ভুবনজুড়ে উড্ডীন ডানা
মাসুদুজ্জামান
প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:৫৩ পিএম
মেরলিন মনরো ও আর্থার মিলার। ছবি: বিবিসি
পুরুষটি ছিলেন আমেরিকার সেই সময়ের খ্যাতিমান নাট্যকার। নারীটি ছিলেন সে দেশেরই সবচেয়ে বিখ্যাত স্বর্ণকেশী যৌনপ্রতীক। এই যে দুজনের কথা বললাম, এদের প্রথম জন নাট্যকার আর্থার মিলার আর দ্বিতীয় জন মেরিলিন মনরো। মিলার যখন মনরোকে বিয়ে করেন তখনই দুজনের অস্থির উত্তাল সম্পর্কের সূচনা ঘটে। সেই বিয়ে পাঁচ বছরও স্থায়ী হয়নি। কিন্তু এই সম্পর্ক মিলারকে কয়েক দশক ধরে তাড়া করে ফিরেছে।
মিলার ছিলেন মনরোর চেয়ে ১১ বছরের বড়। অসম এই জুটি হলিউডের পার্টিতে প্রথমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একসঙ্গে নেচে আর ফ্লার্ট করে কাটান। দুই সন্তানের বিবাহিত কামুক পিতা মেরিলিনের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতেন। মনরোর বয়স তখন পঁচিশ, চলচ্চিত্রের ছোটখাটো দুয়েকটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন। অন্যদিকে নাট্যকার মিলারের খ্যাতি তখন তুঙ্গে। মনরোর সঙ্গে মিলার যখন ডেটিং করছেন, মিলারের বিয়েটা তখন ভাঙনের মুখে।
মনরোর অভিনয়কে যখন কেউ গুরুত্ব দিচ্ছিলেন না তখন মিলারের ভদ্র আচরণ, বৌদ্ধিক গভীরতা এবং অভিনয়ের প্রতি শ্রদ্ধা মনরোকে মুগ্ধ করে।
মনরো বুঝতে পারেন মিলারই একমাত্র পুরুষÑ যিনি মনরোকে যৌনতার প্রতীক না মনে করে রক্ত-মাংসের নারী হিসেবে দেখেন। মিলারের মধ্যে তিনি খুঁজে পান এক বিশ্বস্ত নির্ভরশীল পুরুষকে, যার ভূমিকা একই সঙ্গে হতে পারে পিতা ও প্রেমিকের। মনরো মিলারকে ‘পাপা’ বলেও সম্বোধন করতেন।
মনরোর শৈশবের কষ্টের কথা জেনে তার প্রতি মিলার আকৃষ্ট হন। তাতে কামের সঙ্গে মিশে ছিল করুণা। মিলার সিদ্ধান্ত নেন, মেরিলিনকে দানবদের হাত থেকে উদ্ধার করবেন। দুজনের মধ্যে পার্থক্য অনেক। তবু তারা ভেবেছিলেন একজন আরেক জনের পরিপূরক হবেন।
১৯৫৬ সালের গ্রীষ্মকাল। মিলার তার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে মনরোকে বিয়ে করলেন। কিন্তু বিয়ের আগেই মেরিলিনের মতো সেলিব্রিটির সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছেন বলে মিলার আগ্রাসী মিডিয়ার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন। বাগদান ঘোষণার পর ‘আমেকিার শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিদীপ্ত’ পুরুষের সঙ্গে ‘আমেরিকার শ্রেষ্ঠ শরীরী নারীর’ প্রেম হয়েছে বলে পাপারাৎসিরা প্রচার শুরু করেন।
এই বিয়ে উপলক্ষে সবচেয়ে বিখ্যাত শিরোনামটি করে ‘ভ্যারাইটি’ নামের একটি পত্রিকা ‘এগহেড ওয়েডস আওয়ারগ্লাস’ বলে। ‘এগহেড’ মানে সারবস্তুময় মস্তিষ্ক (বুদ্ধিজীবী) আর ‘আওয়ারহেড’ মানে ফাঁপা মস্তিষ্কের যৌনসুন্দরী। মিলার ছিলেন বামপন্থী লেখক। মনরোকে বিয়ে করায় ‘দেশপ্রেমহীন’ বামপন্থী বলে নিন্দার ঝড় উঠল। মনরো বলেছিলেন, বিয়ের পর খুব বেশি মুভিতে অভিনয় করবেন না। কিন্তু তিনি সে কথা রাখতে পারেননি।
মুভির সেটে মনরোর আচরণ মিলারের কাছে অস্বাভাবিক মনে হতে থাকল। অভিনয় নিয়ে মনরো স্নায়বিক চাপে ভুগতেন। তার মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা দেখা দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে মেরিলিন নিজেই ঘুমের ওষুধ খেতেন। তিনবার তিনি গর্ভধারণ করেন, তিনবারই গর্ভপাত হয়ে যায়। সন্তানের আকাঙ্ক্ষা তাকে বিমর্ষ করে তোলে। এ থেকেই তার মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দিয়েছিল। একাধিকবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছেন।
বাড়িতে দুজনের মধ্যে একধরনের দূরত্ব তৈরি হচ্ছিল। মিলার চাইতেন একা শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে লেখালেখি করতে। অন্যদিকে মনরো চাইতেন মিলারের সার্বক্ষণিক সঙ্গ, মনোযোগ। তার কোনো শখ ছিল না। ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। দিনের বেশিরভাগ সময় তিনি ঘুমিয়ে, মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে দেখা করে, অভিনয়ের ক্লাসে গিয়ে অথবা আয়নায় নিজেকে দেখে সময় কাটাতেন। একা থাকতে একেবারেই পছন্দ করতেন না। স্বামী লেখালেখিতে ব্যস্ত থাকত বলে বিরক্ত হতেন। একদিন রেগে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি দুঃসহ একটা কারাগারে আছি এবং আমার কারারক্ষীর নাম আর্থার মিলার… প্রতিদিন সকালে সে লেখাপড়ার মতো জঘন্য কাজটি করে এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমি তাকে দেখতে পাই না... আমি শুধু একা বসে থাকি, আমার করার মতো কোনো কাজও নেই।’
অনেক দিন হয়, মিলার-মনরোর বিয়ে হয়েছে। বিয়ের পর মিলার এখন পর্যন্ত নতুন কোনো নাটক লিখে উঠতে পারেননি। মেরিলিনের দেখভাল করেই তার সময় কাটে। মিলারের এই আত্মত্যাগ, নিষ্ঠা ও আত্মসমর্পণ দেখে ঔপন্যাসিক নরম্যান মেইলার তাকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিভাবান দাস’ বলে উপহাস করেছিলেন। স্ত্রীকে বুঝিয়েসুঝিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত রাখাই ছিল মিলারের কাজ।
মিলার ভাবলেন, তিনি এমন একটা মুভির চিত্রনাট্য লিখবেনÑ যাতে মনরো তার কাঙ্ক্ষিত চরিত্রটি পায়। কিন্তু মনরো এই সিনেমা সম্পর্কে কোনো আগ্রহ দেখালেন না। মনরোর এ রকম প্রতিক্রিয়ায় মিলারের অনুভূতি চুপসে গেল। তার অহংবোধে তা আঘাত হানল। তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেন।
বিমর্ষ, পরাজিত নাট্যকার মিলার মনরোকে একদিন বললেন, ‘যখন আমরা ছবির কাজ শুরু করি তখন আমরা স্বামী-স্ত্রী ছিলাম। কিন্তু এখন আর নেই।’
মিলারের প্রতি কৃতজ্ঞতার পরিবর্তে মনরোর মনে হচ্ছিল তিনি নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। ১৯৬০ সালের শরৎকালে তিনি বিয়ে বিচ্ছেদের ঘোষণা দেন। দুজনেই মনে করলেন, বিয়েটা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। মিলার পরে দুঃখ করে বলেছেন, ‘বিয়ের আগে আমরা ভেবেছিলাম পরস্পরের পরিপূরক হব। কিন্তু এই ভাবনাতে ভুল ছিল।’
মনরোর সঙ্গে সংকটের মুহূর্ত মিলারের জীবনে নতুন সম্পর্কের দরজা খুলে যায়। ফটোগ্রাফার ইঙ্গে মোরাথের সঙ্গে তিনি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। ইঙ্গে ছিলেন বিশ্বজুড়ে ঘুরে বেড়ানো পেশাদার আলোকচিত্রী। উঁচুমাপের ফটোগ্রাফার হওয়ার কারণে এক জায়গায় বেশি দিন থাকতেন না। স্বভাবেও ছিলেন মেরিলিনের একেবারে উল্টো। মিলার বলেছেন, ‘ইঙ্গে আমাকে স্বস্তি দিয়েছিল।’ দুজনের এই সম্পর্ক চলার সময় মিলার ‘আফটার দ্য ফল’ নামে একটা নাটক লেখেন। এর গল্পটি এ রকম। দুই বিয়ে করা এক অসুখী পুরুষ। তৃতীয় নারীর প্রেম তাকে মুক্তি দিল। ১৯৬৪ সালে নাটকটি ব্রডওয়েতে মুক্তি পায়। নাটকের মূল নারী চরিত্রটি মনরোর মতো আত্মধ্বংসী এক নারী। সংগীতশিল্পী তিনি। চরিত্রটিকে মিলার মনরোর আদলে নির্মাণ করেন। মেরিলিন যেমন মাত্রাতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ খেয়ে শুধু ঘুমোতেন, মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের কাছে যেতেন, আয়নায় নিজেকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতেনÑ এর সবই মিলার তুলে ধরেন এই নাটকে। কিন্তু ব্রডওয়ের দর্শকরা চরিত্রটিকে সহজভাবে নিতে পারেননি। তারা মিলারের এই চরিত্রায়নের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
খুবই স্বাভাবিক ছিল দর্শকদের এই প্রতিক্রিয়া। নাটকটি মঞ্চায়িত হওয়ার মাত্র ১৮ মাস আগে আত্মহত্যা করা মনরোর উজ্জ্বল স্মৃতি তখনও মার্কিনিদের মনে জ্বলজ্বল করছিল। দর্শকরা অভিযোগ করলেন, মনরোর জীবনকে নিজের নাটকের স্বার্থে ব্যবহার করেছেন মিলার। দর্শকদের এই প্রতিক্রিয়ার জবাবে মিলার ‘লাইফ’ ম্যাগাজিনে একটা দীর্ঘ লেখা লেখেন। তাতে তিনি বলেন, ‘নাটকটিতে খুব বেশি যে জীবনের কথা বলেছি তা নয়, আবার কমও বলিনি।’ মিলার আসলে তার জীবনে যে ঝড় বয়ে যাচ্ছিল, ইঙ্গে যাতে সেই আবেগ-অনুভূতিকে অনুভব করতে পারেন সেজন্য নাটকটি লেখেন।
ইঙ্গেকে বিয়ে করেন মিলার। ইঙ্গে ছিলেন তীব্র অনুভূতিপ্রবণ নারী। তিনি যে মিলারকে ঠিকই বুঝতে পারতেন, বিবাহিত জীবনের চল্লিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে মিলার সে কথা বলে গেছেন, ‘আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ মানুষটির নাম ইঙ্গে।’
জীবনের অপ্রত্যাশিত সুখ এবং মুক্তি সত্ত্বেও মনরোকে মিলার কখনও ভুলতে পারেননি। বিবাহ বিচ্ছেদ এবং মনরোকে বাঁচাতে না পারার ব্যর্থতা তাকে কষ্ট দিত। তিনি এক ধরনের অপরাধবোধে ভুগতেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই ব্যর্থতা ও যন্ত্রণার বোধ তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেরিয়েছে।
সাতাশি বছর বয়সে মিলার তার শেষ নাটক ‘ফিনিশিং দ্য পিকচার’ রচনা করেন। ‘দ্য মিসফিটসে’ কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে নাটকটি লেখেন। নানা ঘটনায় কখনও আনন্দে, কখনও বিষাদে দুজনের দিনগুলো তখন কাটছিল। এই ঘটনাই হচ্ছে তার শেষ লেখার বিষয়। এভাবেই জীবনের শেষে এসে মিলার মনরোকে কবর থেকে তুলে আনলেন মঞ্চে। নিজের মর্মস্পর্শী যন্ত্রণা ও বিষাদকে সৃষ্টিশীলতার ভেতর দিয়ে চিরদিনের মতো মুক্তি দিলেন।