ইরাজ আহমেদ
প্রকাশ : ৬ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৬ ঘণ্টা আগে
কোনো এক বছরে ধুলা উড়িয়ে কয়েক বন্ধু চলেছি জঙ্গলের দিকে। জঙ্গল না বলে তাকে অরণ্যই বলা ভালো।
শুনেছি সেখানে একসঙ্গে বিশাল বিশাল গাছের মাথা মেঘের মতো জড়াজড়ি করে থাকে। জেনেছি, পাতা ঝরে, আবার নতুন পাতায় আলো পড়ে ঝলমল করে। কেউ বলেছে, অরণ্যের সবুজকে ময়নাতদন্তের টেবিলে অজ্ঞাত কারও হাঁ হয়ে থাকা বুকের মতো দুই খণ্ড করে রেখেছে একটা ট্রেনলাইন; মাঝে মাঝে ট্রেন যায়।
সঙ্গে ব্যাগ, ক্যামেরা, শুকনো খাবার আর যা কিছু...। সে বছর শহরে বৃষ্টি
নেই বর্ষাকালেও। গাছের পাতায় ধুলার সাদা আস্তরণ, জনশূন্য চায়ের দোকান, পুরনো ছাতা,
কুকুরের বের হওয়া লম্বা জিভ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঠান্ডা ঘরের হাতছানি পেছনে ফেলে আমরা
চলেছি অরণ্য দেখব বলে। আবহাওয়া অফিসে দিস্তা দিস্তা রিপোর্ট আমাদের জানিয়েছিল, অরণ্য
আর পাহাড়ঘেরা জেলায় বৃষ্টি ঝরছে।
অরণ্যে বৃষ্টির সময়ের অনুভূতিটা অন্যরকম। হাজার হাজার বৃষ্টির ফোঁটা
কখনও জোরে আবার কখনও আস্তে ঝরে ঘুমের মতো পড়ছে চোখ-বন্ধ পাতার ওপর। কাঁঠালচাপা ফুটে
আছে কোনো পথের বাঁকে, বিশাল অশত্থ আর বটগাছের গোড়ায় পিঁপড়ের ঢিবি ভিজে যাচ্ছে, পাতা
ঝরে পড়ছে বৃষ্টির আঘাতে, কোথাও পাহাড়ি সাপ সরে যাচ্ছে মানুষের পায়ের শব্দে... চোখ বন্ধ
করলেই গলা টিপে ধরা এক শুষ্ক শহরের কবল থেকে মুক্ত হয়ে বেঁচে থাকা অরণ্যে দৃশ্যের পর
দৃশ্য। সেখানে শহরের মতো অভিনয় করছে না কোনো একটি চরিত্রও। অরণ্যে অভিনয় করার কোনো
সুযোগ নেই।
চোখ খুললেই পলকে ভেসে ওঠে টি-বোর্ডের বাংলোর বারান্দা। লাল মেঝেতে
ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা সাদা রঙ করা লোহার চেয়ার, দরজায় বোগেনভিলিয়ার ঝাড়ে আশ্রয় নিয়েছে
রোদের আগুন। বৃষ্টি কোথায়? অরণ্যই বা কোথায় যেখানে বুনো গন্ধের মতো ভেসে আসবে স্মৃতি
অথবা বিস্মৃতি?
বাংলোর ভেতরে নির্দিষ্ট চেয়ারে বসা আমরা কয়েকটি চরিত্র; অভ্যস্ত পোশাক
থেকে মুক্ত হয়ে যেন পড়েছি পাতার পোশাক। আমরা এবার অরণ্যের আত্মায় গিয়ে বসে থাকব, মাথায়
বৃষ্টি নেব, বৃক্ষের শরীরে হাত রেখে জেনে নেব বহু গল্প। গাছের গল্প, পাতার গল্প, শিকড়ে
অদ্ভুত গন্ধের গল্প, পাখিদের ঘর বাঁধার গল্প…গাছেদের কত গল্প থাকে। কান পেতে শোনার
চেষ্টা করলেই শোনা যায়, কবে মাথার ওপর প্রেমের মতো বাজ পড়েছিল, কবে একটা বড় গিরগিটি
উঠতে উঠতে প্রায় হাঁটু অবধি উঠে এসেছিল, কবে ঘন বৃষ্টিতে এক পুকুর জল জমেছিল...কিন্তু
অরণ্য কোথায়? কোথায়, কতদূরে থাকে চলচ্চিত্রের মতো সচল অরণ্য, যেখানে মানুষ আবার ফিরে
যেতে চায়?
কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় হেমন্তের অরণ্যে পোস্টম্যান হতে চেয়েছিলেন।
কতকালের পুরনো নতুন চিঠি কুড়িয়ে পেয়েছিলে। কবি আবুল হাসান কবিতায় বনভূমির ভেতরে লম্বালম্বি
অসুস্থ মানুষ হয়ে শুয়ে থাকতে চেয়েছিলেন। আমাদের কারও কোনো অসুস্থতা ছিল না। আমাদের
মধ্যে কেউ হেমন্তের অরণ্যে নতুন পুরনো চিঠি খুঁজে পেতে চাইনি। আমরা শুধু অরণ্যের কাছে
যেতে চেয়েছিলাম। মানুষ কেন অরণ্যে যেতে চায়? সেখানে গিয়ে সে কি তার অনেক কথার খই বাতাসে
উড়িয়ে দিয়ে আসে? গাছের শরীরে হাত রেখে, কখনও শুধু একটি পাতার একলা পতন দেখে অথবা অরণ্যের
মাথা ছুঁয়ে টিয়া পাখির ঝাঁক উড়ে যেতে দেখে তার হয়ত অনেক কথা সেখানেই রেখে আসতে ইচ্ছে
করে; যেসব কথা কেউ জানেনি কোনো দিন! আমাদেরও কি সেরকম অনেক কথা জমা হয়েছিল বুকের ভেতরে,
যা বলতে চেয়েছিলাম অরণ্যে গিয়ে।
আমাদের মধ্যে কেউ ক্যামেরার শাটার চাপতে চাপতে, কেউ কথার তুবড়ি ছড়াতে
ছড়াতে, কেউ শার্টের পকেটে বলপয়েন্ট কলমের মতো দুঃখকে গুঁজে রেখে, কেউ আবার চুল আঁচড়ানোর
সময়ের মতো শান্ত মুখভঙ্গিতে হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিলাম অরণ্যের কাছে; ছড়িয়ে পড়েছিলাম
সবাই হাতের রেখার মতো। ‘উডস আর লাভলি, ডার্ক অ্যান্ড ডিপ।’ অরণ্য সুন্দর, অথচ অন্ধকার
এবং গভীর...কে যেন লিখেছিলেন? কবি রবার্ট ফ্রস্ট। অরণ্য কি সত্যিই হারিয়ে যাওয়ার মতো
গভীর এবং অন্ধকার? বৃষ্টিহীন বর্ষাকালের সেই অরণ্যের কাছে আমাদের যা বলার ছিল তা কি
বলতে পেরেছিলাম? কথা হারিয়ে যায় অরণ্যের ভীষণ নিস্তব্ধতায়। হারিয়ে যাওয়াই ভালো। আজকাল
কোনো কথা আর কোথাও পৌঁছায় না। গাছের কোটরে বাঁধা কোনো অদৃশ্য ডাকবাক্সে জমা হয়ে থাকে।
আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে হয়তো একটি দীর্ঘ স্বপ্নের ভেতরে আটকা পড়ে
গিয়েছিলাম। মানুষ স্বপ্নের দাস; মৃত্যুরও। স্বপ্ন ভেঙে গেলে অলৌকিক সব দৃশ্যের মৃত্যু
ঘটে। কোনোটির ওপরেই আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। আমরা অরণ্যে গিয়ে ট্রেন আসা-যাওয়ার লাইন
খুঁজেছিলাম। ঝরনা খুঁজেছিলাম। অরণ্যের ভেতর দিয়ে ঝম ঝম শব্দ তুলে চলে যাওয়া ট্রেন,
জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকা মানুষের নানা গল্প, পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনার ধারাÑ এসবই
খুঁজেছিলাম সবাই মিলে। কিন্তু কিছুই খুঁজে পাইনি সেবার।
তাহলে কী কী পেয়েছিলাম সেই ভ্রমণে? সবুজ পাতার পোশাক পরিহিত আমরা
সবাই মুখোমুখি হয়েছিলাম কতগুলো আয়নার। সেখানে কারও মুখের প্রতিফলন ধারণ করতে পারেনি
পারদের কৌশল; আমরা অরণ্য হয়ে উঠেছিলাম সকলে এবং প্রত্যেকে। কেউ গাছ হয়ে গিয়েছিলাম,
কেউ নিঃশব্দে সরে যাওয়া সাপ হয়েছিলাম, কেউ পাতা হয়েছিলাম, কেউ মাটি, কেউ ঘাস হয়েছিলাম।
একেই কি ফেরা বলে? আত্মার মৃত্যু না ঘটলে মানুষ তো ফিরে যেতে পারে না কোথাও! সেই যে
আয়নায় আমরা কেউ নিজেদের দেখতে পাইনি তখনই কি আমাদের মৃত্যু ঘটেছিল? মৃত্যুর ভেতর দিয়ে
আমরা বদলে গিয়েছিলাম নাকি দক্ষ অভিনয়শিল্পীর মতো অভিনয় করেছিলাম? আমরা আসলে কেউ একে-অপরের
আসল মুখ দেখতে চাইনি। সেখানে প্রত্যেকের প্রতি অন্যের হিংসা, ক্রোধ, মায়া ও মমতাহীন
ভালোবাসার অভিনয়টা দেখতে চাইনি।
আমাদের চারপাশে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সেই হেমন্তের অরণ্য ছিল না যেখানে
শক্তির মনের মধ্যে ভেসে ওঠা ভাবনা তাকে বলে দিয়েছিল, আমরা ক্রমশই একে অপরের কাছ থেকে
দূরে সরে যাচ্ছি। অরণ্যের কাছে গিয়ে আমরা দূরত্বের ভেতরে ফিরে গিয়েছিলাম। কারণ অরণ্য
সত্যকে প্রকাশ করে। পাতার পোশাক আমাদের মানায়নি, সবুজ আমাদের মানায়নি, কাঠবিড়ালি অথবা
গুবরেপোকার সারল্য আমাদের মানায়নি। আমরা আমাদের মুখোশ পরা চেহারা স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলাম।
আমরা আবার শহরে ফিরে এসেছিলাম। বর্ষাকালে বৃষ্টিহীন শহর আমাদের ফিরিয়ে
নিয়েছিল। পাতার ওপর ধুলার সাদা আস্তরণ আমাদের কাঁধে হাত রেখেছিল, কেরোসিনের ঘ্রাণমাখা
ক্লান্ত চয়ের দোকান আমাদের কাছে ডেকেছিল; যেরকম প্রেম ডাকে। অরণ্যে ব্যর্থ হয়েছিল আমাদের
অন্বেষণ। বৃষ্টি আসেনি। শুকিয়ে যাওয়া ঝরনার পাশে পাথর ছড়িয়ে থাকা পাথর, সাপের স্থানবদলের
শব্দ, পাতার নিবিড় পতন, ঝিঁঝি পোকার ডাক, রাত্রিবেলা জোনাকির আলো আমাদের কাউকেই নিজের
কাছে ফিরিয়ে দেয়নি। অথচ আমরা ফিরতে চেয়েছিলাম অরণ্যের কাছে। তবু আজও শুনি, সেই অরণ্যের
ভেতর দিয়ে মধ্যরাত চিরে ট্রেন যায়। তার হুইসেলের আওয়াজ রাত্রির নিমগ্নতা ছিন্ন করে।
ট্রেনের জানালা দিয়ে কেউ তাকিয়ে থাকে অরণ্যের আত্মায় রাখা এক আয়নায় মুখ দেখার আকাঙ্ক্ষায়,
যেখানে নিজেকে দেখতে পাওয়া যায়। সঙ্গে প্রতিফলিত হয় অদ্ভুত আরও সব ছবি।