পলিয়ার ওয়াহিদ
প্রকাশ : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৮:০০ পিএম
শহীদ ওসমান হাদি। প্রতিকৃতি : জয়ন্ত সরকার
শহীদ ওসমান হাদির ৩২ বছরের ছোট্ট জীবন। কিন্তু তার কাজের ব্যাপ্তি ছিল বৃহৎ। চিন্তার জগৎ ছিল ত্রিভুবনময়। ফলে সারা জীবনের কাজ তিনি মাত্র এক বছরে শেষ করেছেন। সাধারণ জ্ঞানে অসাধারণ হাদিকে নিয়ে কোথা থেকে লেখা শুরু করব? যেখানে তার বিপ্লবী কথামালাও হীরের মতো অমূল্য হয়ে উঠেছে। আমি শুধু কবি থেকে বিপ্লবী হাদি হওয়ার পরিবর্তন নিয়ে লিখি।
ফ্যাসিস্ট হাসিনার ১৫ বছর শাসন ছিল কবি হাদি থেকে বিপ্লবী হাদি হওয়ার মূল মঞ্চ। কারণ আমাদের জীবনের স্বপ্ন ও যৌবনের সবচেয়ে সোনালি সময় কেড়ে নিয়েছে খুনি সরকার। তার শাসনামল চিন্তাশীল যুবকদের জাহান্নামের উপলব্ধি দিয়েছে। এই সময়ে যেসব তরুণ সময় ও ইতিহাস সচেতন ছিল তাদের কোনোভাবেই দমানো যায়নি। সেইসব প্রতিবাদী নেতৃত্বেই জুলাই সংগঠিত হয়েছে। আর সেই জুলাই স্পিরিটধারী প্রথম আইকন শহীদ ওসমান বিন হাদি।
কবি হাদি বুঝতে পেরেছিলেন শুধু কবিতা দিয়ে জালেমের মূর্তি ভাঙা যাবে না। তখন তিনি রাজনৈতিক ও কালচারাল মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নেন। তার কথা ও কাজ থেকে বোঝা যায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাকে শানিত করেছে এবং আমরা যখন জুলাই স্পিরিট বলে গলা ফাটাচ্ছি তখন হাদি একাই জুলাইয়ের স্পিরিট কাকে বলে তা জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেলেন। আর এ কারণেই জুলাই জজবার যে আগ্রাসনবিরোধী শহীদি মিছিল শুরু হলোÑ তার ফলাফল হাদির কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব না আসা পর্যন্ত চলতে থাকবে।
শরিফ ওসমান হাদি অনেক কিছুর উদাহরণ দাঁড় করিয়ে গেলেন। তার মধ্যে একটি কবিরাই প্রকৃত বিপ্লবী। আরেকটা কবি হয়েও রাজনীতি জয় করা সম্ভব। আমাদের কবিরা বলেন, আমাদের দিয়ে রাজনীতি হবে না। আমরা ইন্টেলেকচুয়াল উইং হিসেবে রাজনীতিবিদদের পরামর্শ দেব। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কবিরাও যে রাজনীতির মাঠে যোগ্য হয়ে উঠতে পারেন তার প্রমাণও হাদি। একই সঙ্গে কালচারাল লড়াই দিয়ে যে রাজনীতির খেলনলচে পরিবর্তন সম্ভব, সেটার জ্বলন্ত উদাহরণ। তাই বলতে হবে, এখন সময় রাজনীতি করার। এখন সময় আগ্রাসন রুখে দেওয়ার।
এখন খুঁজতে হবে হাদির শক্তি কোথায়? কোথায় তার শহীদ হওয়ার সাহস? তার মূল শক্তি তার স্পষ্ট সত্যবাদিতা ও সততা। সত্য এমন এক অস্ত্র, যার সঙ্গে অন্য সব তরবারি পরাজিত হয়। আমরা এখনও অনেকে বুঝতে পারছি না। তাই প্রশ্ন করছি হাদির রাজনৈতিক ঈমান কেন এত মজবুত? কারণ তার দৃঢ়চেতা বিশ্বাস ও স্বপ্ন। তিনি কবিতা লিখে বুঝতে পেরেছেন সমাজ তথা রাষ্ট্র পরিবর্তনের যে সিলসিলা সেটা কাব্য দিয়ে হবে না। ফলে হাদি রাজনীতির মাঠে নেমেছেন কালচার নিয়ে। কারণ আমাদের কালচার ও রাজনীতি সেই দিল্লিবাদী আধিপাত্যবাদে ডুবে আছে। তাকে উদ্ধার করতে হলে আগে কালচারাল রেভল্যুশন প্রয়োজন। সেই দূরদর্শিতা থেকে প্রতিষ্ঠা করেন কালচারাল সেন্টার। বলা যেতে পারে, এটা তথাকথিত আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগরদের মুখে চপেটাঘাত। কারণ সেই কারিগররা জুলাই হত্যার বিরুদ্ধে টুঁশব্দটিও করেনি। ফলে এই আলোর নিচে কলোনিয়াল দাসত্বের অন্ধকারকে হাদি চ্যালেজ্ঞ করেছেন। অথচ কালচার সর্বদা মানবিকার পক্ষে কথা বলে। কিন্তু সেই মানব দরদ আমরা কলকাতাবাদীদের থেকে পায়নি। হাদির প্রতিবাদী মন এটা মেনে নিতে পারেননি। সে কারণে দেশি ও বিদেশি কালচারাল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে হাদি হয়ে ওঠেন ধনিক-বণিক ও সুশীল শ্রেণির থ্রেট।
দ্বিতীয়ত, তার আড়ম্বরহীন নতুন রাজনৈতিক ধারা। তিনি পরিষ্কার বলেছেন, আমি আপনাদের জন্য কাজ করব। ফলে আপনারাই আমার পাশে দাঁড়ান। আমাকে সাহায্য করেন। মানুষও তার কথা ও কাজের মিল পেয়ে সাহায্য করা শুরু করেছিল। এটা দেশের পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূলে কুঠারাঘাত। এই পরিবর্তনই করতে চেয়েছিলেন হাদি। তিনি গণচাঁদা দিয়ে রাজনীতির খরচ মেটানোর উদাহরণ তৈরি করেছিলেন। মানুষ তাকে লাখ লাখ টাকা দিয়েছে। সেসবের হিসাব ও খতিয়ানও জনতার সমানে হাজির করেছেন। এটা ছিল স্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে এক দাঁতভাঙা জবাব। পেশিশক্তির বিরুদ্ধে গণশক্তির উত্থান। একই সঙ্গে কুক্ষিগত ক্ষমতা থেকে ক্ষমতার মালিকানা গণমানুষকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা। কিন্তু এটা মুখে যত সহজ কাজে তত কঠিন। কিন্তু সেই কঠিন কাজও হাদি পানির মতো বাস্তবে তুলে ধরেছিলেন। আর সেটাই হয়েছে বাংলাদেশপন্থীর হাদির কাল। মুহূর্তে তিনি হয়ে উঠেছেন দেশি-বিদেশি কালচক্রের বিরুদ্ধে এক সুউচ্চ প্রাচীর। আর শত্রুরা তার জনপ্রিয়তার অস্ত্র সহজ জীবনকে দুর্বলতা হিসেবে বেছে নিয়েছে এবং নতুন রাজনৈতিক আয়নাকে ভেঙে করেছে টুকরো টুকরো।
শেষের যে কথাটি সবচেয়ে জরুরি। হাদির শহীদি ফানা। দৃশ্যমান হাদির চেয়ে অদৃশ্য হাদি এখন বেশি শক্তিশালী। কারণ হাদি সেই অদৃশ্যকেই দৃশ্যে পরিণত করার যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। কিন্তু একজন হাদিকে মেরে আপনারা হাজারো হাদির জন্ম দিয়ে ফেলেছেন। জুলাইয়ের সেই কালচারাল ও পলিটিক্যাল স্পিরিট যুগে যুগে জ্বলবে। যতদিন না হাদির স্বপ্নের সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ নির্মাণ করতে না পারছি। ইনকিলাব জিন্দাবাদ। শহীদ হাদি অমর হবে।
শরিফ ওসমান হাদির কবিতা
কালো পাথরে কাবার মিস্ত্রি
বিষাক্ত হয়ে উঠি যখন নিজের কাছে নিজেই
সবচেয়ে ভারী লাগে যখন এই নিজেরই ওজন,
তখন দোহাই মদিনার মাটির,
দোহাই সেই জীর্ণ শীতল পাটির,
চুম্বন বুনেছিল যারা নবীজির গায়ে,
লুটাতে সাধ জাগে বড় সেই প্রিয় পায়ে।
যখন আমার সব দুয়ারেই খিল,
দোহাই তখন মক্কার কপাটের,
দোহাই ছোট্ট আবাবিল ব্রিগেডের,
চৌচির এ বক্ষে বয়ে যাক জমজম ঝিল।
যখন নিঃশ্বাসে শুধু আন্ধার নামে,
তখন দোহাই সেই কালো পাথরের,
পরশে যার পুড়ে যায় শতবর্ষী পাপ
হতাম যদি সে প্রসন্ন পাথর, কী যে অনুতাপ!
খোদা, আমার অন্তর আজ মুমূর্ষু মরু,
প্রকম্পিত সাক্ষ্য লাব্বাইকের দোহাই,
দোহাই শিশু ইসমাইলের তীব্র তিয়াসার,
মা হাজেরার দিগ্বিদিক দৌড়ের দোহাই,
চেয়ে দেখো, কতটা ছাল ওঠা আমি!
তবুও তোমারে ছাড়া কাউকে রব ডাকিনি কভু,
আমার হৃদয়ে দাও উড়িয়ে আরাফার ধুলি,
ওগো কাবার মিস্ত্রি ইবরাহিমের প্রভু!
আমায় ছিঁড়ে খাও হে শকুন
হে সীমান্তের শকুন
এক্ষুনি ছিঁড়ে খাও আমাকে
হে আটলান্টিকের ঈগল
শিগগির খুবলে খাও আমাকে
হে বৈকাল হ্রদের বাজ
আঁচড়ে কামড়ে ছিন্নভিন্ন করো আমাকে।
আমার রক্তরসে শুধু অসহায়ত্ব আর অভাব;
কাগজের কামলারা তারে আদর করে মুদ্রাস্ফীতি ডাকে।
ঋণের চাপে নীল হয়ে যাচ্ছে আমার অণুচক্রিকা
সংসার চালাতে অন্তরে হয় ইন্টারনাল ব্লিডিং
কী আশ্চর্য, তবুও আমি মরছি না!
ওদিকে দোজখের ভয়ে
আত্মহত্যা করবারও সাহস পাই না আমি!
খোদাকে বললাম, আমি মরতে চাই
তিনি বললেন, বেঁচে আছ কে বলল?
সহস্রাব্দ উন্নয়নের সাক্ষী হিসেবে
রাজা তোমাকে মমি করে রেখেছেন!
বাজারে দীর্ঘশ্বাস ফেললে নাকি
রাজ্যের ভীষণ বদনাম হয়
রাজারও মন খারাপ হয় খুব।
কোতোয়ালরা ফরমান জারি করেছে
আমাকে সারাক্ষণই হাসতে হবে!
নইলে দেশি কুকুর ও বিদেশি মাগুরকে
একবেলা ভালোমন্দ খাওয়ানো হবে আমার মাংস দিয়ে
নিত্যদিন ব্রয়লারের ভুঁড়ি নাকি ওদের ভাল্লাগে না!
অথবা আমাকে ভাগ দিয়ে বেচা হবে
মানুষেরও তো মানুষ খাওয়ার সাধ হতে পারে, তাই না?
ভাগ্যিস তা বিদেশি সুপারশপে বিকি হবে না
দেশি মানুষেরই তো হক বেশি আমাকে খাওয়ার!
এ দোজখই যখন নিয়তি
তখন আমি উদাম হয়ে ডাকছি
দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মাংসাশী বিহগদের
হে ঈগল, চিল ও ভয়ংকর বাজেরা
হে সাম্রাজ্যবাদী সাহসী শকুনিরা
তোমরা এফ-থার্টি ফাইভের মতো
মিগ টোয়েন্টি নাইনের মতো—
দলবেঁধে হামলে পড়ো আমার বুকে
আমার রান, থান, চক্ষু, কলিজা
আজ সব তোমাদের গনিমতের মাল
দেশি শুয়োর খুবলে খাওয়ার আগেই
আমায় ইচ্ছেমতো ছিঁড়ে খাও তোমরা!
দোহাই, শুধু মস্তিষ্কটা খেয়ো না আমার
তা হলে শিগগিরই দাস হয়ে যাবে তোমরাও।