তাসনুভা অরিন
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে
মানুষের সঙ্গে মানুষের দেখা হয়, কথা হয়, স্মৃতি তৈরি হয়। একদিন স্মৃতির এই আবেশ থেকে মানুষ বের হয়ে যায়, অথবা মনের ভেতর আধো-আধো স্বপ্নের মতো থেকে যায়। গাছের সঙ্গেও কী এমন হয়?
মানুষের মতো একই গোত্রের
হওয়া সত্ত্বেও প্রতিটি গাছ আলাদা। তাদের ডালপালার প্রসারণ দেখেই বোঝা যায়, তারা
একে অপরের থেকে ভিন্ন। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের মতো গাছের সঙ্গে মানুষের
সম্পর্কও আলাদা। কোনো কোনো মানুষ গাছের ডালের বিকাশের ধরন দেখে তাদের ভাবনাচিন্তা
বুঝতে পারে। যেন এগুলো আমাদের হাতের তালুর অজস্র রেখার বিন্যাসের মতো কিছু জানায়।
বলা যায়, এ একধরনের সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ।
আমার সাথে গাছের সম্পর্ক
বহুদিন নিছক পাড়া-প্রতিবেশী ধরনের ছিল। এই যেমন রাস্তার পাশে থাকা গাছ, যাদের সবার
নাম আমার জানা নেই। রাস্তার দুই ধারে থাকা ছোট ছোট রাধাচূড়া দেখতে দেখতে ঢাকা শহরে
আমার বড় হওয়া। এখানে গাছের সাথে আমার তাই আত্মীয়তা নেই, কিন্তু দারুণ মুগ্ধতা আছে।
আমাদের বাসার রাস্তার মোড়ে ঠিক সন্ধ্যার পর কারো বাসা থেকে ভেসে আসা কামিনী ফুলের
গন্ধে আমি বুঝতে পারি, অন্ধকারে ফোটা ফুলগুলো দারুণ গন্ধময়, যেন তারা জানে তাদের
সৌন্দর্য চাঁদের সাথে জড়িয়ে আছে, তারা চোখকে না, মনকে টানে। কিন্তু ওই গাছগুলো
আমার না, আমি চাইলেও ওইসব গাছের গোড়ায় পানি দিয়ে বলতে পারব না, ‘তোমরা দারুণ
গন্ধময়।’ কিংবা আমার এমন কোনো বাড়ি নেই, যার বারান্দা কিংবা ছাদজুড়ে বাগান বানিয়ে
আমি তার ভেতর বসে থাকতে পারি। এই পৃথিবী যেমন আমার জন্য একটা ক্ষণস্থায়ী জায়গা, এই
গাছগুলোও আমার জন্য সেরকম। আমার কোনো ব্যক্তিগত গাছ নেই।
কিন্তু এরকম ভাবনা কি
একটা গাছের আছে আমার জন্য?
সম্ভবত না, আবার হ্যাঁ।
আমাদের বাসার কয়েক রোড পর একটা গরুর খামার আছে, সেই খামারের পাশে আছে একটা বটগাছ।
গাছটা কিছুটা রাস্তার দিকে হেলান দিয়ে এমনভাবে দাঁড়িয়ে ছায়া দিচ্ছে, যেন এটাই তার
দায়িত্ব, সে জানে তার জীবনের উদ্দেশ্য। ওই রোড দিয়ে যাওয়ার সময় আমি মনে মনে ভাবি,
গাছটা যেন অনেক দিন বাঁচে। গাছদের মানুষের হাত থেকে বেঁচে থাকাটা জরুরি। কেন জানি
প্রায়ই মনে হয়, গাছও আমাকে নিয়ে এমনই ভাবে। আমার সাথে তাদের সম্পর্ক আছে। না হলে
মুগ্ধ হই কেন? কেনই বা ওদের জন্য দীর্ঘায়ু কামনা করি? শুধুই কি তারা আমার শ্বাসের
সারথি বলে? মনে হয় না, আরও অনেক জটিল বিন্যাসে আমরা জড়িয়ে আছি।
জীবনে প্রথম উঠেছিলাম
একটা পেয়ারা গাছে। ছোটবেলায় একটা পেয়ারা গাছে উঠে বসে থেকে পেয়ারা খাওয়ার আনন্দ
অবশ্যই আলাদা ছিল। একজন শিশু প্রথম যখন রং পেন্সিল হাতে নিয়ে ছবি আঁকতে যায়, সে
তিনটা জিনিস আঁকেÑ মানুষ, ঘর আর গাছ। আমিও তার ব্যতিক্রম না। গাছ আঁকতে গিয়ে
দেখলাম, তার রঙ সবুজ আর খয়েরি না, সম্ভবত পৃথিবীর সব রঙ তার পাতায়, ডালে, ফুলে আর
ফলে। গাছের এই চরিত্র সবচেয়ে ভালো বুঝতে পেরেছে গিরগিটি। অবশ্য মানুষ গিরগিটি হয়
মানুষের কাছে গেলে। গাছের কাছে মানুষ এলে, সে হয় দ্বিতীয় মানুষ।
আমাদের বাসার চারপাশে তখন
এত বিল্ডিং ছিল না। তিনতলার দক্ষিণের বারান্দায় দাঁড়ালে সবুজ ঘাসের মাঠ ছুঁয়ে ধেয়ে
আসা বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পারতাম। রোদ আসত আর মেঝেতে বারান্দার গ্রিলের ছায়া পড়ত।
একদিন আমার আম্মু একটা গাছ নিয়ে এলো। আব্বু তাতে পানি দিত। কদিন পর মরে গেল। এবার
আম্মু অনেক গাছ একসাথে নিয়ে এলো। তাতে ছিল কামিনী, জবা, লেবু, গোলাপ, মেহেদি,
ক্যাকটাÑ এরকম আরও কিছু। আব্বু একদিন সার নিয়ে এলো। গাছ বিষয়ে আমরা কেউই খুব
পারদর্শী ছিলাম না। সবগুলো সার আব্বু অত্যন্ত যত্নের সাথে টবে মিশিয়ে গাছগুলো রোপণ
করল। এর কয়েক দিন পর গাছগুলো একসাথে ঝিমিয়ে যেতে লাগল। আমরা ভাবলাম, হয়তো সব গাছ
শেষ। আব্বুকে বললাম, ‘বেশি সার দেওয়াতে এরকম হলো।’ আব্বুও আমাদের সাথে সম্মত হলো।
কিন্তু মজার বিষয় হলো, মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে সবগুলো গাছ একসাথে তরতাজা হয়ে উঠল
এবং দিনকে দিন বড় হতে লাগল। আমরা তো দারুণ খুশি। সবগুলো গাছকে একসাথে বড় হতে দেখা
খুবই আনন্দের বিষয়। আমি বুঝতে পারলাম, গাছরা নিঃসঙ্গতা পছন্দ করে না। তারা নিজেদের
ভেতর গল্প করে, যেমন আমরা করি। হয়তো ওরা আমাদের নিয়েও গল্প করে।
কামিনী গাছ অল্প দিনেই
ছোট ছোট সাদা ফুলে ছেয়ে গেল। আর গন্ধে ম-ম করত ওই ছোট্ট এক টুকরা বারান্দা।
দুই-একটা করে গোলাপ ফুটতে শুরু করল। সেই প্রথম আমি সতেজ, টাটকা গোলাপ ফুল দেখলাম
মনে হয়। গোলাপের সৌন্দর্য ওর পাপড়ির লেয়ারের কারণে। প্রতিটা ভাঁজে ভাঁজে আনন্দের
ঘ্রাণ। লেবু গাছে লেবু ধরল। আমরা প্রায়ই ওই গাছ থেকে লেবু নিয়ে খেতাম। কিন্তু একটা
অদ্ভুত লম্বাটে গাছ কেবল বড়ই হচ্ছিল, না দেয় ফুল, না দেয় ফল। আমরা ভাবছিলাম,
গাছটাকে উপড়ে ফেলে নতুন কোনো গাছ লাগাই। হঠাৎ মনে হলো, হয়তো এই গাছটার কারণেই বাকি
গাছগুলো ফুলে-ফলে পূর্ণ। এরকম মনে হওয়ার পেছনে কোনো বৈজ্ঞানিক যুক্তি নেই। হতে
পারে, মায়ার রূপই এমন, যা যুক্তিকে পাশ কাটিয়ে নিদারুণকে দারুণ বানিয়ে ফেলে। এর
মধ্যে একদিন আব্বু কোথায় থেকে শেকড়সহ একটা ছোট্ট বটগাছ নিয়ে এল। বলল, পাশের
রাস্তার প্লটে বিল্ডিং হচ্ছে, তাই ওখানের সব গাছ কেটে ফেলা হচ্ছিল। তাই ওই গাছটা
আব্বু সাথে করে নিয়ে আসছে। আমরা ওই গাছটাকে একটা ছোট্ট ড্রামের ভেতর মাটি দিয়ে
পুঁতে রাখলাম। গাছটা অন্যান্য গাছের সাথে দিব্যিই থেকে গেল। সেটা ছিল একটা শিশু
অশ্বত্থ গাছ। আব্বু বলছিল, ‘এইটা দিয়ে
একটা বনসাই বানাবে।’ আমার মনে হচ্ছিল, ভাবনাটা মন্দ না। ঢাকা শহরে সংকটের নাম
স্পেস আর টাইম। গাছটা বনসাই হয়েই না হয় থাক, কিন্তু বেঁচে থাক।
একদিন দেয়ালের পাশ ঘেঁষে
দেয়াল দাঁড়িয়ে গেল। বিল্ডিংয়ে ভরে গেল সমস্ত মাঠ। আর আমাদের গাছগুলো একটা একটা করে
হারিয়ে গেল। রোদ চলে গেল। সবকিছুই পালটে গেল। আর আব্বুও আতরের মতো ছিপি-খোলা বোতল
থেকে উড়ে গেল তার সমস্ত সৌরভ আমাদের ছড়িয়ে। কেবল ওই ছোট্ট বটগাছটা তখনো জীবিত ছিল।
তবে আমাদের বারান্দায় তাকে রাখার মতো জায়গা ছিল না। কারণ ওখানে রোদ, বাতাস কিছুই
নেই। আমরা শিশু বটগাছটিকে আমাদের চাচার ছাদে রেখে এলাম। গাছের সাথে আমার এটুকুই
প্রত্যক্ষ স্মৃতি।
গাছ মূলত ব্যক্তিগত সম্পদ
না, যেমন আকাশ ব্যক্তিগত না। গাছ যার বাড়িতেই জন্মাক না কেন, তার ফল হয়তো
ব্যক্তিগত, কিন্তু তার শ্বাস-প্রশ্বাস সবার। এখানেই সে নির্বিশেষ। তাই আমার একটি
ব্যক্তিগত গাছ থাকুক আর না থাকুক, পৃথিবীর সব গাছের সাথে আমি কানেক্টেড। না হলে
কেউ গাছ কাটলে বা ঝড়ে গাছ নষ্ট হলে আমি কষ্ট পাই কেন? প্রতিদিন রাস্তার পাশে
জন্মানো গাছের দিকে তাকিয়ে থাকি আর ওদের বলি, ‘তোমরা বহুদিন বাঁচো, মানুষের হাত
থেকে বেঁচে মানুষকে বাঁচাও।’
মানুষ তার উপলব্ধিতে
দ্বিতীয় মানুষ হয়ে ওঠে গাছের কাছে গেলে। বেশিক্ষণ না, অল্প কিছুক্ষণ থাকলেই একজন
মানুষ অন্য মানুষ হয়ে যায়। ফুলের কাছে গেলে সব মানুষ প্রজাপতি কিংবা পাখি হয়ে যায়,
আর গাছের কাছে এলে সে তার ভাবনার ব্যাকরণ খুঁজে পায়। হতে পারে, সাধু-সন্ন্যাসীরা
এজন্যই বটগাছ খুঁজে নিত আত্মমগ্ন হয়ে নিজেকে পাওয়ার জন্য। হতেই পারে, গাছই আমাদের
অলটার ইগো।