মাসুদুজ্জামান
প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০৪ এএম
অস্কার ওয়াইল্ড, ১৬ অক্টোবর ১৮৫৪-৩০নভেম্বর ১৯০০
মানবীয় ক্রমমুক্তির আলোদীপ এমনি এমনি এসে পৌঁছায় না। আসে দূর সূর্যালোক থেকে। ভূমণ্ডলকে প্লাবিত করে অপাবরণ ঘটায় শুভবোধের। তিনি নিজে যখন জ্যোতির্ময়, অন্যেরা তখন ছিলেন অন্ধকারে।
ডাবলিন থেকে এসেছিলেন লন্ডনে। ভিক্টোরীয় নৈতিকতার পীঠস্থান ইংল্যান্ড। সেই সময়ের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শহর লন্ডন। দীর্ঘকায় শরীর, সুদর্শন। চেহারা দেবদূতের মতো। কাঁধ অবধি ঢেউ খেলানো চুল, গলায় স্কার্ফ, মাথায় হ্যাট, তীক্ষ্ণ গভীর দৃষ্টি দূরতম দারুচিনি দ্বীপের দিকে। মেধা ও মননে সবাইকে ছাড়িয়ে যায় এই যুবকের কণ্ঠস্বর : ‘যে করেই হোক আমি বিখ্যাত হব এবং তা যদি না-ও পারি, কুখ্যাত হব।’ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর সগর্বে বলেছিলেন তিনি।
খ্যাতি-কুখ্যাতি দুইই জুটেছিল। সেই সময়ের নৈতিকতার মানদণ্ডে অভিযুক্ত হয়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন কারাগারে। সেখানেই হারিয়েছিলেন স্বাস্থ্য, নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও প্রিয়তমাকে। এত কিছুর পরও এই নাট্যকার অনুতপ্ত ছিলেন না। কারাগারে থাকতে আত্মপক্ষ সমর্থন করে লিখেছিলেন, ‘আনন্দে বাঁচার জন্য আমি যা করেছি, সেজন্য অনুতপ্ত নই।’
আমি দেখতে পাচ্ছি, অক্সফোর্ডের গথিক ভবনগুলোর সামনে দিয়ে সবুজ ঘাসের মখমল-চেরা আঁকাবাঁকা পথে হেঁটে চলেছেন সেই তরুণ। রোমাঞ্চকর অক্সফোর্ডে তিনি ছাত্র হয়ে এসেছিলেন ১৮৭০-এর দশকে। আন্ডারগ্র্যাডে তার মতো মেধাবী ছাত্র একজনও ছিলেন না। ফ্রাঁসোয়া অরি গ্রিবল্ ১৯১০ সালে প্রকাশিত দ্য রোমান্স অব দ্য অক্সফোর্ড কলেজ শীর্ষক বইতে সেই দিনগুলোর চিত্তাকর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন। নিজের ভাগ্য নিজেই গড়ে নিয়েছেন এই তরুণ। নিজেই হয়ে উঠেছেন কিংবদন্তি। এখনও তা ধূসর হয়ে যায়নি। রূপকথার রাজকুমারের মতো শুরু হয়েছিল তার শিক্ষাদীক্ষার দ্বিতীয় পর্ব। প্রথম পর্ব কেটেছিল ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজে। একেবারে কুয়াশাচ্ছন্ন আবহ থেকে উঠে আসেন পাদপ্রদীপের আলোয়, আর সেটা নিজেরই যোগ্যতায়। তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে অতলান্তিকের দুই প্রান্তে। কিন্তু কে এই উজ্জ্বল তরুণ, যিনি নিজের নামকেই অবিস্মরণীয় করে তুলেছিলেন? নিজের পিতৃপ্রদত্ত নামের প্রতি সুবিচার করার জন্যই হয়ে উঠেছিলেন দুর্ধর্ষ, দুর্মর। নিন্দিত বা নন্দিত হওয়ার সেই আত্মঘোষণা অক্ষরে অক্ষরে ফলে গিয়েছিল। নিজের কথাকে এভাবে নন্দিত থেকে নরকতুল্য করে তুলেছিলেন ওস্কার ওয়াইল্ড। ধ্বনিসাম্য অনুসরণ করলে ওয়াইল্ডের অর্থ তো সেই দুর্বিনীত, দুরাচারী।
প্রিয়তমা স্ত্রী কন্সস্ট্যান্স তখন দূরবর্তী স্মৃতির মতো, ‘আমি আমার চুলে তোমার আঙুলের স্পর্শ অনুভব করছি, তোমার চিবুক আমার গাল তপ্ত করে তুলছে।’ মাত্র দশ বছর আগে ঘটেছিল সেই মেলবন্ধন, ১৮৮৩ সালে বাগদান হয়েছিল। এই নারীকে অস্কার সত্যি অনেক ভালোবাসেন। বাগদানের হৃদয়াকৃতির আংটি কন্সট্যান্সকে পরিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘চারপাশের বাতাস তোমার কথার সংগীতে পরিপূর্ণ, আমার আত্মা ও শরীর তোমার সঙ্গে মিশে গেছে।’ আমার অনুভূতি শরীরী আকর্ষণ ছাড়িয়ে অতীন্দ্রিয় মনোলোকে আশ্রয় নিয়েছে।
সুন্দরী, গল্পপ্রিয় বুদ্ধিমতী কন্সস্ট্যান্স। প্রেমিক হিসেবে অস্কার ছিলেন তার পছন্দের শীর্ষ পুরুষ। শৈল্পিক বোহেমিয় স্বভাবের কারণে অস্কারকে তিনি পছন্দ করতেন। দুজনের যখন দেখা হয়, অস্কার তখন তারকাখ্যাতি পেয়ে গেছেন। শহরের বিখ্যাত পুরুষটিই তার প্রেমিক, যাকে দেখলে মেয়েদের হৃদয়তন্ত্রীতে ভালোলাগার কম্পন শুরু হয়। মুগ্ধতার সুর ওঠে। অপরিশীলিত কৌতুক, জমকালো পোশাক আর দুর্বিনীত আচরণের জন্য অস্কার এরই মধ্যে খ্যাতি পেয়ে গেছেন। ভিক্টোরীয় রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গিকে তুড়ি মেরে তাচ্ছিল্য করে চলেছেন। তার যৌনতা সম্পর্কে বাড়ছে জল্পনা।
দুজনের রুচি এক, অভিপ্রায় এক; দুজনেই উচ্চাকাঙ্ক্ষী। সেলিব্রেটি দম্পতি হিসেবে বাড়াছে সমাদর। সত্যিকারের যুগল হয়ে উঠলেন তারা। দুজনে একসঙ্গে শিশুদের জন্য বই লেখেন, বাড়ির নান্দনিক কারুকর্মে হাত দেন, নতুন ধরনের ট্রাইজার, আঁটোসাঁটো পোশাক সম্পর্কে প্রগতিপন্থী।
সুস্থির আপাতশান্ত প্রকৃতিতেও যেমন ঝড় ওঠে, দুজনের জীবনেও দেখা দিল ঘনঘোর অমানিশা। কন্সস্ট্যান্স গর্ভবতী হওয়ার পর নারীশরীরের প্রতি অস্কার ওয়াইল্ডের ঘৃণা জন্মে। শরীর কেন এভাবে বিকৃত, কুৎসিত হয়ে যাবে, এই নিয়ে বিব্রত ছিলেন তিনি। দুঃখপ্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘মাতৃত্ব কামনাকে হত্যা করে, গর্ভধারণের মধ্যে চাপা পড়ে যায় আবেগ।’ নারী রূপময়তার প্রতি তার যে আকর্ষণ ছিল তাতে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। অস্কার তার এই পরিবর্তন সম্পর্কে দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘যখন আমি বিয়ে করি, তখন আমার স্ত্রী ছিলেন সুন্দরী, সাদা লিলির মতো হালকা-পাতলা ছিল তার তনু। হাসিতে নৃত্যের তরঙ্গ আর সংগীতের সুরমূর্ছনা তৈরি হতো। কিন্তু মাত্র এক বছরের মধ্যে তার ফুলের মতো সৌন্দর্য অদৃশ্য হয়ে গেল... আমি তার প্রতি সদয় হওয়ার চেষ্টা করেছি, নিজে তাকে স্পর্শ এবং চুম্বন করেছি; কিন্তু সে সবসময় অসুস্থ থাকত এবং ওহ! আমি এটি মনে করতে চাই না, সবই ঘৃণ্য মনে হতো থাকল।’
১৮৮৬ সালের শেষ দিকে তাদের দ্বিতীয় পুত্রের জন্মের পর অস্কার ও কন্সস্ট্যান্স কখনও শারীরিকভাবে ঘনিষ্ঠ হননি। তখন থেকেই শুরু হয় অস্কারের বেপরোয়া সমকামী অভিযান। বছরের পর বছর তিনি এর দ্বারা আচ্ছন্ন ছিলেন, ছিলেন নিবিষ্ট। কন্সস্ট্যান্স বাড়িতে অস্কারের তরুণ পুরুষ ভক্তদের স্বাগত জানাতেন, তাদের পারিবারিক বন্ধু হিসেবেও গ্রহণ করেছিলেন। তার স্বামী কেন তার চেয়ে অর্ধেক বয়সী পুরুষদের সঙ্গে নিভৃতে সময় কাটাচ্ছেন, বিষয়টি তার কাছে অদ্ভুত লেগেছিল। কিন্তু তিনি এর পরিণতি কী হতে পারে, ভাবেননি। অস্কারকে আরও শক্ত করে বেঁধে রাখার পরিবর্তে তিনি তার গভীর রাতে বাইরে যাওয়া এবং ঘন ঘন অনুপস্থিতিকে সহ্য করেছিলেন। সম্ভবত ভেবেছিলেন, স্বাধীনতা দিয়ে তিনি তাদের সম্পর্ক বাঁচাতে পারবেন। কন্সস্ট্যান্সও এ সময় বাইরের জগতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। রাজনৈতিক মিছিল, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি বন্ধুদের সঙ্গ কামনা করতেন। নিজের একাকিত্বকে এভাবেই তিনি দূরে সরিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। এই সময়ই অস্কারের একটি বই সম্পাদনা করতে গিয়ে এক প্রকাশকের সঙ্গে গোপন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি। কিন্তু অনেকেই বুঝতে পারছিলেন, তাদের সম্পর্কে চির ধরেছে। কবি ইয়েটস কথা প্রসঙ্গে এই ভঙ্গুর সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছিলেন। ১৮৯১ সালে সম্পর্কের এই ফাটল দৃশ্যমান হয় বোসি নামের এক তরুণের সঙ্গে অস্কারের সমকামী সম্পর্কে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ার পর। এই দুই পুরুষ অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কে জড়িয়ে একসঙ্গে বসবাস করতে থাকেন। সমকামিতা তখন ব্রিটিশ আইনে ছিল নিষিদ্ধ, শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু এই সম্পর্কে বাদ সাধলেন বোসির বাবা কুইন্সবেরি মার্কেস। অস্কার কুইন্সবেরির বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন। কিন্তু সেই মামলায় অস্কার নিজেই নিজের বিপদ ডেকে আনেন।
অস্কার আদালতে সমকামিতার অভিযোগে অভিযুক্ত হন এবং তাকে কারাগারে যেতে হয়। জুরিরা উল্লেখ করেছিলেন, ‘দুঃখজনক হলেও আমরা লন্ডনের সবচেয়ে মেধাবী মানুষটিকে ধ্বংস করে দিয়েছি।’
এতকিছুর পরও কন্সস্ট্যান্স অপমানিত স্বামীর প্রতি অনুগত ছিলেন। কারাগারে তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। মানসিক ও আর্থিক সহায়তা করেছিলেন। তিনি তাকে ক্ষমা করতেও প্রস্তুত ছিলেন। বিয়ে বিচ্ছেদের আবেদনও করেছিলেন অনেক দেরিতে। কিন্তু মুক্তির পর অস্কার বোসির কাছে আবার ফিরে গেলে তিনি সব আশা ছেড়ে দেন। অস্কারের মুক্তির কয়েক মাস পর মাত্র ঊনত্রিশ বছর বয়সে একটা জটিল অস্ত্রোপচারের সময় তার মৃত্যু হয়। স্ত্রীর সমাধি দেখতে গিয়ে অস্কার দুঃখ করে লিখেছিলেন, ‘সমস্ত অনুশোচনাই আজ অর্থহীন। জীবন কী নির্মম!’
বন্ধুদের পরামর্শে অস্কার আশ্রয় নিলেন ফ্রান্সে। তখন তার শরীর ভেঙে পড়েছে। কন্সস্ট্যান্সের শোকে বিমর্ষ, কাতর। ঠিক ১৯০০ সালের ৩০ নভেম্বর মাত্র ৪৬ বছর বয়সে এই পৃথিবী থেকে অস্কার ওয়াইল্ড বিদায় নিলেন।
অনন্তলোক থেকে আলো যেমন আসে, তেমনি অন্ধকারের বর্ষাও আমাদের বিদ্ধ করে। অসম্ভব প্রতিভাবান এক নক্ষত্র, আধুনিক বিশ্বের প্রথম সেলিব্রেটি ও র্যাডিক্যাল চিন্তক নশ্বর পৃথিবী থেকে অবিনশ্বর অসীমে মিলিয়ে গেলেন।