হোসেন আবদুল মান্নান
প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০২৩ ০২:৪৭ এএম
আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৩ ১০:৪৩ এএম
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘আমাদিগকে যদি কেহ বাঙালি বলিয়া অবহেলা করে আমরা বলিব, রামমোহন রায় বাঙালি ছিলেন’। রাজা রামমোহন রায়কে বলা হয় ভারতবর্ষের প্রথম আধুনিক মানুষ। মূলত তাঁর হাত ধরেই ভারতের রেনেসাঁসের যাত্রা। পাশ্চাত্যের সঙ্গে ভারতীয় সমাজের যোগসূত্র স্থাপিত হয় তাঁর মাধ্যমে। ১৭৭২ সালে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায় রামমোহনের জন্ম। তিনি জন্মেছিলেন এক সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে। তাঁর পিতার নাম রামকান্ত রায়। কৈশোর থেকেই পিতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না। এর মূল কারণ ছিল ধর্মকর্ম, সামাজিক আচার, রীতিনীতি, পূজাপার্বণের কুসংস্কার বিষয়ে সমালোচনা ও যথাযথ অনুকরণ না করা। এমনকি তাঁর আত্মীয়স্বজনও তাঁকে আড়চোখে দেখতেন। শিশুকালেই ঐশ্বরিক আশীর্বাদ লব্ধ হয়ে বিদ্যার্জন বা লেখাপড়ার প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ প্রকাশ পায়। মাত্র আট বছর বয়সে আরবি ভাষা এবং ১২ বছর বয়সে সংস্কৃত শিখেছিলেন। ১৫ বছর বয়সে বাড়ি ছেড়ে তিব্বতে চলে গিয়েছিলেন। নানা জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের ভাষা ও সংস্কৃতি তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করত। তবে ১৭৯০ সালে পিতার আহ্বানে তিনি তিব্বত থেকে স্বদেশে ফিরে আসেন। তিব্বতে বছর তিনেক ছিলেন। তিব্বতের নারীদের সস্নেহ ব্যবহার এবং আতিথেয়তার কথা তিনি সারা জীবন শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করে ছিলেন। ধারণা করা যায়, নারী জাতির প্রতি তাঁর অকুণ্ঠ সম্মানবোধ এবং নৈতিক দায় সেখান থেকেই গড়ে ওঠে। ধর্মীয় গোঁড়ামি, কূপমণ্ডূকতা, পৌত্তলিকতা, কুসংস্কারাচ্ছন্নতা ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মনীষা ও মননশীলতা নিয়ে তিনি বড় হতে থাকেন। অল্প বয়সেই মূর্তিপূজার বিপক্ষে কঠোর অবস্থান তথা বলিষ্ঠ উদ্যোগ নিয়ে সমাজকে সংগঠিত করেছিলেন।
দুই.
লেখাপড়া শেষ করে রামমোহন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে চাকরি করেন। ১৮০৩ থেকে ১৮১৬ সাল পর্যন্ত কোম্পানির একজন কর্মচারী হিসেবে বাংলার বিভিন্ন বিভাগ ও জেলায় দায়িত্ব পালন করেন। ১৮০৩ সালে তাঁর পিতা রামকান্তের মৃত্যু হয়। তবে পিতার ইহলোক ত্যাগকালে রামমোহন উপস্থিত ছিলেন না বলে অনেক গবেষক মনে করেন। তিনি ২২ বছর বয়সে ইংরেজি শিখতে শুরু করেন। তাঁর ইংরেজি শিক্ষায় সহায়তা করেছিলেন জন ডিগবি। রামমোহন রায় তাঁর দেওয়ান হিসেবে কাজ করতেন। রামমোহনও তাঁর নিবিড় ভালোবাসা, আনুকূল্য লাভ করেছিলেন। রামমোহন রায় একাধারে আরবি, ফারসি, উর্দু, ইংরেজি, সংস্কৃত, হিব্রু, ল্যাটিন, গ্রিক, ফ্রেঞ্চ ইত্যাদি ভাষায় জ্ঞান লাভ করেন। বাইবেল নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আরও কতিপয় ভাষা আয়ত্ত করেছিলেন। বইপুস্তক রচনা করেছেন বাংলা, ইংরেজি, আরবি ভাষায়। পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন একাধিক। ১৮২৬ সালে রামমোহন ব্রিটিশ সাহেবদের বাংলা ভাষা শেখার জন্য রচনা করেন Bengali grammar in the English
Language. তখন দেশি-বিদেশি নানা ভাষায় তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাসের পক্ষে-বিপক্ষে মতামত তুলে ধরেছেন। অ্যারিস্টটলের মতো তাঁরও ছিল আপসহীন যুক্তিবাদের প্রয়োগ। তিনি মনে করতেন, একেশ্বরবাদী হওয়া মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির মতো। সব সৃষ্টির উৎস এবং তার চালক একমাত্র পরমপিতা। এমন বিশ্বাস বিশ্বজনীন। একদিকে এ সহজাত প্রবণতা ও উপলব্ধি, অন্যদিকে অযৌক্তিক আচার অনুষ্ঠান, কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস যেকোনো সমাজের পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকর। তাই রামমোহন হৃদয়হীন শাস্ত্রানুশাসনের নির্মম অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন।
তিন.
ভারতের অভিশাপ সতীদাহ এবং চিতায় তোলা জীবন্ত নারীর মর্মান্তিক করুণ মৃত্যুর দৃশ্য দেখে রামমোহন রায়ের অন্তরাত্মা কেঁদে উঠেছিল। তিনি ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে এ নির্মমতা চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। দেখেছিলেন দিল্লির এক বিশাল বিত্তবৈভবের মালিক বৃদ্ধ শেঠজির মৃত্যুর পর তার চারজন সুন্দরী রূপসী স্ত্রী কীভাবে একই ব্যয়বহুল আকাশচুম্বী চিতায় দাহ হলেন। তাদের বাঁচার প্রচ্ছন্ন আকুতি তাঁকে মর্মে বেদনার্ত করে তুলেছিল।
এক পরিসংখ্যান বলছে, সে সময় কলকাতা ডিভিশনের অধীনে ছিল বর্ধমান, কটক-বালাসোর, হুগলি, যশোর, জঙ্গলমহল, মেদিনীপুর, নদীয়া, কলকাতার চারপাশ ও চব্বিশ পরগনা। শুধু কলকাতা ডিভিশনে প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, ১৮১৫ সালে সতীদাহের সংখ্যা ছিল ২৫৩, ১৮১৬ সালে ২৮৯, ১৮১৭ সালে ৪৪২, ১৮১৮ সালে ৫৪৪, ১৮১৯ সালে ৪২১। এর বাইরেও নথিবিহীন সর্বত্র সতীদাহ চলমান ছিল। রামমোহন রায় কলকাতার গঙ্গার তীরে গিয়ে সতীদাহ বন্ধ করার জন্য জীবনপণ চেষ্টা করেছেন।
১৮১৯-২০ সালে তিনি এর বিরুদ্ধে প্রবলভাবে সোচ্চার হতে শুরু করেন। শুধু সচেতন শ্রেণির নাগরিকের জনমত নয়, লেখালেখির মাধ্যমেও ব্রিটিশরাজকে সমাজে বিদ্যমান এমন অমানবিকতা বিষয়ে সম্যক ধারণা দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৮২০ সালে সতীদাহের বিপক্ষে কথা বলতে গিয়ে রামমোহন বলেন, এ সমাজে নারীদের যে বুদ্ধিহীন, অস্থিরমতী বা বিশ্বাসঘাতক বলা হয় তা সম্পূর্ণ অমূলক। তিনি বলেছিলেন, যে দেশে নারীদের কোনো শিক্ষা দেওয়া হয় না তাদের কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে? তা ছাড়া নারীরা কীভাবে অস্থির হবে, যেখানে মৃত্যুর কথা শুনলে পুরুষরা আগেই মৃতপ্রায় হয়ে যায়, সেখানে স্ত্রীরা অন্তঃকরণের অসীম স্থৈর্যদ্বারা অগ্নিপ্রবেশে উদ্যত হয়। তাঁর সহমরণ বিষয়ক বই ‘প্রবর্তক ও নিবর্তক সম্বাদ’ দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়; যা ইংরেজিতে A Conference Between an Advocate for
an Opponent of, the Practice of Burning Widows Alive (১৮১৮-১৮২০)। এতে যুক্তির অখণ্ডতায় তিনি বলেছেন, সতীদাহ কখনও আবশ্যিক ধর্মাচার নয়, বরং এটা সচেতনভাবে নারীহত্যা। এখানে উল্লেখ্য, রামমোহন রায় সে বইটি ওয়ারেন হেস্টিংসের পত্নীকে উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি মণুস্মৃতি থেকে অকাট্য উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করেছেন, সহমরণ নয়, স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা স্ত্রীর মুক্তিলাভের প্রধান উপায় হতে পারে ব্রহ্মচর্য পালন। এতে চারদিকে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে গেলেও তিনি পিছপা হননি বা রণে ভঙ্গ দেননি, দমে যাননি।
এমন অসভ্য কুসংস্কারের বলি থেকে হাজার হাজার ভারতীয় নিষ্পাপ নারীকে বাঁচানোর জন্য তিনি তখনকার দিনে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত পত্রপত্রিকায় চিঠি ও প্রতিবেদন প্রেরণ করলে ধীরে ধীরে ইউরোপজুড়ে তা আলোচনা হতে থাকে। ইংল্যান্ডে সতীদাহ বন্ধ করার দাবি ওঠে; যা ভারতে তথা বাংলায় নিযুক্ত ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেলদের মনোজগতে একটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
চার.
ইতিহাস বলে, তৎকালীন ফোর্ড উইলিয়ামের গভর্নর এবং বাংলার গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস (১৭৩২-১৮১৮) সতীদাহ প্রথার বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। তিনি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, রীতিনীতির বিপক্ষে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে কালক্ষেপণ করে গেছেন। তিনি মনে করতেন, এটা হবে প্রচলিত ধর্মের অনুভূতিতে আঘাত। তা ছাড়া এ বিষয়ে কোম্পানিকে আরও তথ্য-উপাত্ত দিতে হবে বলে জানাতেন। এতে বরং তিনি কুসংস্কার অনুসারী-অনুকারী প্রতিপক্ষকে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছিলেন।
পরে গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক (১৭৭৪-১৮১৮) আইন করে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করেন। তিনি ছিলেন একজন এক কথার মানুষ। সাদাকে সাদা কালোকে কালো বলতেন। তিনি শুধু আইন করা নয়, এর সঙ্গে জড়িতদের ফৌজদারি আইনের আওতায় এনে শাস্তির বিধান করেছিলেন; যা Bengal Regulation -- of 1829 for
declaring the practice of Sati or of Burning or Burying alive the Widows of
Hindus, illegal and punishable by the criminal courts হিসেবে আজও অম্লান অক্ষয় হয়ে আছে। ৪ ডিসেম্বর ১৮২৯ সাল। রাজা রামমোহন রায়ের পরামর্শ নিয়ে লর্ড বেন্টিংক সতীদাহ প্রথা আইনত রদ করেন এবং বন্ধ হলো সতীদাহ।
যদিও এর পরও গোঁড়া ও রক্ষণশীল হিন্দুরা আন্দোলন করেছিল। উল্লেখ্য, একই বছর রামমোহন দিল্লির মুঘল বাদশাহ দ্বিতীয় আকবর কর্তৃক ‘রাজা’ উপাধি লাভ করেন।
অনেকে মনে করেন, সতীদাহ প্রথা রদকরণের মতো একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব বা অবদানের জন্য রাজা রামমোহন রায় ভারতীয়দের কাছে প্রাতঃস্মরণীয় ও বরণীয় হিসেবে বেঁচে থাকবেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আরও বলেছেন, ‘রামমোহনের হৃদয় যেন ভারতেরই হৃদয়। তিনি ভারতের সত্য পরিচয় আপনার মধ্যে প্রকাশ করেছেন। তিনি বাংলার নবজাগরণের পথিকৃৎ এবং চিরকালের মতই আধুনিক’।
তাঁকে prophet of India বলেও আখ্যায়িত করা হয়। ১৮৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে স্বামী বিবেকানন্দ কলকাতাবাসীর উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘যেদিন হইতে রাজা রামমোহন রায় এই সংকীর্ণতার বেড়াজাল ভাঙিলেন সেই দিন হইতেই ভারতের ক্রমবর্ধমান উন্নতি ও জয়জয়কার শুরু হইল।’
ভাবলে বিস্মিত হতে হয়, জীবনসায়াহ্নে পৌঁছে সেই বাঙালি কিংবদন্তিও অনির্বচনীয় দারিদ্র্য এবং পরাশ্রিত অবস্থায় ১৮৩৩ সালের সেপ্টেম্বরে ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে প্রয়াত হন। এই অসামান্য বিশ্বনাগরিক মানুষটিকে নিয়ে বাঙালির চিরকালীন কৃতজ্ঞতাবোধের পাশাপাশি হয়তো বিতর্কও চলমান থাকবে। তবু বলা যায়, ভারতবর্ষের সমাজ সংস্কারের কণ্টকাকীর্ণ দীর্ঘ পথের নিঃসঙ্গ যাত্রী হিসেবে রাজা রামমোহন রায় অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
তথ্যসূত্র : রামমোহন রায় সম্পর্কিত বিভিন্ন জীবনী পুস্তক, গবেষণাপত্র ও ম্যাগাজিন মেঘমুলুক