× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ভুবনজুড়ে উড্ডীন ডানা

লোরকা ১২৫+

মাসুদুজ্জামান

প্রকাশ : ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:২৫ এএম

মাসুদুজ্জামান

মাসুদুজ্জামান

সবাই একে একে ছেড়ে যায়। ছেড়ে যায় না, শরীর ও ছায়া। ছায়া আলোর পাশে এসে দাঁড়ায় অথবা আলোহীনতায় মিলিয়ে যায়। তৈরি করে প্রতিবিম্ব। ছায়া যখন একেবারে মিলিয়ে যায়, শরীরও থেকে হারিয়ে যায়। সে রকমই একটা কিছু কী বলা হয়েছে এই কবিতায়? ‘হে কাঠুরে,/ আমার শরীর থেকে আমার ছায়াকে ছিন্ন করো।/ নিজেকে ফলহীন দেখার যন্ত্রণা থেকে আমাকে এখুনি মুক্তি দাও।’ মুক্তি তিনি পেয়েছিলেন শরীর থেকে, ছায়া থেকে, জীবন থেকে। কিন্তু তা ছিল নির্মম এক জীবনালেখ্য। সে জীবন এই পৃথিবীতে এখন অবধি একজন কবিই পেয়েছেন, তিনি লোরকা।

‘কী অসাধারণ কবি! আমি আর কারও মধ্যে তার মতো প্রতিভা ও প্রসন্নতার, গগনবিহারী হৃদয়ের উন্মুক্ততা ও স্ফটিক প্রপাতের উজ্জ্বলতার এমন অনুপম সমন্বয়ের দৃষ্টান্ত দেখিনি।’ লোরকা সম্পর্কে কথাগুলো তার মৃত্যুর পর স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন চিলির পাবলো নেরুদা, হিস্পানি ভাষার আরেক মহান কবি। নেরুদার কথা থেকেই বোঝা যায়, কবিতার বিশ্বপটে অসাধারণ এক কবি হিসেবে আবির্ভাব ঘটেছিল লোরকার।

লোরকা জন্মছিলেন স্পেনের গ্রানাদা অঞ্চলের ফুয়েন্তে বাকেরোস। সেটা ৫ জুন, ১৮৯৮ সাল। ধনী কৃষিজীবী পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান ছিলেন তিনি। খুব অল্প বয়সেই অনুরাগ দেখা দেয় থিয়েটারের প্রতি। সনাতন ধ্রুপদী সংগীত আর ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীতÑ গানের এই উভয় ধারার প্রতি তার ছিল তীব্র আকর্ষণ। পড়াশোনার প্রতিও ঝোঁক ছিল। গ্রানাদা আর মাদ্রিদÑ এই দুই জায়গাতেই শিক্ষা অর্জন করেছেন। মাদ্রিদে পড়াশোনা করার সময় ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন প্রখ্যাত পরাবাস্তববাদী চিত্রশিল্পী সালভাদর দালি আর চলচ্চিত্র পরিচালক লুই বুনুয়েলের। নাটক রচনা ও প্রদর্শনের অভাবনীয় সাফল্য অর্জনের পাশাপাশি হিস্পানি কবিতাতে তিনি সংযোজন করেছেন নতুনতর বিষয়-আশয় ও স্বর। বিশ্বকবিতার পটে এভাবেই নিজেকে যখন প্রায় প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন, তখনই ফ্রাঙ্কো বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে খুন হন তিনি। পতন ঘটে একজন কবি-নক্ষত্রের।

লোরকা আসলে এমন একজন আধুনিক হিস্পানি কবি যার কবিতা ও জীবন প্রতীকী অভিযোজনায় পৃথিবীর সংবেদনশীল কবিতা পাঠকের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। তিনি এতটাই জনপ্রিয় কবি যাকে আধুনিক হিস্পানি কবিতার প্রধান প্রতিনিধি বলে গণ্য করা হয়। ভাবা হয়, তিনি হচ্ছেন হিস্পানি আধুনিকতার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টিশীল কবি। তবে জীবৎকালে নয়, স্পেনের গৃহযুদ্ধ চলাকালে অস্বাভাবিক অকালমৃত্যুর পরই কবি হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন লোরকা। কী দ্যুতিময় ছিল তার উত্থান আর কী বেদনাবহ ছিল তার ট্রাজিক মৃত্যু।

লোরকার মৃত্যুটা যদিও রহস্যাবৃত হয়ে আছে, কিন্তু এখন আর সন্দেহ নেই, রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণেই হত্যা করা হয় হিস্পানি ভাষার এই মহান কবিকে; লোরকাকে যদিও কোনোক্রমেই রাজনৈতিক কবি বলা যাবে না। তিনি জার্মানির ব্রেখট হতে চাননি, শিল্পসাহিত্যে এমন কোনো তত্ত্ব হাজির করেননি, যা তার গায়ে প্রোলেতারীয় রাজনীতির তকমা সেঁটে দিতে পারে। হিস্পানি উপত্যকায় শত শত বছর ধরে প্রবহমান ঐতিহ্যবাহী সাধারণ জীবনপ্রবাহকেই তার রচনায় ধরতে চেয়েছিলেন তিনি। লোরকা হচ্ছেন মূলত আধুনিক সাহিত্যের এমন এক জনপ্রিয় ‘লোককবি’ যার মধ্যে একই সঙ্গে সমীকৃত হয়ে গেছে আধুনিক জীবনবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি আর অভিজাত অনন্য রচনাশৈলী। বিশ্বকবিতার কেন্দ্রে তাই সহজেই স্থান করে নিতে পেরেছেন তিনি।

লোরকার দুয়েন্দে সম্পর্কিত বিখ্যাত বক্তৃতা থেকে বোঝা যায়, ‘অনুপ্রেরণা’ কবিকে কবিতা রচনায় উস্কে দিতে পারে, লোরকা যাকে শনাক্ত করেছেন ‘উপমা’ বলে; সেই অনুপ্রেরণাকে কবি দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করবেন, কবিতায় ঘটবে উপমা ও প্রেরণার অভূতপূর্ব ব্যঞ্জনা, কিন্তু প্রেরণাই সব নয়। এই ভাবনার সূত্রে আমাদের কী মনে পড়ে যায় না জীবনানন্দের সেই কথাটা, উপমা ও আন্তরপ্রেরণা কবিতার উৎস, কিন্তু প্রেরণাতেই কবিতা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে না। কবিতায় থাকতে হবে ইতিহাসের অন্তঃশীল ইশারা। লোরকা একবার এক বন্ধুকে বলেছিলেন, ‘আমি হয়তো ঈশ্বরের আশীর্বাদে অথবা শয়তানের প্ররোচনায় কবি হয়েছি, তবে কবিতার কৃৎকৌশল কী, কবি হয়ে ওঠার জন্য কী কী করতে হয়, আমি তা জানি।’ যতই ঈশ্বরের দোহাই দিন, লোরকার যে জিনগতভাবেই অবিস্মরণীয় কবিপ্রতিভা ছিল, গত শতকের বিশ্বকবিতার ইতিহাস সেই সাক্ষ্যই দেয়। লোরকার কবিতাসমগ্র, স্বল্পকালের জীবদ্দশায় যা তিনি রচনা করছিলেন, আবেগের তীব্রতা আর ভাবচ্ছবির অপূর্ব বিন্যাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। এই যে আবেগঘন গভীর ভাবচ্ছবি, শব্দের গহনতপ্ত মহিমা, ১৯২১ সালে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কবিতার বই’তে। জিপসি ব্যালাড বুক (১৯২৮) কাব্যগ্রন্থ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে হোর্হে গিয়েনকে লেখা একটা চিঠিতে নিজের কবিতা সম্পর্কে লোরকা বলেছিলেন, ‘পুরানো রীতির মধ্যে নতুন সংবেদের উদ্ভাস’ ঘটানোই ছিল তার লক্ষ্য।

তার কবিতার একটা প্রধান দিক হচ্ছে ‘পারসনিফিকেশন’ বা মানবায়ন, এটাই হলো আধুনিকতা। মৃত পাতারা তার কবিতায় তাই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে, নিঃসঙ্গ পপলার তার শতবর্ষের বাহু দিয়ে চাঁদের গায়ে আঘাত করে। সেইসঙ্গে তিনি মানবিক বিষয়গুলোকে প্রকৃতির সঙ্গে সমীকৃত করে দেন অথবা মানুষের বৈশিষ্ট্যকে প্রকৃতির মধ্যে প্রতিফলিত করেন। প্রকৃতিযাপনের নিবিড় ছবি লোরকার কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। মৃত্যু প্রথম থেকেই লোরকাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। মৃত্যুর ভাবচ্ছবি তার কবিতায় শান্ত, স্নিগ্ধ, পরিপার্শ্বকে জড়িয়ে ঘনিয়ে ওঠে। বিকাল পাঁচটায়।/ মৃত্যু সবই আর কেবল মৃত্যুই/ বিকাল পাঁচটায়। কবিতা মূলত জীবিতদের কান্না আর মৃতদের নৈঃশব্দ্যের স্নায়ুক্ষয়ী টানাপড়েনে উজ্জ্বল। বিষাদই যেন কবিদের সঙ্গী। কোথাও যেন তাদের পৌঁছবার নেই। সনাতন উপমা, কিন্তু সেই উপমাই আধুনিক একটি ভাবÑ নৈঃসঙ্গ্যে-বিষাদের বাহন হয়ে উঠেছে। লোরকার সবচেয়ে জনপ্রিয় আর সমাদৃত কাব্যগ্রন্থ জিপসি বালাদ (১৯২৮) বা জিপসি গাথা। লোরকা বলেছিলেন, এই বইতে তিনি মিথের সুদূরতা আর প্রতিদিনের দৈনন্দিতাকে মিশিয়ে দিয়েছেন। সেইসঙ্গে এর কবিতাগুলো পরাবাস্তবধর্মী চিত্ররূপময় অসাধারণ ভাবচ্ছবি।

লোরকার কবিতা আসলে এ রকমই। তিনি অনুভবেরই ছবি এঁকে গেছেন, বস্তুনির্ভর প্রতিবেশের নয়। চাঁদের যে কত বিচিত্র ব্যবহার আছে তার কবিতায়, ভাবলে অবাক হতে হয়। আরেকটি উপজীব্য বিষয় হচ্ছে যৌনতা। দিওয়ান-ই-তামারি, জিপসি গাথার ‘অবিশ্বাসিনী বউ’ আর ‘তামার আর আমনোন’ কবিতাগুলো যৌনতার পটভূমিতে লেখা। প্রেমে পড়েনি এই কবিতার কথক কিন্তু রিরংসা এবং বাসনায় উজ্জ্বলের পঙক্তিগুলো।

লক্ষণীয়, প্রেমের মধুর রূপ নয়, লোরকাকে আকর্ষণ বা বিকর্ষণ করেছিল এর তিক্ত রূপটি। প্রেমের প্রতি বিতৃষ্ণা ছিল তার, বিশেষ করে নারীর প্রেমে তিনি আস্থা রাখতে পারেননি। সমকামী হিসেবে কাব্যজীবনের শুরুতেই পরিচিতি পেয়েছিলেন। এ কারণেই তিনি স্পেন ছেড়ে নিউইয়র্ক গিয়েছিলেন বলে অনেকে মনে করেন। নিউইয়র্কের কবিতাগুলোতে লোরকার নির্জিত আত্মার কালো দিকগুলোই ফুটে উঠেছে। পরাবাস্তবতার প্রকাশ হিসেবেও বিবেচনা হয় গ্রন্থটিকে। এই আবিষ্কার, নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য।

পরাবাস্তববাদী শিল্পী সালভাদর দালি ও লুই বুনুয়েল, অনেকের ধারণা, তারা পরস্পরের সৃজনীপ্রতিভার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেনÑ ব্যক্তিত্বে এবং নন্দনভাবনায়। সুরালিস্ট মেনিফেস্টো কবিতার ভাষা, বিশেষ করে ইমেজ ব্যবহারে যে স্বয়ংক্রিয় রীতি বা অটোমেটিক রাইটিংয়ের সূচনা ঘটিয়েছিল পশ্চিমী কবিতায়, তা বিপ্লবের সূচনা ঘটায়। নিউইয়র্কের কবিতাগুলো ওই ইশতেহারের প্রভাবে রচিত হলেও লোরকা আগে থেকেই ইমেজের পর ইমেজ সাজিয়ে কবিতা রচনায় সিদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন। এই পর্বে তা আরও বিস্তার পায়, সহজ ও সাবলীল হয়ে ওঠে অটোমেটিক রাইটিংয়ের বিষয়টি। লোরকার কবিতার আকারও এ সময়ে দেখা যাবে দীর্ঘ হয়ে উঠছে, কথা বলার ও ইমেজ তৈরির ঝোঁক বাড়ছে। ফলে দালি বা বুনুয়েল নয়, লোরকার কবিপ্রবণতাই ছিল অনেকটা এ রকমÑ বিবৃতি নয়, ইমেজকেই তার ভাবপ্রকাশের উপযুক্ত মাধ্যম মনে করতেন। কবিতায় গতি এবং যেভাবে যে অনুষঙ্গ আসে, সেভাবে কবিতা লিখে গেছেন; ফলে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তা অটোমেটিক রাইটিং হয়ে উঠেছে। তবে লোরকার কৃতিত্ব হলো, বহুচর্চিত, অতি ব্যবহারে ক্লিশে ইমেজ নয়, একেবারে নতুন, অভূতপূর্ব কিন্তু মনকাড়া ইমেজ ব্যবহার করেছেন। তার কবিতা এভাবেই বিশ্বকবিতায় নতুন কবিতার আমেজ নিয়ে এসেছে। ঘন নিবিড় সংহত ছোট কবিতার মতো দীর্ঘ কবিতা রচনাতেও অসাধারণ কাব্যপ্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন লোরকা। তার সবচেয়ে বিখ্যাত একক কবিতা হচ্ছেÑ ‘ইগনাসিয়ো সাঞ্চেস মেহিয়াসের জন্য বিলাপগাথা (১৯৩৫)।’ ভাব আর ইমেজের চমৎকার বুননের সূত্রে কবিতাটি অনবদ্য।

লোরকার মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয় দিওয়ান-ই-তামারিত কাব্যগ্রন্থটি। স্পেনের মুসলিম ঐতিহ্যের গভীর অনুরাগী ছিলেন লোরকা। আরবি ক্বাসিদা বা গজল ধারার গান ও কবিতা একসময় পৌঁছে যায় স্পেনে। লোরকা ঐতিহ্যবাহী এই গীতিধারার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে রচনা করেন বেশকিছু গজলরীতির কবিতা এবং ক্বাসিদা। একটা ক্বাসিদায় তিনি লিখেছেন, বারান্দাটা বন্ধ হয়ে গেছে, তিনি অনুভব করছেন, ‘কোথাও কিছু নেই শুধু শোনা যায় ফোঁপানো কান্নার ধ্বনি।’ লোরকা বুঝেছিলেন, হৃদয়ের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে, কবিতায় বলতে হবে এই হৃদয়ের কথাই। মৃত্যুচিন্তাই এই কাব্যগ্রন্থের প্রধান বিষয়। হার্দ্রিক উষ্ণতায় এর কবিতাগুলো অবিস্মরণীয় হয়ে আছে।

লোরকার মৃত্যুর পর প্রকাশিত সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ সনেটস অফ ডার্ক লাভ (১৯৮৫) কাব্যগ্রন্থেও এই মৃত্যুর কথা আছে। মৃত্যুকে তিনি দেখেছেন গাছের প্রতীকে, যার শেকড় মাটিতে প্রোথিত। লোরকার সামগ্রিক কবিভাবনাই এমনÑ নশ্বর জীবনের দাসানুদাস হচ্ছে মানুষ। তবে বেঁচে থাকতে হবে আত্মগরিমা নিয়ে, আবেগময় উজ্জ্বল মানুষের জীবন চাই তার। এ প্রসঙ্গে লোরকা বলেছিলেন, ‘কবিতা, তরবারির আঘাতের মতো; যা হৃৎপিণ্ডকে ছিন্ন করে, এখনও লেখা হয়নি।’ কিন্তু আমরা লক্ষ করলে দেখব, লোরকা কিন্তু এই ধরনের চমৎকার কবিতাই লিখেছেন। তার অকালমৃত্যু ঘটেছে ঠিকই, তবে তিনি পাঠকের জন্য লিখে গেছেন অবিস্মরণীয় সব কবিতা। খুব কম কবিই আছেন যারা লোরকার মতো হৃদয় হরণকারী মগ্ন গভীর কবিতা লিখতে পেরেছেন। মানুষের জন্য তার মমত্ববোধ ছিল অত্যন্ত তীব্র। তিনি শুধু কবিতা রচনা করেননি, কবিতা আবিষ্কারও করেছেন। বিশ্বকবিতার অন্যতম শীর্ষ কবি তিনি। যতদিন কবিতা থাকবে, ততদিন লোরকাও থাকবেন। ফ্যাসিবাদী শক্তি তার জীবনদীপ নিভিয়ে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু পাঠকহৃদয়ে তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী।

দুই

কবিরা হয়তো তাদের ভবিষ্যৎ দেখতে পান। আর কেউ না হলেও লোরকা যে আবছায়া হলেও মৃত্যুকে দেখতে পেরেছিলেন, বলা যায় সেকথা। দালির জবানিতেও এর উল্লেখ পাই আমরা : ‘লোরকা দিনে অন্তত পাঁচবার তার মৃত্যুর কথা বলত। রাতে যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা কয়েজন মিলে তাকে ‘বিছানায় সোপর্দ করতাম’, সে ঘুমাতে যেতে পারত না।’

কবিজীবনের শুরু থেকেই লোরকার মধ্যে ঘনিয়ে উঠেছিল মৃত্যুচিন্তা। তিনি কী জানতেন, অকালে ছেড়ে যেতে হবে এই পৃথিবী? ফ্রাঙ্কোর সেনারা তাকে বদ্ধভূমিতে নিয়ে যাওয়ার কিছুদিন আগে ঘোরের মধ্যে দুঃস্বপ্নে তিনি দেখেছিলেন মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে। আরেকটি কবিতায় শুধু মৃত্যুবোধের পাশাপাশি নিজের কবর কোথায়, খুঁজে ফিরছেন প্রকৃতিতে। কবিতাটির নাম ‘কালো পায়রার ক্বাসিদা’। নাটকীয়তা, স্বগোতোক্তি, জিজ্ঞাসা, আর্তিÑ ঝরে পড়ছে কবিতাটিতে। নিজের ভবিতব্য বুঝি দেখতে পাচ্ছিলেন লোরকা, তাই ধ্রুবপদের মতো রচনা করেছিলেন এই পঙক্তি : ‘কোথায় আমার গোর?’ সত্যিই তো, আজও তো কোথায় লোরকার কবর, কেউ তো জানি না। জানা সম্ভব হয়নি, ঘাতকরা তাকে লোকচক্ষুর আড়ালে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলেছিল বলে। কী অমোঘ আত্মদর্শন। কবিদের পক্ষেই মনে হয় ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব! ২০২৩ সাল ছিল লোরকার জীবনের ১২৫তম জন্মবর্ষ। এর পর আরও দু-বছর চলে গেছে। আমরা শুধু তার জন্মদিনই উদযাপন করতে পারব, কিন্তু মৃত্যুদিন নয়; তিনি তো মৃত্যুহীন।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা