স্নিগ্ধা বাউল
প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৫:৪৭ পিএম
আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৫:৫০ পিএম
বাংলার মানুষের জীবন এক উৎসবমুখর জীবনের প্রতিভাস। দুঃখ-কষ্ট কিংবা জীবনের খুব বেশি গভীরতা নাই বলেই বাঙালির জীবন সম্ভবত ফিরে আসে আবেগের কাছে, প্রকৃতির কাছে। প্রকৃতির খেয়ালের কাছে আমরা অনবরত মিলিয়ে রাখি আমাদের নিজেদের আবেগের গল্প। আমরা গাছের নতুন পাতায় লিখছি কবিতা, বৃষ্টির জলে ধুয়ে নিচ্ছি ঘাম আর বাতাসে মেলে ধরছি আমাদের স্বপ্ন। ধানের গন্ধে, শাপলার পালকে আর ঝরাপাতায় আমরা খুঁজে দেখি অতীত। আমাদের জীবনের মানে আমাদের কাছে ধরা পড়ে সুন্দরের সহজ সাবলীল উপায় হয়ে। নদী, কৃষি আর পরম্পরার দীর্ঘ যাত্রায় আমাদের যে জীবন তাতে সুন্দরের বয়ানে নেমে আসে পাখির পালক, কুয়াশার সকাল, সোনালি সবুজ ধান, ঘাসের শিশির, পেঁচার মেডিটেশন আর বড়জোর আত্মশুদ্ধির নামে সমুদ্রে মিশে যাওয়ার মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা। বাঙালির জীবন সংস্কৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকÑ তার ভাষা আর খাদ্য। এ দুটো বিষয়ই জড়িয়ে আছে মাটি, আকাশ আর মানুষের গন্ধে। বলতে চাইছি বাঙালি মাত্রই মিশে থাকে প্রকৃতির সঙ্গে। এই থাকাকে খুঁজে নিয়ে পরম পরিতৃপ্তির সঙ্গে আমরা বের করে নিয়েছি আরও কাছাকাছি থাকাতে রয়েছে রূপ-রঙ আর বাহারের ভিন্নতা। ভিন্নতায় প্রকৃতি হাসে, ফুল-ফল দেয়, রোদে ঝরে পড়ে আবার বৃষ্টিতে নতুন করে জেগে ওঠে। ছোটবেলায় বইয়ের পাতায় মাথা ঝুলিয়ে পড়েছি এই বঙ্গদেশে মোট ছয়টি ঋতু। আবার তাদের নাম পড়ে পড়ে লেখার সময় মনে হতো কেন এতগুলো ঋতু! একটু কম হলে কী হতো! তবে সুখের বিষয় আমাদের মায়েরা হাত ধরে আমাদের জানিয়ে দিতেন ঠিক কখন কোন ঋতু আমাদের জন্য বয়ে যাচ্ছে! ঠাকুমার ঘরের চালার ওপর কালো মোষের মতন মেঘ করে এলে আমরা জানতাম কালবৈশাখী আর জ্যৈষ্ঠ মাসের তীব্র গরম বলে দিত এইতো বাংলার গ্রীষ্মকাল। আমাদের উঠানে জল জমে জমে থইথই হলে তখন বর্ষাকাল; সাদা মেঘ মায়ের আঁচলে জড়িয়ে ধরলে নেমে আসত শরৎ। নতুন চালের ভাতের সঙ্গে আলুভর্তায় ডালের অমৃত গন্ধ, সঙ্গে দোয়েল-চড়ুই পাখির চাল খুটে খাওয়া আমাদের বিপন্ন হেমন্তকাল। ভোরের আলোর আগেই বাড়ির মেয়েরা চালভাজা মুড়ির পাত্রে যে অনবদ্য সকাল লিখে রাখত তা শীতকাল; শীতের পাঁজরজুড়ে আমাদের রাত্রের দহন, পাতায় জমে থাকা শিশিরের জল চোখের কাজলের মুক্তায় শীতকাল। শীতের পর আমের পল্লবে যে মুকুল তার নাম সম্ভবত বসন্ত। বসন্তের কত মানে থাকে! নতুন জন্ম, নতুন পাতা, প্রেম, ভালোবাসা, লতায় পাতায় মিশে থাকা অনাগত দিনের ভাগ্য আর নতুন বছরের প্রত্যাশা! বসন্তে পাতা ঝরে যেমন তেমন করে প্রকৃতি ফুলেও ভরে যায়। আমাদের মেঘনা নদীতে তখন শীতের কুয়াশা কেটে গিয়ে ধু-ধু একটা প্রান্তর তৈরি হয়, যার নাম আমাদের কাছে মায়ের গল্পে রয়ে গেছে। তখন নিমপাতায় মা আমাদের প্রতিদিনের স্নান সেরে দিতেন, কেননা আমাদের জীবনে প্রথম বসন্ত মানেই হলো গুটিবসন্ত। এক দিন মামাবাড়ি যাওয়ার আগের রাতে আমার পুরো শরীর ঢেকে গেল, কোথাও সরিষাদানা ফেলার জায়গা নাই। একে একে আমাদের সব ভাই-বোনের বসন্ত হয়ে গেল। হলুদ জন্ডিসের মতো সেই সব দিনের চোখে ভাসে বিছানার কাছে কালো মুখের চক্রবর্তী বাড়ির বুড়ির মুখ। ডান হাতে তার নিমপাতার বিচালি। বিড়বিড় করে বুড়ি কিছু একটা বলে আমার চোখে-মুখে ঝাপটা মেরে আবার বামদিক টেনে নিচ্ছে তখন। মন্ত্রের কোনো শব্দ আমার শিশুদেহের অঙ্গ ধরতেই পারছিল না কিংবা আধো আলো আর অন্ধকারে বুড়ির মুখ আর আমার তীব্র ব্যথার শরীরে কোনো হ্যালুসিনেশন তৈরি করে দিচ্ছিল; যা ঠিক ত্রিশ বছর পর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে আমি টের পাচ্ছি! মায়ের মলিন মুখের আঁচল, বাড়িতে আলাদা করে রাখা আর তিতা খাবার আমার শিশুকালের বসন্ত দিন একেবারেই আলাদা করে রেখেছে। কেবল আজও উত্তর পাই না কীভাবে এত ছোঁয়াচে রোগে জড়িয়ে থাকা মায়ের শরীরে এই বসন্ত লেগে যায় না। আমার মায়ের বসন্ত দিনের কোনো গল্প জানা নাই। যেমন জানা নাই আমার বাবার; নিরন্তর যে জীবন প্রবাহ তাদের তাতে আমাদের জীবনের গল্পই মূলত আমাদের মা কিংবা বাবার বসন্ত দিনের গল্প। কিন্তু একবার বসন্ত দিন আমার কাছে ভিন্নতর হয়ে উঠল; তখন সদ্য ফুর ফুরে কিশোরী আমি। চুলের ডগায় সাদাফিতে আর আমি জেনে গেছি মানুষের জীবনে আলাদা করে এসে ভিড় করে ভিন্ন ভিন্ন গল্প। আমার দাদা তখন টগবগে সুদর্শন তরুণ। এক দিন ফাল্গুনের এক বিকালে খাকি পোশাকে এলো এক চিঠির হরকরা। এসে আমাকে বলছে খুকি ঝুমুর বাউল কে! আমি বললাম আমার দাদা। চিঠি আমার হাতে দিয়ে চলে গেল সেই মানুষটি। কৌতূহল হলো আমার অনেক; আমার দাদাকে কে চিঠি লিখল! আমার মায়ের ছোট সংসারে তখন একটা স্টিলের আলমিরা; আলমিরার দুটা আলাদা দেরাজ তখন দাদা আর বড়দির জন্য। আমি তক্কে তক্কে ছিলাম দাদার চিঠি আমাকে পড়তেই হবে! তারপর মায়ের আঁচলে থাকা চাবি নিয়ে বসন্তের যে বিকালে ঘরে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিল আমি বিড়ালের মতো চুপচুপি পড়ে ফেললাম দাদার কাছে আসা গোপন চিঠি। কালীগঞ্জের ঠিকানা হতে পোস্ট করা সে চিঠির লেখিকা দাদার কলম বন্ধু। কী আশ্চর্য সুন্দর সে সম্পর্কের অক্ষর! তবে আমি কম্পিত হয়েছিলাম আমার দাদাকে সে মেয়ে হিসেবে চিঠি লিখত। এত দিন পর যখন আমি এই গল্প লিখছি, তখন আমার দাদা চির বসন্তের দ্বারে নিরবচ্ছিন্ন সময়ের অন্তলীন! আমি কাঁদছি তাদের সময়ের গল্প লিখতে পেরে।
আমার দ্বিতীয়
বসন্তের গল্প বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প। হলুদ রঙ নিয়ে আমাদের মেঘনা পাড়ের গল্পেরা ভিন্ন
অর্থে বসেছিল আমাদের চিত্তপ্রবাহে। নৌকা করে নদীর এই পাড়ে আসা গ্রামীণ নারীর অপরিকল্পিত
সাজ, যার নাম আধুনিকতা নয় বরং আধুনিকতার ভাষায় তা গাইয়া। বসন্তের রঙ যে এমন বাসন্তী
আর হলুদে প্রাণময় এটি জানতে আমাকে জীবনের কৈশোর পেরিয়ে আসতে হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
ফাগুনের সাজে প্রকৃতির সঙ্গে মেতে ওঠা হলের আবাসিক মেয়েদের সঙ্গে আমার বসন্ত কেটেছে
ভোর থেকে এই রুম সেই রুমের সবাইকে শাড়ি পরিয়ে দেওয়ার মধ্যে। ভালোবাসায় একটা দিন কাটিয়ে
দিতে আমার চারপাশের প্রাণময় মেয়েদের প্রাণান্ত চেষ্টা আমাকে দিনভর আনন্দ দিত; মনে হতো
আমি বসে আছি আমাদের পাড়ার সেই রাস্তাটায়; যার তেমাথার মোড়ে একটা পলাশগাছ ফুটে আছে রাতের
তারার মতো ফুল নিয়ে। সেই গাছটায় একটা কাঠঠুকরা পাখি অনবরত শব্দ করছে, খুটে খাচ্ছে তার
দেহ আমার বসন্তের অপেক্ষায়। পাড়াগলির সেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক, যার চোখ স্বপ্ন
দেখছে আমায় নিয়ে বসন্ত দিনের। জটিল আকাশে দুরন্ত চাঁদের মতো আমি তার কাছে হয়তো দূর
গ্রহের বস্তু। নির্বিশেষে আমাকেও তার ইথারীয় টান টেনে নিচ্ছিল কোনো এক বিকালে, যার
কোনো মানে জানা নাই পরিশ্রান্ত সেই সব দিনের গল্পে। ও তত দিনে আমি এবং আমরা জীবনের
বাঁক পরিবর্তন করে ফেলেছি; জীবনের মানে গুটিবসন্তের বাইরে এক হলুদ জন্ডিসে রূপান্তরিত।
তবে কে আমায় ডেকে যাচ্ছে,Ñ ‘ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল!’ আজব লাগে এই বাংলা সাহিত্যের
ঠাকুরের প্রতি; তিনি আমাকে বলে দিচ্ছেন, ‘আকাশে বহিছে প্রেম/ নয়নে লাগিল নেশা/ কারা
যেন ডেকে গেছে/ বসন্ত এসে গেছে!’ আজব আমার ঠিক তখনও বসন্তের লিলুয়া বাতাস কিংবা কামদেব
মদনের তীব্র বাণে কেউ বিদ্ধ করতে পারে নাই। তাহলে আমার বসন্ত কোথায় হারিয়ে গেল! যায়
নাই সে ব্যাটা! জীবনে এমন ভোগান্তি এলো যে, এক পরিণত বয়সে আমাকে বসন্ত বাতাস শৈশব-কৈশোর
ছাপিয়ে অনন্তলোকে নিয়ে গেল যেখানে স্বপ্ন দেখার চাইতে স্বপ্নে বিভোর থাকার নাম জীবনের
তাগিদ। তার পর বহু দিন ভেবেছি ‘কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যে রে!’ না কোথাও পাওয়া
যায় না আমাদের সেই বসন্ত-মানুষ। হিসেব করে জেনেছি আমি সেই বাউল, যার কাছে অনন্ত দিবালোকে
প্রচ্ছন্ন থাকে তার পারিজাত সুখ! আমাকে প্রশান্তি দেবে সেই যে আমাকে নিয়ে বিপাকে পড়ে
যাবে কিংবা আমি সেই ভুল মানুষ, যার কাছে থাকে না কোনো মুক্তির গান কিংবা দিব্যজ্ঞান।
সম্ভবত আমাকে নিয়েই কবিগুরু তাই লিখেছিলেন এমন করেÑ ‘আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে/ অতি
নিবিড় বেদনা বনমাঝে রে,/… দূর গগনে কাহার পথ চাহিয়া/ আজি ব্যাকুল বসুন্ধরা সাজে রে।’
এখন যদি বলি
তবে সাহিত্য পড়ে আমার কেমন লাভ হলো! হলো এমন যে আমি দেখেছি বাংলা সাহিত্যে বসন্তের এক চমৎকার চিত্র আছে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’
উপন্যাসে, যেখানে রোহিনী যাচ্ছে ঘাটের দিকে আর তখন হঠাৎ একটা কোকিল ডেকে উঠল। এ
কোকিল আমাদের সবার বসন্তপ্রাণ। বঙ্কিম তখন লিখছেন, ‘কোকিলের ডাক শুনিলে কতকগুলি
বিশ্রী কথা মনে পড়ে। কী যেন হারাইয়াছি। যেন তাহা আর পাইব না। যেন কী নাই। কেন যেন
নাই। কী যেন হইল না। কী যেন পাইব না!’ উফ, এরপর বসন্ত নিয়ে পেয়েছি কালীদাসকে। তিনি
কয়েক কদম এগিয়ে। তিনি ‘মেঘদূত’ কাব্যে বিরহী যক্ষ্মের প্রিয়তমার দেশের শ্রেষ্ঠতম
সম্পদটির নাম দিয়েছেন বসন্ত। সেদেশে ঋতু কেবল একটিই, তার নাম বসন্ত। এরপর আমার
ইংরেজি সাহিত্যের বন্ধুটিকে বললাম, তোমার সাহিত্যে বসন্ত কেমন; সে খানিক ভাবনা
নিয়ে জানাল, ইংরেজি সাহিত্যের লোকেরা বরং অপেক্ষায় রইত বসন্তের। আর তার ধারণা বঙ্গসাহিত্যে
বসন্তের মাতামাতি ইউরোপীয় সাহিত্যেরই ফল; কেননা যে তীব্র শীতের পর পশ্চিমে বসন্ত
আসে তা মৃত্যুর পর জীবন প্রাপ্তির মতো; তো বসন্তকে পশ্চিমা সাহিত্য হেলা করবে
কীভাবে! তাদের কাছে বসন্ত হলো রিবার্থ, নিউ হোপ, ইয়থ, নিউ বিগিনিং। বন্ধুর ভাষ্যে শেলীর
বিখ্যাত লাইন তো বাংলার শিক্ষিত সকলজন জানেই, If winter comes, can
Spring be far behind? বলতে গেলে এটি তো
দারুন আশাবাদী এক চরণ। এখানে শীত এক চরম কশাঘাত আর বসন্ত মানেই মুক্তি! এবং এই
মুক্তি আসতেই হবে, কিংবা আনতেই হবে, কবি স্নিগ্ধা বাউল তাই লিখে দিলÑ
হে আমার অনন্ত
বসন্ত
দিবালোকে মুক্তি
দাও
ঝরে যাক পত্র,
পরিত্রাণ করো
অদেখা ফুলেও আনো নতুন বসন্ত!