× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

গতানুগতিক নয়, প্রগতি চাই

মামুন রশীদ

প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০২৩ ২৩:৩৫ পিএম

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৩ ২০:০১ পিএম

গতানুগতিক নয়, প্রগতি চাই

রাষ্ট্রচিন্তাবিদ সমাজবিশ্লেষক আবুল কাসেম ফজলুল হক দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা শেষে অবসর নিয়েছেন। ছাত্রজীবনে সক্রিয় ছিলেন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে। পরবর্তীতে প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে সরে আসেন। লেখালেখি তার ধ্যানজ্ঞান। লেখাকেই চিন্তা ছড়ানোর মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ভাষা আন্দোলনের মিছিলে হাঁটা এই সমাজচিন্তকের জন্ম ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৪৪, কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায়। সম্পাদনা করছেনলোকায়তনামের একটি সাহিত্য-সমাজচিন্তার কাগজ। ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের সঙ্গে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর পক্ষে কথা বলেছেন সহকারী সম্পাদক মামুন রশীদ

আপনি তো প্রায় চার দশক শিক্ষকতা করেছেন, সাহিত্য চর্চা করছেন। শ্রেণিকক্ষে যেমন, তেমনি সাহিত্যের মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষের বাইরেও আপনার চিন্তা ছড়িয়ে দেবার যে দীর্ঘ যাত্রা, সেখানে এই সময়ে সমাজ রাজনীতিতে, বিশেষত চিন্তায় কোনো পরিবর্তন কি লক্ষ্য করেন? যদি করেন তাহলে সেই পরিবর্তন কেমন?

আবুল কাসেম ফজলুল হক : বাংলাদেশের যে রাষ্ট্রীয় আদর্শ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে তাজউদ্দীন সরকার ঘোষণা করেছিল তাতে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতা (ইংরেজিতে Secularism) ছিল। Secularism-এর বাংলা হওয়া উচিত ছিল ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। ১৯৭২ সালের সংবিধানে এই তিনটি কথার সঙ্গে যুক্ত করা হয় বাঙালি জাতীয়তাবাদ। ১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর তাজউদ্দীন সরকার ঘোষণা করেছিল : মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম, জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টিÑ এই চারটি দল স্বাধীন বাংলাদেশে নিষিদ্ধ থাকবে। ঘোষণায় বলা হয়েছিল, এই চারটি দল সব সময় পূর্ববাংলার বাঙালি জাতীয়তাবাদ স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সব আন্দোলনের বিরোধিতা করেছে এবং স্বাধীনতা যুদ্ধকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগিতা করেছেÑ গণহত্যা, নারী নির্যাতন, ঘর-বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করা ইত্যাদি অপকর্মে যুক্ত থেকেছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে নিষিদ্ধ এই চার দলকে নিষিদ্ধই রাখা উচিত ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। তাতে বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল করা যাবে নাÑ এই রকম কিছু কথা যুক্ত করা হয়। জামায়াতে ইসলামী যে তখন ধর্মভিত্তিক দল ছিল, তাতে কারও সন্দেহ নেই। কিন্তু মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম, পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি কি ধর্মভিত্তিক রাজনীতির দল ছিল? এগুলো ছিল মুসলিম-সাম্প্রদায়িকতাবাদী দল। গণতন্ত্র কিংবা সমাজতন্ত্রের আকর্ষণে মানুষ ধর্মের প্রতি নিস্পৃহ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু গণতন্ত্রকে কিংবা সমাজতন্ত্রকে কার্যকর হতে না দেখে মানুষ এসব আদর্শের প্রতি আস্থা হারায় এবং ধর্ম পরিত্যক্ত পুরাতন সংস্কার-বিশ্বাসের দিকে ঝুঁকে যেতে থাকে। ১৯৮০- দশকের প্রায় শুরু থেকে বিবিসি রেডিও সুপরিকল্পিতভাবে প্রচারকার্যের দ্বারা মৌলবাদবিরোধী আন্দোলন পরিচালনা করতে থাকে। গণতন্ত্র সমাজতন্ত্রকে ব্যর্থ করে মৌলবাদবিরোধী আন্দোলন কোনো সুফল ফলাতে পারেনি। প্রায় গোটা পৃথিবীব্যাপী ধর্মীয় শক্তি পুনরুজ্জীবিত হতে থাকে। বাংলাদেশে মৌলবাদবিরোধী আন্দোলন চালাতে গিয়ে বামপন্থি শিবির আওয়ামী লীগ মহল থেকে কেউ কেউ অত্যন্ত প্রবলভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ইসলামের বিরুদ্ধে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে বক্তৃতা-বিবৃতি দেন এবং পত্র-পত্রিকায় লেখেন। এর প্রতিক্রিয়ায় সমাজে পরিত্যক্ত পুরাতন সংস্কার-বিশ্বাসের ধর্মের পুনরুজ্জীবন ঘটে। ইতিহাসের চাকা যে পেছনদিকে ঘুরেছে তার আরও নানা কারণ আছে। আমার কোনো কোনো বইয়ে বিষয়ে আমার পর্যবেক্ষণের মতামতের প্রকাশ আছে। কথিত উদার গণতন্ত্র দিয়ে হবে না। উদ্ভাবন করতে হবে এবং কার্যকর করতে হবে সর্বজনীন গণতন্ত্র।

 স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার যে পরিবর্তন, সেই পরিবর্তন কি জাতীয় নীতিমালার সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী অনেকের চিন্তাকেও প্রভাবিত করেছে?

আবুল কাসেম ফজলুল হক : বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদরা উন্নয়নবিদরা বিশ্বব্যাংকের প্রচারিত উন্নয়নের ধারণা অবলম্বন করে মত প্রকাশ করেন। এর দ্বারাই বর্তমান রাজনীতি অর্থনীতি পরিচালিত হচ্ছে। রাজনীতি অর্থনীতির পরিচালনায় সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশনগুলোর (CSO) এবং এনজিওগুলোরও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। বিশ্বব্যাংক অনেকটা বিশ্বসরকারের মতো কাজ করছে। এই ধারায় চিন্তা কাজের দ্বারা আমাদের রাজনীতি, অর্থনীতি সংস্কৃতির উন্নতি হচ্ছে না। দরকার স্বাধীন চিন্তাশীলতা। দুনিয়াব্যাপী রাষ্ট্রব্যবস্থা বিশ্বব্যবস্থাকে পুনর্গঠিত করতে হবে। পুনর্গঠনের ধারণা অবলম্বন করে উন্নত চরিত্রের রাজনীতি রাজনৈতিক দল গঠন করতে হবে। গতানুগতিক রাজনীতি প্রগতিবিরোধী, গণবিরোধী রূপ নিয়ে আছে। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের শুরুতে যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, বিদেশি সহায়তা নিয়ে তা যত ভালোভাবেই সম্পন্ন করা হোক, তা দ্বারা বাংলাদেশ উন্নতির ধারায় চলবে না। দরকার জনগণের কল্যাণে উন্নত চরিত্রের রাজনৈতিক দল। পশ্চিমা বৃহৎ শক্তিবর্গের এবং বিশ্বব্যাংক আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের নির্দেশনা অনুযায়ী চললে বাংলাদেশ পরনির্ভরতা থেকে অরও বেশি পরনির্ভরতার দিকে যাবে, আত্মশক্তি হারিয়ে ফেলবে। বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বে সদিচ্ছার অভাব প্রকট। নতুন রাজনীতি রাজনৈতিক সংগঠনে আন্তরিকতা, সদিচ্ছা, শুভবুদ্ধি প্রজ্ঞা দরকার। কাজের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দল সরকার এগুলো অর্জন করতে পারবে।

 আপনি তো ভাষা আন্দোলনের মিছিলে গিয়েছেন, ষাটের দশকের সব আন্দোলনেই সক্রিয় কর্মী ছিলেন। মার্ক্সবাদী রাজনীতিও করেছেন। পরবর্তীতে প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে সরে এসেছেন। কেন সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ ঘটালেন?

আবুল কাসেম ফজলুল হক : স্বাধীন চিন্তাশীলতার সুযোগ দুইদিক থেকে কমিয়ে ফেলা হচ্ছে। প্রথমত, গণতন্ত্রের নামে যে কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে তা দ্বারা চিন্তার স্বাধীনতা খর্ব হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, পশ্চিমা বৃহৎ শক্তিবর্গ এবং বিশ্বব্যাংক আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল এদেশে তাদের কার্যক্রমের দ্বারা চিন্তার স্বাধীনতা খর্ব করছে। বাংলাদেশে তো চিন্তার চর্চাই দুর্লভ। এদেশে মূল্যবোধ নৈতিক চেতনা দুর্গত। আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে নৈতিক চেতনা মূল্যবোধকে সক্রিয় রাখতে হবে। শিক্ষানীতি শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষার স্থান রাখতে হবে। প্রাথমিক মাধ্যমিক পর্যায়ে মানুষের নৈতিক চেতনার প্রকৃতি নীতিনির্ধারণের পদ্ধতি বিষয়ে পাঠ্যপুস্তকে শিক্ষার্থীদের শেখার ব্যবস্থা রাখতে হবে। ধর্মীয় নীতি শিক্ষাদানের ব্যবস্থা আছে। যেভাবে আছে তা দ্বারা ফলপ্রসূ শিক্ষা হচ্ছে না। দরকার বিজ্ঞানসম্মত নৈতিক বিবেচনা নীতিশিক্ষা।

 অভিযোগ রয়েছে আমাদের রাজনীতি একটি বৃত্তে আবদ্ধ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্প। সাম্প্রদায়িকতার এই বিষবাষ্প শুধু আমাদেরই নয়, বর্তমানে পুরো বিশ্বেই তার থাবা বসাচ্ছে। এভাবে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়ানোর কারণই বা কি আর থেকে পরিত্রাণের পথই বা কি?

আবুল কাসেম ফজলুল হক : মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকেও বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েÑ সন্মুখদৃষ্টি নিয়েÑ বুঝতে হবে। কেবল গৌরবের দিকগুলো নিয়ে, পশ্চাৎমুখী মুগ্ধ দৃষ্টি নিয়ে জানলে সুফল হয় না। বিচার-বিশ্লেষণ করে তথ্য সত্য নির্ণয় করতে হবে। সঙ্কীর্ণ দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিচার করলে তা দ্বারা জনজীবন, জাতি (Nation) রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আজ পর্যন্ত আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম যুদ্ধের ইতিহাস রচিত হয়নি। তবে এর মধ্যে সংগ্রামের যুদ্ধের নানা অংশ নিয়ে কিছু ভালো বই বেরিয়েছে। বদরুদ্দীন উমর আহমদ রফিকের বই আছে। শেখ মুজিবের বইগুলো আছে। আলোচনা-সমালোচনা দরকার। হীন-স্বার্থান্বেষীদের চিন্তা প্রচার জনজীবন, জাতি রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হয়। সরকারের উদ্যোগে কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে পনেরো খণ্ডে প্রকাশিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র ঐতিহাসিক তথ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সেটি এখন খুব কমই ব্যবহৃত হয়। ওয়াজেদ মিয়ার লেখা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে কিছু কথা বইটিও ভালো, কিন্তু সেটি এখন বাজারে রাখা হচ্ছে না। আমার তিনটি বইÑ মুক্তিসংগ্রাম, তাজউদ্দীন আহমদ প্রথম বাংলাদেশ সরকার এবং রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন বাজারে আছে। মইদুল হাসানের লেখা মূলধারা একাত্তরও একটি উৎকৃষ্ট বই। এই ধরনের আরও অন্তত পঞ্চাশটি ভালো বই প্রকাশিত হয়েছে বলে আমার অনুমান। ভালো বইগুলো নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা দরকার। কিন্তু দৃষ্টিকে একান্তভাবে মুক্তিযুদ্ধে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক নয়। বর্তমান অতীতের সৃষ্টি এবং ভবিষ্যৎ সৃষ্টি হচ্ছে বর্তমানের দ্বারাÑ এই কথাটির তাৎপর্য বুঝবার চেষ্টা করা দরকার। ভবিষ্যৎকে বর্তমানের চেয়ে উজ্জ্বলতর করতে হবে।

 

মুক্তিযুদ্ধের ৫১ বছর পর আজ যেভাবে মৌলবাদ, জঙ্গিবাদের জাল ছড়ানো তা কি বিষ্য়য়কর নয়? অথচ প্রগতির আলো এবং মানুষে মানুষে সম্প্রীতির নজির খুঁজতে খুব বেশি পেছনে যেতে হয় না। কিন্তু আজকের যে অবস্থা, তা কেন? অবস্থা তো একদিনে তৈরি হয়নি। জন্য আপনি কাকে দায়ী মনে করেন?

আবুল কাসেম ফজলুল হক : অতীত অবস্থায় ফিরে যাওয়ার ধারণা ঠিক নয়। চলতে হবে ভবিষ্যতের দিকে। তার জন্য বর্তমানকালের সমস্যা সম্ভাবনাকে বুঝতে হবে এবং অতীত থেকে বা ইতিহাস থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে। আর ব্যক্তিজীবন থেকে জাতীয় জীবন পর্যন্ত সর্বত্রই আত্মজিজ্ঞাসা, আত্মসমালোচনা আত্মশুদ্ধির চেষ্টা দরকার। জ্ঞান প্রজ্ঞা দরকার।

 

স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা সাংবিধানিকভাবেই ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি গ্রহণ করেছিলাম। সেই অবস্থা থেকে সম্প্রীতির পরিবেশ নষ্ট হবার পেছনে কি কারণ? থেকে মুক্তির জন্য আমাদের কোন পথে এগুনো প্রয়োজন?

আবুল কাসেম ফজলুল হকরাজনীতির বিকল্প নেই। বাংলাদেশের জনগণ ১৯৭২ সাল থেকেই তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এগোতে এগোতে রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে। অবস্থায় নতুন রাজনীতি উন্নত চরিত্রের রাজনৈতিক দল দরকার। আটাশ দফা : আমাদের মুক্তি উন্নতির কর্মসূচি নামে একটি বক্তব্য আমি গত পনেরো-ষোলো বছর ধরে প্রচার করে আসছি। রাজনীতির সেই ধারায় অগ্রসর হওয়া দরকার। কিন্তু রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা, বুদ্ধিজীবীরা এবং কথিত বিশিষ্ট নাগরিকেরা গতানুগতিক ধারাতেই চলছেন। তাতে অবস্থা একটি আবর্তের মধ্যে পড়ে আছে। ছাত্র তরুণেরাও প্রবীণদের দ্বারা গতানুগতিক ধারায়ই পরিচালিত হচ্ছে। ফলে উত্তরণ সম্ভব হচ্ছে না।

 আমরা উন্নয়ন করছি এবং অনেকেই বলছেন, সেই উন্নয়ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন। প্রশ্ন হচ্ছে এক্ষেত্রে ব্যক্তির উন্নয়নে আমাদের ঘাটতি কোথায় এবং কতোটুকু? সেই উন্নয়নের জন্য আমাদের কি করা প্রয়োজন।

আবুল কাসেম ফজলুল হক : পাকিস্তান ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশ হয়েছে। গত একান্ন বছরে বাংলাদেশে অনেক উত্থান-পতন ঘটেছে, অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আমরা উন্নতির ধারায় অনেক বেশি আশা করেছি, কিন্তু উন্নতি অল্পই হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মানদণ্ড অনুযায়ী অর্থনৈতিক উন্নয়ন অনেক হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে উন্নতি অল্পই হয়েছে। নৈতিক চেতনা নিম্নগামী। মানবিক গুণাবলি বা মনুষ্যত্ব বিকশিত হচ্ছে নাÑ বিকৃত হচ্ছে। ধনী-গরিবের বৈষম্য বাড়ছে, অন্যায় অনাচার বাড়ছে। ছাত্র-তরুণের মধ্যে ন্যায়, সত্য সুন্দরের প্রতি যে দৃঢ়চিত্ততা দেখেছি, স্বাধীন বাংলাদেশে তা অল্পদিনের মধ্যেই বিলীন হয়ে গেছে। রাজনীতির নিম্নগামিতার ফলে সব ক্ষেত্রেই মহান সব সম্ভাবনা বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বৌদ্ধিক চরিত্র বা intellectual character বলে যে বিষয়টি কাম্য, বাংলাদেশে তা খুঁজে পাওয়া যায় না। নিরাপত্তার অভাব ন্যায়কামী সবাই অনুভব করেন। বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকে (১৯০৫-১১) যে গণজাগরণের সূচনা, ১৯৭০-এর দশক পার হতে না হতেই তার অবসান ঘটেছে। প্রকৃত গণঅভ্যুত্থানের কোনো সম্ভাবনা দেখা যায় না। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রগতিশীলতা, রক্ষণশীলতা প্রতিক্রিয়াশীলতার ধারণা হারিয়ে গেছে। এখন সুবিধাবাদ ভোগবাদ মানুষের চালিকাশক্তি। অবস্থার পরিবর্তন উন্নতি দরকার। তার জন্য মানুষের মধ্যে উপলব্ধি জাগাতে হবে। রাজনীতিবিদদের, বিশিষ্ট নাগরিকদের লেখক-শিল্পীদের মধ্যে সদিচ্ছা উন্নত চিন্তা-চেতনা দরকার।

 

আমাদের মূল্যবোধ নৈতিক চেতনার উন্নতির জন্য কি করা প্রয়োজন? আপনার কি মনে হয় দেশে-সমাজে স্বাধীন চিন্তাশীলতার সুযোগ কমে যাচ্ছে?

আবুল কাসেম ফজলুল হক : ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় নঞর্থক ঘটনা। বঙ্গবন্ধু পরিবার, সেরনিয়াবাত পরিবার, শেখ মণি পরিবার সেদিন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। তারপর যারা ক্ষমতায় এসেছেনÑ খন্দকার মোশতাক, সেনাপতি জিয়া, সেনাপতি এরশাদÑ তারা ইতিহাসের গতিধারাকে বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। যারা আমাদের রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক তারা এসবের দ্বারা অবশ্যই প্রভাবিত হয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রত্যক্ষ কারণ পরোক্ষ কারণ বিবেচনায় নিয়ে গোটা বিষয়টিকে বুঝতে হবে। রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের নীতি, জিয়াউর রহমানের নীতি এরশাদের নীতিতে অনেক পার্থক্য আছে। সংক্ষেপে বিষয়ে কিছু বলা ঠিক হবে না।

 বিশ্ব ইতিহাসের অনন্য অধ্যায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার পর আমরা ইতোমধ্যে ৫০ বছর অতিক্রম করেছি। যে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ, এবং সার্বিক মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মানুষ সেই লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পূরণের পথে আমরা কতোটা এগিয়েছি?

আবুল কাসেম ফজলুল হক : ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আমি জীবনে প্রথম মিছিলে যাই। তখন আমি স্কুলে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। সেদিন অন্যদের সঙ্গে আমি স্লোগান দিয়েছিলাম, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, নুরুল আমিনের কল্লা চাই।... পঞ্চাশের ষাটের দশকে প্রগতিশীল সব আন্দোলনেই আমি সক্রিয় ছিলাম। রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে মার্কসবাদ গ্রহণ করেছিলাম, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পরে রাজনীতি থেকে সরে এসেছি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছিÑ সবই ঠিক কথা। মুক্তিযুদ্ধকালে পরিচিত অপরিচিত কিছু মুক্তিযোদ্ধাকে খাবার দিয়ে, আশ্রয় দিয়ে সহায়তা করেছি। রাজনীতির মাধ্যমে যা করতে চেয়েছিলাম, পরে তা লেখার মাধ্যমে করতে চেয়েছি এবং এখনও করছি। মার্কসবাদী রাজনীতিতে যাদের সঙ্গে আমি ছিলাম তাদের ধারায়, এবং অন্য ধারাগুলোতেও, যে অবস্থা দেখেছিলাম, তাতে এদেশে মার্কসবাদী কোনো ধারাকেই আমার কাছে ঠিক পথে চলছে বলে মনে হয়নি। এজন্যই ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর আমি রাজনীতি থেকে সরে এসেছি। ছয়দফা আন্দোলন শেখ মুজিবের নেতৃত্বের প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল হই। সেই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধকালে তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বের প্রতিও আমি শ্রদ্ধাশীল হই। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই আমি কোনো সাংগঠনিক সংযোগে যাইনি। আমার লেখার মধ্যে আমার মনোজীবনের পরিচয় আছে। এখনও লিখি। আগের মতো পারি না। দেশের রাজনীতির তো উন্নতি দেখি না। হিংসা-প্রতিহিংসায় ভালো সবকিছু নষ্ট হয়ে যায়।

 অনেকেরই অভিযোগ আছে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের অনেক প্রত্যয়ই হারিয়ে গেছে। কিভাবে আমাদের আবার সেই জায়গায় ফিরে যাওয়া সম্ভব বলে মনে করেন?

আবুল কাসেম ফজলুল হক : ইংরেজ শাসকেরা ভারতের রাজনীতিতে CommunalismÑ বাংলায় সাম্প্রদায়িকতাবাদ কথাটা চালু করেছিলেন। তারা যে কর্মনীতি নিয়ে ভারত শাসন করতেন তাতে Devide and rule policy ছিল একটি মূলনীতি। এতকাল পরেও আমরা সেই শব্দটি ব্যবহার করে চলছি। ইংরেজরা nationalism-এর স্থলাভিষিক্ত করেছিলেন Communalism-কে। এখন তো আমরা ধর্মের পুনরুজ্জীবন দেখছি। পুরাতন পরিত্যক্ত সব সংস্কার-বিশ্বাসের পুনরুজ্জীবন দেখছি। যারা হিন্দুমন্দির, হিন্দুবাড়ি লুট করছে তারা তো দুষ্কৃতকারী। তাদেরকে সমাদর করে সাম্পদ্রায়িক বলা হয়, কেন? তারা কোন সম্প্রদায়ের লোক? গণতন্ত্র সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতার মধ্যে ধর্মের পুরাতন সংস্কার-বিশ্বাসের পুনরুজ্জীবন ঘটছে। আদর্শহীন বাস্তবতার মধ্যে ধর্ম পরিত্যক্ত পুরাতন সংস্কার-বিশ্বাসের পুনরুজ্জীবন ঘটছে। আমি মনে করি, সর্বজনীন গণতন্ত্রের ধারণা উদ্ভাবন অবলম্বন করে রাজনীতির পুনর্গঠন করা হলেও সমস্যা সমাধানের উপায় পাওয়া যাবে। স্বতঃস্ফূর্তভাবে হবে না, চেষ্টা লাগবে। যুগান্তকারী নতুন চিন্তা চেষ্টা লাগবে।  

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা