মাহমুদ শফিক, মাহমুদ কামাল, সুহিতা সুলতানা, কানিজ পারিজাত
প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:১৯ এএম
ধানসিড়ি কবিতা। প্রতীকী ছবি
ব্যক্তিগত দূরত্বে
মাহমুদ শফিক
আমরা প্রত্যেকেই এখন ব্যক্তিগত
দূরত্বে আছি, কারও সঙ্গে কারও
কথা হয় না,
কেউ নই উদ্বাস্তু কিংবা উন্মূল,
বরং গৃহবাসী এবং আরামপ্রিয়,
ব্যক্তিগত দূরত্বে থেকেও বাস
করছি একই পৃথিবীতে, চতুর্দিকে
ছড়িয়ে আছে আমাদের পায়ের
শব্দ।
আমরা প্রত্যেকেই এখন ব্যক্তিগত
দূরত্বে আছি, আমাদের মাঝখান
দিয়ে বয়ে যাচ্ছে খরস্রোতা নদী,
তাই এপার থেকে ওপারে কিছুই
যাচ্ছে না দেখা, সকলেই সকলের
কাছে অস্পষ্ট।
আমরা প্রত্যেকেই এখন ব্যক্তিগত
কারণে
আয়নার পেছন থেকে ঘষে ঘষে
তুলে ফেলছি পারদ, মুছে ফেলছি
প্রতিবিম্ব, যেমন পা থেকে দূরত্বে
থাকে মাথা, তেমন আমরা প্রত্যেকে
আছি ব্যক্তিগত দূরত্বে,
আমাদের মধ্যে কেউবা আঙুলের
দাগ মুছতে মুছতে খুঁজে ফিরছে
আধপোড়া সিগারেট, কেউবা
খুঁজছে ছেঁড়া-টুকরো বজ্র কিংবা
ভাঙা মাথার খুলি।
আমরা সকলেই একই বাসের যাত্রী,
যাচ্ছি ভিন্ন ভিন্ন কাজে, একই মানুষ
ঘরে ফিরছি ভিন্ন মানুষ হয়ে।
একুশের মন্ত্র
মাহমুদ কামাল
একুশ বছর বয়সে মনে হয়েছিল
সংখ্যাটি বিদ্রোহের
বায়ান্ন বছর বয়সে মনে হয়েছিল
সংখ্যাটি বিপ্লবের
আটষট্টি বছর বয়সে মনে হচ্ছে
সংখ্যাটি যৌবনের।
কারণ আটষট্টির আগেই
৫২ ও ২১ আমাকে
মন্ত্র শিখিয়েছে।
ভূমিপুত্র
সুহিতা সুলতানা
বহুদিন পর আবার মুখ ও মুখোশের রহস্য খুলে পড়ল
চোখের ওপর!বুকের পাঁজর ভেঙে যারা ভাষা ও দেশকে
রক্ষা করেছিল,অবলীলায় তাদেরকে হত্যা করবার জন্য
ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়ে রেখেছিল গ্রামে-গঞ্জে,পথে-ঘাটে
কূল-উপকূলে, ঘর-দরজা সীমানা বরাবর! দক্ষিণবঙ্গের
চেনা পথ অচেনা হয়ে উঠতে লাগল ক্রমশ! চারদিকে
গুপ্তচর আর বিশ্বাসঘাতকের অট্টহাস্য আমাকে অস্থির
শূন্যতা আর মাঘের ঝরাপাতার মতো বিবর্ণ করে তুলল!
কী আশ্চর্যভাবে দেশপ্রেম আমাকে ছদ্মবেশী হাওয়ার
ভেতর থেকে পাখির ডানায় ভর করে উড়িয়ে নিয়ে এলো
ফেব্রুয়ারির আলোকময় দিনে! মানুষ যখন সবুজকে সবুজ,
লালকে লাল আর না কে না বলতে ইতস্তত! ঠিক তখন
সাহসের পথ দেখাল ভূমিপুত্র!এই দেশ আমাদের, এই
মানচিত্র আমাদের, এই লাল-সবুজ পতাকা আমাদের,
বাংলা ভাষা আমাদের, আমরা বাঙালি, আমাদের দেশের
নাম বাংলাদেশ। আমাদের ঠিকানা ’৫২ থেকে ’৭১!
জন্ম-আঁতুড়ঘর
কানিজ পারিজাত
সব পথ এখানে এসে শেষ
হয়ে যায়;
রাজপথ কিংবা সাক্ষীপথ—
সরল কিংবা বক্রপথ—
নতুন এবং পুরনো পথ—
সব পথ এখানেই এসে
শেষ হয়ে যায়;
সব রেখা—
সরল কিংবা কৌণিক—
কর্কটীয় কিংবা মকরীয়—
জ্যামিতিক কিংবা ত্রিকোণমিতিক—
নানাবিধ নকশা এঁকে
এখানেই এসে থমকে যায়
এক স্থির বিন্দু হয়ে;
এখানেই গাছেরা দাঁড়িয়ে থাকে ঠায়—
ত্রিকালোজ্ঞ বটের মতোই
ইতিহাস-সত্য হয়ে;
এখানেই পাখিরা ফিরে আসে
বারবার—
দিন ও রাতের মোহনায়;
এখানেই কোনো কোনো প্রভাতে ঘণ্টা বেজে ওঠে—
হাতে ফুল— পলাশ-শিমুল…
বিশ্বাসীরা হেঁটে আসে—
ঘন-ধীর— খালি পায়ে…
এখানেই বিশ্বাসীরা বলে ওঠে—
‘বায়ান্ন থেকে একাত্তর
আমার অস্তিত্বের পরিচয়—
আমার আত্মার অহংকার—
আমার জন্মসাঁতার—’
এখানেই হৃদয় যাদের তালাবদ্ধ নয়
শুধু তারাই গেয়ে ওঠে সেই গান—
‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো
একুশে ফেব্রুয়ারি,
আমি কি ভুলিতে পারি...!’
এখানেই কেউ কেউ থেকে যায়
থেকে যায় অনন্তকাল
নিস্তব্ধতার চাদর পরে
দৃশ্যের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে;
এখানেই ফুল— পাতা— পাখি
সমস্বরে বলে ওঠে—
‘ওরা ছিল, ওরা আছে, ওরা থাকবে;
আর থাকবে এই মিনার
বাঙালির জন্ম-আঁতুরঘর।