মাসুক হেলাল
প্রকাশ : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৪:১৪ পিএম
আন্ওয়ার আহমদ। কবি ও প্রকাশক। আশি সালে চারুকলায় পড়ি। রাতে ৮২ নয়াপল্টনে খেলাঘর অফিসে বারান্দায় ঘুমাই। দৈনিক সংবাদে খেলাঘরের পাতায় ইলাস্ট্রেশন করি। সেখান থেকে কোনো টাকা-পয়সা পাই না।
সোমবার সংবাদে
চারুকলা বিকালে থেকে হেঁটে ৬৩, বংশালে দৈনিক সংবাদ অফিসে যাই। ছড়া কবিতার জন্য
ছবি আঁকি। সেখানে লেখকরাও নিয়মিত আসতেন। তখন খেলাঘরের পাতা দেখতেন দুজন। ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র ভীস্ম দেব চৌধুরী এবং নবেন্দু চৌধুরী। পেস্টিং
চলত। সঙ্গে চা ও পুরি। গভীর রাতে হেঁটে পল্টনে খেলাঘর অফিসে আসি। অথবা অনেক রাত
পর্যন্ত সদরঘাটে ঘুমন্ত মানুষের ছবি আঁকি।
সংবাদে খেলাঘরের
পাতায় ছড়া দিতে আসতেন আন্ওয়ার ভাই। বংশালে রাস্তায় ডেকে এক দিন বললেন, ‘তুমি
তো মাসুক, কিছুধ্বনির একটা কভার করে দাও না।’ সাদা শার্ট, সাদা প্যান্ট পরা আন্ওয়ার
আহমদ। হাঁটুর ওপর ব্রিফকেস রেখে লিখে দিলেন বইয়ের নাম, সঙ্গে তিনশ টাকা।
তখন পল্টনে খেলাঘর
অফিসের সামনে নোয়াখালী হোটেল। সে হোটেলে তিন টাকায় ইলিশ মাছ দিয়ে পেট পুরে
ভাত খাওয়া যেত। আমার দুর্দিনে সেই টাকা দিয়ে আমি এক মাস চলেছি।
আন্ওয়ার ভাইয়ের
সঙ্গে এভাবেই পরিচয়। তারপর টুকটাক স্কেচ, ড্রয়িং করে দিয়েছি, টাকাও পেয়েছি
নগদ। থাকতেন রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালের পূর্বপাশে মতিঝিল কলোনিতে। বিমানবন্দরে
কাস্টমসে কাজ করতেন আন্ওয়ার ভাই।
আমি তখন একটি
মাসিক পত্রিকায় কাজ পাই। নাম ‘দীপক’। পল্টন জোনাকি সিনেমা হলের নিচতলায় অফিস।
তখন পুলিশের দুটো পত্রিকা ছিল। একটি দীপক বাংলা মাসিক পত্রিকা আর অন্যটি সাপ্তাহিক
ডিটেকটিভ ইংরেজিতে। দীপকের প্রচ্ছদ ও ইলাস্ট্রেশন করি আমি। ওখানেই ছিল পুলিশ
সোসাইটির পলওয়েল প্রিন্টিং প্রেস। আমি মাঝে মাঝে বিকালে যাই ‘দীপকে’। উল্টো দিকে
১০ হাত দূরে সাপ্তাহিক সচিত্র সন্ধানীর অফিস। সম্পাদক গাজী শাহাবুদ্দিন আহমেদ।
বেলাল চৌধুরী ছিলেন নির্বাহী সম্পাদক। সন্ধানীতে আন্ওয়ার ভাই আসতেন আড্ডা দিতে।
শিল্পী সাহিত্যিকদের ভিড় লেগেই থাকত। যাওয়ার সময় দীপকে আসতেন আমার সঙ্গে দেখা
হতো। লেখা দিতেন।
আবার পলওয়েল প্রেসেই
আন্ওয়ার ভাই তার পত্রিকার কাজ করতেন। সাইদুর রহমান ছিলেন প্রেস ম্যানেজার। তার
সামনে বড় টেবিল। তার টেবিলে বসে আলমগীর কবীর তার সিনেমা বিষয়ক পত্রিকা সিকোয়েন্সের
কাজ করতেন। মাঝে মাঝে দেখেছি আবু জাফর আর তরুণী ফরিদা পারভীন বসে আছেন। আবু
জাফর আসতেন কুষ্টিয়া থেকে। তার একটি গান বিষয় পত্রিকা ছিল। অন্যান্য কাজের সঙ্গে
পত্রিকার কাজটুকু ঢাকা থেকে করে যেতেন। আন্ওয়ার ভাইকে সেখানেও কখনও কখনও দেখেছি
তার প্রকাশনার কাজ করতে। কখনও আড্ডা দিচ্ছেন আলমগীর কবির, আবু জাফরের সঙ্গে।
বিকালে আলমগীর
কবীর একটি বড় টিফিন ক্যারিয়ার থেকে আস্ত মুরগির রোস্ট বের করে খেতেন, একা একা
রুটি দিয়ে। উল্টো পাশে বসে আন্ওয়ার ভাই রুমাল দিয়ে মুখের ঘাম মুছতেন। ঘন ঘন
সিগারেট টানতেন। খুব অস্থির। অস্থিরতা তাকে তাড়া করেছে।
তারপরই বোধহয়
আন্ওয়ার ভাই বগুড়ায় বদলি হয়ে যান। তার জীবনের ওপর দিয়ে পারিবারিক ঝড় বয়ে গেছে।
শেষের দিকে একা লালমাটিয়া থাকতেন। মাঝেমধ্যে তরুণ কবিদের নিয়ে ধানমন্ডি ৩২
নম্বরের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখেছি।
আমাকে চিঠি
লিখতেন। ছোটকাগজে বড় বড় করে লিখতেন। সবকিছুই লেখালেখির জন্য। সারাক্ষণ ঘামছেন,
রুমাল দিয়ে বুক, মুখ মুছছেন। তরুণদের কবিতা, কিছুধ্বনি, রূপম নিয়ে সব কথা। একটা
জীবন উড়িয়ে দিয়ে চলে গেলেন।
আন্ওয়ার ভাই মারা
গেছেন অনেকদিন হলো। তার কথা প্রায়ই মনে পড়ে। তরুণ কবিদের, কবিতা নিয়ে উন্মাদনা
দেখে তার কথা মনে পড়ে। আন্ওয়ার ভাই আপনি যেখানেই থাকেন, ভালো থাকবেন। ‘সাত
আসমানের আদম সুরত তাকে তুমি তারা ফুলের ঝুমঝুমি দিও।’