× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

হাসান আজিজুল হক ও ষাটের দশক

জাকির তালুকদার

প্রকাশ : ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৩ এএম

জাকির তালুকদার

জাকির তালুকদার

এই ভূখণ্ড যখন বিশ শতকের ষাটের দশকে পা রাখে, ততদিন ছোটগল্পের বয়স দেড়শ বছর পেরিয়ে গেছে। বিশ্বসাহিত্যের সবচেয়ে নবীন শিল্পমাধ্যমটি তারুণ্যের দীপ্তিতে উজ্জ্বল, খুব দ্রুত এগোচ্ছে পরিণতির দিকে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ছোটগল্পগুলোর অধিকাংশই ততদিনে লিখিত হয়ে গেছে। এদিকে বাংলা ছোটগল্পের বয়সও সত্তর পেরিয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথের সার্বভৌম প্রতিভার হাত ধরে যার জন্ম তার হাতেই তার পরিণতি ও সিদ্ধির আকাশছোঁয়া মহীরূহ ততদিন নবীন প্রজন্মের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সাফল্যের উত্তরাধিকারী হয়ে। লিখিত হয়ে গেছে প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়, ত্রৈলোক্য নাথ মুখোপাধ্যায়, প্রমথ চৌধুরী প্রমুখের শ্রেষ্ঠ গল্পসমূহ। সতীনাথ ভাদুড়ী, বনফুল, জগদীশ গুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র, মানিক-বিভূতি-তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ইতোমধ্যেই উপহার দিয়ে দিয়েছেন তাদের গল্পের শ্রেষ্ঠ কারুকৃতিসমূহ। তাদের পাশাপাশি পথ তৈরি করে দেওয়ার প্রাথমিক কাজটুকু নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করছিলেন এ দেশে চল্লিশ এবং পঞ্চাশ দশকের গল্প লেখকবৃন্দ। কাজেই ইতোমধ্যেই এক বিশাল উত্তরাধিকারে ধনবান হয়েই ছিলেন তারা, যারা ষাটের দশকে লিখতে শুরু করেছিলেন ছোটগল্প। প্রয়োজন ছিল শুধু সেই বিশাল উত্তরাধিকারকে আত্মস্থ করে পূর্বসূরিদের আলোকবিন্দুগুলোকে একত্রিত করে একটি আলোকস্তম্ভ তৈরি করা, যার মধ্যে ভিন্নতর দ্যুতি নিয়েও সমন্বিতের মধ্যেই জ্বলজ্বল করবে নিজেদের দীপাবলি। যেহেতু ঢাকা তখন একটি নবীন রাষ্ট্রের প্রাদেশিক রাজধানী। যেহেতু কলকাতার পরে ঢাকা তখন প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে বাংলা সাহিত্যের দ্বিতীয় কেন্দ্র হিসেবে (যা নিশ্চিতরূপেই পরবর্তীতে পরিণত হবে শুধু সাহিত্য নয়, বাংলা সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়েই প্রধান হিসেবে), যেহেতু সাতচল্লিশ উত্তর সময়েই প্রথম পূর্ববঙ্গের কৃষককুল থেকে বাঙাল সন্তানেরা সুযোগ পেয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের সারস্বত সমাজে নিজেদের অবস্থান সংস্থাপিত করার, যেহেতু অব্যবহিত পূর্বের দশকের শুরুতেই ভাষা আন্দোলনের মতো যুগান্তকারী ঘটনায় পাকিস্তান সম্পর্কিত মোহ থেকে মুক্তি ঘটেছিল বাঙালিদেÑ তাই ষাটের দশকে রাজনীতি, সমাজ সংস্থান, শিল্পকলা ও সংস্কৃতি আন্দোলনের মতোই ছোটগল্পের দিকেও বিশেষভাবে আলোকপাত করা দরকার। সেই গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় যদি আমরা মনে রাখি যে, বাংলাদেশ নামক এই ভূখণ্ডের মানুষ দশকের পর দশক ধরে স্বাভাবিক ও সম্মানজনক জীবনের জন্য যে বহুমাত্রিক সংগ্রাম করে আসছে, বাংলাদেশের ছোটগল্পেই তার প্রতিফলন সবচেয়ে বেশি। এই সব কারণেই উত্তরপ্রজন্ম কৌতূহলী ষাটের দশকের প্রতি।

রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বলা যায় ষাটের দশক স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামে উত্তাল একটা দশক। পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে একে একে সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রাম দানা বেঁধে উঠেছিল এই দশকে। এই দশক শুরুই হয়েছিল রবীন্দ্র শতবার্ষিকী উদযাপনের সরকারি বিধি-নিষেধ-রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা এবং রোমান হরফে বাংলা লেখার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, পঁয়ষট্টির ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পূর্ববঙ্গবাসীর অসাহয়তা, ছয় দফা আন্দোলন, রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানÑ একের পর এক উত্তাল তরঙ্গ বইয়ে দিয়েছে ষাটের দশকে বাংলাদেশের বুকের ওপর দিয়ে। ছায়াপথের তারকাগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে গেছে একের পর এক শহীদি আত্মাহুতির সংখ্যা।

সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে এই দশক হচ্ছে গ্রামীণ কৃষি সমাজ থেকে উঠে এসে একদল মানুষের মধ্যবিত্ত হিসেবে স্থিত হওয়ার দশক। এই দশকেই এ দেশের মানুষ পেল একেবারে নিজেদের মধ্য থেকে সৃষ্টি হওয়া বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, শিল্পী, কবি-সাহিত্যিক। যদিও মার্কসবাদ ও মার্কসবাদী নন্দনভাবনা প্রবেশ করছিল আগে থেকেই, এই দশকেই তা ব্যাপকতা পেল শিক্ষিত সমাজে। একই দশকে এদেশের শিল্পী-সাহিত্যিকদের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে অস্তিত্ববাদ, পরাবাস্তববাদ, ফিউচারিজম, নিও-রিয়ালিজম প্রভৃতি চিন্তাধারার।

সাহিত্যিক তাৎপর্যের মধ্যে প্রধান হচ্ছে এই দশকেই প্রথম লিটল ম্যাগাজিন ধারণাটি ব্যাপকভাবে পরিব্যপ্ত হয় এ দেশে।

ষাটের দশকের ছোটগল্পের মূল প্রবণতাগুলো শনাক্ত করতে গেলে অনেকগুলো উপাদান এবং উপকরণ চোখে পড়ে। 

প্রথমত, ষাটের দশকের উজ্জ্বল গল্পগুলো প্রধানত প্রকাশিত হয়েছিল লিটল ম্যাগাজিনে। আগের দশকের গল্পগুলোর মতো সেগুলো শুধু দৈনিক পত্রিকার পাতা ভর্তি কিংবা বেতারে পাঠের জন্য লিখিত হয়নি। ফলে একধরনের অপ্রাতিষ্ঠানিকতার পরিচয় এই দশকের গল্পগুলোর শরীরে পাওয়া যায়। মূলত লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত, ফলে ছোটগল্পে পরীক্ষা-নিরীক্ষার যথেষ্ট সুযোগ পেয়েছেন ষাটের গল্পকাররা। ইতঃপূর্বে জীবনের যেসব দিক নিয়ে পূর্বজ লেখকরা লেখেননি বা লিখতে চাননি, কিংব লিখতে গিয়েও সাহিত্যের স্তরে উন্নীত করতে পারেননি বলে পিছিয়ে এসেছেন, ষাটের গল্পকাররা সেই দিকগুলোকে তাদের গল্পে উপজীব্য হিসেবে বেছে নিতে পেরেছিলেন। এদের নিরীক্ষা যে সবসময়ই সাফল্যের মুখ দেখতে পেয়েছে তা নয়। তবে একটি নিরীক্ষা সবসময়ই অন্যতর নিরীক্ষার উৎসমুখ খুলে দেয় বিধায় গণ্ডিবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে যাবার একটা না একটা পথ ঠিকই খুঁজে পাওয়া যায়। আবার নিরীক্ষার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হচ্ছে তা লেখককে অনেক সময়ই তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের বিপরীত প্রান্তে পৌঁছে দেয়। অর্থাৎ আলো খুঁজতে গিয়ে অনেকেই অন্ধকারে হারিয়ে যান। শিল্প, যে আঙ্গিকেই হোক, তা জীবনকে নানাভাবে বিন্যস্ত করতেই আগ্রহী। জীবনের বিন্যাস-পুনর্বিন্যাসের কাজে নেমে অনেকেই নিরীক্ষার গোলকধাঁধায় পৌঁছে যান জীবনবিমুখতায়। এই বিপদটা ঘটেছিল ষাটের অনেক গল্পলেখকের ক্ষেত্রেই।

দ্বিতীয়ত, ষাটের দশক প্রধানত কেটেছে আইউবি স্বৈরশাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে। এ সময় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, প্রত্যক্ষ পরিবর্তন কামনা নিষিদ্ধ ছিল। তাই ষাটের গল্পকারদের কথনভঙ্গিতে আনতে হয়েছে অনিবার্য পরিবর্তন। শিল্পে জীবন রূপায়ণ এবং তার বিপরীতে জীবন নিরপেক্ষ শিল্প সর্বস্বতাÑ এই দুই প্রবণতা পৃথিবীর সব দেশের সব ভাষার সাহিত্যেই বর্তমান। তবে ষাটের দশকে এ দেশে শেষোক্তটির প্রকাশ একটু বেশি হয়েছিল। তৎকালীন প্রশাসন ছিল স্বৈরাচারী। এই প্রশাসনের সাথে লেখকদের সম্পর্ক ছিল নিস্পৃহ। অর্থাৎ প্রশাসনের সাথে সুসম্পর্কও ছিল না, আবার সরাসরি দ্বন্দ্বেও তারা জড়াননি। দ্বন্দ্বে নামলে এই দশকের লেখার মধ্যে জাতীয়তার বোধ তীব্রতা লাভ করত, জনগণের সম্পৃক্তির কারণে গণমনের প্রত্যাশাকে তারা অনেক স্পষ্টভাবে দেখতে পেতেন কিন্তু সেপথে তারা যাননি। স্বৈরাচারী দমননীতি এড়ানোর জন্য তারা অপ্রত্যক্ষ রীতিতে পা বাড়ালেন। কিন্তু পৌঁছলেন না কোথাও। তবে তাদের এই ব্যর্থতা সত্ত্বেও একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, বাংলা ভাষায় গল্প লেখাটাও ষাটের দশকে বিপ্লবী দায়িত্বপালন হিসেবে নিতান্ত ন্যূন ছিল না।

তৃতীয়ত, ষাটের গল্পলেখকদের প্রধান সাফল্য হচ্ছে গল্পের ভাষাকে উপযুক্তরূপে নির্মাণ করতে পারা। ষাটের গল্পকাররা প্রায় সবাই শব্দের শক্তি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তারা তাদের গল্পের প্রয়োজনে একেবারে মেঠো উক্তি যেমন তুলে আনতেন, তেমনিভাবে প্রয়োজনের বিদেশি শব্দকে অক্লেশে জড়িয়ে দিতেন গল্পের শরীরে। সব মিলিয়ে তারা তাদের গল্পের দর্শন এবং গল্পের শরীর-অবয়বের চাহিদা অনুযায়ী ভাষাকে সাজিয়ে নিতে পেরেছিলেন। অতিকথনের মেদ কারও কারও গল্পের নিটোলতাকে ক্ষুণ্ন করেছে বটে, তবে সার্বিকভাবে ষাটের গল্পগুলো মিতভাষী।

চতুর্থত, যদিও বাংলা কবিতায় পাশ্চাত্যের বিমর্ষতা, অবক্ষয় ও নৈরাজ্য আরোপিত হয়েছিল তিরিশের দশকেই তবে এ দেশের গল্পে এই অনুষঙ্গগুলোর প্রাদুর্ভাব ঘটে ষাটের দশকে। এই প্রবণতাগুলোর তেমন কোনো বস্তুগত ভিত্তি আমাদের সমাজজীবনে না থাকায় এই সব অনুষঙ্গ শেষ পর্যন্ত আরোপিত হিসেবেই চিহ্নিত হয়েছে। দেশকাললগ্নতাহীন এই অনুষঙ্গগুলো শেষাবধি কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি, এটাই আশার কথা। ষাটের প্রতিনিধিত্বকারী যে কজন লেখক পরবর্তীতে লেখনীকে সচল রাখতে পেরেছিলেন, তারা প্রায় সবাই নিজেদের এই সীমাবদ্ধতাটিকে কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছেন।

দশকের চিহ্ন হাসান আজিজুল হকের রচনা ও মননে রয়ে গেছে। হাসান আজিজুল হক সম্ভবত শুধু ষাটের দশকই নয়, আজও পর্যন্ত এ দেশের সবচেয়ে আলোচিত গল্পলেখক। আর সমগ্র বাংলাসাহিত্য বিবেচনায় নিলে রবীন্দ্রনাথের পরে সবচাইতে বেশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য অর্জন করেছেন তিনি। তবে যত আলোচনা চোখে পড়ে, তার মধ্যে খুব কম সংখ্যকই সুষম। বেশিরভাগই একপেশে। হয় স্তুতিতে ভরা, নয়তো বিষোদগার। তার ফলে হাসান আজিজুল হকের কোনো লাভ-ক্ষতি হয়েছে কি না জানি না, তবে সেই আলোচনাগুলোর পাঠকদের কারও কাছে তিনি মহীরূহতূল্য, কারও কাছে তার বামনত্ব করুণা যোগ্য। কিছুটা বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা অবশ্য কেউ কেউ করার চেষ্ট করেছেন। বশীর আল হেলাল লিখেছেনÑ ‘হাসান আজিজুল হকের ছোটগল্পে আমাদের সামাজিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ভয়ংকর ইতিহাস রূপ লাভ করেছে। তিনি যেন ভয়ংকরেরই রূপকার। একদিকে আছে তার এই জীবন রূপায়ণের ভয়ংকরের বাস্তব প্রবণতা অন্যদিকে আছে এই রূপায়ণের তার এক আপন পদ্ধতি। পদ্ধতিটি তার সম্পূর্ণ আপন নয়। তার ভাষায় ও বিবরণে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর খুব প্রভাব রয়েছে। তবে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর থেকে তার ব্যবধান আবার এই যে, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর অশেষ বর্ণনাকে কখনও ব্যাপক বলে মনে হয় না। কিন্তু হাসান আজিজুল হক তার গল্পের ঘটনাগুলোকে বর্ণনার মাধ্যমে ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর ও স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর করে তোলেন। তার গদ্যে রয়েছে কাব্যের অফুরন্ত সৌন্দর্য, পূর্ণিমার চরাচরব্যাপী কোমল জ্যোৎস্নার মতো। ভাষার এই সৌন্দর্য তার গল্পের বিষয় ও বক্তব্যকে আবৃত, আচ্ছন্ন ও বিমোহিত করে। তার ফলে তার হাতে ছোটগল্পরূপ এই গদ্যশিল্পের প্রধান উদ্দেশ্য অনেকাংশে ব্যর্থ হয়। তার কালো মাটির ঘনশ্যাম মৃৎপুত্তলিগুলো যেন তার গল্পদেহের বৃহৎ কারুমণ্ডিত স্বর্ণ-আধারে কোথায় তলিয়ে যায়। তবে স্বীকার করতে হবে বিষয় ও প্রকরণের তার এই বৈপরীত্য, বরং এই বৈপরীত্যের বিচিত্র এক সমন্বয় এক অভিনব শিল্প-চমৎকারিত্বের সৃষ্টি করে এবং সেটা তার পাঠককে কম আকর্ষণ করে না। তিনি জীবনবাদী, সমাজ ও আদর্শসচেতন গল্পকার। অনেক গল্পেই তিনি জীবনের জয়গান গেয়েছেন, গণমানুষের সংগ্রামের অপরাজেয় শক্তিতে বিশ্বাস রেখেছেন। তার জীবনদৃষ্টি ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল শিল্পক্ষুধা। আমাদের মতো অনুন্নত সমাজে ও শিল্প ঐতিহ্যে বিক্ত-ক্ষুধার মতোই এই রূপ চিত্তক্ষুধা বা শিল্পক্ষুধা থাকে।’

প্রকৃত প্রস্তাবে হাসান আজিজুল হক আমাদের দেশের সেই বিরল গল্পকারদের একজন যারা স্বাভাবিক গল্পকার। (এই স্বাভাবিকের সাথে ন্যাচারালিজমের কোনো সম্পর্ক নেই।) তার স্বাভাবিকতার প্রধান লক্ষণ হচ্ছে, তার গল্পের ভাষা, প্রবন্ধের ভাষা আর কথনের ভাষার মধ্যে প্রচণ্ড মিল। তিনি যে রীতিতে কথা বলেন লিখতে বসেও সেই ধরনটাই বজায় রাখেন। অপ্রত্যক্ষ রীতিতে বিষয়টকে ধোঁয়াটে করে গল্প লেখা তার ধাতে নেই। পরিস্ফুটনই তার যাবতীয় অনুশীলনের লক্ষ্য।

তার স্বাভাবিকতার দ্বিতীয় লক্ষণ হচ্ছে, বিষয় আগে না আঙ্গিক আগে অথবা গল্পে নারী-পুরুষের ভারসাম্য বিষয়ক সিদ্ধান্ত নিতে তাকে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামাতে দেখা যায় নি।

আঙ্গিক নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হননি তার মানে এই নয় যে তিনি আঙ্গিকের ব্যাপারে অসচেতন। তার ‘শকুন’ গল্পের আঙ্গিকের সাথে ‘সাক্ষাৎকার’ গল্পের আঙ্গিকটিকে মেলানো যায় না। আজকের বহুল প্রচলিত ধারাবর্ণনামূলক গল্পআঙ্গিক একসময় ছিল না। এটা গড়ে উঠেছে অনেক দিন সময় নিয়ে। এখন আবার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে সেই ন্যারেটিভ আঙ্গিকের বাইরে যাবার। হাসান আজিজুল হক এটাকে বিষয়ের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ একটা ব্যাপার হিসেবেই দেখেন। কখনও কোনো নির্দিষ্ট ফর্ম ঠিক করে গল্প লিখতে বসেন না।

মানবযাত্রায় নারী-পুরুষ পাশাপাশি রয়েছে। তা এতই স্বাভাবিক যে নারীকে পৃথকভবে দেখার দরকার হয়নি হাসান আজিজুল হকের। সমাজে নারী-পুরুষের ভূমিকা ও অবস্থানে তারতম্য আছে, সে সম্পর্কে তিনি ঠিকই সচেতন। কিন্তু নারীবাদী না সাজলেও কিংবা শরৎচন্দ্রের মতো ঘোষিত নারীদরদী না হলেও হাসান আজিজুল হকের গল্পে দেখা যায় নারীদের জীবনতৃষ্ণা পুরুষের তুলনায় প্রবল, সংসারের কঠিনতম বাস্তবে সেই-ই শক্ত হয়ে দাঁড়ায়, সমস্ত বিষ তাকেই উদরস্থ করতে হয়।

অর্থাৎ যে সমস্ত সমস্যা নিয়ে গৌণ লেখকদের অহরহ মাথা ঘামাতে দেখা যায়, হাসান আজিজুল হককে সেজন্য সময়ক্ষেপণ করতে হয় না। এই নির্দ্বিধ থাকার ক্ষমতা তিনি অর্জন করেছেন এক স্বচ্ছ জীবনদৃষ্টি এবং শিল্পদৃষ্টি থাকার কারণে। তার এই শিল্পদৃষ্টি অনেক বড় চেয়ার জুড়ে বসে থাকা তথাকথিত বড় লেখকদের তুলনায় তীক্ষ্ণ, সৎ ও স্বচ্ছ।

হাসান আজিজুল হকের গল্পে যে জিনিসটি নেই তা হচ্ছে এ দেশের গ্রামীণ নিম্নবিত্ত জীবনের সামাজিক আধ্যাত্মিকতা। প্রথাসিদ্ধ ধর্মের নিজেদের মতো করে নেওয়া অংশ, বিভিন্ন লোকজ ধর্মের মিশেল, আংশিক বৈরাগ্য আংশিক বাস্তবমুখিনতা, বংশপরম্পরা বাহিত সামাজিক উপদেশমালা, কিছু মূল্যবোধ এবং পরস্পরের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ও আদান-প্রদানের ফলে গড়ে ওঠা পারস্পরিক মমত্ববোধ ইত্যাদি উপাদান মিলে তৈরি হয় এই সামাজিক আধ্যাত্মিকতা। যুগের পর যুগ অবর্ণনীয় শোষণ, প্রাকৃতিক ও সামাজিক দুর্বিপাক, শারীরিক নির্যাতন সবকিছু সয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে বেঁচে থাকে যে নিঃস্ব মানুষেরা কিংবা যুদ্ধে রত থাকে যে মরিয়া মানুষেরাÑ তার কারণ শুধুই জৈবিকতা নয়। গ্রামীণ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই মানুষগুলোকে বেঁচে থাকতে সবচেয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ করে এই গ্রামীণ সামাজিক আধ্যাত্মিকতা। বলাই বাহুল্য শুধু জৈবিক তাগিদে শোষিত মানুষেরা বংশপরম্পরায় এইভাবে যুঝে যেতে পারে না। তাদের নিজেদের কাছে নিজেদের জীবনযাপনের মানবীয় অর্থবহতা বিরাজমান। আর তার এই অস্তিত্বের অর্থবহতার উপাদানগুলোকে প্রধানত আহরণ করেন গ্রামীণ সামাজিক আধ্যাত্মিকতা থেকে। হাসান আজিজুল হক গল্পে অসাধারণভাবে মানবিক শোষণের ছবি আঁকতে পারেন, জীবন বহমানতার ছবি আঁকতে পারেন (আমৃত্যু আজীবন) সিস্টেমের অসহায় শিকারদের চিত্রিত করতে পারেন (পাবলিক সার্ভেন্ট) শাসক শ্রেণির অবিমৃশ্যকারিতা ও মধ্যবিত্তের ফাঁপা মূল্যবোধকে নিস্পৃহভাবে আঘাত করতে পারেন (খনন) কিন্তু তার গল্পের অসাধারণ সংগ্রামশীল নিঃস্ব শোষিত মানুষগুলোকে প্রায়শই রক্তমাংসহীন একপেশে মনে হয়। তার কারণ হাসান আজিজুল হক খুঁজে পাননি এই সামাজিক আধ্যাত্মিকতার সূত্রটিকে। তবে এ সমস্যা হাসানের একার নয়, মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে উঠে আসা প্রায় সকল লেখক এবং সমাজবিজ্ঞানাীর।

হাসান আজিজুল হকের জানা আছে আঞ্চলিক ভাষা বা স্থানিক রঙ ফোটানের কারুকুশলতা। একটা ছোট্ট দেশেও যে অঞ্চলভেদে জীবনভেদের ফারাক থাকে, তা অনেকেরই চোখে পড়ে না। আঞ্চলিক জীবনযাপনের সাথে আঞ্চলিক ভাষার মিল থাকতে হয় তা নইলে হয়ে যায় জোড়াতালির গল্প। হাসান আজিজুল হক এই দুর্বলতা থেকে মুক্ত। তার অনেক গল্প আমাদের সাহিত্যের অক্ষয় সম্পদ।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা