লাবণী মণ্ডল
প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৫:৩৫ পিএম
আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৫:৩৮ পিএম
বই: পর্বত, পলাতক জীবন ও শুদ্ধতার শহর। লেখক: আলতাফ হোসেন উজ্জ্বল। প্রকাশক: জলধি। প্রকাশকাল: ২০২৬ বিষয় : ভ্রমণকাহিনী মূল্য : ৩৫০
ফরাসি ঔপন্যাসিক মার্সেল প্রুস্ত বলেছিলেন, ‘আসল আবিষ্কারের যাত্রা নতুন ভূখণ্ড খোঁজার মধ্যে নয়, বরং নতুন দৃষ্টিতে দেখার মধ্যে নিহিত।’ ভ্রমণ মানে কেবল মানচিত্রের এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে সরে যাওয়া নয়; ভ্রমণ হলো নিজেকে নতুন করে চেনা, চেনা পৃথিবীকে অচেনা চোখের বিস্ময়ে অবলোকন করা। বাংলা সাহিত্যে ভ্রমণকাহিনীর এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পালামৌ’ থেকে শুরু করে সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশে বিদেশে’Ñ বাংলাদেশের পাঠক বরাবরই ভ্রমণের গল্পে খুঁজে পেয়েছে জানালার বাইরের এক বিশাল আকাশ। সেই ঐতিহ্যের ধারায় ২০২৬ সালে ‘জলধি’ থেকে প্রকাশিত আলতাফ হোসেন উজ্জ্বলের ‘পর্বত, পলাতক জীবন ও শুদ্ধতার শহর’ গ্রন্থটি এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন।
এটি কোনো ট্যুর গাইড বা দিনপঞ্জি নয়; বরং লেখকের ভাষায় এটি এক ‘অনুসন্ধিৎসু মননের বর্ণিল ভ্রমণকাহিনী’। নরওয়ের হিমাচ্ছন্ন প্রান্তর থেকে ডেনমার্কের সাজানো বাগান, জার্মানির যান্ত্রিকতার আড়ালে থাকা ইতিহাস, আর সুইজারল্যান্ডের নন্দনতত্ত¡Ñ সবই এই বইতে উঠে এসেছে এক আলত ক্যানভাসে।
‘বরফ, বসন্ত ও ডেনমার্কের গ্রাম’ বইটির শুরুটা হয় এক দারুণ বৈপরীত্য দিয়ে। নরওয়ের ট্রোমসো বা অসলোর হাড়কাঁপানো তুষার-রাজ্য থেকে লেখক যখন ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে পা রাখেন, তখন প্রকৃতিতে বসন্তের আগমনী বার্তা। কাস্টপ বিমানবন্দরে নেমে ‘Velkommen til Danmark’ (স্বাগতম ডেনমার্কে) শুনে লেখকের মনে যে উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে, পাঠকও সেই অনুভূতির অংশীদার হন। লেখক কোপেনহেগেনকে দেখেছেন শুধু রাজধানী হিসেবে নয়, ‘আত্ম-অন্বেষণের দরজা’ হিসেবে।
তবে বইটির অন্যতম শক্তিশালী অংশ হলো ডেনমার্কের গ্রামীণ জীবনের বর্ণনা। আধুনিকতার চাকচিক্য ফেলে লেখক যখন গ্রামের মেঠোপথে হাঁটেন, তখন পাঠক এক ভিন্ন ইউরোপকে আবিষ্কার করেন। লাল টাইলসের ছাদ, সাদা চুনকাম করা দেয়াল, আর প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে থাকা মানুষগুলোর জীবনদর্শন লেখককে মুগ্ধ করেছে। সেখানে মানুষের জীবন কেবল প্রযুক্তিনির্ভর নয়, বরং সেখানে আছে মাটির সোঁদা গন্ধ আর স্বনির্ভরতার প্রশান্তি।
‘ফ্রাঙ্কফুর্ট : আধুনিকতা ও বন্ধুত্বের নস্টালজিয়া’ গ্রন্থটির সম্ভবত সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী অধ্যায়টি আবর্তিত হয়েছে জার্মানিকে ঘিরে। ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরের গগনচুম্বী মেইন টাওয়ার কিংবা কমার্স ব্যাংকের জৌলুস লেখকের চোখ এড়ায়নি, কিন্তু তিনি আটকে গেছেন রোমারবার্গের প্রাচীন টিম্বার-ফ্রেমের বাড়িগুলোর সামনে। তিনি লিখেছেন, ‘সময় আসলে কোনো সরলরেখা নয়; বরং এক রহস্যময় বৃত্ত।’
তবে এই পর্বের প্রাণভোমরা হলো লেখকের বন্ধু ‘আইয়ুব’। প্রবাস জীবনের চাকচিক্যের আড়ালে যে দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে থাকে, তা আইয়ুবের চরিত্রের মাধ্যমে মূর্ত হয়ে উঠেছে। মেইন নদীর তীরে বসে আইয়ুব যখন বলে, ‘অভিবাসী মানে এক ধরনের চিরস্থায়ী একাকিত্ব,’ তখন বইটির শিরোনামের ‘পলাতক জীবন’ অংশটি সার্থক হয়ে ওঠে। প্রবাসীদের সংগ্রাম, স্বপ্নভঙ্গ এবং অস্তিত্বের সংকটকে লেখক অত্যন্ত মমতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। আইয়ুবের ঘরে রবীন্দ্রনাথের ছবি আর তাকে সাজানো বাংলা বইÑ বাঙালির শেকড়ের টানের এক করুণ অথচ সুন্দর প্রতিচ্ছবি।
আলতাফ হোসেন উজ্জ্বল পেশায় শিক্ষক এবং স্বকীয়তায় একজন কবি। তার গদ্যে তাই কবিতার আমেজ স্পষ্ট। তিনি যখন বলেন, ‘সব ক্লান্তি যেন গলে যায় আলোর স্পর্শে,’ তখন বোঝা যায় তিনি দৃশ্যপটের বাইরের অদৃশ্য অনুভূতিকেও ধরতে চেয়েছেন। স্থানিক বর্ণনার পাশাপাশি তিনি ইতিহাস, দর্শন এবং সমাজতত্ত্বকে মিশিয়েছেন নিপুণভাবে। নরওয়ের শীতলতা, ডেনমার্কের প্রশান্তি, জার্মানির গাম্ভীর্য আর সুইজারল্যান্ডের শুদ্ধতাÑ প্রতিটি দেশের আত্মাকে তিনি আলাদা রঙে চিত্রিত করেছেন।
লেখক খুব ধীরলয়ে পাঠককে সঙ্গে নিয়ে হাঁটছেন। কোথাও কোনো তাড়া নেই। তবে তথ্যের ভারে কোথাও কোথাও বর্ণনা কিছুটা প্রামাণিক মনে হতে পারে, যা সাধারণ পাঠকের কাছে সামান্য গুরুগম্ভীর লাগতে পারে। কিন্তু লেখকের রসবোধ এবং আবেগঘন বর্ণনা সেই ভারকে নিমেষেই লঘু করে দেয়। বিশেষ করে, মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগের গল্পগুলো বইটিকে নিছক ভ্রমণকাহিনী থেকে জীবনকাহিনীতে উন্নীত করেছে।
একটি বছর, একটি জীবন, একটি দেশ, একটি হৃদয়Ñ সব মিলিয়ে এই ভ্রমণ শুধু নিছক গল্প বলা নয়; এ যেন এক গভীর ধ্যান, এক অন্তদর্শন। বইটির পাতায় পাতায় লেখক পাঠককে এক গূঢ় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। এই ভ্রমণকাহিনী পড়তে পড়তে হয়তো কোনো পাঠক আনমনে ভাববেনÑ ‘এইতো, আমিও একদিন এমন করে হেঁটে যেতে চাই সুইস ট্রেইলে কিংবা নিস্তব্ধ হয়ে বসে থাকতে চাই ব্রাসেলের কোনো এক মিউজিয়ামে!’
লেখকের জবানিতেই যেন প্রতিধ্বনিত হয় এক অমোঘ স্বীকৃতিÑ ‘হ্যাঁ পাঠক, আপনিও ভ্রমণ করেছেন আমার চোখ দিয়ে, আমার পথে, আমার একাকিত্বে।’ আর এখানেই বইটির সার্থকতা। এটি কেবল ভ্রমণের সমাপ্তি নয়, বরং পাঠকের হৃদয়ে এক নতুন শুরুর প্রতিশ্রুতি।
‘পর্বত, পলাতক জীবন ও শুদ্ধতার শহর’ যারা পড়বেন, তারা হয়তো শারীরিকভাবে ইউরোপে যাবেন না, কিন্তু মানসিকভাবে ঘুরে আসবেন আল্পসের পাদদেশ কিংবা রাইন নদীর তীর থেকে। লেখক প্রমাণ করেছেন, ভ্রমণ মানে শুধু দেখা নয়, অনুভব করা। জলধি থেকে প্রকাশ হওয়া ঝকঝকে প্রচ্ছদ ও বাঁধাইয়ের এই বইটি ভ্রমণপিপাসু তো বটেই, যেকোনো সংবেদনশীল পাঠকের সংগ্রহে রাখার মতো।
দিন শেষে বইটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñ আমরা যেখানেই যাই না কেন, আমরা আসলে নিজেকেই খুঁজি। আর সেই খোঁজার নামই ভ্রমণ।
বই : পর্বত, পলাতক জীবন ও শুদ্ধতার শহর
লেখক : আলতাফ হোসেন উজ্জ্বল
প্রকাশক : জলধি
প্রকাশকাল : ২০২৬
বিষয় : ভ্রমণকাহিনী
মূল্য : ৩৫০
প্রচ্ছদ : লিটন হালদার