মাসুদ রানা
প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১৮:৩৫ পিএম
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে লোকজ উপাদানের নান্দনিকতা প্রয়োগ নিয়ে মতিন রহমানের বই ‘চলচ্চিত্রে লোকজ উপাদান ও নন্দনভাবনা’।
বাংলাদেশের লোকসমাজের শেকড় থেকে উঠে আসা শিল্পরীতি, বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান এবং জীবনঘনিষ্ঠ নানা বহিঃপ্রকাশ আমাদের সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। সেই সংস্কৃতির বর্ণিলতার সঙ্গে চলচ্চিত্রের নান্দনিকতার সম্পর্ককে গবেষণাধর্মী বিশেষণে উপস্থাপন করেছেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার মতিন রহমান তার গ্রন্থ চলচ্চিত্রে লোকজ উপাদান ও নন্দনভাবনাতে। লোকজ উপাদান কীভাবে চলচ্চিত্রভাষাকে সমৃদ্ধ করে এবং সেই সমৃদ্ধি কীভাবে চলচ্চিত্রের অর্থবহ নন্দনভূমি নির্মাণ করে বইটি তারই প্রামাণ্য নিদর্শন। মানুষের প্রবহমান জীবনযাপন, কৃষিনির্ভর সমাজ, উৎসব-অনুষ্ঠান, লোকগান, হস্তশিল্প ও আঞ্চলিক রূপকলার বহুমাত্রিকতা চলচ্চিত্রে কীভাবে প্রতিফলিত হয়, তার সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় এখান থেকে। সাধারণ মানুষের শিল্পচর্চায় নিহিত সৌন্দর্য যে চলচ্চিত্রের ভিজ্যুয়াল নন্দনকে গভীরতর করে, লেখক তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।
গ্রন্থের মূল বিষয়Ñ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে লোকজ উপাদানের নান্দনিকতা প্রয়োগ। লেখক নিজে চলচ্চিত্রনির্মাতা হওয়ায়, বলা যায় তিনি ক্যামেরার চোখ দিয়ে এ গ্রন্থের বিষয়গুলো দেখেছেন। চলচ্চিত্র দৃশ্যমাধ্যম হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের শক্তিশালী বিনোদন-মাধ্যম। শিল্পের নান্দনিকতা ফুটে ওঠে চলচ্চিত্রের প্রতিটি ফ্রেমে। অপার সম্ভাবনার মাধ্যমটি যখন পল্লীবাংলার লোকজ সংস্কৃতির উপাদান দিয়ে দৃশ্যকাব্য তৈরি করে, তখন তা সবার মন ছুঁয়ে যায়। কেবল কথা নয়, ছবি দিয়ে বিষয়কে গ্রহণযোগ্য করে তোলার সৃজনশীল আর বহুমাত্রিক চিন্তাভাবনার সমন্বয় ঘটে চলচ্চিত্রে। চলচ্চিত্রে গ্রামবাংলার আবহমান সংস্কৃতির যথাযথ ব্যবহার নির্মাতার বাণীকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজেই পৌঁছে দেয়। বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে নির্মিত চলচ্চিত্র জনগণকে তাদের শেকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।
বইটির অন্যতম মূল্যবান দিক হলো স্বাধীনতা-পূর্ব এবং পরবর্তী দুই পর্বে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে লোকজ উপাদানের প্রয়োগ বিশদভাবে উপস্থাপনা। ১৯৫৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সময়কে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্রের প্রবণতা, নির্মাণশৈলী, সামাজিক পরিবর্তন, ঘটনাপ্রবাহ এবং তার প্রভাব চলচ্চিত্রকারদের ভাবনায় কী ধরনের রূপান্তর এনেছে, লেখক তা যুক্তিভিত্তিক বিশ্লেষণে তুলে ধরেছেন। এই অংশগুলো গবেষণাভিত্তিক তথ্য, উদাহরণ ও তুলনামূলক আলোচনায় সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের সুবিস্তৃত লোকসমাজের প্রবাহধারা বিচিত্র লোকজ উপাদানে পুষ্ট। এ দেশের মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা ও অস্তিত্বের গভীরে নানান শ্রেণিভুক্ত লোকজ উপাদান প্রতিনিয়ত বর্ণিলতায় উদ্ভাসিত। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে লোকজ উপাদানের প্রয়োগ কতটা নান্দনিকভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ, তা অন্বেষণ করা হয়েছে এখানে। উদ্দেশ্যÑ এ দেশের চলচ্চিত্রে লোকজ উপাদানের প্রয়োগব্যাপ্তি, পরিধি ও প্রয়োগকৌশলের গুরুত্ব এবং বৈচিত্র্যগত অবস্থানও চিহ্নিতকরণ। পাশাপাশি প্রায়োগিক তাৎপর্যে মূল্যায়িত করা এবং চলচ্চিত্রে প্রতিফলিত লোকজ উপাদানের নন্দনশৈলী এবং লোকসমাজ দ্বারা চর্চিত লোকজ উপাদানের উদ্দেশ্য ও সৌন্দর্যগত সাংস্কৃতিক মূল্য অনুসন্ধান। আমাদের লোকসমাজের বিনোদনের দাবিও পূরণ হয়েছে গ্রামীণ মেলা, দুর্গাপূজা উৎসব, সন্ধ্যারাতে প্রতিমা বিসর্জন, নদীতে নৌকাবাইচ এবং দলবেঁধে সিনেমা দেখে। উদাহরণস্বরূপ ১৯৬৫ সালে মফস্বল প্রেক্ষাগৃহে রূপবান দেখতে আসা গ্রামের সাধারণ শ্রোতা-দর্শকের সমাগম লেখকের প্রত্যক্ষকৃত একটি ঘটনা। কিন্তু ১৯৬৬ সালে বেহুলা দেখতে আসা দর্শক ছিল শিক্ষিত শ্রেণি, সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। চলচ্চিত্র দর্শকের বিভিন্ন শ্রেণিচরিত্রও এই বইয়ের উদ্ঘাটনের বিষয়।
মতিন রহমানের চলচ্চিত্রে লোকজ উপাদান ও নন্দনভাবনা একটি প্রামাণ্য গবেষণাগ্রন্থ; যা চলচ্চিত্র গবেষক, শিক্ষার্থী, নির্মাতা এবং সংস্কৃতিমনস্ক পাঠক সবার জন্য সমান উপযোগী। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র; তার শেকড় ও তার নন্দনভুবনকে সামগ্রিকভাবে জানতে চাইলে এ বই নিঃসন্দেহে একটি অপরিহার্য পাঠ।