হাবীব ইমন
প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:২৭ এএম
বাংলা ভাষার ইতিহাস কেবল সাহিত্য ও ব্যাকরণের বিবর্তনের নয়, এটি রক্ত দিয়ে কেনা ভাষার ইতিহাস।
ভাষা ছাড়া জাতিসত্তা যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি বাঙালি জাতিকে বাদ দিয়ে বাংলা ভাষার ইতিহাস কল্পনাও করা যায় না। এই ভাষা কেবল ভাব প্রকাশের বাহন নয়, এটি আমাদের চিন্তা, সংস্কৃতি, আন্দোলন ও আত্মত্যাগের এক গৌরবময় চিহ্ন।
ইতিহাসের গভীরে গেলে দেখা যায়, বাংলা ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা-পরিবারের অংশ। যদিও একসময় মনে করা হতো বাংলা সরাসরি সংস্কৃতের বংশধর, আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানীরা বাংলা ভাষার উৎপত্তিকে মাগধী প্রাকৃত, পালি ও অন্যান্য ইন্দো-আর্য ভাষার সম্মিলিত ফসল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
বর্তমানে বাংলা ভাষা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভাষা। ইংরেজি, চৈনিক ও স্প্যানিশের পর এটি কখনও চতুর্থ, কখনও সপ্তম স্থানে অবস্থান করে। দক্ষিণ এশিয়ার পূর্বপ্রান্তে জন্ম নেওয়া এই ভাষা কেবল বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা নয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামের বারাক উপত্যকাতেও দাপ্তরিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। প্রবাসী বাঙালিদের মাধ্যমে এটি ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আমেরিকায়ও বিস্তৃত হয়েছে।
বাংলা ভাষার প্রাচীনতম লিখিত নিদর্শন চর্যাপদ (৮ম-১২শ শতক)। এই বৌদ্ধ সাহিত্যে প্রত্ন-বঙ্গীয় ভাষার সেই আদি রূপ দেখা যায়, যার অনেক শব্দ ও ধ্বনি আজকের বাংলার ভিত্তি রচনা করেছে। ভাষাবিজ্ঞানীরা একে প্রামাণ্যভাবে বঙ্গীয় ভাষার পূর্বসূরি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
বাংলা ভাষার বিবর্তনকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয় : ১. প্রাচীন বাংলা (৯০০-১৪০০) : চর্যাপদই এই পর্বের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। ২. মধ্য বাংলা (১৪০০-১৮০০): চণ্ডীদাস, মঙ্গলকাব্য ইত্যাদি। ৩. আধুনিক বাংলা (১৮০০-বর্তমান) : গদ্য ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ ও সর্বব্যাপী ব্যবহার।
কিন্তু বাংলা ভাষার ইতিহাস কেবল সাহিত্য ও ব্যাকরণের বিবর্তনের নয়, এটি রক্ত দিয়ে কেনা ভাষার ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে মাতৃভাষার স্বীকৃতির দাবিতে শহীদ হন সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারসহ আরও অনেকে। ১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচরের রাজপথে প্রাণ দেন শচীন পাল, সুনীল সরকার, কমলা ভট্টাচার্যরা। পৃথিবীর ইতিহাসে ভাষার জন্য এমন আত্মত্যাগ বিরল। একুশে ফেব্রুয়ারি তাই কেবল স্মরণদিবস নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রতীক, যা ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
ভাষা কেবল ভাবপ্রকাশ নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক নির্মাণ, যা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্তরে সম্পর্ক নির্ধারণ করে। কিন্তু সব ভাষা সমান মর্যাদা পায় না। বিশেষত আঞ্চলিক ভাষাগুলো প্রান্তিক, উপেক্ষিত ও বঞ্চিত থাকে। এই বৈষম্য কেবল সাংস্কৃতিক নয়; এটি শ্রেণিভিত্তিক, কাঠামোগত এবং রাজনৈতিক-তাত্ত্বিক এক নিপীড়নব্যবস্থা।
ভাষার মর্যাদা : শ্রেণি ও সাংস্কৃতিক ক্ষমতার প্রতিচ্ছবি
আমাদের সমাজে ভাষার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নিরপেক্ষ নয়, বরং তা শ্রেণিভিত্তিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষমতার জটিল জালে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। শহরকেন্দ্রিক, মিডিয়া-অনুমোদিত প্রমিত বাংলা ভাষাকে সাধারণত ‘শুদ্ধ’, ‘ভদ্র’, এমনকি ‘বুদ্ধিদীপ্ত’ হিসেবে তুলে ধরা হয়। বিপরীতে, গ্রামীণ বা আঞ্চলিক ভাষাভঙ্গিকে ‘অশিক্ষিত’, ‘অপরিষ্কার’ বা ‘অভদ্র’ হিসেবে দেখা হয়। এই ভাষাগত শ্রেণিবিন্যাস আমাদের সমাজের ভেতরে গভীর বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদের ইঙ্গিত বহন করে।
ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক পিয়েরে বুর্দিয়ু এই বিভাজনকে ব্যাখ্যা করতে ব্যবহার করেন ‘linguistic capital’ ধারণাটি। তার মতে, যে ভাষা বা উপভাষা সামাজিকভাবে অধিক মূল্যায়িত ও গ্রহণযোগ্য তা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষমতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। এই ভাষা ব্যবহারকারীরা সমাজে উচ্চ মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা পান, কারণ তাদের ভাষা ‘ক্ষমতার ভাষা’ হিসেবে স্বীকৃত। অন্যদিকে, যেসব ভাষাভঙ্গি স্থানীয় বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীরÑ তা ব্যবহারে সামাজিক লজ্জা, উপহাস ও বঞ্চনা জড়িত থাকে।
এখানে ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি একটি প্রতীকী শক্তিÑ যার মাধ্যমে শ্রেণি, সংস্কৃতি ও আধিপত্যের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। স্কুলে, আদালতে, গণমাধ্যমে, এমনকি সাহিত্যেও প্রমিত ভাষার একচেটিয়া আধিপত্য দেখা যায়, যেখানে আঞ্চলিক ভাষা হয় বাদ, নয় অবজ্ঞার শিকার। শিক্ষাব্যবস্থায় ‘ভালো ভাষা’ শেখানো মানে আসলে সেই প্রভুত্বশীল ভাষাকে শেখানো, যা শিক্ষার্থীদের সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে তাদের নিজেদের আঞ্চলিক বা পারিবারিক ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন করে তোলে।
আসলে ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে যারা প্রভুত্ব করে, তারা শুধু শব্দ নয়, সাংস্কৃতিক মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেয়। এইভাবে ভাষার ভেতরেও শ্রেণি ও বঞ্চনার কাঠামো গড়ে ওঠেÑ যা কেবল অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিকভাবেও আমাদের আত্মপরিচয়কে সংকুচিত করে।
ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো
ব্রিটিশ শাসনামলে ইংরেজি ভাষাকে প্রশাসন ও শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। উপনিবেশের ভাষানীতি ছিল একটি শক্তিশালী রাজনীতির হাতিয়ার, যার মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে অবহেলা করে ব্রিটিশ শাসকের আধিপত্য নিশ্চিত করা হয়। ইংরেজি শেখানো শুধু শিক্ষার প্রসার নয়, বরং ছিল উপনিবেশের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক দখলের একটি কৌশল। এর ফলে শাসিত জনগণের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বা ‘অশিক্ষিত’ হিসেবে স্বীকৃত হয়।
স্বাধীনতার পরেও অনেক নতুন রাষ্ট্রে এই ঔপনিবেশিক ভাষানীতির প্রভাব গভীরভাবে রয়ে যায়। জাতীয়তাবাদের নামে একমাত্রিক ভাষানীতি চালু হয়, যা জাতীয় ঐক্যের নামে আঞ্চলিক ভাষা ও উপভাষাকে হীনম্মন্যতা ও দমননীতির মুখোমুখি করে। বাংলাদেশেও ঢাকাকেন্দ্রিক প্রমিত বাংলা ভাষাকে প্রশাসন, শিক্ষা, গণমাধ্যম এবং সরকারি নীতির একচ্ছত্র মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। এর ফলে দেশের আঞ্চলিক ভাষাগুলোÑ যেমন চট্টগ্রামের চিটাগাং, সিলেটের সিলেটি, রাঙামাটির পার্বত্য ভাষাগুলো বা বরিশালের আঞ্চলিক উপভাষাগুলো ধীরে ধীরে সাংস্কৃতিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়তে থাকে।
এই প্রক্রিয়া শুধু ভাষাগত বৈচিত্র্যের হ্রাস ঘটায় না, বরং আঞ্চলিক জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক নিপীড়ন ও আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি করে। কারণ ভাষা হলো আত্মপরিচয়ের অন্যতম প্রধান মাধ্যম; যখন একটি ভাষাকে অবমূল্যায়ন করা হয়, তখন তার সঙ্গে যুক্ত সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মানুষের আত্মসম্মানও ক্ষুণ্ন হয়। এই দমননীতির মধ্য দিয়ে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার আজও বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও ভাষানীতিতে ছাপ ফেলেছে।
তবে এই সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বাংলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলা একাডেমি বাংলা ভাষার শুদ্ধতা, সমৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য কাজ করার পাশাপাশি আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতির সংরক্ষণে সচেষ্ট। বাংলা একাডেমি বিভিন্ন গবেষণা, প্রকাশনা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মাধ্যমে ঔপনিবেশিক ভাষানীতির ছায়া কাটিয়ে ভাষার স্বাতন্ত্র্য ও বৈচিত্র্য রক্ষায় অবদান রেখেছে।
তবে আজকের বাংলাদেশেও ভাষাগত বৈচিত্র্য ও আঞ্চলিক ভাষার স্বীকৃতি ও সুরক্ষার ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় নীতিতে ভাষার প্রতি সমান সম্মান না থাকায় আঞ্চলিক ভাষাগুলো আজো সাংস্কৃতিক অবহেলা ও সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন। তাই বাংলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা আরও প্রসারিত করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ভাষা নীতির সংস্কার ও বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে প্রতিটি ভাষা তার নিজস্ব মর্যাদা ও সাংস্কৃতিক অবস্থান ফিরে পায়।
ভাষা, সাংস্কৃতিক আধিপত্য ও ক্ষমতার রাজনীতি
গ্রামসি ভাষা ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের মধ্যকার সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখেন। তার মতে, ‘প্রতিটি আধিপত্যের সম্পর্কই একধরনের শিক্ষাবন্ধন।’ অর্থাৎ ক্ষমতাধর শ্রেণি শুধু তাদের ভাষাকে চাপিয়ে দেয় না, বরং সেটিকে শালীনতা, সংস্কৃতি ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদিবাসী, গ্রামীণ ও সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ভাষাকে একধরনের ‘ভুল’ বা ‘অগ্রহণযোগ্য’ ভাষা হিসেবে গড়ে তোলা হয়। এর ফলে ভাষার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের সূক্ষ্ম একটি স্তর সৃষ্টি হয়, যা নির্যাতিত গোষ্ঠীর আত্মপরিচয়কে দুর্বল করে দেয়।
নোয়াম চমস্কি এই চিন্তাকে আরও গভীরতর করেছেন। তিনি বলেন, ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি মতাদর্শের বাহক। যখন শিশুদের পরিবার বা সমাজ বলে, ‘ভদ্রভাবে বলো,’ তখন তারা তাদের নিজের ভাষা ও পরিচয়কে অবচেতনভাবে দমন করার শিক্ষা নেয়। এই শিক্ষা রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় সাংস্কৃতিক পরাধীনতায় রূপ নেয়, যেখানে আধিপত্যশীল গোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতিকে ‘শুদ্ধ’ ও ‘সম্মানিত’ হিসেবে দেখানো হয়, অন্য ভাষাগুলোকে হীন করা হয়।
মিলান কুন্দেরার ভাষায়, ‘মানুষের ক্ষমতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম মানে ভুলে যাওয়ার বিরুদ্ধে স্মৃতির সংগ্রাম।’ আঞ্চলিক ভাষা শুধুমাত্র শব্দের সমষ্টি নয়; এর মধ্যে নিহিত থাকে একটি জনগোষ্ঠীর লোক ইতিহাস, পারিবারিক স্মৃতি ও আবেগের জমাট বাঁধা চিত্র। যখন আঞ্চলিক ভাষা হারিয়ে যায়, তখন সেই জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, প্রতিরোধ ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ও ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে যায়। ভাষা হারানো মানে শুধু ভাষাগত ক্ষতি নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের সংকট।
বাংলা ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এই ভাবনাকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন, ভাষা হলো একটি জাতির মনন ও অস্তিত্বের আঙিনা। ভাষার মাধ্যমে ইতিহাস রচিত হয়, সংস্কৃতি ধারিত হয় এবং জনমানুষের স্বপ্ন ও সংগ্রামের গাথা সংরক্ষিত থাকে। তিনি সতর্ক করেন যে, আঞ্চলিক ভাষার অবহেলা ও অবসান জাতির সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং সমাজের অভ্যন্তরীণ বহুবচনতা ও সমৃদ্ধি হ্রাস পায়। তার মতে, ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া মানে নিজস্ব ঐতিহ্য ও অস্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া।
সার্বিকভাবে দেখা যায়, ভাষার ক্ষমতা-রাজনীতি গভীরতর, যেখানে আধিপত্যশীল শ্রেণি ভাষাকে ব্যবহার করে তাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শাসন সুদৃঢ় করে। এ ক্ষেত্রে ভাষার স্বাতন্ত্র্য রক্ষা শুধু সাংস্কৃতিক অধিকার নয়, বরং সামগ্রিক সামাজিক ন্যায় ও আত্মপরিচয়ের জন্য একটি রাজনৈতিক সংগ্রাম।
আঞ্চলিক ভাষা ও আত্মপরিচয়
ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং তা এক জাতিগোষ্ঠীর স্মৃতি, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের ধারক। বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষাগুলো যেমন সিলেটি, চাটগাঁইয়া, নোয়াখাইল্লা, বরিশাইল্যা, রংপুরিয়া, খুলনাইয়া কিংবা রাজশাহীর ভাষ্যবিন্যাসÑ এ সবই শুধু ভিন্ন উচ্চারণে কথা বলার পদ্ধতি নয়, বরং ভিন্ন ভিন্ন সাংস্কৃতিক ইতিহাসের বাহক। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে এই ভাষাগুলোর অস্তিত্ব প্রায় নিঃশব্দ। এগুলো যেন ‘বাংলা ভাষার নিচু স্তর’, এমন ধারণা আমাদের পাঠ্যবই, মিডিয়া এবং শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়েই শিশু বয়স থেকে রোপিত হয়।
এই নিঃস্বীকৃতির রাজনীতি কেবল ভাষাগত নয়, শ্রেণিগতও বটে। আঞ্চলিক ভাষার সঙ্গে সাধারণত যুক্ত হয় গ্রামীণ জীবন, দরিদ্রতা, শ্রমজীবী মানুষের সংস্কৃতি, যার সামাজিক মর্যাদা শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির চোখে খুব কম। ফলে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলাটা হয়ে ওঠে একধরনের লজ্জার বিষয়, এমনকি বুদ্ধিজীবী শ্রেণিতেও। উচ্চারণ শুদ্ধ না হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ছাত্রছাত্রীদের হেয় হতে হয়। অথচ ভাষার ভেতরেই তো ব্যক্তির পরিচয়ের প্রথম ছাপ। যে শিশুটি প্রথম ‘মা’ বলে ডাকে, সে তার আঞ্চলিক টানেই তো ভাষায় প্রবেশ করে। অথচ সেই শিশুকেই বিদ্যালয়ে গিয়ে শিখতে হয়, তার মায়ের ভাষা ‘ভুল বাংলা’।
রাষ্ট্রীয় ‘এক জাতি, এক ভাষা, এক সংস্কৃতি’ নীতির ফলে আমাদের বহুমাত্রিক ভাষাগত পরিচয় চেপে ধরা হয়েছে তথাকথিত ‘শুদ্ধ বাংলা’ নামে একরকমের শহুরে উচ্চারণভিত্তিক প্রমিত রূপে। এটি ছিল একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, যাতে বহুস্বরকে নীরব করে একক স্বর প্রতিষ্ঠা করা যায়। এর পেছনে ঔপনিবেশিক আমলের ভাষানীতির উত্তরাধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে জাতি-রাষ্ট্র গঠনের নামে সাংস্কৃতিক একরূপতা চাপানোর একচোখা প্রয়াস। এই ‘প্রমিত বাংলা’ আদতে কলকাতা-কেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত হিন্দু সমাজের উচ্চারণ ও ব্যাকরণভিত্তিক, যা পূর্ববাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে প্রচলিত বৈচিত্র্যপূর্ণ ভাষাচর্চার প্রতি ছিল নিদারুণ ঔদাসীন্যপূর্ণ।
এমন ভাষানীতির ফলে বাংলার মানুষের মধ্যে একটি অন্তঃসত্ত্বা বঞ্চনার মনস্তত্ত্ব গড়ে ওঠে। নিজস্ব উচ্চারণকে ভুল বলে জেনে শিশুরা নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে একরকম বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। শহুরে শিক্ষা ব্যবস্থায়, করপোরেট মিডিয়ায় ও সাহিত্যে এই আঞ্চলিক রূপগুলোর অস্তিত্ব প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে ‘বাংলা’ বলতে আজ যা বোঝানো হয়, তা মূলত একটি সাংস্কৃতিক আধিপত্যের ফল। এই আধিপত্য কেবল ভাষার নয়, বরং শ্রেণি ও ক্ষমতারও।
আসলে ভাষার ভেতরেই শ্রেণি রয়েছে। ধনিক শ্রেণি যেভাবে উচ্চারণ করে, রাষ্ট্র তা-ই মান্য করে। গরিব মানুষের ভাষা হয়ে ওঠে ‘ভুল’, ‘অশুদ্ধ’, ‘অপরিচর্য’। ফলে ভাষা এখানে সাংস্কৃতিক পুঁজি, এবং যাদের ভাষা ‘মান্য’ তাদের শ্রেণিগত কর্তৃত্বও প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ভাষিক শ্রেণিবিভাজনের ভেতরে আত্মপরিচয়ের সংকট ঘনীভূত হয়Ñ একজন রংপুরের কৃষক জানেন, তার ভাষা ‘ঠিক’ নয়; একজন নোয়াখালীর ছাত্রী জানেন, তার ভাষায় চাকরির ভাইভায় হাসাহাসি হবে।
এই বাস্তবতায় আঞ্চলিক ভাষাকে স্বীকৃতি ও মর্যাদা দেওয়ার দাবি নিছক সংস্কৃতির প্রশ্ন নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন। এটি শ্রেণির প্রশ্ন, আত্মমর্যাদার প্রশ্ন, সাংস্কৃতিক মুক্তির প্রশ্ন। মাতৃভাষার ভেতরেই জাতির আত্মা লুকিয়ে থাকে, তবে তা যদি সত্যিকারের মাতৃভাষা হয়, যদি রাষ্ট্র সেই মাতৃস্বরকে স্বীকৃতি দেয়। নইলে মাতৃভাষার নামে আমরা আসলে শিখি এক বৈদেশিক ‘শুদ্ধতা’, এক বহিরাগত আদর্শ, যা আমাদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্বকে করে তোলে পরাধীন।
প্রমিত বনাম আঞ্চলিক ভাষা : দ্বন্দ্ব, বাস্তবতা ও ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ
বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও প্রমিত ভাষা ও আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে একটি গভীর দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। আঞ্চলিক ভাষাপ্রেমীরা প্রমিত ভাষাকে কখনও নিজস্বতা ও সংবেদনের ক্ষেত্রে বিকৃত ও সংকুচিত হিসেবে দেখেন, যেখানে প্রমিত ভাষাপ্রয়োজকরা এটি জাতির মধ্যে সুষ্ঠু ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেন। সাধারণত একটি প্রশ্ন ওঠেÑ সব আঞ্চলিক ভাষা যদি সমান মর্যাদা পায়, তবে কে নির্ধারণ করবে প্রমিত রূপ? সিলেটি, চাটগাঁইয়া, কুমিল্লা কিংবা খুলনার ভাষার মধ্যে প্রমিত ভাষা কীভাবে গড়ে উঠবে? ভাষাবিদদের মতে, একাধিক আঞ্চলিক ভাষার মিশ্রণে একটি নতুন প্রমিত রূপ তৈরি করলে ভাষার ব্যাকরণ, অর্থ ও উচ্চারণ জটিলতর হবে, যা যোগাযোগকে কঠিন করে তুলবে।
প্রমিত ভাষার প্রয়োজনীয়তা এখানেই নিহিতÑ এটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য একটি সমন্বিত ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। তবে ব্রাত্য রাইসু ও সোহেল হাসানের মতো ভাষাবিদরা প্রমিত ভাষাকে ব্যবহৃত ভাষার সংকোচন বা ‘ভাষার কঙ্কাল’ হিসেবে দেখেন, যা আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ। তবু তাদের উদ্বেগ একপাক্ষিকÑ কারণ আঞ্চলিক ভাষাও শব্দভাণ্ডার, প্রসার ও ব্যবহারিক দিক থেকে সীমিত।
অন্যদিকে প্রমিত ভাষার বৈজ্ঞানিক ও বৌদ্ধিক ভূমিকা অপরিসীম। দর্শন, সাহিত্য ও বিজ্ঞানচর্চার জন্য ‘বিনির্মাণ’, ‘কলাকৈবল্যবাদ’, ‘আসঞ্জনবিদ্যা’ ইত্যাদি প্রমিত ভাষায় গঠিত পরিভাষা আঞ্চলিক ভাষায় নেই। এ কারণে প্রমিত ভাষার প্রসার ঐতিহাসিক ও সামাজিক বাস্তবতা, যা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর বোধগম্যতা ও প্রয়োজনে নির্মিত।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রমিত ভাষা একাধারে ঔপনিবেশিক ও সংস্কৃত পণ্ডিতদের সহায়তায় গড়ে উঠলেও এটি সম্পূর্ণ নির্মিত হয়নি। বাংলা ভাষার প্রমিত রূপ বিকশিত হয়েছে জনগণের মুখের ভাষার ধারায়, যদিও নদীয়াকেন্দ্রিক হলেও এতে সিলেটি, চাটগাঁইয়া ও নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষার সীমাবদ্ধতাÑ গঠন, উচ্চারণ ও প্রচলনের পরিসরের কারণে অংশগ্রহণ ছিল কম।
ভাষা ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের ভবিষ্যৎ
প্রমিত ভাষার প্রাণহীনতা কোনো অন্তর্নিহিত সমস্যার প্রতিফলন নয়। আল মাহমুদ, জীবনানন্দ দাশ, সৈয়দ মুজতবা আলীসহ অসংখ্য মেধাবী লেখক প্রমিত ভাষাকে আঞ্চলিক রূপ ও উপাদান সংযোজনের মাধ্যমে প্রাণবন্ত করে তুলেছেন। ভাষা তখনই জীবন্ত হয় যখন আমরা তাতে অনুভব, চিন্তা ও অর্থারোপ করি।
প্রমিত ভাষা ও আঞ্চলিক ভাষার দ্বন্দ্ব কোনো একক ও চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছায় না। বরং আমাদের দরকার এক বহুত্ববাদী ভাষা-চর্চা, যেখানে আঞ্চলিক ভাষার মর্যাদা ও ঐতিহাসিক স্মৃতি রক্ষিত থাকবে এবং প্রমিত ভাষা হিসেবে থাকবে সমন্বয়ের একটি পরিশীলিত মাধ্যম। ভাষার বৈচিত্র্যই একটি দেশের গণতন্ত্রের প্রাণ; কারণ আঞ্চলিক ভাষা শুধু একটি অঞ্চল নয়, বরং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের ইতিহাস, স্মৃতি, সংগ্রাম ও সম্ভাবনা।