× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জন্মদিনের শ্রদ্ধা

পৃথক প্লাবনের কবি হেলাল হাফিজ

সিরাজুল ইসলাম আবেদ

প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০২৩ ১২:৪৩ পিএম

হেলাল হাফিজ, ৭ অক্টোবর ১৯৪৮

হেলাল হাফিজ, ৭ অক্টোবর ১৯৪৮

বয়স পনেরো কি ষোলো। প্রেম আসি আসি করেও আসে না। রাজনীতির মারপ্যাঁচ- মিছিল-মিটিং-স্লোগান, উত্তপ্ত রাজপথ। কিছু ধরা দেয় বাকি সব অধরা। তরুণ হাতে হঠাৎ এসে ধরা দেয় হেলাল হাফিজ।

কমলা-সবুজ আঁকা প্রচ্ছদ- যে জলে আগুন জ্বলে। মলাট ওল্টাতেই পাতায় পাতায় শিহরন জাগে। ভীষণ ঝাঁকুনি দিয়ে যায়, শহর-নগর-বন্দর ছাড়িয়ে গ্রাম-গঞ্জ-হাট।

-কী আছে কাব্যে?

দূর পাড়াগাঁয়ে তরুণ বুঁদ হয়ে পড়ে। একবার, দুবার, অসংখ্য বার পড়ে। তবু ঘোর কাটে না। বরং মননে-মগজে ঠাঁই করে নেয়- ‘মিছিলের সব হাত/কণ্ঠ/পা এক নয়’।

কী চরম সত্য, কত সহজে বলা! এমন করে এর আগে কেউ বলেছে কখনও?

তরুণ আবার পড়ে- ‘এরকম দুঃসময়ে যদি মিছিলে না যাই,/উত্তর পুরুষে ভীরু কাপুরুষের উপমা হবে। ’-অলক্ষ্যে তরুণের শিরদাঁড়া টানটান হয়ে যায়। কথা বলে ওঠে ‘অশ্লীল সভ্যতা’- ‘নিউট্রন বোমা বোঝ/ মানুষ বোঝ না।’

তরুণের চেতনায় চলে অনুরণন। কবির রাগ, ক্ষোভ, হাহাকারের উচ্চারণ তরঙ্গ তোলে ইথারে ইথারে। প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দেয় ব্যক্তি, রাষ্ট্র, সমাজÑ লোকদেখানো জাতিমোর্চার সাইনবোর্ডে। মাত্র দুই লাইনের কবিতার কী প্রচণ্ড শক্তি! অনুভবে শরীরের প্রতিটি লোম দাঁড়িয়ে যায়। অথচ কি সহজ, শান্ত, শৈল্পিক উচ্চারণ কবির। তরুণের ঘোর আরও ঘনীভূত হয় যখন কবি বলে ওঠেন, ‘কথা ছিল একটি পতাকা পেলে/আমাদের সব দুঃখ জমা দেবো যৌথ-খামারে,/সম্মিলিত বৈজ্ঞানিক চাষাবাদে সমান সুখের ভাগ/সকলেই নিয়ে যাবো নিজের সংসারে।’

শুধু তো পার্থিব অপ্রাপ্তি, সংগ্রাম আর দ্রোহের রূপকল্প নয়; জীবন মথিত করে লেখা কাব্যশ্লোকে কবির প্রেম এসে মিশে গেছে বিষাদ হৃদয়ে।

‘ইচ্ছে ছিলো রাজা হবো/তোমাকে সম্রাজ্ঞী করে সাম্রাজ্য বাড়াবো,/আজ দেখি রাজ্য আছে/রাজা আচ্ছে/ইচ্ছে আছে,/শুধু তুমি অন্য ঘরে।’ তরুণের এবার পাগল হওয়ার উপক্রম। সে ভাবে, কতটা শক্তি ক্ষরণ করলে কবি ‘প্রস্থান’ পর্বে বলতে পারেন, ‘আর না হলে যত্ন করে ভুলেই যেও, আপত্তি নেই।/গিয়ে থাকলে আমার গেছে, কার কী তাতে?/আমি না হয় ভালোবেসেই ভুল করেছি, ভুল করেছি,/নষ্ট ফুলের পরাগ মেখে/পাঁচ দুপুরের নির্জনতা খুন করেছি, কী আসে যায়?/এক জীবনে কতটা আর নষ্ট হবে,/এক মানবী কতটাই বা কষ্ট দেবে!’

অথবা

‘আমি তো গিয়েছি জেনে প্রণয়ের দারুণ আকালে/নীল নীল বনভূমির ভেতরে জন্মালে/কেউ কেউ চলে যায়, চলে যেতে হয়,/অবলীলাক্রমে কেউ বেছে নেয় পৃথক প্লাবন,/কেউ কেউ এইভাবে চলে যায় বুকে নিয়ে ব্যাকুল ভাঙন।’ এবার কবির হৃদয়ের বেদনা তরুণের বুকে এসে বিঁধে! উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প ভিন্ন বাঙময়তা নিয়ে হাজির হয়। এ স্বর একেবারে অন্য। পৃথক প্লাবনে এ নদীর পথচলা।

তরুণের ইচ্ছে জাগে, কবির সঙ্গে দেখা করবে। কিন্তু কোথায় পাবে তারে, তাহার মনের মানুষ যেরে।

দুই

এর মাঝে বহু নদী মরে যায়। মগড়ার বুকে ময়লার ভাগাড়, ব্রহ্মপুত্রে জাগে চর। বুড়িগঙ্গার উচ্ছল জল কালো তখন বিষে। ভাগ্য অন্বেষণে তরুণ সেই নদীতীরে, হঠাৎ কবিকে পায় একই ছাদের নিচে। আবেগে টগবগ অনুভূতি স্তিমিত করে তরুণ কবিকে দেখে। সামনে থেকে ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’র কবি ‘নিখুঁত স্ট্র্যাটেজি’র কবি, কষ্টের ‘ফেরিওয়ালা’কে মেলানোর চেষ্টা করে কল্পনার ছবির সঙ্গে। কাছে থেকে ধরতে চেষ্টা করে কবির প্রেম, দ্রোহ, বিরহ এবং বেদনার রঙ। কিন্তু পরিণত কবির মাঝে যৌবনের সেই উদ্দাম খুঁজে পাওয়াই দায়। সৌম্যকান্তি কবি কর্মস্থলের গেটে রিকশা থেকে নেমে ধীর পায়ে হেঁটে যান। কোনো অস্থিরতা নেই, তাড়া নেই। মাটির দিকে চেয়ে যখন হাঁটেন, মনে হয় মাটির আরও গভীরে তার দৃষ্টি। একসময় কাছে ডাকেন। এক দিন, দুই দিন, মাস, বছর- কথা চলতেই থাকে। উঠে আসে কবির জীবনের নানা গল্প। যেন ঠিক গল্প নয়, স্যালুলয়েডের ফ্রেমে বাঁধা দৃশ্যকাব্য।

দৃশ্যকাব্য-১ : দাদির কোলে চেপে শেষবার দেখেছিল মায়ের মুখ। আবছা মনে পড়ে।- বাড়ি ভর্তি মানুষ। তিন বছরের শিশুর মৃত্যু নিয়ে কীইবা অনুভূতি থাকে। কিন্তু দিন যতই গড়িয়েছে সেই কষ্ট এসেছে ফিরে ফিরে।কয়েক গুণে।

দৃশকাব্য-২ : মায়ের অবর্তমানে স্কুলশিক্ষক বাবাই ‘আম্মা ও আব্বা’। অবুঝ ছেলেকে বোঝাতে নকল মা সাজেন। ফিডারে দুধ লুকিয়ে নিয়ে, মিথ্যা স্তনদানের অভিনয় করেন।

দৃশ্যকাব্য-৩ : আজন্ম স্নেহের কাঙাল কবি। স্নেহের ছায়া খুঁজে পান স্কুলশিক্ষক সবিতা সেনের কাছে। সেই স্নেহ-মায়ায় কখন কীভাবে যে ফ্রয়েড ঢুকে পড়েন? আজও তা অজানা রহস্য হয়ে আছে। বুঝতে পারেন যখন, সবিতা মিস্ট্রেসের প্রিয় কচুরিপানার ফুল কবিরও প্রিয় হয়ে যায়। বেগুনি সেই ফুল আজও হাওয়ার তোড়ে থরথর করে কাঁপে।

দৃশ্যকাব্য-৪ : শৈশবে নিজ শহরেই পরিচয়। কাছাকাছি বয়স। নাম হেলেন। এক সিঁদুররঙা সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিরীষতলায় সেই হেলেন বাজালেন বিদায়ের সুর। আর বিষপানে কবি হলেন নীলকণ্ঠ।

দৃশ্যকাব্য-৫ : আন্দোলনে উত্তাল দেশ। খোঁয়ারি রাত। কোনো এক দেহাতি মানুষের মুখ থেকে তুলে নিয়েছিলেন কথাটা। তারপর নির্ঘুম কয়েক দিবসরজনি। লেখা হলো ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’। এক সকালে কবির সঙ্গে নগরবাসীও অবাক হয়ে দেখল, নগরের সব দেয়াল ভরে গেছে একটি কবিতায়-

‘এখন যৌবন যার, মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়

এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’

দৃশ্যকাব্য-৬ : প্রেস ক্লাবের কার্ডরুম। রীতিমতো সেলিব্রিটিতে ভরপুর থাকত। সাংবাদিক ছাড়াও সংস্কৃতি অঙ্গনের বড় বড় ব্যক্তিত্ব, বড় ব্যবসায়ী ছিলেন অনারারি মেম্বার। তারাও ক্লাবে তাস খেলতে আসতেন। সাঁতারু ব্রজেন দাস, সংগীত পরিচালক সমর দাস, গায়ক মাহমুদুন্নবী, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী জাহেদুর রহিম, কবিদের মধ্যে আসাদ চৌধুরী, নির্মলেন্দু গ‍ুণ আর কবি তো ছিলেনই। তারকা সাংবাদিক আবদুস সালাম, এনায়েতুল্লাহ খান, এ বি এম মূসা, এম আর আখতার মুকুলের পদচারণে কার্ডরুমে আলোর ফোয়ারা ঝরে। অধিকাংশই অবশ্য ব্রিজ খেলেন। কিন্তু বেকার কবির প্রয়োজন টাকার। সে প্রয়োজন মেটাতেই খেলতেন হাইড্রোজেন। গ্যাম্বলিং হয়ে যায় কবির জীবিকানির্বাহের পথ।

দৃশ্যকাব্য-৭ : কোনো এক সাহিত্য আসর শেষে এক অন্ধ সাহিত্যমোদী এসে কবির পাশে বসলেন। পরিচয় পেয়ে একসময় তিনি কবিকে বলেন, ‘অন্ধ হলেও দুটি জিনিস আমি দেখতে পাই। এক. আমার স্ত্রীর গায়ের রঙ। কোথায় কালো, কোথায় ফরসা আমি দেখতে পাই। আর দ্বিতীয়টি আপনার কবিতার “পাথরচাপা সবুজ ঘাসের সাদা কষ্ট”- সেই কষ্টটা আমি শুধু অনুভবই করি না, দেখতেও পাই।’ কবি নিশ্চুপ হয়ে যান।

তিন

১৯৮৬ সালের পর দীর্ঘ বিরতি। প্রায় ৩৪ বছর পর ২০১৯ সালে তরুণ হাতে পায় দ্বিতীয় মৌলিক কাব্যগ্রন্থ ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’। যখন কবি অনেক পরিণত। বেদনাহত কবি লেখেন, ‘আজন্ম মানুষ আমাকে পোড়াতে পোড়াতে কবি করে তুলেছে,/মানুষের কাছে এও তো আমার এক ধরনের ঋণ।/এমনই কপাল আমার/অপরিশোধ্য এই ঋণ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।’

তার পরও কবি কখনোই হতাশ নন। বয়স হয়েছে। নানা রোগে-শোকে-সন্তাপে শরীর হয়েছে কাবু। যেতে পারেন না প্রিয় প্রেস ক্লাব, হয় না আড্ডা ভক্ত-বন্ধু কুলে। অনেকেই ছেড়ে গেছেন। তবু নিঃসঙ্গ হোটেলের ৬ ফুট বাই ১০ ফুট কক্ষে বসে ৭৫-এর কবি বলে ওঠেন, ‘সবাই জমায় টাকা,/আমি চাই মানুষ জমাতে।’ তরুণ এবার আর বিস্মিত হন না। তার আগেই জানা হয়ে গেছে কবির ভাষ্য, ‘আমি তো কাঙাল ঘুড়ি,/বৈরী বাতাসে কী আশ্চর্য/একা একা আজও উড়ি!’

কবি একদম একা। এখনও উড়ে চলেছেন। ৭৬তম জন্মদিনের আগে একটিই চাওয়া- নীরোগ জীবন হোক। শুভ জন্মদিন কবি। 


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা