এই অনুচ্ছেদটি বহুবার
বহুভাবে উদ্ধৃত হবে, কখনো সমর্থনে, কখনো প্রতিবাদে, ভবিষ্যতে, যাঁরা শামসুর রাহমানের
কবিতা পড়বেন কিম্বা তাঁর কবিতা নিয়ে কাজ করবেন : সমর্থন যাঁরা করবেন তাঁরা শামসুর
রাহমান পরবর্তী কবিতার এই বক্তব্যের আলোকসম্পাতে উল্লসিত ও নিশ্চিত বোধ করবেন, প্রতিবাদ
যাঁরা করবেন তাঁদের এর চেয়ে গ্রাহ্য।
কোনো বক্তব্য নির্মাণে প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে ও অবশ্যই হুমায়ূন
আজাদের চেয়ে অধিক প্রতিভা-শ্রম কাজে লাগাতে হবেÑযার সম্ভাবনা ব্যক্তিগতভাবে আমি আমাদের
কালে আর দেখি না।
প্রতিবাদীদের একটি উচ্চারণ অবশ্যই এটা হবে বলে আমি মনে করি যে, শামসুর
রাহমান কি সত্যি সত্যি ‘নিঃসঙ্গ শেরপা’?Ñ তাঁর যে কবিতা থেকে উপমাটি হুমায়ূন আজাদ
ধার করেছেন, তা ঐ কবিতার অন্তর্গত অভিজ্ঞতার ফলে উচ্চারিত নিশ্চয়, কিন্তু হুমায়ূন
আজাদ যখন উপমাটিকে বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে কবি শামসুর রাহমানের, বাংলাদেশের কবি সংঘের
ভেতরে শামসুর রাহমানের অবস্থানের বর্ণনা হিসেবে প্রয়োগ করেন তখন তা সত্য বলে নিঃসংশয়ে
মেনে নেয়া সম্ভব নাও হতে পাবে। বস্তুত, আমি এমন সন্দেহ করি যে, হুমায়ূন আজাদ পুরো
এই বইটিতে মাত্র একটিবারই যুক্তি ও তথ্যের চেয়ে আবেগের প্রাধান্য বেশি দিয়ে ফেলেছিলেন
ও তা এই গ্রন্থনাম স্থিরিকরণের বেলায়। আমরা ভুলে যেতে পারব না, যে, শামসুর রাহমান
একা নন। তাঁর সমসাময়িক ও পরবর্তী অন্তত পাঁচজন কবির অস্তিত্ব অত্যন্ত দৃষ্টিগ্রাহ্য
যাঁদের প্রতিভা-শ্রম বাংলাদেশের কবিতার মধ্যে নির্মাণ করেছে শামসুর রাহমানের একই সঙ্গে।
তবে, এই কবিসংঘের সম্মিলিত কাজটির কথা যে শামসুর রাহমানের ওপর লেখা বইয়ের কাঠামো হতে
পারে না, এটাও আমি জানি। আর তাই গ্রন্থনাম সম্পর্কে সচেতন ভিন্নমত পোষণ করেও আমি এই
বইকে শামসুর রাহমানের ওপর বই হিসেবেই দেখব ও দেখেছি।
এতক্ষণে বলা যায়, হুমায়ূন আজাদের এই বই ‘শামসুর রাহমান/নিঃসঙ্গ শেরপা’-কে
আমি মনে করি শামসুর রাহমানের ওপর লেখা সম্ভবত এ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বই হয়ে থাকবে।
এবং এতটা বলবার পর এটাও এইখানে বলা দরকার যে, বইটিকে অন্তত দুটি দিক
থেকে আমি অসম্পূর্ণ মনে করি; সেই দু’টি দিকে নিয়ে হুমায়ূন আজাদ যদি ভবিষ্যতে কিছু
লেখেন ও পরবর্তী সংস্করণে যোগ করেন তো শামসুর রাহমানের দীর্ঘকালের বন্ধু হিসেবে ও সহযাত্রী
হিসেবে আমি সুস্থির বোধ করব। এক, বইটিতে পঞ্চম একটি পরিচ্ছেদের অভাব আমি অনুভব করেছি,
যে পরিচ্ছেদে শামসুর রাহমানের কবিতার প্রভাব বর্তমান বাংলা কবিতার ওপর, পরবর্তী কবিদের
ওপর, বাংলাদেশে, কি ভাবে ও কতটুকু পড়েছে তা আলোচিত হতে পারত। আমি মনে করি, বর্তমানে,
এবং বর্তমান বলতে গত কুড়ি বছর ধরে, বাংলাদেশে যে কবিতা লেখা হচ্ছে বস্তুত যে কোণ থেকে
জীবনকে দেখা হচ্ছে কবিতার কাচের ভেতর দিয়ে তার অনেকটাই শামসুর রাহমান উদ্ভাবিত ও স্থাপিত
বটে, এমন কি যে কবিতা ভিন্ন, তাও শামসুর রাহমানের অবস্থান থেকে ভিন্ন বলেই ভিন্ন, কোনো
কোনো ক্ষেত্রে সেই ভিন্নতা শামসুর রাহমান থেকে ভিন্ন হবার প্রচ্ছদ-ইচ্ছা থেকেই ভিন্ন
বৈ আর কিছু নয়। আমি ভুলে যাইনি, যে ব্যতিক্রম আছে ও ব্যতিক্রমী কবিও আছেন শামসুর রাহমানের
সমকালেই, কিন্তু সেই ব্যতিক্রমও আজ অনিবার্যভাবে শামসুর রাহমানেরই ব্যতিক্রম। আর, দ্বিতীয়
যে বিষয় নিয়ে আলোচনা হুমায়ূন আজাদের এ বইয়ে আমি পাইনি, যে বিষয় নিয়ে লেখকের ভাবনা
আমি অবশ্যই জানতে চেয়েছিলাম, তা হচ্ছে, শামসুর রাহমানের কাব্য-ভাষা। আমি মনে করি শামসুর
রাহমানের দীর্ঘ কবি জীবনে এখন পর্যন্ত এই একটিই তাঁর অপারগতা, যে, তিনি তাঁর নিজের
কাব্যভাষা নির্মাণ করতে পারেননি, এমনকি নিজের বাগভঙ্গীও তাঁর কবিতার এ যাবৎ দুর্লক্ষ্য;
শামসুর রাহমান তিরিশের কাব্যভাষাকে আত্মসাত করেছেন আত্মসাত করে নতুন কিছু নির্মাণ করতে
পারেননি, তবু যে নতুন মনে হয় তা ঐ তাঁর একান্ত নিজস্ব মনোভঙ্গীও জীবন উপলব্ধির দরুন,
এবং আমি আরো মনে করি, শামসুর রাহমান যদি নিজস্ব কাব্যভাষা উদ্ভাবন করতে না পারেন তাহলে
কেবল মনোভঙ্গী ও উপলব্ধির ভিন্নতা দিয়ে তিনি আর অধিকদূর অগ্রসর হতে পারবেন না; এবং
সম্ভবত এ কারণেই অনেক শামসুর রাহমান প্রেমিকের কাছেও কিছু দিন থেকে মনে হছে, যে তিনি
নিজের চারদিকেই অনবরত ঘুরে চলেছেন। প্রসঙ্গ উল্লেখ করি যে, আমার ধারণা, শামসুর রাহমানের
ওপর ভাষা ও বাগভঙ্গীর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বুদ্ধদেব বসুর এবং কবি হিসেবে তিনি
বুদ্ধদেবের চেয়ে অনেক বড় কবি বলেই এই ঋণ আমাদের চট করে চোখে পড়ে না, কিন্তু তা নির্মমভাবে
প্রকাশিত হয়ে পড়ে শামসুর রাহমানের যেকোনো গদ্য রচনার কি প্রবন্ধ কি অতি সম্প্রতি
তিনি যখন উপন্যাস লেখেন।
শামসুর রাহমানকে আমি ভালোবাসি, হুমায়ূন আজাদের এ বই আমার সেই ভালোবাসাকে
সচেতন ভালোবাসায় পরিণত করল, শামসুর রাহমানকে নিয়ে আমি ভাবি, হুমায়ূন আজাদের এ বই
আমার সেই ভাবনাকে স্পষ্টতর করল, শামসুর রহমানের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে একদা আমিই
প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু করবার জন্যে এগিয়ে এসেছিলাম; হুমায়ূন আজাদের এ বই শামসুর
রাহমানের পঞ্চাশ বছর বয়স পেরিয়ে যাবার মুহূর্তে গ্রন্থিত হবার দরুন তা একটি বৃত্ত
সম্পূর্ণ করল; শামসুর রাহমানের কবিতার বইগুলোর পাশাপাশি হুমায়ূন আজাদের এ বইটি এখন
থেকে আমাদের শেলফের স্থায়ী একটি বই হয়ে থাকবে, শামসুর রাহমানকে জানবার জন্যে, বুঝবার
জন্যে যখন তাঁকে নতুন করে আবিষ্কার করবার জন্যে হুমায়ূন আজাদের এ বইয়ের কাছে আমাদের
বারবার ফিরে আসতে হবে।
[বানানরীতির ক্ষেত্রে মূল প্রবন্ধের বানান অনুসরণ করা হয়েছে]
ভূমিকা ও সংগ্রহ : ইমতিয়ার শামীম
কবি শামসুর রাহমানকে নিয়ে অনেকেই লিখেছেন; ভবিষ্যতেও নিশ্চয়ই লিখবেন অনেকে। কিন্তু সেসবের
মধ্যে প্রাবন্ধিক হুমায়ুন আজাদের লেখা প্রবন্ধের বই ‘শামসুর রাহমান : নিঃসঙ্গ শেরপা’ বরাবরই হয়ে
থাকবে অগ্রগণ্য অবশ্যপাঠ্য। ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হওয়ার পর পরই আলোচনার
ঝড় তোলে বইটি। শুধু শামসুর রাহমানকে আলোচনার ক্ষেত্রে নয়, আধুনিক বাংলা সাহিত্য সমালোচনার
ইতিহাসেও এটি অনন্য এক গ্রন্থের স্বীকৃতি পায়। যে-কথাটি আমাদের অনেকেরই অজানা, প্রকাশের
মাত্র এক বছরের মাথায় হুমায়ুন আজাদের এ গ্রন্থটি নিয়ে একটি আলোচনা লিখেছিলেন বাংলা
সাহিত্যেরই আরেক পুরোধা, সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। গুরুত্বপূর্ণ এ লেখাটি আমাদের
অনেকেরই দৃষ্টির বাইরে রয়ে গেছে। এর একটি অন্যতম কারণ বোধকরি এই যে, পরবর্তী সময়ে সৈয়দ
শামসুল হক আলোচনাটিকে আর কোনো গ্রন্থভুক্ত করেননি। লেখাটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলছিÑ কেননা
এটি এমন একটি লেখা, যেটি লেখা হয়েছে হুমায়ুন আজাদের শামসুর রাহমান বিষয়ক গ্রন্থকে নিয়ে,
যেটি আবার লিখেছেন সৈয়দ শামসুল হক; যার সৃষ্ট কথাসাহিত্যের ঘোরে আমরা এতই আবিষ্ট হয়ে
থাকি যে, ভুলেই থাকি যে, তিনি নিজেও শক্তিমান এক কবি; লিখতে গিয়ে সৈয়দ হককে এটি মাথায়
রাখতে হয়েছে তিনি কেবল কবি শামসুর রাহমানকে নিয়েই লিখছেন না,Ñ লিখছেন কবি, প্রাবন্ধিক
ও চিন্তক হুমায়ুন আজাদকে নিয়েও। এভাবে এ লেখার মধ্য দিয়ে যেন বা নিজেদের কবিতাদর্শনের
শক্তিপরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছেন বাংলা সাহিত্যের তিন পুরোহিত।
এক ধরনের নস্টালজিক বোধ তৈরি করতে করতে এ লেখায় সামনের দিকে এগিয়েছেন
সৈয়দ শামসুল হক। কিন্তু খুব দ্রুতই খুব সহজ ভঙ্গিতে চলে গেছেন মূল আলোচনায়, আর হুমায়ুন
আজাদের এ গ্রন্থটিকে মূল্যায়ন করেছেন এক কথায় ‘অসাধারণ’ বলে। বলার
পর নিজেই থেমেছেন, নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেছেন, অসাধারণ কেন বললেন, তা জেনে নিয়েছেন
নিজের কাছ থেকে। এখানে তিনি যেন-বা সূক্ষ্ম একটু খোঁচাও দিয়েছেন আজাদকে এই বলে যে,
‘শামসুর রাহমানের কবিতার প্রতি অনুজ একজন কবির অকুণ্ঠ ভালোবাসা তিনি বাক্য না চিবিয়ে
প্রকাশ করেছেনÑ অসাধারণ এই অর্থে যে, জীবিত সক্রিয় ও এখনও বিশাল সম্ভাবনা যার সম্মুখে
তেমন একজন লেখককে নিয়ে বাংলা ভাষায় এমন একটি বিশদ ও অনুপ্রাণিত বই এর আগে কখনও লেখা
হয়েছে বলে তার জানা নেই। তিনি আজাদকে টুপিখোলা অভিবাদনও জানিয়েছেন এ কারণে যে, ‘তার
মতো একই সঙ্গে কবি ও পাঠক, কবিতার প্রেমিক ও গবেষক না হলে এভাবে শামসুর রাহমানের মুখ
আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠত না।’ তবে তার পরও তিনি এ গ্রন্থের নামকরণের
ব্যাপারে সংশয় প্রকাশ করেছেন, প্রশ্ন তুলেছেন, ‘সত্যিই শামসুর রাহমান নিঃসঙ্গ শেরপা
কি না?’ তিনি দুটি অপূর্ণতাও শনাক্ত করেছেন তার মতো করে। তিনি বলেছেন, শামসুর রাহমানের
কবিতার প্রভাব বর্তমান বাংলা কবিতার ওপর, পরবর্তী কবিদের ওপর কীভাবে পড়েছে তা নিয়ে
এতে আলোচনা হতে পারত। বলেছেন, রাহমানের কাব্যভাষা নিয়েও লেখক এ গ্রন্থে কোনো আলোচনা
করেননি। প্রসঙ্গত তিনি এ প্রসঙ্গে তার নিজের অভিমতটিও জানিয়ে দিয়েছেন এই বলে যে, দীর্ঘ
কবিজীবনে রাহমানের এই একটিই অপারগতা যে তিনি তার নিজের কাব্যভাষা নির্মাণ করতে পারেননি।
বলার বা লেখার অপেক্ষা রাখে না, নিঃসন্দেহে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ
রচনা। যা ভবিষ্যতে সৈয়দ শামসুল হকের কোনো গ্রন্থে কিংবা শামসুর রাহমান বিষয়ক কোনো গ্রন্থে
অনায়াসে সংকলিত হতে পারে। এটি প্রকাশ পেয়েছিল সাপ্তাহিক বিচিত্রায়, দ্বাদশ বর্ষের ৩৮তম
সংখ্যায়, ১৩৯০ বঙ্গাব্দের ৪ ফাল্গুন (১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৪)।