× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

গল্পের ঢোলে সত্য বাজে

তাসনুভা অরিন

প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৪১ এএম

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:১৭ পিএম

চিত্রকর্ম: মালিহা রহমান

চিত্রকর্ম: মালিহা রহমান

দিন শেষে বাসায় ফিরে ফেসবুক ওপেন করতেই নজরে এলো ‘আজ রাতে বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে, সতর্ক থাকুন’। যত স্ক্রল করছি তত অবাক হচ্ছি আর ভাবছি সকাল থেকে তো সব সুন্দর ছিল। আচমকা কী হলো। ঘনিষ্ঠ বন্ধু রাজনও দেখি একই কথা লেখছেÑ ‘যা কিছুই ঘটুক, আজ রাতে ঘরে থাকুন’ সঙ্গে একটা হাসির ইমোজি। ঠিক বুঝতে পারছিলাম না কী হচ্ছে। স্রেফ মজা করা নাকি অন্য কিছু। হতেই পারে। প্রতিদিন আমাদের এখানে নিত্যনতুন ঘটনা ঘটে। চট করে মাথায় এলো ২০২৪ সালের জুন মাসে রাসেল ভাইপারের ঘটনা। সেবার বর্ষার সময় সবার ফেসবুকজুড়ে শুধু রাসেল ভাইপার। মীমস আর ভিডিওতে সোশ্যাল মিডিয়া সয়লাব। সেসময় ভয় পেয়ে আমি গ্রামে আমার আত্মীয়দের বলছিলাম সতর্ক থাকতে। বেশ কয়েক দিন চলছিল সেই আলাপ। পরিবেশকর্মী থেকে শুরু করে সবাই রাসেল ভাইপার নিয়ে সতর্ক। একই সঙ্গে চলছিল রাসেল ভাইপারের জন্ম বৃত্তান্ত নিয়ে আলোচনা। কিছু মানুষ আতঙ্কিত হয়ে রাসেল ভাইপার না চিনে নিরীহ সাপ মেরে ফেলে নির্দ্বিধায়। আজ সন্ধ্যার পর থেকে আমরা উদ্বিগ্ন। আত্মীয় ও বন্ধুরা ফোন করে বাইরে না যেতে পরামর্শ দিচ্ছে। সেই করোনাকালীনের কথা মনে পড়ে গেল। লকডাউনের শহর। কেউ কারও কাছে নেই। ঘরের মানুষকেও মনে হচ্ছিল দূরের। আচমকা চাপ ধরে আসছে যেন। মনে হচ্ছে ঘরের দেয়ালগুলো একটু একটু করে এগিয়ে আসছে আর আমি আরও ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র হয়ে যাচ্ছি।

 এমন সময় কলিংবেল বেজে উঠলে তড়িঘড়ি করে দরজা খুলতে গেলে, মা বললÑ আগে লুকিং গ্লাসে দেখে নে। আমি তাকিয়ে দেখি পাশের বাড়ির অ্যান্টি। দরজা খুলতেই উনি সবেগে ভেতরে ঢুকে মায়ের হাত চেপে জিজ্ঞেস করলেনÑ ভাবি কিছু শুনেছেন নাকি? কী হবে আজ রাতে? সবাই যে এত সতর্ক করছে। মাকে কিছুটা শান্ত ভাবেই বলতে শুনলামÑ দেখা যাক, কী হয়। প্রতিদিন এত কিছু ঘটছে, কিছুই আগে থেকে বলা যায় না।

 

আমি বুঝতে পারলাম, ঘটনা হোক কিংবা রটনা বিড়ালের গলায় ঘণ্টা ভালোভাবেই লাগানো গেছে। মনকে বারবার বলছিলাম এটা রাসেল ভাইপারের গল্প ছাড়া কিছুই না। তথাপি সন্দেহ মনের ভেতর তুষারের মতো জমছে আর বুঝতে পারছি চিন্তার তাপমাত্রা কমছে। সচরাচর আমি ফেসবুক রাত ১০টার পর লগইন করি না। কিন্তু আজকে করলাম। ভাবলাম দেখি কে কী ভাবছে। আমার অফিস কলিগ থেকে শুরু করে বন্ধুবান্ধব সবাই অ্যাকটিভ আছে। প্রত্যেকে কিছু না কিছু লেখছে। আমি লেখব না, লেখব না করেও টাইপিং শুরু করে দিলাম।


‘রাসেল ভাইপার থেকে ভূমিকম্প, মনে করিয়ে দেয় ২০১২ নামে একটি মুভি নির্মিত হয়েছিল’

 

স্ট্যাটাস দিয়ে কিছুটা রিলিজ লাগছিল, সেইসঙ্গে মনে হচ্ছে যদি কিছু হয়। যেকোনো কিছু হতে পারে, নাও পারে। যদি হয় তাহলে? কিন্তু কী হবে। প্রথম মাথায় এলো ভূমিকম্প, তার পর ডাকাত, তার পর এলিয়েন আক্রমণ। এলিয়েনের কথা মনে আসতে নিজের অজান্তে হাসতে থাকি। এলিয়েনের মুখ মনে এলেই শরীর থেকে বড় মাথা আর বড় বড় দুই চোখের অতি মানবিক ও বুদ্ধিমান প্রাণীর হলিউড ছবি ভেসে ওঠে। তারপরই মার্ক এলিয়ট জাকারবার্গের মুখ মনে পড়ে। মনে হতে থাকে আমাদের হাতগুলোই এক একটি স্মার্টফোন আর তাতে আলোর গতির চেয়ে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে যাচ্ছে ইনফরমেশন, সত্য মিথ্যায় মেশানো। এসব ভাবছি আর একটু ক্ষণ পর পর কমেন্ট পড়ছি। এভাবে আমরা একটা বিষয় নিয়ে বিভোর হয়ে আছি। এমন সময় আচমকা বিকট এক আওয়াজ। মুহূর্তে আমি ছুটে যাই জানালার কাছে, বাইরে কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করছে। পরে দেখলাম তেমন কিছু না, হয়তো কোনো গাড়ির টায়ার বার্স্টের শব্দ নয়তো কেউ পটকা ফুটিয়েছে। মন শঙ্কিত থাকায় তিলকে তাল ভাবছি। এ নিয়ে তেমন মাথা না ঘামিয়ে বিছানায় গেলাম। ভাবলাম, দেখি কোথাও কিছু হলো কী না। আচমকা একজনের স্ট্যাটাসে চোখ পড়তেই দেখলাম লেখা আছে, কোনো এক পুকুরে কারও লাশ পাওয়া গেছে। তাতে লক্ষাধিক ভিউজ। অনেকেই দেখলাম শেয়ার দিয়েছে। তাহলে কি সত্যি কিছু হওয়া শুরু হয়ে গেছে!

 

যত স্ক্রল করছি তত দেখছি মানুষের একই বিষয় নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লেখা। একটা নির্দিষ্ট সময় পর মন আর আঙুল একসঙ্গে ক্লান্ত হলে কখন ঘুমিয়ে পড়লাম টেরও পেলাম না। ঘুম ভেঙে দেখলাম সুন্দর একটা সকাল, রাস্তার পাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছে টুংটাং আওয়াজ তুলে রিকশা আর মানুষ। মনে হলো ‘যত গর্জে তত বর্ষে না।’ গতকাল যে এত কিছু হয়ে গেল এর আলামত কোথাও লেগে নেই। যেন গত রাত বলে কোনো রাতই ছিল না পৃথিবীতে।

 

প্রতিদিনের মতো ছুটে গেলাম কর্মক্ষেত্রে। সেখানে সবার আমারই মতো অবস্থা। সবার একই প্রশ্নÑ কী হয়েছিল শেষে। যেন একটা লাইভ সিনেমায় পুরো জাতি আটকে ছিল। ফেসবুকে লগইন করতেই দেখলাম আলহামদুলিল্লাহ কেউ কেউ গুজবের রাত। এসব স্ক্রল করতে করতে সংবাদে জানলাম কে কীভাবে এ রকম সংবাদ ছড়িয়েছে কেউ জানে না। এসবের সঠিক কোনো সোর্স নেই।

 

কিন্তু মানুষ কিছু হবে ভেবে কাটিয়ে দিয়েছে একটা রাত ঘুমিয়ে কিংবা না ঘুমিয়ে।

 

এক দেশে এক রাজা ছিল, যিনি ন্যায়পরায়ণ বলে পরিচিত হলেও তার একটা সমস্যা ছিল। তিনি নাকি সত্যের চেয়ে গল্প বেশি পছন্দ করতেন এবং বিশ্বাসও করতেন। এজন্য তার আশপাশের সবাই তাকে সত্য মিথ্যায় ভরিয়ে নানান গল্প শোনাত। যার কথায়, চিন্তায় যত রঙ, তিনিই তার রাজ্যের সবচেয়ে জ্ঞানী।

 

এক দিন সেই রাজদরবারে গুজব ছড়িয়ে গেল যে, রাজ্যের পশ্চিম প্রান্তে নাকি এক দৈত্য এসেছে, যে দিনে মুখ দিয়ে আগুন খায় আর রাতে ধোঁয়া ছাড়ে। এই কথা শুনে রাজা তো ভীষণ ভয় পেয়ে গেল এবং আদেশ দিল যদি কেউ সেই দৈত্যকে ধরতে পারে, তাকে পুরস্কৃত করা হবে। এ সময়ে নানান জনে নানান গল্প নিয়ে হাজির হতো। কেউ কেউ বলত, সেই দৈত্যের নাকি তিন মাথা, চার পা… এ রকম আরও কিছু। রাজা এসব গল্প শুনছে, কিছুটা ভয়ও পাচ্ছে আবার আদেশ দিচ্ছেন যেন দ্রুতই এর মীমাংসা হয়। কেউ কেউ বলছেন, এটা শত্রু রাষ্ট্রের পাঠানো কোনো ভয়ানক পিশাচ হবে। আলোচনা এভাবে গভীর থেকে গভীর হচ্ছিল। রাজা খেয়াল করল, সবাই সরব হলেও নীরব একমাত্র গোপাল ভাঁড়। রাজা জানতে চাইলেন–

‘গোপাল, তুমি কী ভাবছ?’

গোপাল তখন বলল, ‘মহারাজ আমি তো দৈত্যকে ধরেই এনেছি।’

 

গোপালের কথা শুনে সবাই চমকে উঠল।

 

সবাই দেখতে চাইল দৈত্যকে। গোপাল কিছুক্ষণ পর রাজদরবারে ফিরে এলো একটি ঢোল নিয়ে, যার গায়ে লেখা আছে ‘ভয়’, তারপর জোরে জোরে ঢোল বাজাতে বাজাতে বললÑ মহারাজ এই হলো সেই দৈত্য ‘ভয়’, যে প্রতিদিন আগুন খায়, ধোঁয়া ছাড়ে, তিন মাথা, চার পা ওয়ালা একটি প্রাণী। কেউ বিচার করেনি কিন্তু ভয় পেয়েছে। আর ভয়টা ধীরে ধীরে সবাইকে গিলতে শুরু করে দিয়েছে। এটাই সেই দৈত্য।

 

রাজা রেগে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন

 

এ কথার প্রমাণ কী?

 

গোপাল ভাঁড় মুচকি হেসে বলল, এখন কোনো কিছুর প্রমাণ লাগে না, মানুষ যা বিশ্বাস করতে সক্ষম সেটাই সত্য।

 

কিছুক্ষণ পর রাজা বললেন, তুমি ঠিকই বলছ, মানুষ সত্যের চেয়ে গল্প বেশি ভালোবাসে।

 

গোপাল মাথা নেড়ে জবাব দেয়, জি মহারাজা। এটাই বর্তমান সময়ের রাজধর্ম।

 

এখন এই মুহূর্তে যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা, এই গল্পটা কোন বইতে লেখা আছে? তাহলে কিন্তু উত্তর দিতে পারব না। কারণ এই গল্পের সোর্স জানা নেই। গল্প সত্য নয়, এটা যেমন সত্য তেমনি সত্য গল্পের চেয়েও গল্পময়, সেও সত্য। তাই বিশ্বাস যেন একটা দ্বিমুখী কয়েন, হেড না টেল কেউ বলতে পারে না।

 

চোখ বন্ধ করে কিংবা খোলা রেখেও আর সত্য চেনা যায় না। অফিস রুমে পায়চারি করতে করতে হঠাৎ নিজের ছায়ার দিকে চোখ পড়ল। দেখলাম আমার অনেকগুলো ছায়া মেঝেতে ছোট-বড় রেখার মতো আমাকে ঘিরে আছে। রুমে অনেক লাইট থাকার কারণে বিবিধ ছায়ার প্রকার ছড়িয়ে আছে। ঠিক তখন মনে হচ্ছে, এই যে এতগুলো ছায়া, তারা যদি আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জানতে চায়, তাদের কোন শরীরটা আমি। আমিও কি দ্বিধায় পড়ে যাব না!

 

বুঝতে পারি ‘Post Truth’ এখানে ‘সত্যের পরে না, বরং বোঝায় সত্য যেখানে হারিয়ে যায়। ন্যারেটিভ বনাম ফ্যাক্টের এই যুগে সত্য উপস্থাপনায় গৃহীত হয়। ইন্টারনেট কেন্দ্রিক বিশ্বে সত্য আর বাল্য শিক্ষার বইয়ের মলাটের মতো সাদাসিধে নেই। আর আমরাও নেই সত্য যুগে। আমরা এসে পড়েছি পোস্ট-ট্রুথ যুগে, যেখানে প্রধান সংকট ‘এপিস্টেমোলজিক্যাল সংকট’। মানুষ এখন আর বিশেষজ্ঞদের মতামতকে বিশ্বাস করতে পারছে না, বিশ্বাস করতে পারছে না বৈজ্ঞানিক প্রমাণকে। ফলে প্রকট হচ্ছে আমার অভিজ্ঞতাই আমার সত্য। এই অবস্থায় যে যার বুদ্ধির পরিধি অনুযায়ী এবং যুক্তির চেয়ে আবেগ দিয়ে ভাবছে আর তা ছড়িয়েও দিচ্ছে দ্রুত। সত্য আর সত্যে নেই, সত্য হয়ে গেছে খণ্ডিত, বহু। সত্য এখন মানুষের সংখ্যার সমান, তাই গল্পের ঢোলে সত্য বাজে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা