ময়ুখ চৌধুরী
প্রকাশ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৮:০৪ পিএম
হে কবিতা,
আমরা তোমার
গুনাহ্গার,
আমাদের মাফ
করে দাও।
যখন তখন খুশি
তোমাকে মেরেছি টান
শুইয়ে দিয়েছি
শাদা কাগজের
বিছানায়।
তুমি ভালো
আছো কি-না, শরীর ভালো কি মন্দ
জানতেও চাইনি।
তোমার নির্বেদ
দেহে বন্য শূকরের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছি;
তোমার প্রতিটি
ঢেউয়ে, প্রতিটি ঢেউয়ের খাঁজে
কালো কালো
অক্ষরের কীট
ছড়িয়ে দিয়েছি।
প্রতিটি শব্দের
গায়ে নখের আঁচড়,
অলংকৃত প্রতি
অবকাশে
প্রোথিত শব্দের
গায়ে লালা আর বিষধর থুতু।
রাতজাগা ভালোবাসা
মোটেও ছিল না, তবু ছুঁয়েছি শরীর; অতঃপর
তোমার বিস্রস্ত
দেহ যত্রতত্র পাচার করেছি।
হে কবিতা,
তুমি অসহায়
চিৎ হয়ে শুয়ে
থাকা আদিম পসরা,
চাররঙা অফসেটে
খুব ভোরে চোখ কচলে ওঠো।
তোমাকে আমরা
দাঁড় করিয়েছি যেখানে সেখানে-
ফুটপাতে, ইস্টিশানে,
বাস-টার্মিনালে। তুমি দৃশ্যময়ী
গর্ভবতী পাগলি
বোবা মেয়ে।
আমাদের অনর্গল
অন্ধকার পান করে করে
পশুত্বের পাণ্ডুলিপি
তুমি।
থেকে থেকে
প্ল্যাটফর্মে বমি,
‘দূর হ দূর
হ’ বলে পালিয়ে বাঁচতে চায় দুর্বল মুখোশ।
ভদ্রলোক ফেলে
গেছে লাল পিক পানের দোকানে, অন্ধকারে।
কোনো এক ভোরে
বিশেষ সংখ্যার
মতো অন্য রকমের লাল রঙে কেঁদে ওঠে
আমাদের নির্লজ্জ
কবিতা।
কান্নার পরেই
অনড়তা, শব্দহীনতাকে
চুরমার করে
দেওয়া একটানা হাসির বিদ্রুপ
সেই সঙ্গে
চোখে পানি। আমরা চাদর টানি
অন্ধকার মুখের
ওপর। হে কবিতা,
ক্ষমা করো
ক্ষমা করো, আমরাই অন্ধকার পিতা।
তোমাকে বুঝিনি
তবু উপগত হয়েছি ভীষণ
চতুষ্পদ জন্তুর
মতন। হামাগুড়ি দিয়ে
রোমশ রাতের
বুকে শব্দবিদ্ধ করেছি তোমাকে।
আমাদের জঘন্য
নির্যাস
কালি আর কালিমাকে
পুঁতে দিচ্ছি তোমার ভেতর।
হাসছো কাঁদছো
তুমি, ভুলে যাচ্ছো যথারীতি; তবু
রচিত হচ্ছো
না যথাযথ।
শব্দের খোলস
থেকে বের করে দেখিনি তোমাকে,
কেবল পাতাল
খুঁড়ে উন্মোচন করেছি আঁধার,
শব্দের সড়ক
শেষে পাইনি নরকও স্মরণীয়;
র্যাঁবো নই
শার্ল নই- আমাদের ক্ষমা করে দিও।
হে কবিতা,
মৃতবৎসা,
আমাদের অক্ষমতা
করে দাও ক্ষমা,
সম্মিলিত গ্লানি
আজ তোমার পায়ের কাছে
দিতে চাই জমা।
কৃপা করো আমাদের
ভালোবাসাহীন
দুটো সরীসৃপ হাত-
সেখানে ফিরিয়ে
দাও বাল্মীকির প্রাক্তন মহিমা,
অভিশাপমুক্ত
হোক পশ্বাচারী কালি ও কলম।
তুমি শেষবারের
মতন
গোসল করিয়ে
দাও প্রতিটি শব্দকে,
কর্পূরের পবিত্রতা
দাও;
অলিখিত কাগজের
মতো
দাও শাদা কাফন
পরিয়ে। অনাবিল অন্তিম অর্জন।
ধন্য হোক বিসর্জন,
মৃত শব্দ বুকে তুলে নাও,
ধুয়ে দাও কলঙ্ক
সবার।
শুধু একবার,
শেষ বার
মাথাটা রাখতে
দাও তোমার চরণতলে কবিতাজননী,
তোমার ক্ষমার
যোগ্য করো,
সবুজ লোবান
জ্বেলে ঢেকে ফেলো আমাদের অবুঝ শব্দের ইতিহাস।
তারপর আমাদের
স্তব্ধতার ’পরে
ক্ষমার বকুলই
যেন ঝরে।