ধ্রুব সাদিক
প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৫:২৫ পিএম
কথাসাহিত্যিক শওকত আলী এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াস— দুজনই ছিলেন রাজনীতি-মনস্ক, গভীর জীবনদর্শনের এবং বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের জায়গা-জমিন-ভাষার কথাশিল্পী। কালজয়ী সৃষ্টিকর্মের জন্য বাংলা সাহিত্যের অনন্য স্থানে আসীন উভয় কথাসাহিত্যিক জন্মলাভ করেছেন ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে। শওকত আলীর জন্ম ১৯৩৬ সালে আর এর সাত বছর পর আখতারুজ্জামান ইলিয়াস জন্মলাভ করেন। আমাদের এই দুই কথাসাহিত্যিক একে অপরের সাথে এতটাই নিবিড়ভাবে জড়িত যে তাদেরকে যেন আলাদাই করা যায় না।
সেই যে প্রথম দেখা হয়েছিল কবি সিকান্দার আবু জাফর-সম্পাদিত সমকাল সাহিত্য পত্রিকার অফিসে ১৯৬২ সালে, এরপর জগন্নাথ কলেজে একসাথে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে তারা ছিলেন নিবিড়ভাবে জড়িত; নানান কাজে ও কর্মে। লেখক-অনুবাদক অধ্যাপক খালিকুজ্জামান ইলিয়াস দুজন কথাসাহিত্যিকের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। স্যার যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন, তিনি প্রায়ই তার ভাই আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে দেখতে যেতেন এবং মাঝেমধ্যে শওকত আলীর ‘বিরতি ভিলা’ নামের বাড়িটিতে কয়েক দিন থাকতেন। হাটখোলা রোডের যে বাড়িটির নিচতলায় ইলিয়াস একসময় ভাড়া থাকতেন।
আমাদের দুই কথাসাহিত্যিকের ব্যাপারে স্যারের থেকে একবার জানতে চেয়েছিলাম যে তিনি দুজনকে কেমন দেখেছেন। তিনি বলেন, শওকত আলী এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াস দুজনের জীবনধারা ও লেখায় এত বেশি মিল রয়েছে যে মাঝে মাঝে তাদের আত্মার সঙ্গী বলতে হয়। খালিকুজ্জামান ইলিয়াসের অভিমত হলো, তারা দুজনই এমন ধরনের লেখকÑ যারা আত্মপ্রচারের বিরুদ্ধে ছিলেন। পাঠদানের পাশাপাশি লেখালেখিতে তারা ছিলেন একেবারেই সৎ।
বাম সাহিত্য সংগঠন বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন শওকত আলী এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। আলী এর সভাপতি এবং ইলিয়াস সহ-সভাপতি হিসেবে বহু বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। খালিকুজ্জামান ইলিয়াস মনে করেন, সংগঠক হিসেবে উভয়ই অত্যন্ত সফল প্রমাণিত হয়েছেন।
তাদের লেখার ধরন ভিন্ন, তবে তাদের লেখার মানসিকতা প্রায় একই রকম। তারা তাদের সংলাপ এবং উপভাষায় উপভাষার বৈচিত্র্যের মাধ্যমে তাদের বৈচিত্র্যময় কাল্পনিক চরিত্রগুলোর বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধিত্ব করেন। এই প্রেক্ষিতে খালিকুজ্জামান ইলিয়াস উল্লেখ করেন, তাদের উপন্যাসে, প্রকৃতপক্ষে, ইতিহাস এবং স্থানকে এত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যে তারা প্রায় চরিত্র হিসেবে উপস্থিত হয়। ‘উভয়েই সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা লালন করেছেন এবং আহত ও অপমানিত, সমাজের নিম্নবর্গের মানুষদের সংগ্রামকে চিত্রিত করেছেন এবং তাদের উপযুক্ত সামাজিক প্রেক্ষাপটে তাদের জীবন্ত করার জন্য তাদের উপভাষাগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছেন।’
জেমস জয়েসের ইউলিসিসের ব্যাপারে এলিয়ট মন্তব্য করেছিলেন, যে, ইউলিসিস থেকে কারও পালিয়ে বাঁচার কোনো সুযোগ নেই। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণী চোখ দ্বারা সমাজ-রাষ্ট্রের বিকাশের ধারা এবং মানুষের জীবনসংগ্রামকে অনন্য বয়ানরীতি দিয়ে চিত্রিত করে শওকত আলী শক্তিশালী কথাসাহিত্য রচনা করার পাশাপাশি জন্ম দিয়েছেন ভিন্ন কাঠামোর। শিল্প প্রকরণের ওপর প্রবল দখল রাখা শওকত আলী এমন একজন সাহিত্যিক যিনি তার কথাসাহিত্যে আখ্যান রচনার বদলে সমাজ-সংসারের গভীর বাস্তবতাকে তুলে এনেছেন। ফলে এটা বলতে দ্বিধা নেই, শওকত আলীর সাহিত্যের চিরন্তনতা থেকে পালিয়ে বাঁচার কোনো সুযোগই আমাদের নেই। বিশেষ করে প্রদোষে প্রাকৃতজন শওকত আলীর এমন একটি সাহিত্যকর্মÑ যার থেকে নিস্তার না মেলাটাই স্বাভাবিক।
যদিও তার ত্রয়ী উপন্যাস দক্ষিণায়নের দিন, কুলায় কালস্রোত ও পূর্বদিন পূর্বরাত্রি-র জন্য তিনি সমধিক পরিচিতি অর্জন করেন, তবে প্রদোষে প্রাকৃতজন-ই তার বহুল আলোচিত উপন্যাস। তুর্কিদের আক্রমণ ও সেন রাজাদের সময়ের প্রাকৃতজনদের কাহিনী মূলত বিধৃত হয়েছে ইতিহাস-আশ্রিত উপন্যাসটিতে। সেনদের শাসনকালে সামন্ত এবং মহাসামন্তদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ সাধারণ জনগণ কীভাবে দ্রোহী হয়ে ওঠে, সেই সময়কালটির কয়েকজন প্রাকৃতজনের জীবন-সংগ্রামের প্রতিবিপ্লব প্রতিবিম্বিত করেছেন শওকত আলী তার প্রাকৃতজনদের দ্বারা। তবে এটা আমাদের খেয়াল রাখা জরুরি, যে, শওকত আলীর প্রাকৃতজন তৎকালীন হিন্দু, বৌদ্ধ ভিক্ষুরা শুধু শাসকদের অত্যাচারের প্রতিবাদই করে না, অত্যাচারী সামন্ত-মহাসামন্তদের অত্যাচার থেকে তারা দেশকে বাঁচাতে চায়।
শওকত আলীর বয়ানের ঢং, জীবনঘনিষ্ঠতা, মানুষের প্রতি গভীর দরদ থেকে চিত্রিত আত্রেয়ী নদী পাড়ের মৃৎশিল্পী শ্যামাঙ্গ এবং তার গুরু বসুদেবের মধ্যকার সম্পর্ক; অন্যায়, অসাম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী স্ফুলিঙ্গ মানুষের ভেতরে দাবদাহ সৃষ্টি করলে মানুষের অবস্থা কেমন খিটখিটে হয়ে যায়— এই সবকিছু দ্বারা শওকত আলী আমাদের অনুধাবন করিয়ে দেন শ্যামাঙ্গের প্রতি বসুদেবের অজানা রাগের মাধ্যমে। এ ছাড়া, প্রেম-অপ্রেম, নর-নারীর আদিম আকর্ষণ প্রভৃতি বিষয় ও বস্তু মায়াবতী, বসন্তদাস, লীলাবতী প্রমুখ প্রাকৃতজন চরিত্রগুলোর মধ্যকার অন্তর্দাহ তুলে ধরে অনন্য এক ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করে পাঠককে অন্য এক আবেশে নিমজ্জিত রাখেন শওকত আলী।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বাংলা সাহিত্যেরই মাইয়েস্ত্রো কথাসাহিত্যিক। কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামান স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আড্ডায় মজা করে বলতেন, তার রক্তের গ্রুপ পি অর্থাৎ পোয়েট।’ তিনি মনে করতেন, লেখকদের রক্ত হলো আলাদা, অন্যের রক্তের সঙ্গে মিলবে না। কিন্তু তাই বলে লেখকদের জন্য জীবনের একটা সিংহাসন তিনি দাবি করতেন? না। লেখক বলে যে যাবতীয় বেপরোয়া জীবনযাপনের লাইসেন্স আছে, এই ব্যাপারটিকেও তিনি মানতেন না।
ইলিয়াস মনে করতেন, জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের মতো লেখাও একটা কাজ। আর লেখা দাবি করে ব্যাপক শ্রম ও নিষ্ঠা। যে নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি শিক্ষকতা করতেন, সেই একই নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি লিখতেন। ইলিয়াসের ডায়েরি সম্পাদনা করতে গিয়ে শাহাদুজ্জামান এও দেখেছেন, সাহিত্যিক দলাদলিতে তীব্র বিরূপতা পোষণ করা ইলিয়াসের ক্ষোভ ছিল দলবাজ লেখকদের প্রতি।
ইলিয়াস পাঠের আনন্দ এই, যে, পাঠক যদি কষ্ট করে মনোযোগ ঠিক রেখে এগিয়ে যেতে পারে, তাহলে শব্দের সাথে শব্দমিছিলের বহমান প্রবাহের সাথে ইলিয়াসের জাদুকরি উপমায় মুগ্ধ হয়ে একপ্রকার চরমানন্দে ডুবে যে যাবে, এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। কার আশায় হাত নাড়াতে নাড়াতে তমিজের বাপ মূলত আসমানের মেঘ তাড়ায়? শুধুই মুনসির? সেই মুনসি বয়তুল্লা শাহর? কাৎলাহার বিলের ধারে ঘন জঙ্গল সাফ করে সোভান ধুমা আবাদ শুরু করে বাঘের ঘাড়ে জোয়াল চাপিয়ে আর ওইসব দিনের এক বিকালবেলা মজনু শাহের অগুনতি ফকিরের সঙ্গে মহাস্থান গড়ের দিকে যাওয়ার সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেপাই সর্দার টেলারের গুলিতে মারা পড়া মুনসির? মুন্সিকে যদি একনজর দেখা যায় এই আশায় তমিজের বাপ হাত নাড়াতে নাড়াতে আসমানের মেঘ খেদায়? দারুণ খটকা লাগতে পারে; এমনকি মস্তিষ্ক হয়তো হালও ছেড়ে দিতে চাইবে কয়েকবার; কিন্তু আপাত এইসব ব্রেইনখেলা যখন ক্লিয়ার হবে, তখন, যেমন বলা হয় উপত্যকা পথ পাড়ি দিয়ে মনে পুলক কাজ করে, পুলকিত হতে হয়, স্নিগ্ধ সমীরণ শিহরন আনে অনুভব করে:
‘... তা না হয় হলো, কিন্তু এখন থেকে দুই বছর সোয়া দুই বছর পর, না-কি আড়াই তিন বচ্ছরই হবে, বিলের পানি মুছতে মুছতে জেগে-ওঠা ডাঙার এক কোণে চোরাবালিতে ডুবে মরলে তমিজের বাপটা উঠবে কোথায়...।’
‘খোয়াবনামা’ এবং ‘চিলেকোঠার সেপাই’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে দুটি অনন্যসাধারণ বই, যার তুলনীয় গুটিকতেক বই বিশ্বসাহিত্যে আছে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ধরনটি ইলিয়াসের একান্ত নিজস্ব। ইলিয়াস মূলত বাংলার মানুষের সমাজ-সংসারের গভীর বাস্তবতা, মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিবিম্বন ঘটিয়েছেন তার সাহিত্যকর্মে। তবে বলতে দ্বিধা নেই, মহৎ সাহিত্যকর্ম আসলে এতটাই মহান হয়ে ওঠে যে, তখন এই সব ধরন/স্টাইল নিয়ে বিশেষ একটা ভাবনা আর কাজ করে না। যেমন জয়েসের ইউলিসিস, অভিদের মেটামরফোসিস অথবা কাফকার মেটামরফোসিস, কামুর স্ট্রেইঞ্জার, হেমিংওয়ের ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি অথবা ব্রাদার কারামজভ, আনা কারেনিনা... আমরা আর মোটেও এসব গ্রন্থের স্টাইল নিয়ে বিশেষ ভাবিত হই না।
বয়ানের ঢংটি ইলিয়াসের সূক্ষ্ম, যা তার পাঠককে শুধু মোহিত করে রাখে তাই নয়, চিন্তার চ্যুতি-বিচ্যুতির দোলাচল’ পর একটা অতল ধাক্কা দিয়ে দেয়; তখন পাঠক শুধু হাবুডুবু খেতে থাকে একটা বিশাল জমিনে। ‘চিলেকোঠার সেপাই’-এ অনুধাবন করা যায় : কার চিন্তায় বুঁদ হবে পাঠক? ওসমান, হাড্ডি খিজির নাকি গণঅভ্যুত্থানের সেইসব দিন সেইসব রাত্রির প্রেক্ষাপটে?
নগর ঢাকা, ঢাকার উপকণ্ঠের প্রতিদিনের অনেক চিত্রই ইলিয়াস তার ডায়েরিতে টুকে রাখতেন। সুতীব্র অন্তর্দৃষ্টি এবং যেহেতু তিনি কবিও ছিলেন, যার কারণে কারণ অজ্ঞাত হাড্ডি খিজিরের বুক বুলেটবিদ্ধ হওয়ার কালে বলা কথাটি ‘কোন হালায় রে বুকের উপর ট্র্যাক চাপায় দেয়’ পুরো গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হওয়ার কারণকে যেন এককথায় নির্দেশ করে দেয়।
ইলিয়াসের সাহিত্যে সংগ্রাম একটা বিশাল জায়গা দখল করে আছে; আর আমরা জ্ঞাত থাকি : এই সংগ্রাম আকস্মিক নয়, অনাদিকালের। ইলিয়াসের সংগ্রাম প্রসঙ্গে শওকত আলীর কথা পাঠ করি, ‘মানুষের বিদ্রোহের আর লড়াইয়ের স্মৃতি থেকে যায় তার অবচেতনার পরতে পরতে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এবং তা বেরিয়ে আসে কখনও মন্ত্র বা গানের শোলক হয়ে, কখনও আঁকিবুকি টানা নকশার ভেতর দিয়ে, আবার কখনও বা স্বপ্ন ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে।’
খোয়াবনামায় ইলিয়াস দেখান বিলের মালিকানা চলে যায় জমিদারের হাতে। মুনসির শোলোকে শোলোকে মানুষের স্বপ্নের ব্যাখ্যা করে বেড়ায় চেরাগ আলি ফকির। তমিজের বাপ শোলোক শোনে আর ঘুমের মধ্যে বিলে গিয়ে কাদায় পা ডুবিয়ে দেখতে চায় পাকুড়গাছের মুনসিকে। এরপর কোম্পানির ওয়ারিশ ব্রিটিশের ডাণ্ডা উঠে আসে দেশি সায়েবদের হাতে। দেশ আর দেশ থাকে না, হয়ে যায় দুটো রাষ্ট্র। দেশি সায়েবরা নতুন রাষ্ট্রের আইন বানায়, কেউ হয় টাউনবাসী, কেউ হয় কন্ট্রাকটর। আবার নিজেদেশে পরবাসী হয় কোটি কোটি মানুষ। হিন্দু জমিদার নায়েব চলে যাওয়ার পরও আজাদ পাকিস্তানে জমি আর বিলের মানুষ নিজেদের মাটি আর পানির পত্তন ফিরে পায় না। পাকুড়গাছ নাই। মুনসির খোঁজ করতে করতে চোরাবালিতে ডুবে মরে তমিজের বাপ।
কিন্তু ইলিয়াস চান মানুষের মুক্তি। ফলে ভবানী পাঠকের সঙ্গে পূর্বপুরুষের জের টেনে বৈকুণ্ঠনাথ গিরিকে প্রতীক্ষা করান ভবানীর শুভ আবির্ভাবের। জমির স্বপ্ন দেখান তমিজকে। শুধুই নিজের কোটরে আটকে পড়া তেভাগার কবি কেরামতকে দিতে চান স্ত্রী, ঘর-সংসার। দিশা না-পাওয়া চেরাগ আলির নাতনি কুলসুমকে দেখাতে চান দিশা।
তবে উল্লেখ করতে হয়, খোয়াবনামার সদ্য দুনিয়ায় আসা সখিনা চরিত্রটিকে ইলিয়াস ভালোবাসা দিয়েছেন বেশি। খটখটে মা, ফুলজানের, দাঁড়িয়ে আছে কেন? এই মা শুধু ফুলজানের? না। ইলিয়াসেরও মা। মা যে জননী কান্দে। মা’ই তো দুনিয়া। ইলিয়াস মানুষের মুক্তির শিল্পরূপ এঁকেছেন ফুলজানের গর্ভ বেয়ে দুনিয়ায় আসা সখিনার দ্বারা। আমরা দেখি, সখিনা তাকিয়ে থাকে। মোষের দিঘির উঁচু পাড়ে লম্বা তালগাছের তলায় পুরনো উঁইঢিবির সামনে খটখটে মাটিতে দাঁড়িয়ে। সখিনা তাকিয়ে আছে; তাকিয়ে থাকে সখিনা কাৎলাহার বিলের উত্তর সিথানে জখম চাঁদের নিচে জ্বলতে-থাকা জোনাকির হেঁসেলে। এর দ্বারা ইলিয়াস দেখাতে চান ধোঁয়া ওঠা শাদাভাতের স্বপ্ন। মানুষ আর অভুক্ত থাকবে না। মানুষের মুক্তি ঘটবে।
শওকত আলীর শক্তিমান সাহিত্যকর্ম নাঢ়াই-এও আমরা দেখতে পাই তিনি বাংলাদেশের জনপদের ভূমিহীন মানুষের জীবনের করুণ সংগ্রাম কতটা গভীর মমতায় চিত্রিত করেছেন। চিরকাল বঞ্চিত হওয়ার আক্রোশের দ্রোহ তুমুল আন্দোলনে পরিণত হলে পরে তৎকালীন সর্বভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করলে ১৯৪৬ সালে সংঘটিত হওয়া কৃষক আন্দোলনে অবিভক্ত বাংলার ৬০ লাখের বেশি কৃষক অংশ নিয়েছিলেন। পুলিশ, জমিদার ও জোতদারদের গুলিতে সেই আন্দোলনে শহীদ হয়েছিল প্রায় ৮৬ হাজার কৃষক। শওকত আলী জীবনের গভীরের জীবন তুলে ধরতেই স্বচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। নাঢ়াই উপন্যাসটিতে ব্রিটিশ আমলের পিছিয়ে পড়া সাধারণ মানুষের জীবন, রাষ্ট্র ও সমাজ ভাবনা, অল্প বয়সেই বিধবা ফুলমতির টিকে থাকার সংগ্রাম এবং ভূমির অধিকারবঞ্চিত মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম ধরে ঘনীভূত হওয়া ১৯টি জেলায় বিস্তৃতি লাভ করা তেভাগা আন্দোলন তুলে ধরেন শওকত আলী।
উত্তর জনপদে নাঢ়াই শব্দটি দ্বারা মূলত লড়াই বোঝানো হয়। এই লড়াই যেমন-তেমন লড়াই নয়। জয়ের লড়াই। বিপ্লবের লড়াই। বিদ্রোহের লড়াই। অধিকারের লড়াই। ব্রিটিশদের বিদায় হলেও সাধারণ মানুষের ভাগ্য যে পরিবর্তন হওয়ার নয়, দেশীয় রাজনীতিবাজরা তাদের জীবন নিয়ে খেলবে, ব্যাপারটা সাধারণ মানুষ যে ভালোভাবে জ্ঞাত, শওকত আলী তার চিত্রন ঘটিয়েছেন এভাবে :
‘হাটত সভা করে কী যে নেকচার দেয় শালার ব্যাটারা, অরাই জানে— আংরেজ রাজা নাকিন হটে যাবে, তো যাউক, হামার সাহেব বাবুরা রাজা হইলে হামার কী? তাতে হামার কী? হামার কী নয়া বাল গজাবে?’
ব্রিটিশরা চলে গেলে নতুন রাজা কে হবে ভায়া মাঝি জানতে চাইলে মাস্টার যখন বলে, ‘রাজা তোমরাই হবে’, কুতুবালি নয় মূলত শওকত আলীই হেসে ওঠেন মাস্টারের কথা শুনে, ‘স্যার ইসব পাগলা পাগলি কথা কহে ক্যানে হামার সাথে মাজাক করেন। আংরেজ বাদশা চলে গেলে কে বাদশা হোবে, কনেক বুঝায় দেন মাস্টার বাবু।’
মাদারগঞ্জের হাটে ওয়াজ হয়। মওলানা মুসলমানের জন্য নতুন একটা মুলুক হওয়ায় খুশিতে আত্মহারা হয়। হিন্দু পুরুতঠাকুরও আত্মহারা হয় তাদের আলাদা ভূমি পেয়ে। দুঃখ পায় মহিন্দর বর্মণ, সুবল দাসরা। আর দুঃখ পান শওকত আলী। মহিন্দর বর্মণ দোসরা মুলুক শব্দ দুটোর অর্থ বুঝতে না-পারলে, সুবল দাস বুঝিয়ে দেয়, ‘আরে ভিন্ন দেশ চাহে অরা, উমার কথা মাউরাগের লাহান, তমরা বুঝেন না? গজুয়া নাকি?’
মানুষের সংগ্রাম থেমে যায় না। সমাজের অবহেলিত অন্ত্যজ শ্রেণিও মুছে যায় না। রাজা যায় রাজা আসে কিন্তু শওকত আলীর মানুষের ভাগ্যের আর পরিবর্তন বিশেষ হয় না। ফলে শওকত আলী আক্ষেপ করেন, ‘সাহিত্যিকেরা এখন মানুষের কাছে গিয়ে জীবন দেখে তা নিয়ে লেখার চেয়ে আধুনিক কলাকৌশল রপ্ত করতে বেশি আগ্রহী। কিন্তু কি জানো, সাহিত্যে সব থাকতে হবে। গণআন্দোলনের প্রয়োজন নেই বলে সাহিত্যে প্রাকৃতজনরা অনুপস্থিত হবে? তাহলে সেই সাহিত্যকর্ম কি সত্যি গোটা সমাজকে উপস্থাপন করে?’
শওকত আলী এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের নিবিড় সম্পর্কের ব্যাপারে ওয়াকিবহাল পাঠকরা জ্ঞাত : ২৯ বছর আগের সেই পাখির মতো সকালটি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে বড় বিরক্ত করছিল। জীবনের অন্তিম সময়ের গভীর মহব্বত; ফলে মহব্বতের সাগরের ঢেউ তাকে বিরক্ত করলেও করতে পারে। কেননা, স্বর্গ কোথাও আছে কি না আছে আর তিনি তা জানেন কি না-জানেন তা আমাদের জানা না-থাকলেও; বা তিনি করতোয়া মাহাত্ম্যÑ এ মগ্ন ছিলেন কি না-ছিলেন; তিনি কাৎলাহার বিলের উত্তর সিথানে পাকুড়গাছের মাথায় আসন পাতলেন কি না-পাতলেন; বা দিনের বেলা রোদের মধ্যে রোদ হয়ে ছড়িয়ে থাকেন কি না-থাকেন সারাটা বিল জুড়ে আর রাতভর বিল শাসন করেন কি না-করেন ওই পাকুড়গাছের ওপর থেকে; তিনি আকাশের মেঘ খেদান কি না-খেদান; ভেড়ার পাল সাঁতরে পার করেন কি না-করেন; গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে গরুর দালালের সাথে আলাপ জুড়ে দেন কি না-দেন... কিন্তু এটা ভেবে ইলিয়াসের বুকের ভেতর স্মিতস্নিগ্ধ সমীরণ বয়ে যায়নি, ক্যানসারের কারণে যখন তার একটি পা কেটে ফেলতে হয়; শওকত আলী যখন গিয়ে দেখেন ইলিয়াসের পা নেই এবং একপর্যায়ে তিনি শিশুর মতো কেঁদে ফেলেন; আর ইলিয়াস তখন আরেক শিশু হয়ে উঠে বলেন, ‘আশ্চর্য পা গেল আমার, তুমি কাঁদছ কেন?’