দিলারা হাফিজ
প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৫:৩৮ পিএম
আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৩:৫৯ পিএম
চিত্রকর্ম : মলয় বালা
মোরগের আজানের সময় জন্মগ্রহণ করেছিলেন এক কবিÑ টাঙ্গাইল জেলার গুণী গাঁয়েÑ ঘটনাপরম্পরা তার সঙ্গে আমি গাঁদা ফুলের বন্ধনে বাঁধা পড়েছি এক বসন্ত রাতে। কাজেই আমার ঘরে সারা বছরই বসন্ত বিরাজ করে।
শূন্য ডালপালা
নিয়ে শীতে অর্ধমৃত হয়ে যায় প্রকৃতি। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রাও জবুথবু ও পীড়িত
প্রায়। পাখিরা গান ভুলে জারে কাতর হয়। তাই ঋতুরাজ বসন্তের পথ চেয়ে থাকে প্রকৃতিমাতা
ও কবির হৃদয়। বসন্ত-বাতাসে আগুনঝরা রঙের মেলা, শিমুল-পলাশে লালের স্পন্দনে চারদিকে
সৌন্দর্যের ঢল নামে এবং তরুণ মনে জেগে ওঠে নয়নতারার মতো চপল প্রণয়াকুতি। বসন্ত আবেশে
বনে বনে গেয়ে ওঠে পাখি। কবি মনে ভর করে কাব্য-কথা। ‘হেথা নয় হেথা নয় অন্য কোথা অন্য
কোনোখানে’ চলে যেতে মন যেন উন্মুখ হয়ে থাকে সকাল-দুপুর-রাত্রি।
আমার সৌভাগ্য
যে, বসন্তকে বিয়ে করে আমি তার গৃহিণী হয়েছি। বসন্তের জাতক এই কবি দশ বছর নেই আমার ও
আমাদের পাশে। তবু প্রতিবছর আমার গৃহে তিনি আসেন ঠিক পয়লা ফাল্গুনেই। বহুবর্ণিল রঙে
ঘটা করে তার জন্মোৎসব উদযাপন করে থাকি প্রতিবছর পয়লা ফাল্গুনেই। এ বছর ব্যতিক্রম ছিল।
এ বছরটায় অস্থির স্বদেশে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের ডামাডোল থাকায় পয়লা ফাল্গুন মানে
১৪ ফেব্রুয়ারি জন্মোৎসব করতে সাহস করিনি।
পরিবর্তে জানুয়ারি
১৪ তারিখে বেঙ্গল বুকসের অডিটোরিয়ামে কবির জন্মোৎসবের অনুষ্ঠান করেছি। এই অনুষ্ঠানের
মাধ্যমে ২০২৫ সালের জন্য কবি ময়ুখ চৌধুরী এবং ২০২৬ সালে কবি ওবায়েদ আকাশকে পুরস্কৃত
করেছি। প্রসঙ্গত একটু খোলাসা করে বলি, ২০১৭ সালে কবির নামে প্রতিষ্ঠিত স্মৃতি পর্ষদ
থেকে এই জন্মোৎসব উদযাপনের মাধ্যমে আমরা স্মরণ করছি প্রায় দশ বছর পার হতে চলেছে।
২০২১ সাল থেকেই
কবি রফিক আজাদের জন্মোৎসবের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিবছর একজন প্রতিশ্রুতিশীল বিশিষ্ট
কবিকে ‘কবি রফিক আজাদ স্মৃতি পুরস্কার’ প্রদানের মাধ্যমে সম্মানিত করে থাকি। যার আর্থিক
মূল্য পঞ্চাশ হাজার টাকা, উত্তরীয় ও ক্রেস্ট।
জানি, একজন কবি
বেঁচে থাকেন তার কালজয়ী পঙ্ক্তিমালায়। বেঁচে থাকেন তার প্রিয় পাঠকের হৃদয়ে হৃদয়ে।
কবি রফিক আজাদ
বসন্তকালে জন্ম নিয়েও ‘বসন্তে এসো না’ শিরোনামে তিনি অনবদ্য একটি কবিতা লিখেছেন।
এই কবিতায় শুধু
বসন্ত ঋতু নয়, তিনি প্রতিটি ঋতুকে তুলে ধরেছেন মানব মনে প্রকৃতির বিষয়-বৈচিত্র্যরূপে।
মাটির সোঁদা গন্ধের
কথা আমরা সকলেই জানি, কিন্তু যে মাটি থেকে বকুল, গন্ধরাজ, হাসনাহেনার সুবাস ছুটে আসেÑ
তার বৈচিত্র্য ও প্রভাব যেমন আলাদা, তেমনি ঋতুর রানী বসন্তকাল দখিনা বাতাসে বিমুগ্ধ
নয়নে দূরবনগন্ধবহ সেই স্মৃতির আবেগেও অনন্য হয়ে ওঠে আমাদের ছেঁড়াখোঁড়া সাধারণ মানুষের
জীবনে।
কবিতা হলো ইশারা
ও ইঙ্গিতে কথা বলে। কবির থাকে সেই ত্রিনয়ন। দুই নয়নে সবাই দ্যাখে। কবি দেখেন তৃতীয়
নয়নে।
এজন্য কবি যেন
বলতে চেয়েছেন, প্রকৃতির সবচেয়ে প্রিয়তর কাঙ্ক্ষিত ঋতু বসন্তকালে সকলেই যাওয়া আসা করে,
কিন্তু যেসব ঋতুর কথা আমরা কম জানি বা কম বলি, প্রকৃতি-মাতার সন্তানদের জন্যে সেইসব
ঋতুর অবদানও কিছু কম নয়। এজন্য কবি বলেন,
‘সুন্দর মুহূর্ত,
আরো একবার আসো
এই কুঁড়েঘর ঘরেÑ
কোন দিক থেকে
কী করে আসবে তুমি
সংকেত পাঠাও
গ্রীষ্মে আসো
যদি দখিনের দরোজাটা
উন্মুক্ত রেখেছিÑ
শীতে এলে উত্তরের
হিমেল হাওয়ায়
ভেসে আসতে পারো,
হেমন্তে শস্যের
সঙ্গে চলে দেখো
রয়েছি উন্মুখ,
বর্ষায় বৃষ্টির
বিন্দু হয়ে যদি আসো
গা-গতরে পাবে
শরতের শাদা মেঘে,
পরিষ্কার রোদে?
Ñ অপেক্ষায় আছি:
বসন্তে তো সকলেই
আসা-যাওয়া করে
বসন্তে এসো না…।’
জানি, নবজাগরণে
প্রকৃতি ও ধরাতল সেজেগুঁজে অন্য এক মোহনীয় রূপে আবির্ভূত হয় চরাচরজুড়ে।
এই সময়ে নারী-পুরুষ
সকলেই অপরূপ এক ভালোবাসায় বিমোহিত ও নিমগ্ন হয়ে থাকে, যা অন্য সময়ে দেখা যায় না।
এজন্যে কবি তার
কবিতায় সকল ঋতুর অনিবার্যতা তুলে ধরেছেন।
অভিমানী প্রেমিক
কবি যেন বলতে চেয়েছেন, প্রকৃত প্রিয়জন বা বন্ধুর জন্য আমি সকল ঋতুর দুয়ার খুলে প্রস্তুত
হয়ে বসে আছি।
শুধু বসন্তে কেন
যেকোনো ঋতুতেই তুমি আমার পরমজন।
ষড়ঋতুর এই দেশে
বসন্ত হলো ঋতুর রাজা।
প্রকৃতি ফুলে
ফলে দুরন্ত হয়ে ওঠে। লাল পলাশ, শিমুলে মুখরিত প্রকৃতি।
সুমিষ্ট সুরেলা
শিল্পীপাখি কালো কোকিল সারাদিনমান কুহুকুহু রবে ডেকে ওঠে প্রাণের ভেতর থেকে ভেতরে।
মন চলে যায় দূরে বহুদূরে…তার কুঁড়েঘর ছেড়েÑ সেই বসন্ত-বাসরে। আনচান করে বসন্তহৃদয়, সর্বক্ষণ
বাতাসে খুঁজে বেড়াইÑ কী যেন নাই, কে যেন নেই। ওহ্ আমার বসন্ত বাতাস!
২.
বসন্তের স্মৃতি
অনুষঙ্গ :
আমার জীবন জড়িয়ে
যার বাস তিনি বসন্তের জাতক। কী করে ভুলব এই বসন্তকে?
নয়ন সমুখে না
থাকুক, হাজার নয়নেই তার ঠাঁই।
কাজেই পাশে না
থাকলেও আরও বেশি করে আছেন তিনি আমার সর্বস্বজুডে।
মনে পড়ে ১৯৮৯
সালের কথা। সেই বছরটাতে রফিক আজাদের শরীর খুব খারাপ হয়ে পড়েছিল। অন্তহীন অসুখ ডায়েবেটিস
ধরা পড়েছে সদ্য। মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন ঝড়ে বিধ্বস্ত বৃক্ষের মতো। যেন উপড়ে পড়েছে
তার সব শেকড়-বাকর। বেচারা!
Ñ নতুন প্রেমের
মতো নয়া অসুখের মোহ-মায়া কিছুটা উজিয়ে উঠেছেন যখন, প্রায়ই মজা করে তখন বলতেন, যে মানুষটা
দু’পা হাঁটতে চায় না মোটে, পারলে রান্নাঘরে সালুনের নুন চাখতে যায় রিকশায় চড়েÑ আল্লাহতায়ালা
তাকে এ রকম যাবজ্জীবন চরম কারাদণ্ড দিলেন হাঁটাবে বলে।
এর চেয়ে আমার
ক্যানসার হওয়াও তো ভালো ছিল।
তাকে থামিয়ে দিয়ে
বলিÑ কী যে বলো না! ওসব অলুক্ষণে কথা বলতে নেই।
এদিকে তাকে কিছুতেই
বুঝিয়ে শান্ত করতে পারি না যে, ঢাকা শহরের স্ট্রেসফুল জীবনযাপনের জন্য অধিকাংশ মানুষই
আজ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। সবাই যেমন নিয়ম মেনে দীর্ঘজীবন লাভ করছে তোমার বেলায় তাই হবে,
দেখো।
অভিমান করে বলে,
‘জানি না কী হবে। তবে সা’দত কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় করটিয়া বাজারের কাজেম আলী
ময়রাকে প্রায়ই রাত দুটো তিনটার সময় ডেকে তুলে তার দোকানের মিষ্টি খেতাম। অদ্ভুত এক
সময় ছিল তখন। বইয়ের নেশা, কবিতার নেশা, সঙ্গে রাত দুপুরে মিষ্টি খাওয়ার নেশায় পেয়ে
বসেছিল। মন চাইলে এখন যে, মিষ্টি আর খেতে পারব না সেটাই মহাদুঃখ আমার। যে কিনা সারা
জীবনে কোনো কিছু গুণে খেতে শেখেনি, তাকে এবার থেকে আমৃত্যু মেপে খেতে হবে।’
এই বেদনা ভুলি
কী করে?
তাই তো, তুমি
তো এতদিন শিশিরজলে ভিজে বলতে, রফিক আজাদ গুণে খায় না, মেপে খায়।
আল্লাহ তোমার
কথা শুনেছে। এবার থেকে মেপে খাও।
হায়, রবীন্দ্রসংগীতের
মতো যদি হতো সবকিছু তাহলে হয়তো বলতে পারতাম, বহু বাসনায় প্রাণ পানে চাই, বঞ্চিত করে
বাঁচালে আমায়।
হায় ভগবান, এতটাই
নিষ্ঠুর হলে আমার প্রতি?
মন খারাপের তো
আর বাতিঘর নেই। তবু অন্ধকারের ডুবু জলে বিপুল পিপাসা নিয়ে মরতে কে চায়? যে চায় মুখে
মুখে, সে তো চায় না আসলে প্রাণপণে।
ফলে কবিকে নিয়ে
আমার দুশ্চিন্তার শেষ নেই। যে যা বলে আরোগ্য লাভের আশায় তাই করি। কেউ একজন বলেছিল
সকালে বাসি পেটে তেলাকুচা পাতার রস খেলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে।
কোথায় পাই তেলাকুচা
লতার পাতা?
ইডেন কলেজের বাগান,
বনজঙ্গল উজাড় করে ৫-৬ বছর সেই পাতার রস খাওয়ালাম, এরপর করল্লার রস বেশ কবছর খেয়েছে।
কন্ট্রোল থাকে,
রোগ কি আর সমূলে যায়?
আমার সদা চিন্তা
থাকে কীভাবে ওর মনটাকে একটু উজ্জীবিত ও প্রাণবন্ত করে তুলব? কী করলে রোগটাকে রোগীর
মতো না নিয়ে কবির মতো স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে অসুখের ধু-ধু বিরান মাঠ পেরিয়ে আবার
ফিরে যাবে তার সৃজনশীলতার শস্য ক্ষেতে।
শব্দের অভিধা,
লক্ষণা, ব্যঞ্জনা গুণের চাষাবাদে মগ্ন কৃষকের মতো বহু বাসনার ফসল ফলাবে আবার কবেÑ আমি
কেবল সেই অপেক্ষাতে থাকি।
ছন্দের কলাবৃত্তের
মতোই ১ ফাল্গুন আসে বছর বছর। সব বছর এতো ঘটা করে জন্মদিন পালন না হলেও পরিবারের স্বজন,
সুজন, শুভার্থীরা আসেন প্রতিবারেই।
তবে পহেলা ফাল্গুনের
কৃষ্টি অনুযায়ী প্রেমিক প্রেমিকা, নব-দম্পতি এবং তরুণ-তরুণীরা সারাদিনই বাইরে ঘোরাফেরা
করে। ফুল উপহার একে অপরকে। স্কুল-কলেজের মেয়েরাও লাল-হলুদের সংস্কৃতিমাফিক শাড়ি পরে
মাথায় ফুলের টোপর গুঁজে একুশের বই মেলার পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। ইদানীং এই রীতি বসন্তকালের
সংস্কৃতির একটা অঙ্গে পরিণত হয়েছে।
এর পাশাপাশি ঋতুরাজ
বসন্তের হলুদ গাঁদা, কসমস, ডালিয়া, সূর্যমুখী ছাড়া ও নানা রঙের বাহারি ফুলে ফুলে প্রকৃতি
সেজে ওঠে অসামান্য রূপে।
Ñ কবিকে বলতে
শুনি, ‘আমি তো গরীব কবি, আমার জন্মদিন পালন করে তাই প্রকৃতি আর এদেশের তরুণী মেয়েরা
লাল পেড়ে হলুদ শাড়ি পরে।’
প্রসঙ্গত মনে
হলো, কবির পঞ্চাশতম জন্মদিনটা খুব ঘটা করে পালন করেছিল কবিতা পরিষদ। এই স্মৃতি আজও
অম্লান। একটা স্যুভেনির বের করেছিল, নাসির আলী মামুনের তোলা একটা বড় একটা পোর্ট্রেট
বাঁধাই করে কবিকে উপহার দিয়েছিলেন।
সম্ভবত, কবি মোহন
রায়হান তখন কবিতা পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। বর্তমানে সভাপতি।
তার উদ্যোগেই
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে জন্মদিনের বহু বর্ণিল মননশীল উদযাপনে অনুষ্ঠানটি পরিণত হয়েছিল
সকলের আন্তরিক অংশগ্রহণের এক অনবদ্য মিলন মেলায়।
ভারী আহ্লাদিত
হয়েছিল কবি রফিক আজাদ। অনুষ্ঠানে আগত কবি, কবিতাপ্রেমী দর্শনার্থীদের ফুলে ফুলে ভরে
গিয়েছিলে চারপাশ।
অসাধারণ দীপ্তিময়
লাবণ্যে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল ওর মুখখানা।
সেই ভাবনা থেকে
ওর জন্মদিনটা বাড়িতেই একটু ঘটা করে পালনের কথা ভাবছিলাম কিছুদিন থেকেই। এর মধ্যে সেই
সময়টাতে একুশের বই মেলায় এলেন পশ্চিমবঙ্গের কবি ও ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, কবি
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, শঙ্খ ঘোষ, সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত লেখক ও আজকাল পত্রিকার সাংবাদিক
বাহারউদ্দিন, তার সঙ্গে এলেন গায়িকা বাবলি সাহা।
বাংলাদেশের কবিদের
মধ্যে শামসুর রাহমান ভাই নিয়ে এসেছিলেন পুরনো ঢাকার জিলাপি।
আমার হাতে দিয়ে
বললেন, রফিকের মন তো জিলাপির প্যাঁচের মতো তাই জিলাপি নিয়ে এলাম। কথাটা শুনে নির্বিকার
ভঙ্গিতে খাবারটা গ্রহণ করলাম বটে, মুখে কোনো কথা সরছিল না আমার। উপরন্তু তিনি আমার
অতিথি এই মুহূর্তে আমি কী আর বলতে পারতাম! তা ছাড়া কাউকে আহত করে কোনো কথা বলতে শেখাননি
আমার মা। কষ্ট যতোই গভীর হোক, তা কেবলই নিজের, আনন্দটুকু শুধু সকলের তরে ভাগ করে নিতে
শিখেছিলাম সুদূর শৈশবেই।
এজন্য কবি যখন
বিরিশিরিতে উপজাতীয় কালচারাল একাডেমির পরিচালক, কবির নির্দেশে আমি শামসুর রাহমান ভাই,
ভাবি ও তাদের নাতনি নয়নাকেসহ ঢাকা থেকে কবির বিরিশিরির আস্তনার পথ চিনিয়ে নিয়ে যাই।
সেসময় তিনটি দিন-রাত্রি অসাধারণ কেটেছিল রাহমান ভাই ও ভাবির সান্নিধ্যে।
সৈয়দ শামসুল হক,
কবি রবিউল হুসাইন, বেলাল চৌধুরী, হাবিবুল্লাহ সিরাজী, শিহাব সরকার, অসীম সাহা, ড. সামাদ,
তারিক সুজাত, সৈয়দ আল ফারুক, ওর স্ত্রী কণ্ঠশিল্পী নাজিয়া নাহিদ বীথি, কণ্ঠশিল্পী বেবী
নাজনীন, প্রকাশক বন্ধু কবির খান ছাড়া ও আমাদের দুজনার পরম পূজনীয় শিক্ষক ড. আনিসুজ্জামান
স্যার রফিক আজাদের ঘরোয়া জন্মদিনের সেই পার্টিতে উপস্থিত থেকে আমাদের দুজনকেই খুব অনুপ্রাণিত
করেছিলেন।
শিল্পী বেবী নাজনীন
স্যারের পায়ের কাছে বসে গান গাইলেন কিছুক্ষণ। এরপর পশ্চিমবঙ্গের অতিথি শিল্পী বাবলী
সাহাও গাইলেন প্রাণমন ভোর করে। কবির এই জন্মদিনটি আজও বিশেষ হয়ে আছে আমার হৃদয় তোরঙ্গে॥
৩.
আজও বসন্ত আসে
আমার জীবন মাড়িয়ে আত্মার কুসুম রূপে, আমি তাকে বরণ করি হৃদয়ের রক্তরাগে। রবীন্দ্রনাথের
গানে গানে বেঁচে থাকি অসীমের মায়ায়।
আমিও তো রক্তমাংসের
মানুষ, কতক্ষণ আর ছায়া দেবে আমাকে। যখন আমি আর কবি থাকি না, সাধারণ একজন নারী, জীবন
থেকে খসে পড়েছে প্রেম ও ভালোবাসার নহবত। তখন মাঝে মধ্যেই রবীন্দ্রসংগীত এসে পাশে দাঁড়ায়,
মাথায় হাত রাখে বিশ্বাসী পরম বন্ধুর মতো। গলা ছেড়ে আমি গেয়ে উঠি সেই অপার সংগীত।
‘কাঁদালে তুমি
মোরে ভালোবাসার ঘায়ে…
নিবিড় বেদনাতে
পুলক জাগে গায়ে
তোমার অভিসারে
যাবো অগম-পারে।’
২০২২ সালের বসন্তে
কবি রফিক আজাদকে নিয়ে ১৮ মাত্রার অক্ষরবৃত্ত ছন্দে লিখেছিলাম ‘বসন্তের দীর্ঘশ্বাস’
শিরোনামের একটি কবিতা। তার অমশবিশেষ উল্লেখ করে নিবন্ধ শেষ করব।
‘আমার একটা লাল
দীর্ঘশ্বাস পলাশের ডালে
বসে ‘বউকথা’ সুরে
ডাকাডাকি করছে কেবলি।
কথা বলবার মতো
বউ বটে ছিলাম কবির,
একজন কাব্যকথকের,
একজন দেশপ্রেমী
সূর্য সৈনিকের,
কিন্তু আমি তাকে হারিয়ে ফেলেছি।
সে তো নেই, তবু
অসময়ে পাখিটি ডাকছে কেন?
কী কথা বলবো আমি,
দেহহীন আত্মা পরম্পরা?
কত আশা ছিল, তার
হাতে হাত রেখে বৃদ্ধ হবো,
কাশফুলের চূর্ণ
হাওয়ায় উড়বে চুলগুলো,
দু’জনে এক বনভূমি,
অস্তগত দ্বীপের মতন
কুয়াশা ছড়িয়ে
হাঁটব অচিন পথে যেতে যেতে।
পরস্পরের আঙুল
ছুঁয়ে কাটাব অনন্তকাল
আলতো করে ছুঁয়ে
দেব চোখের নদী-জল,
পথের দিশায় দেব
ভাসিয়ে হৃদয়-জাগরণ।
মন-মজানোর পথে
কেউ যদিবা ডাকতো তাকে
ফিরিয়ে দু’চোখ
খুঁজে নিত Ñ আমার দু’হাতখানি।
১২/৩/২০২২Ñ ধানমণ্ডি, ঢাকা
জীবনের সব চাওয়া
কখনও পাওয়া হয় না একজীবনে। আমি অকৃতি অধম হয়েও যা পেয়েছিÑ তা কম কিসে!
ষড়ঋতুর দেশে ঋতু
আসে, ঋতু যায়, আমরাও হারিয়ে যাই ঋতুর পরশে, হৃদয়ের বসন্ত-বাতাসে।
শেষাবধি, জীবনের
উদযাপনই সকল আনন্দের উৎস। যখন দেশমাতৃকা থাকে শত্রুকবলমুক্ত। তখন বসন্ত ঋতু আসে সগৌরবে,
আনন্দে, আহ্লাদে।
মহান মুক্তিযুদ্ধে
তিরিশ লক্ষ শহীদ ও দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া এই যে আমার দেশ। সেই
দেশের সন্তান হিসেবে কবির ভাষায় বলি,
‘আমার মাথা নত
করে দাও হে তোমার
চরণধুলার
তলে।
সকল অহংকার হে আমার
ডুবাও
চোখের জলে।’