আনিসুল হক
প্রকাশ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৮:৪৬ পিএম
যখন আকাশ ঢেকে
গিয়েছিল ধাতব চাদরে ছিদ্রহীন
যখন পৃথিবী
আলোকশূন্য তমসায় ছিল অন্তরীণ
যখন শহর বিরান
শূন্য প্রাণহীন মৃত পাথরপুর
গলিতে হঠাৎ
সাইরেন বাজে, অ্যাম্বুলেন্সে মৃত্যুসুর
যখন মানুষ
মানুষের কাছে যেতে পারছে না, যাওয়া মানা
যখন আঙুল আঙুল
ছোঁবে না, সান্নিধ্যের উষ্ণতা না
যখন মমতা মানে
ছিল শুধু নিজের জন্য মায়া করা
যখন বাঁচার
মানে ছিল শুধু নিজ দেহে প্রাণটুকু ধরা
তখনও ঘরের
দরজায় এসে টোকা দিয়েছিল শুধু আশা
আমাদের কাঁধে
হাত রেখেছিল ভরসা দিয়েছে মৃদু আশা
আমাদের মুখে
ভাতের লোকমা তুলে দিয়েছিল প্রীত আশা
মার আঁচলের
গন্ধের মতো মায়ায় জড়ানো মিত আশা
বড় ভগিনীর
আঙুলের বিলি চুলে কেটেছিল গাঢ় আশা
দয়িতার ভেজা
চুলে গামছার বেণী বেয়ে ঝরে আরও আশা
২.
আমাদের আর
বাইরে যাওয়ার কথাই ছিল না
ছিল আশা
আমাদের আর
রোদে ভিজবার কথাই ছিল না
ছিল আশা
আবার জমবে
মেলা বটতলা কথাই ছিল না
ছিল আশা
৩.
বালকের হাতে
চরকির মতো ঘুরছে পৃথিবী পশ্চিমে পুবে
উঠবে না ভাবি
তবুও সূর্য আনছে সকাল রোজ সাঁঝে ডুবে
রোদ্দুর এসে
জানালায় নাচে লোবানের ঘ্রাণ ঘর ছেড়ে যায়
স্বজন হারানো
ভেজা চোখ মুছে সামনের দিকে মানুষ তাকায়
ইশকুলে বাজে
ঘণ্টার ধ্বনি নামতার সুরে ভরে প্রাঙ্গণ
মেলায় রঙিন
চুড়ি ফিতা মালা নিয়ে এসে বসে বেদেনির বোন
প্রথম শাড়ির
আঁচল সামলে কিশোরীরা কেনে চুড়ি হাত ভরে
কোছা ভরে রাখা
রঙিন সওদা, স্বপ্নরা জাগে সারা রাত ভরে
আমরা আবার
জল মুছে হাসি ফোটাই আঁখির পল্লবে
আমরা আবার
সশরীরে মিলি হাটে মাঠে ঘাটে উৎসবে
৪.
কিন্তু আবার
সূর্যগ্রহণ সকালবেলায় আকস্মিক
আকালের সুর
আঁধি ডেকে আনে আলোর মেলায় কী ভৌতিক।
আবারও আঁধার
আবারও হতাশা আবারও অমঙ্গলের সুর
থাবা মেলে
ধরে জনপদে ঘরে, ভয়ে কেঁপে ওঠে হৃদয়পুর
লাইটপোস্টে
বাতি নিভে যায়, পশুপাখি ছোটে ত্রস্ত পায়,
বাবার কপালে
চিন্তার রেখা, মা যেন আকাল দেখতে পায়।
কী হলো আবার,
ভেবে বারবার, বিজ্ঞ দ্রষ্টা বলতে চান,
এবার শত্রু
ভাইরাস নয়, মানুষই আনছে অকল্যাণ :
চড়ুইপাখির
প্রধান শত্রু বাজপাখি নয়
হরিণদলের প্রধান
শত্রু বাঘদল নয়
নদ ও নদীর
প্রধান শত্রু মরুভূমি নয়
বনবনানীর প্রধান
শত্রু দাবানল নয়
মানুষজাতির
প্রধান শত্রু ভাইরাস নয়
মানুষের বড়
শত্রু ভীষণ মানুষদল
৫.
কিষানি মায়েরা
আকাল ঠেকাতে হাঁড়িতে যখন রাখে বীজধান
পান খাওয়া
দাঁতে তখনও ঝিলিক দিচ্ছে করুণ হাসি আর গান
মানুষের যদি
মৃত্যুও হয়, তবুও মানব ঠিকই থেকে যায়
সাতটি তারার
তিমির আবার আলোর কোরাস নয়া সুরে গায়
শঙ্খচিলের
ডানায় রৌদ্রে নবান্ন দিনে ধানসিঁড়ি তীরে
জীবনানন্দ
দাশের কিশোরী পায়ে ঘুঙ্গুর আসে ফিরে ফিরে
বটের গাছের
ছায়ায় একটু জুড়োতে বসেন ক্লান্ত পথিক
মাথার ওপরে
ঝরে পড়ে তার মমতার মতো লাল বটফল
পাতায় শাখায়
ছোটাছুটি করে দোয়েল চড়ুই টুনটুনি দল
ডানায় পাখায়
রোদ্দুর পড়ে চঞ্চুতে আলো দিচ্ছে ঝিলিক
পাশে এসে বসা
ফেরিওয়ালা বেচে খেলনা পুতুল লাল রঙে আঁকা
ছোট্ট নাতনি
খুশি হবে খুব প্রবীণ খোঁজেন শেষ কটা টাকা
পাখি ডেকে
বলে : ভালো থেকো খুব তোমরা মানুষ
বটছায়া বলে
: ভালো থেকো খুব তোমরা মানুষ
সাদা মেঘ বলে
: ভালো থেকো খুব তোমরা মানুষ
আকালের ছায়া
মুছে যায় দূর অবারিত মাঠ দিগন্ত থেকে
চনমনে রোদ
ধানক্ষেত জুড়ে ছায়াকে তাড়ায় আশা নেয় ডেকে
বছর শেষের
সূর্য ডুবলে অচেনার পাড়ে অজানা পাড়ায়
নতুন দিনের
সুনন্দ আলো ভোর হয়ে আসে কুয়াশা তাড়ায়
আকালের ধ্বনি
ফিকে হয়ে আসে, আসবে সুদিন ডেকে ওঠে পাখি
ধনুকব্যবসা
ছেড়ে দিয়ে ওরা বিনিময় করে প্রীতিভরা রাখি
দিগন্তজুড়ে
রোদ পড়ে আছে, দোরে আলপনা, সোনারোদ কাঁচা।
রোদ্দুর মানে
আশা প্রণোদনা, ভালোবাসা আর আলো নিয়ে বাঁচা।