ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন
প্রকাশ : ০২ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:৩৫ পিএম
আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:০৫ পিএম
খালেদা জিয়া
১৯৯২ সালের ১৮ মার্চ। দেশনেত্রী, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার যুক্তরাষ্ট্র সফরকে ঘিরে আমরা তখন ভীষণ ব্যস্ত। তাঁর আগমনের বিষয়টি আগেই আমাদের জানিয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রদূত আবুল আহসান সাহেব। তিনি ওয়াশিংটন থেকে নিউইয়র্কে এসেছিলেন। সেই সময় আমি যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কনভেনার। আমাকে জানানো হলো, ম্যাডাম নিউইয়র্কে আসবেন এবং তাঁকে সংবর্ধনা দিতে হবে, জনগণের পক্ষ থেকেই সেই আয়োজন করতে হবে। এরপর তিনি আমাকে নিয়ে প্রায় চার ঘণ্টার একটি দীর্ঘ মিটিং করেন। স্থান ছিল ডাউনটাউন ম্যানহাটনের সিক্স স্ট্রিটে অবস্থিত ‘প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া’ রেস্টুরেন্ট। আলোচনা চলল, ডিনারও হলো। কিন্তু মিটিং শেষে আমি ডিপ্লোম্যাট আবুল হাসনাত সাহেবকে বললাম- চার ঘণ্টা ধরে আমরা বৈঠক করলাম, একসঙ্গে ডিনার করলাম, কিন্তু আপনি আসলে ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন, আমি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারিনি। কারণ তিনি কোনো বিষয়েই সরাসরি কথা বলছিলেন না, সবই বলছিলেন কূটনৈতিক ভাষায়, ইঙ্গিতে।
রাষ্ট্রদূত
সাহেবকে আমি বললাম, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে আমরা গণসংবর্ধনা দেব। কারণ তিনি
শুধু কোনো দলের প্রধান নন; তিনি বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। দলীয় ব্যানারে
সংবর্ধনা দিলে সেটি দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ
সরকারের প্রধানমন্ত্রী, তাই এই আয়োজনটি হতে হবে জনগণের পক্ষ থেকে। এ দায়িত্ব আমাদের
নিতেই হবে। তিনি কথা শুনে বললেন, “ভালো কথা।”
সেই
সময় বাংলাদেশ সোসাইটির নেতৃত্বে ছিলেন ডা. ওয়াদুদ ভুইয়া ও সৈয়দ টিপু সুলতান। তাঁদের
সঙ্গে আলোচনা করে আমরা একটি মিটিংয়ে বসলাম। তাঁরা বললেন, ‘বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন’ একটি নন-প্রফিট ও নন-পলিটিক্যাল
সংগঠন, তারা এককভাবেই সংবর্ধনার আয়োজন করতে চান। আমি ভেবে দেখলাম, যদি তারা একাই আয়োজন
করে, তাহলে সেটি তো শেষ পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট অ্যাসোসিয়েশনের সংবর্ধনাই হয়ে যাবে।
তখনই রাতারাতি আরেকটি বৈঠকের আয়োজন করলাম। দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক
সংগঠন গড়ে তোলা হলো। যার বাড়ি ফরিদপুর, তাকে ফরিদপুর অ্যাসোসিয়েশনের দায়িত্ব দেওয়া
হলো, যার বাড়ি বরিশাল, তাকে বরিশাল অ্যাসোসিয়েশনের, আর যার বাড়ি কুমিল্লা, তাকে
কুমিল্লা অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান করা হলো। এভাবেই একের পর এক বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশন
গঠন করে সবার সমন্বয়ে একটি বৃহৎ সভা ডাকা হলো এবং বিশাল গণসংবর্ধনার আয়োজন করা হলো।
এই
পুরো আয়োজনের মূল দায়িত্ব এসে পড়ে আমার ওপরই। আমাদের প্রস্তুতি অবশ্য নতুন করে শুরু
করতে হয়নি। আমরা আগেই জানতাম, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফরে আসবেন।
তাই অনেক আগে থেকেই সংগঠনকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি, যেন দেশনেত্রীকে সংবর্ধনা
দেওয়ার বিষয়টি যতটা সম্ভব সুন্দর, মর্যাদাপূর্ণ ও নান্দনিকভাবে সম্পন্ন করা যায়।
নব্বইয়ের
গণঅভ্যুত্থানের পর বেগম খালেদা জিয়া যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ
করেন, তখনই আমার মনে একটি ভাবনা আসে। বিশ্বে বহু সংগ্রামী নেতা, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারকারী ব্যক্তিত্বদের যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটি অনারেবল
পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করেছে, এই ইতিহাস আমার জানা ছিল। সেই স্মরণ থেকেই আমার মনে হলো,
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে রাজপথের সংগ্রামী নেত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়াও সেই সম্মানের
যোগ্য। এই ভাবনা থেকে আমি তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী লে. কর্নেল (অব.) মোস্তাফিজুর রহমানের
মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বেগম খালেদা জিয়ার সংগ্রামী জীবন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে
তাঁর ভূমিকা তুলে ধরে একটি জীবনবৃত্তান্তমূলক প্রতিবেদন সংগ্রহ করি এবং তা বোস্টন ইউনিভার্সিটির
অনারারি পিএইচডি অ্যালোকেশন বোর্ডে জমা দিই। কিছুদিনের মধ্যেই তারা তাদের অপারগতার
কথা আমাকে জানিয়ে দেয়। বিষয়টি বুঝতে আমার দেরি হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া
সেই প্রতিবেদনটি তখন আমার কাছে অসম্পূর্ণ ও যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয়নি বলেই মনে হয়েছিল।
কিন্তু যেহেতু এটি রাষ্ট্রীয় নথি ছিল, তাই আমি নিজ উদ্যোগে কোনো সংশোধন বা মতামত যোগ
করিনি।
এরপর
হঠাৎ করেই আমার মনে আসে ইতিহাসের সেই কঠিন সময়গুলোর কথা। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান
শাহাদত বরণ করার পর ভাইস প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত
হন। এরপর ১৯৮২ সালের ২৫ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন।
সেই সময় থেকে বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির দায়িত্ব গ্রহণ করে দীর্ঘ নয় বছর রাজপথে সংগ্রাম
চালান। অবশেষে ১৯৯০ সালের নভেম্বরের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসক এরশাদের পতন
ঘটে এবং ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন।
এই
দীর্ঘ সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরে প্রয়াত আলোকচিত্রী লুৎফর রহমান বীনু ক্যাপশনসহ একটি
অ্যালবামধর্মী বই প্রকাশ করেছিলেন। বইটি আমার ভীষণ ভালো লেগেছিল। ছবিগুলো যেন নিজেই
কথা বলে, নয়টি বছরের আন্দোলন, রাজপথে নেতৃত্ব, ত্যাগ ও সাহসিকতার বীরত্বগাথা চোখের
সামনে ভেসে ওঠে। বইটি দেখলেই বিশ্বাস করতে হয়, স্বৈরাচার উৎখাতে রাজপথের নেত্রী হিসেবে
বেগম খালেদা জিয়া কতটা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। ঢাকায় যাতায়াতের সময় বীনু ভাই আমাকে
ছাপাখানার খরচ তোলার জন্য সেই বইয়ের ১০০ কপি দিয়েছিলেন। আমি প্রতিটি বই ১০০ ডলার করে
মোট দশ হাজার ডলার তাকে দিয়েছিলাম, যেন প্রকাশনার ব্যয় কিছুটা হলেও উঠে আসে। পররাষ্ট্র
মন্ত্রণালয়ের চিঠির প্রেক্ষিতে প্রথমবার নেতিবাচক উত্তর আসার পর আমি অনারারি পিএইচডি
অনুমোদন কমিটির কাছে পুনরায় দরখাস্ত করি। এবার আমি আগের চেয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত,
দালিলিক প্রমাণ এবং সেই সংগ্রামের আলোকচিত্রসমৃদ্ধ বই সংযুক্ত করি। সেই প্রেক্ষিতেই
একদিন বিকেলে জেএফকে বিমানবন্দর থেকে একটি বড় ফ্লাইটে বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে যাই। সেখানে
আমি আমার পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করি এবং বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজপথের
সংগ্রামের দালিলিক বইটি তাদের সামনে তুলে ধরি।
আমার
এখনও স্পষ্ট মনে আছে, সেদিন রাত ১১টার শেষ ফ্লাইটে বোস্টন থেকে নিউইয়র্কে ফেরার কথা
ছিল। বিমানবন্দরে পৌঁছে দেখি চারপাশ প্রায় জনশূন্য। মনে হলো, বুঝি ফ্লাইট বাতিল হয়ে
গেছে। তাছাড়া সেদিন আবহাওয়াও ভালো ছিল না। এমন সময় জানতে পারলাম, ফ্লাইট রেডি। বিমানে
ওঠার সময় চোখ কপালে উঠে গেল। মাত্র সাতজন যাত্রী, আর এগারো সিটের একটি ছোট্ট বিমান।
বিমানটি উড্ডয়ন করতেই বুঝলাম আমার আশঙ্কা অমূলক ছিল না। আকাশের অবস্থা সত্যিই ভয়াবহ।
ছোট্ট বিমানটি যেন গাঙচিলের মতো, ঝড়ো হাওয়ায় কখনো হঠাৎ নিচে নেমে যাচ্ছে, আবার দুলতে
দুলতে ওপরে উঠছে। মনে হচ্ছিল, আজই বুঝি আমার শেষ দিন। কিন্তু বিমানচালক ছিলেন অসম্ভব
আত্মবিশ্বাসী। তাঁর দক্ষতায় আমরা নিরাপদেই জেএফকে বিমানবন্দরে পৌঁছে যাই। জীবনে বহুবার
আকাশপথে ভ্রমণ করেছি, কিন্তু এমন অভিজ্ঞতা আগে কখনো হয়নি। আশ্চর্যের বিষয়, ম্যাডামের
সম্মানসূচক পিএইচডির সুখবর নিয়ে ফেরার পথে যতটা আতঙ্কিত হওয়ার কথা ছিল, তার চেয়ে
অনেক বেশি যে অনুভূতিটা আজও মনে গেঁথে আছে, তা হলো গভীর উৎফুল্লতা।
এরপর
আমি যোগাযোগ করি প্রয়াত সাবিহ উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে, যিনি ছিলেন ম্যাডামের পিএস। কথা
হয় প্রেস মিনিস্টার তাজুল ইসলাম এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও। পাশাপাশি আলোচনা
করি আমাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় মানুষ, ছাত্রজীবন থেকেই যাঁকে শহীদ জিয়ার ঘনিষ্ঠ সহযোগী
হিসেবে দেখেছি, বাংলাদেশের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী লে. কর্নেল
(অব.) মোস্তাফিজুর রহমান সাহেবের সঙ্গে। ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠালগ্নে যিনি আমাদের পুত্রতুল্য
স্নেহ করতেন এবং সারা দেশের ছাত্রদলের কাছে যিনি “বড় ভাই” হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।
সবার
সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে বোস্টন ইউনিভার্সিটির সম্মানসূচক পিএইচডি গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগদানের
জন্য ২১ মার্চ তারিখটি নির্ধারণ করা হয়। আমি তখন ডাউনটাউন ম্যানহাটনের চেম্বার স্ট্রিটে
অবস্থিত বোরো অব ম্যানহাটন কমিউনিটি কলেজে শিক্ষকতা করতাম। কলেজটি ওয়েস্ট রিভারের
একেবারে শেষ প্রান্তে অবস্থিত। ১৯ মার্চ, কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে সেই কলেজের
অডিটোরিয়ামেই বেগম খালেদা জিয়ার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করি। সেই অনুষ্ঠান আয়োজন
করতে গিয়ে কঠোর নিয়মকানুনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছিল। প্রতিটি ধাপে আমেরিকার আইন,
বিধি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার বাস্তব প্রয়োগ আমাকে নতুন করে শিখিয়েছিল। আজও সেই অভিজ্ঞতা
আমাকে মনে করিয়ে দেয়; নিয়ম মেনে চললে, আইন মেনে চললে, সবকিছুই সুন্দর, সুশৃঙ্খল
ও মর্যাদাপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা যায়।
এরপর
ঘটল আরেকটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা। অনুষ্ঠানের আগের দিন রাতে জানানো হলো, ব্যানার টানানো
যাবে না, কারণ ফায়ার প্রুফ ব্যানার লাগবে। ফায়ার প্রুফ ব্যানার কোথায় পাওয়া যায়, সে
ধারণা তখন আমার একেবারেই ছিল না। তখনো নিউইয়র্ক বাংলাদেশিদের জন্য আজকের মতো এত বিস্তৃত
বা সহজলভ্য ছিল না। শেষমেশ বাধ্য হয়ে ডিপার্টমেন্ট অব ফায়ারে গেলাম। তারা যে ব্যানারটি
দিল, সেটি ছিল ক্যানভাসের মতো মোটা। প্রিন্ট করার কোনো সুযোগও তখন ছিল না। মনে আছে,
সেই ব্যানারটি বহুদিন আমার নিউইয়র্কের পুরোনো বাসায় রাখা ছিল। সারা রাত জেগে পেন দিয়ে
হাতে হাতে ব্যানারটি লিখেছিলাম।
পরদিন
যথারীতি অনুষ্ঠান শুরু হলো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আগমনের আগে আমি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে
জানালাম, বোস্টনে ম্যাডাম সম্মানসূচক পিএইচডি অ্যাওয়ার্ডেড হবেন, সেখানে তাঁকে যেতে
হবে। মোস্তাফিজুর রহমান সাহেব আমাকে জানালেন, হ্যাঁ, ম্যাডামের প্রোগ্রাম রাখা আছে।
সাবিহ উদ্দিন আহমেদ সাহেবও সেখানে ছিলেন, যিনি এখন প্রয়াত। দুজনই আজ আমাদের মাঝে নেই।
সাবিহ উদ্দিন সাহেব আমাকে বললেন, প্রোগ্রাম ঠিক আছে, তবে বিষয়টি ম্যাডামের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে
আবার রি-কনফার্ম করতে হবে। এই কথাটা শুনে আমি কিছুটা বিভ্রান্ত হলাম। প্রোগ্রাম যখন
রাখা আছে, তখন আবার রি-কনফার্ম কেন? কৌতূহলটা ভেতরে ভেতরে কাজ করতে লাগল। আমি বললাম,
তাহলে আগে বোস্টন ইউনিভার্সিটিকে জানিয়ে দিই। সেই সময় আমি অনুষ্ঠানটির উপস্থাপনা করছিলাম।
ম্যাডামের প্রধান অতিথির আসনের পেছনে একটু কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে, ২০ তারিখের অনুষ্ঠানে
তাঁর উপস্থিতি ঘোষণার জন্য আগাম অনুমতি চাইলাম।
ম্যাডাম
বক্তৃতা দেবেন, তার আগে আমি তাঁকে বললাম,
“ম্যাডাম, কাল আপনার দুটি প্রোগ্রাম আছে।
একটি হলো আপনাকে ইস্টরিভার ক্রুজ ঘুরে দেখানো হবে। আর দ্বিতীয়টি হলো, বোস্টন ইউনিভার্সিটি
আপনাকে সম্মানসূচক পিএইচডি অ্যাওয়ার্ড দিয়েছে, সেটি গ্রহণের অনুষ্ঠান।”
কথা
শুনেই ম্যাডাম আমাকে বললেন, “রিসিভ না করলে হয় না?”
আমি
বুঝেছিলাম, এই ইউনিভার্সিটি আসলে কতটা মানসম্পন্ন। আমি বললাম, “ম্যাডাম, তারা ভারতের
ইন্দিরা গান্ধীকেও এই অ্যাওয়ার্ড দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দিয়েছে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট
ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁকে। এরা সাধারণত খুব উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিত্ব ছাড়া কাউকে অনার করে
না। আপনাকে তারা সম্মান করেছে ‘স্ট্রাগল ফর ডেমোক্রেসি’র জন্য, রাজপথে আপনি যে লড়াই করে গণতন্ত্র
ফিরিয়ে এনেছেন, সেটার জন্য। তারা আপনাকে অ্যাডমায়ার করেছে। আমি এটা আনুষ্ঠানিকভাবে
ঘোষণা দিতে চাই।”
ম্যাডাম
মৃদু হেসে বললেন, “এভাবে পিএইচডি নিতে হলে ভবিষ্যতে আরও পিএইচডি পাওয়া যাবে। এত পিএইচডি
নেওয়াটা কি ঠিক হবে?”
আমি
বললাম, “ম্যাডাম, ভবিষ্যতে কয়টা নেবেন সেটা আমি জানি না। কিন্তু এটা আমরা প্রস্তুত
করেছি। আপনি এটা গ্রহণ করুন।”
তিনি
বললেন, “তুমি অ্যানাউন্স করে দাও। আমি ওখানে যেতে চাচ্ছি না।”
আমি
বললাম, “ঠিক আছে ম্যাডাম। পরে আপনি সিদ্ধান্ত নেবেন। আমি ঘোষণা দিচ্ছি।”
এরপর
মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে আমি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করলাম, বোস্টন ইউনিভার্সিটি দেশনেত্রী
বেগম খালেদা জিয়াকে সম্মানসূচক পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করেছে। সেই সঙ্গে অফার লেটারটি
তাঁর হাতে তুলে দিলাম।
আজ
দেশমাতা বেগম খালেদা জিয়া আমাদের মাঝে নেই। বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ জানাজা নামাজ
আদায় করে বাসায় ফিরতে ফিরতে বারবার মনে হচ্ছিল এই মহীয়সী নারীর সুদূরপ্রসারী চিন্তা,
দূরদর্শিতা ও রাষ্ট্রনায়কসুলভ বিবেচনার কোনো সীমা ছিল না। সময়ের বহু আগেই তিনি যা বুঝেছিলেন,
তা ইতিহাস আজ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। তিনি তখনই বলেছিলেন, আজ যদি একটি পিএইচডি
গ্রহণ করি, কাল আরও অনেকে অফার করবে, তখন কি সবগুলোই নিতে হবে? এই কথার ভেতরেই লুকিয়ে
ছিল তাঁর অসাধারণ দূরদর্শিতা। তিনি জানতেন, একজন সত্যিকারের নেতার মূল্য ডিগ্রিতে নয়,
বরং সততা, নৈতিকতায় ও আদর্শে। নিজের মাথা উঁচু রেখে সত্য, ন্যায় ও দেশপ্রেমিক জীবন
যাপন করাই ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। তিনি এমন কোনো কিছু করতে চাননি, যাতে ভবিষ্যতে
মানুষ তাঁকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে বা তাঁর সংগ্রামী জীবনের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। পরবর্তীকালে
ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে শেখ হাসিনা একের পর এক করে ১৯টি পিএইচডি ডিগ্রি গ্রহণ করেছিলেন।
এসব বিষয় নিয়েই মানুষ তাঁকে নিয়ে তামাশা করেছে। হয়তো এই বাস্তবতাও দেশমাতা খালেদা জিয়ার
দূরদর্শী চিন্তায় ছিল, যেন তাঁর নাম, তাঁর সংগ্রাম ও তাঁর নেতৃত্ব কখনো প্রশ্নবিদ্ধ
না হয়। এই সংযম, এই আত্মমর্যাদা, কেবল একজন প্রকৃত রাষ্ট্রনায়কের পক্ষেই সম্ভব।
আজ
জানাজাস্থলে দাঁড়িয়ে যখন জায়ান্ট স্ক্রিনে বেগম জিয়ার পুরোনো বক্তৃতাগুলো ভেসে উঠছিল,
আমি স্থির হয়ে শুনছিলাম। এক জায়গায় তিনি বলছিলেন- “লেন্দুপ দর্জি হবেন না। বাংলাদেশকে
সিকিম বানাতে পারবেন না।”
ইতিহাসের কী নির্মম সত্য, আজ যিনি লেন্দুপ দর্জি হওয়ার পথ বেছে নিতে
চেয়েছিলেন, তিনি পালিয়ে গেছেন লেন্দুপ দর্জির দেশেই। আর বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করছে,
যাকে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করে নিঃসঙ্গ মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, তাঁর শেষ বিদায়ে
আজ কোটি মানুষের অশ্রুসজল উপস্থিতি। এই জনস্রোতই প্রমাণ করে দেয়, নেতৃত্ব মানে ক্ষমতা
নয়; নেতৃত্ব মানে ত্যাগ, সততা, সাহস ও মানুষের ভালোবাসা অর্জন। আমাদের প্রিয় নেত্রী,
গণতন্ত্রের মা, তাঁর এই গুণাবলির কারণেই চিরকাল মানুষের হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকবেন এবং
চিরনিদ্রায়ও তিনি শায়িত আছেন নিজের মাতৃভূমির বুকে।
হে
আল্লাহ, আমাদের দেশমাতা বেগম খালেদা জিয়াকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।
আমিন।