× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সত্য যেখানে নীরব, আবেগ উচ্চকণ্ঠ

বিপাশা চক্রবর্তী

প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩৩ এএম

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৩২ পিএম

চিত্রকর্ম: জান মাতুলকা

চিত্রকর্ম: জান মাতুলকা

পোস্ট-ট্রুথ কথাটা শুনলে প্রথমে একটু ভারী লাগে। মনে হয় খুব বড় কোনো তত্ত্ব বুঝি! খুব জটিল কোনো ধারণা! কিন্তু আসলে বিষয়টা আশ্চর্য রকম সহজ। আমরা প্রায় প্রতিদিনই এর ভেতরে থাকি। শুধু খেয়াল করি না।

পোস্ট-ট্রুথ মানে এমন এক সময় বা পরিস্থিতি, যেখানে সত্য কী সেটা ততটা গুরুত্বপূর্ণ থাকে না। মানুষ কী বিশ্বাস করছে? কী অনুভব করছে? সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তথ্য ঠিক আছে কি না, সেটাও অনেক সময় কেউ যাচাই করে না। মনে মনে যেটা ভালো লাগে, যেটা নিজের মতের সঙ্গে মেলে, সেটাকেই সত্য ধরে নেওয়া হয়। সহজ করে বললে, পোস্ট-ট্রুথ হলো এমন এক দুনিয়া, যেখানে আবেগ সত্যকে হার মানায়।


এই হার মানানোর ঘটনাটা খুব নাটকীয়ভাবে ঘটে না। এটা নীরবে ঘটে। ধীরে ঘটে। এমনভাবে ঘটে যে, মানুষ টেরও পায় না। কখন সে যুক্তির জায়গা ছেড়ে আবেগের হাতে নিজের সিদ্ধান্ত তুলে দিয়েছে মানুষ সেটা অনুভব করে না।

একটা ছোট গল্প দিয়ে বিষয়টা বলি।


ধরা যাক, একটা গ্রামে হঠাৎ খবর ছড়ালো জঙ্গলে নাকি এক অদ্ভুত ‘লাল বাঘ’ দেখা গেছে। গ্রামে ভয় আর কৌতূহল একসঙ্গে ছড়িয়ে পড়ল। কেউ রাতে ঘর থেকে বেরোতে ভয় পাচ্ছে। কেউ আবার দলবেঁধে বাঘ দেখার পরিকল্পনা করছে। গ্রামের এক শিক্ষক ক্যামেরা নিয়ে জঙ্গলে গেলেন। ছবি তুললেন, ভিডিও করলেন। দেখালেন, ওটা আসলে একটা সাধারণ কুকুর। কেউ দুষ্টুমি করে গায়ে লাল রঙ মেখে দিয়েছে। তিনি যুক্তি দিলেন, প্রমাণ দিলেন, বোঝালেন।


কিন্তু ততক্ষণে গ্রামের এক প্রভাবশালী লোক সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখে ফেলেছেন, ‘এই লাল বাঘ আমাদের গ্রামের জন্য সৌভাগ্যের প্রতীক। যারা এটা মানতে চায় না, তারা গ্রামের শত্রু।’


মুহূর্তের মধ্যে পোস্টে লাইক, শেয়ার, মন্তব্য। উত্তেজনা। গর্ব। ভয়।


এরপর যা হলো, সেটাই আসল গল্প। মানুষ আর শিক্ষকের কথা শুনতে চাইল না। কারণ লাল বাঘের গল্পটা তাদের মনে একটা রোমাঞ্চ তৈরি করেছে। যুক্তির চেয়ে সেই আবেগটা বেশি আরামদায়ক। এই যে সত্যের বদলে আবেগকে বেছে নেওয়াÑ এটাই পোস্ট-ট্রুথ।


আজকের দিনে এই প্রবণতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমাদের ফোনের পর্দায়। স্মার্টফোন আর সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের সামনে যে পৃথিবীটা তুলে ধরে, সেটা পুরো পৃথিবী নয়। সেটা আমাদের পছন্দের একটা সংস্করণ। আমরা যেসব পোস্টে থামি, যেগুলোতে লাইক দিই, যেগুলো শেয়ার করি, অ্যালগরিদম সেগুলো মনে রাখে। এরপর আমাদের সামনে ঠিক সেই ধরনের খবরই বারবার আসে। ধীরে ধীরে আমরা ঢুকে পড়ি একটা ইকো চেম্বারে। যেখানে নিজের বিশ্বাসটাই বারবার প্রতিধ্বনিত হয়।

এই ঘরের ভেতরে বসে মনে হয়, ‘সবাই তো এটাই বলছে।’


আসলে সবাই না। আমরা শুধু নিজেদের মতো কণ্ঠ শুনছি।


এখানে আরেকটা ছোট দৃশ্য ধরা যাক।


ছবি আপু রাতে ঘুমানোর আগে ফোন স্ক্রল করেন। হঠাৎ একটা পোস্ট দেখেনÑ ‘এই স্লিমিং টি সপ্তাহে ১০ কেজি ওজন কমাবে!’ পোস্টের নিচে শত শত মন্তব্য। কেউ লিখেছে, সে এটাতে ফল পেয়েছে, তার ওজন কমেছে। কেউ লিখেছে এই স্লিমিং টি সত্যি কাজের! ছবি আপু কিছুটা উৎসাহিত হন। আবার কিছুটা সন্দেহও করেন। তারপরও পরদিন অনলাইনে অর্ডার দিয়ে তিনি ওই স্লিমিং টি কিনে ফেলেন। কেউ হয়তো তাকে বলল, এসব স্লিমিং টি কফি জুস আসলে ভুয়া। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। কিন্তু ছবি আপুর ভাবনা হচ্ছে, ‘ভুল হলেও কী? চেষ্টা করে দেখি।’



এই ‘ভুল হলেও কী’ মানসিকতাই পোস্ট-ট্রুথের সবচেয়ে শক্ত ভিত।


অনেকেই মনে করেন, পোস্ট-ট্রুথ একেবারেই আধুনিক সমস্যা। সোশ্যাল মিডিয়া না থাকলে নাকি এটা থাকত না। ইতিহাস কিন্তু অন্য কথা বলে।


১৯৩০-এর দশকের জার্মানিতে প্রচারমন্ত্রী জোসেফ গোয়েবলস খুব ভালো করেই জানতেন, মানুষ যুক্তির চেয়ে আবেগে বেশি সাড়া দেয়। সেসময় ভয়, অপমান আর ক্ষোভ ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে জনমত তৈরি করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, দেশের সব সমস্যার জন্য দায়ী একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী। কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছাড়াই এই কথাটা বারবার বলা হয়েছিল। মানুষ সত্য যাচাইয়ের পথে হাঁটেনি। তারা তাদের কষ্টের জন্য একটা সহজ ব্যাখ্যা পেয়ে গিয়েছিল। এর পরিণতি ছিল ভয়াবহÑ যুদ্ধ, গণহত্যা, ধ্বংস। তখন পোস্ট-ট্রুথ শব্দটা চালু ছিল না, কিন্তু তার চরিত্র স্পষ্ট ছিল।


এই তালিকায় আরও একটি উদাহরণÑ ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ। যুদ্ধ শুরুর আগে বলা হয়েছিল, ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে, যা গোটা বিশ্বকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। পরবর্তীতে এই দাবির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু তত দিনে যুদ্ধ হয়ে গেছে। লাখো মানুষের জীবন বদলে গেছে। এখানে যুক্তির চেয়ে ভয় আর রাজনৈতিক গল্প বেশি কাজ করেছিল। সত্য যাচাইয়ের চেয়ে বিশ্বাস তৈরি করাটাই ছিল মুখ্য। এটা পোস্ট-ট্রুথের রাষ্ট্রীয় রূপ।


আজকের সময়ে পোস্ট-ট্রুথ আরও জটিল হয়েছে প্রযুক্তির কারণে। এখন শুধু কথার সত্যতা নয়, চোখে দেখা জিনিসের সত্যতাও প্রশ্নের মুখে। ডিপফেক ভিডিও দিয়ে এমন দৃশ্য বানানো যায়, যেখানে একজন পরিচিত মানুষ এমন কথা বলছেন বা করছেন, যা তিনি কোনোদিন করেননি। চোখ আর কান আর শেষ বিচারক নয়।


করোনাকালীন আমরা দেখেছি, কীভাবে ভ্যাকসিন নিয়ে অবৈজ্ঞানিক তথ্য ছড়িয়ে পড়েছিল। গবেষণা আর চিকিৎসকদের বক্তব্যের চেয়ে অনেকের কাছে বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছিল মেসেঞ্জার আর হোয়াটসঅ্যাপে আসা ভয়ংকর বার্তাগুলো। কারণ ভয় মানুষকে যুক্তিহীন করে তোলে। পোস্ট-ট্রুথ এখানেই সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ নেয়।


তাহলে প্রশ্ন আসে, সত্য কি হারিয়ে গেছে?


না। সত্য হারায়নি। কিন্তু সত্য এখন শান্ত। সে চিৎকার করে না, নাটক করে না। তাকে খুঁজে নিতে হয়। যাচাই করতে হয়। প্রশ্ন করতে হয়।


আর মিথ্যা? সে আবেগে হাত রাখে। ভয় দেখায়। উত্তেজনা তৈরি করে।


পোস্ট-ট্রুথের যুগে সবচেয়ে বড় বিপদ বানানো মিথ্যাটা নয়। বড় বিপদ হচ্ছে আমাদের মানসিকতা। যেটা বলে, ‘ভুল হলেও কী? আমার বিশ্বাসটাই যথেষ্ট।’


এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আমাদের সবারই একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আছে। আমরা কি শুধু আরামদায়ক বিশ্বাস চাই, নাকি অস্বস্তিকর হলেও সত্যের সঙ্গে থাকতে চাই?

পোস্ট-ট্রুথের আসল লড়াই এখানেই। পোস্ট-ট্রুথের সময়ে সত্য মরেনি, আমরা শুধু তার কাছে যাওয়ার ধৈর্য হারিয়ে ফেলছি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা