× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শীতের শ্রেণিচরিত্র

আলফ্রেড খোকন

প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১৮:০৮ পিএম

আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১৮:১৮ পিএম

চিত্রকর্ম : হামিদুজ্জামান খান

চিত্রকর্ম : হামিদুজ্জামান খান

শীত একটি অসাধারণ ঋতু। তাকে আমি উপভোগ করি। রাতে লেপের আদরে, সকালে কুয়াশার চাদরে। দুপুরে মিঠেকড়া রোদে। পড়ন্ত বিকালে কানের কাছে শীত, আহা কী যে মৃদু মৃদু লাগে। তার একটু পরই ঝরাপাতার ভেতরে দেশলাই জ্বালিয়ে শীত পোহাবার উত্তাপ যে পায়নি, তার জীবন ঝড়ঝঞ্ঝার নদীতে সাঁতার না-জানা বাবুর মতনÑ ষোলো আনাই মিছে। 

এই বাংলায় শীতের সকালে খেজুরের রস যে পান করতে পারেনি, তার বহুমূত্ররোগ থাকুক আর নাই থাকুক, সে জীবন আসলেই রসহীন। যদিও আমরা দেখেছি রসেভরা এই শীতকাল, লেপ বা কম্বলের নিচে শুয়ে থেকে শীতের ভোরবেলা রস চুরি হয়ে যাওয়ার পর আমার গ্রামের আদেলউদ্দিন শিউলির কণ্ঠ থেকে ভেসে আসা সুমধুর গালি। এই গালি যে শোনেনি, তারও জীবনের একটি মধুর অধ্যায় অসমাপ্ত থেকে যাবে। কুয়াশাভরা শীতসকালে শিউলি আদেলউদ্দিন সরদার, আমরা তাকে ‘আদি’ ভাই নামে ডাকতাম, সে কোনোদিন গালি দিতে পারেÑ এ কথা আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি। যদি না, শীত সকালে রস চুরি না হতো। তার গালি শুরু হলে, মা আমাদের লেপ মুড়ি দিয়ে দিত, যাতে সেই গালি আমাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ না করতে পারে। কিন্তু আমার মতন দুষ্টু ছেলেমেয়েরা তো ওই গালি শোনার জন্য একটি রাত অপেক্ষা করত। ফলে মা যতই শব্দকে লেপ দিয়ে বাঁধা দিত, আমরা কোনো না কোনোভাবে একটু লেপ ফাঁক করে কান খাড়া করে রাখতাম। রস চুরির অপরাধে গালির জন্য যে রসবোধÑ এই বাংলায় তা হারিয়ে গেছে। শৈশবে শোনা ওই গালিগুলো কিন্তু কোনোদিনও বড় হতে হতে আমি আর মুখ দিয়ে উচ্চারণ করতে পারিনি। এক্ষেত্রে এও বলা যায় যে, সব খারাপ জিনিস সবাই শেখে না। মন্দ বিষয়ের মধ্যে মধু থাকে, তা পান করার আনন্দই অনিবর্চনীয়। যদিও এখন এই শহরে সেইসব গালাগালি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে অহরহ শুনি; তাতে আমার আর কোনো শিহরন লাগে না। এখন এসব গালি এই রাজধানী শহরে প্রতিনিয়ত ভেসে আসে, কিন্তু তা আমার কানের পাশ দিয়ে চলে যায়। অথচ এমন এক দিন ছিল, এই রসময় গালি শোনার জন্য, আদি ভাইয়ের খেজুর রস যাতে চুরি হয় তার জন্য, একটি শীতরজনী আমাদের অনেকেরই গভীর অপেক্ষায় ভরে থাকত। যদিও রসের অন্বেষণে খেজুরগাছ কাটার বেদনা অপরিসীম। খেজুর গাছের বুকচিরে ঢোকানো বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি নলাকৃতির একটি কলম থেকে ফোঁটা ফোঁটা রস নির্গত হতো সারা রাত ধরে। মাটির হাঁড়ি পেতে সেই রস সংগ্রহ করতেন যিনি আমার গাঁয়ে তার নাম ‘শিউলি’। আদি ভাই আজ আর বেঁচে নেই দৃশ্যত, কিন্তু তিনি আমার স্মৃতিতে বেঁচে রয়েছেন অবিরত। 

তো এভাবে আমি ও আমার শৈশবের শীত উদযাপন করতাম। সকালে যখন শীতের সূর্য আমাদের উঠানের পূর্বদিক থেকে অনেক গাছপালা ও বাড়িঘর ছাপিয়ে উঁকি দিত, তখন সূর্যকে মনে হতো মহাপরাক্রমশীল। আমরা উঠানে হোগলা বিছিয়ে পড়তে বসতাম। মা এসে মুড়ি এবং খেজুর রসের গুড় দিয়ে যেতেন। মুড়ির সঙ্গে খেজুরের রস যারা খাননি, আজ তারা এ কথা ভাবতেও পারবেন না! তারা মূলত একটি অসহায় প্রজন্ম!

শীতের রয়েছে শ্রেণিচরিত্র। ঘরের শীত আর বাইরের শীত এক না। যার ঘর আছে, লেপকাঁথা আছে, তার শীত একরকমের। আর যার ঘর নেই, শুধু বাহির আছে, তার শীত আরেক রকমের। যার শীত উপভোগ করার জন্য গরম কাপড় আছে, তার শীত আরামদায়ক। যার শীত নিবারণের জন্য সামান্য শীতবস্ত্রটিও নেইÑ যারা এখনও শীতের প্রশ্নে একটি কম্বল আকাঙ্ক্ষা করে, তাদের শীত অসহ্য রকমের। ফলে শীত সবার জন্য এক রকমের নয়। শীতের চরিত্র তো শীত-ই। শীতের দোষ কী? সে তো ঋতুচক্রের আবর্তনে আসবেই। কিন্তু মানুষ মানুষকে বিভাজিত করে রেখেছে শীতের প্রশ্নে। আজ যদি আমি প্রশ্ন করিÑ এই শীতে তোমার কয়টি অতিরিক্ত লেপ-কম্বল আছে? উত্তর কী হবে? নানান রকমের উত্তর আসবে। লাগে, হয় না ইত্যাদি ইত্যাদি। এই প্রশ্নের উত্তরে আমিও কিছুটা অপরাধী এই কারণে যে, শীত নিবারণের প্রশ্নে আমারও অতিরিক্ত বস্ত্র জমা হয়েছে। কিন্তু সুকান্ত ভট্টাচার্যের লেখা শীতের সূর্য কবিতাও আজ আর উত্তাপ দিতে পারে না রাস্তার ধারে উলঙ্গ শিশুটিকে। কারণ সূর্য এখন আর শ্রেণি বিভেদ জানে না। শৈত্যপ্রবাহে সে উঠতেই পারে না!

শীতকে নিয়ে আমি একটি রোমান্টিক আলাপ করতে শুরু করেছিলাম, কিন্তু সে তো আমার কথা শোনে না। কথা না শুনলে কোনো কথাই আর উপভোগ্য হয় না। ফলে শীত এখন আমার কাছে একটি বেদনার ঋতু। বেদনাকেই ভালোবাসি, শীতু।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা