নাসির আহমেদ
প্রকাশ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৮:১০ পিএম
নদী ও সমুদ্রঘেরা
এই বদ্বীপের নীল নিসর্গ বলয়ে
তোমার অস্তিত্ব
আমি এঁকেছি শৈশবে এই হৃদয়-মানচিত্রে,
মায়ের আদুরে
ডাকে প্রথম চিনেছি তুমি মাতৃকণ্ঠস্বর
আমার সমস্ত
সত্তাময় তুমি বেজে যাচ্ছো মুগ্ধ কলস্বরে।
ধমনির ধ্বনি
এই আশ্চর্য নিসর্গঘেরা শ্যামলী স্বদেশ-
তাকেও চিনেছি
সে তো তোমারই সত্তায় পেয়ে আত্মপরিচয়।
মায়ের স্নেহের
ওই আঁচলটা ছুঁয়ে ছিলে আমার সঙ্গেই,
‘আয়রে বুকের
ধন বাবাসোনা তুই!’-
তোমারই আশ্রয়ে মা’র এই উচ্চারণ!
তোমাকে ভাবতে
গেলে রক্তে ঝলসে ওঠে যেন বিদ্যুৎ-তরবারি!
আমি যে বাঙালি,
সেই সূত্র তো তোমারই কাছে, তুমি প্রাণবায়ু!
তোমার সত্তার
কাছে সমর্পণে এই আমি চিনেছি নিজেকে,
স্বদেশ এবং
মাকে অভিন্ন জেনেছি সেই কবে ‘মা, মা’ বলে!
প্রতিটি ধ্বনির
মধ্যে প্রতিধ্বনিত তুমি অভিন্ন দেশকাল,
যেন বা জননী
চিরমানবের কণ্ঠস্বরে অভিন্ন বোধের।
সমতার-মমতার
আশ্চর্য প্রতীক তুমি! আমৃত্যু সত্তার উচ্চারণ,
সাদাকালো ভেদহীন
পূর্ণাঙ্গ আবেগ তুমি বিচিত্র অক্ষরে।
কী করে বিচ্ছিন্ন
ওরা করতে চেয়েছে সেই শাশ্বত আবেগ!
দেহ থেকে মাথা
কেটে নিলে কি প্রাণীর আর অস্তিত্ব থাকে!
তুমি যেন চিরন্তন
সেই মাথা, যার সঙ্গে হৃদয়ের যোগ
জীবনসংযোগ
তুমি মূর্ত কর মানুষের নিত্য উচ্চারণে।
যখন তোমাকে
ভাবি চেতনায় ঢেউ তোলে ক্ষুব্ধ ইতিহাস,
সন্তান হারানো
মা’র দীর্ঘশ্বাসে
দীর্ণ হয় আজও এই দেশ!
ফাল্গুনে আগুনঝরা
দুরন্ত বাতাসে ঝরে পলাশ-শিমুল;
কোকিলের কুহুস্বরে
যেন শোক ঝরে পড়ে তীব্র আর্তনাদে!
ভুলব কী করে
সেই শিকড়-বিস্তৃত ত্যাগে পাওয়া মাতৃভাষা!
প্রথম মা-ডাক
দেওয়া সেই তীব্র ভালোবাসা বাঙময় সত্তায়,
জীবনানন্দের
প্রিয় রূপসী বাংলার এই মানচিত্র ছেড়ে
ছড়িয়ে পড়েছ
বিশ্বে রক্তের অক্ষরে লেখা অমর একুশ!
বাংলার প্রকৃতি
জুড়ে ফুটে থাকা অগণিত লাল-সাদা ফুল-
প্রতিটি বসন্তে
যেন স্মরণ করিয়ে দেয় সেই ইতিহাস-
বুকের শোণিতে
যারা লিখে গেল জননীর মহিমাগৌরব-
অমর সোনার
ছেলে, ভাইয়েরা আমার আজ রক্তিম পতাকা।
কালো পতাকার
শোক রূপান্তর হয়ে গেছে মহান অর্জনে,
লালসবুজের
ওই পতাকায় সমবেত সোনার স্বদেশ
অগণিত শহীদের
পুরোভাগে বায়ান্নর আজও সে বীরেরা
পথিকৃৎ হয়ে
জ্বলে উজ্জ্বল তারকা, কণ্ঠে আজও তুমি ভাষা।
হাজার নদীর
স্রোতে, উত্তাল সমুদ্রে ওঠা সকল তরঙ্গ
সমস্বরে গেয়ে
যায় প্রবল উচ্ছ্বাসে মাতৃভাষারই জয়গান
শত গণঅভ্যুত্থান
সুপ্ত এ মাটির নিচে, কেন্দ্রে তুমি তারই
আমার প্রাণের
ধ্বনি রক্তে ভেজা ফেব্রুয়ারি মাতৃউচ্চারণ!
এ বাংলার মেঠোপথ,
আলপথে রৌদ্রজলে যে আলো চমকায়,
তার সবটুকু
জুড়ে সূর্যের অধিক সূর্য তুমি অনির্বাণ!
শ্বাপদসংকুল
পথ দুঃসাহসে পাড়ি দিচ্ছি আজও সে আলোয়
সোনার বাংলার
রোদে- জ্যোৎস্নায় লাবণ্যময়ী তুমি মাতৃভাষা!
যা কিছু বলার
ছিল সবই তো বলেছে দেশ তোমারই ভাষায়,
নক্ষত্ররাজির
মতো শহীদস্বজন জেগে আছে চেতনায়।
যখন তোমাকে
ভাবি শৈশবের পাঠশালা থেকে ভেসে আসে
নামতার কোরাস!
আহা, প্রিয় মাতৃভাষা আজও ডাক দিয়ে যায়!
শতাব্দী পেরিয়ে
যাবে আমার প্রাণের প্রিয় এই বর্ণমালা,
প্রতিটি অক্ষরে
দেখি আমার মায়ের মুখ আর ছেলেবেলা।
তাইতো বুঝেছি
সার- একুশ একটিমাত্র শব্দ-অঙ্ক নয়,
বোধের গভীরে
সে তো অনির্বাণ রক্তস্নাত স্বদেশেরই মুখ!
মাঝে মাঝে
মনে হয় আমারই একান্ত তুমি নও মাতৃভাষা
বিশ্বমানবেরও
তুমি হৃদয়ের ধ্বনি, যেন সমস্ত পিপাসা
মেটায় পরম
তৃপ্তি, প্রখর চৈত্রের পোড়া উত্তপ্ত তৃষ্ণায়
শ্রাবণের জলধারা
প্রাণে প্রাণে বয়ে যায় শান্তি-ভালোবাসা।
তুমিহীনতায়
প্রাণ কী করে বাঁচতে পারে, যেন অক্সিজেন
সবুজ পাতার
মধ্যে সুপ্ত ক্লোরোফিল তুমি নিঃশ্বাসে অম্লান!
দীর্ঘ পরবাস
শেষে ফিরে আসা যুবকের জননী-দর্শন-
ততোধিক আবেগের
তুমি তো প্রাণের তৃষ্ণা অনির্বচনীয়।
রূপসী বাংলার
বুকে রূপের পেখমমেলা আশ্চর্য ময়ূর!
এ উপমাও নয়
যথার্থ তোমার, যেন
ব্যাখ্যাতীত দূরাগত সংগীতের সুর!